তৃষ্ণা বসাক
যাদবপুর বিশববিদ্যালয় থেকে বি.ই‚ এম.টেক | সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ‚ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিদর্শী অধ্যাপনা তাঁর লেখনীকে বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে | গল্প‚উপন্যাসের পশাপাশি ছোতদের জন্য কল্পবিজ্ঞান লিখে থাকেন নিয়মিত |

খট খট খট

Banglalive

প্রথমে যেটাকে মনে হচ্ছিল ঘোড়ার খুরের শব্দ, ঘুম একটু পাতলা হয়ে আসতে মঞ্জিমা বুঝতে পারল ধুস, ঘোড়া আসবে কোত্থেকে? এ তো বংশীলালের উঠোনে লাঠি ঠোকার আওয়াজ। সারারাত উঠোনে চক্কর কেটে কেটে রাতপাহারা দেয় বংশীলাল। এই নিরাপত্তাটুকুর জন্যেই দরিয়াগঞ্জের এই পুরনো হোটেলটায় বারবার এসে ওঠে ও । এখানে নতুন দিল্লির ঝাঁ চকচকে পাঁচতারা হোটেলের চাকচিক্য নেই বটে, কিন্তু বোর্ডারদের সুখসুবিধের দিকে সর্বক্ষণ দৃষ্টি আছে। একা মেয়ে  নিশ্চিন্তে উঠতে পারে এখানে।

অবশ্য ঘোড়ার খুরের আওয়াজ এলেও অবাক হওয়ার কিছু ছিল না, অন্তত কয়েক মাস আগে। পুরনো দিল্লির রাস্তায় ঘোড়া, গরু, গাধা হামেশাই চোখে পড়ত। এখন নগরনিগম থেকে মূল শহরে এদের ঢোকা মানা করে দেওয়া হয়েছে। কী একটা অসুখ ছড়াচ্ছে নাকি এরা। হে-ফিভার নাকি? ভাবতেই নাক সুড়সুড় করে উঠল মঞ্জিমার। ফাল্গুন মাসের এই সময়টা এমন হয়। কেমন একটা জ্বরজ্বর ভাব। মাথা ঝিমঝিম করা। এই সময়টা বিশেষ করে কলকাতায় থাকা তো অসহ্য ব্যাপার। বন্ধুরা এসে টানাটানি করবে রং খেলার জন্যে। রঙে অ্যালার্জি আছে, বললেও শুনবে না। গত বছর সে চলে গিয়েছিল ঝাড়খণ্ড। একাই গিয়েছিল, একটা ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে। বন্ধুদের সঙ্গে গেলে তো সেখানেও রঙের হুল্লোড় হত। ভাগ্যিস, দলে সবাই বয়স্ক দম্পতি কিংবা নিঃসঙ্গ প্রৌঢ়। কেউ কাউকে রং দেয়নি, হোলির কথা মনেই ছিল না হয়তো।

কিন্তু প্রকৃতি তো ভোলেনি। মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধু পলাশ আর পলাশ। অত পলাশ একসঙ্গে আগে দেখেনি মঞ্জিমা। পৃথিবীটাকে মনে হচ্ছিল রক্তআবিরে রাঙানো চুনরি মেলে নৃত্য করা এক যুবতী। সেই পলাশ রাঙানো রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে ওর সারা শরীর শিরশির করছিল। লাতেহারের ওপর দিয়ে যখন যাচ্ছিল, তখন চোখে পড়েছিল একটা নিঃসঙ্গ, নিষ্পত্র শিমুল গাছ। এত পলাশের ভিড়ে কেমন একা একা দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে ওই শিমুল গাছটার মতো মনে হয়েছিল মঞ্জিমার। ফুল তো দূরের কথা, একটা পাতা পর্যন্ত নেই। থাকবে কোথা থেকে? একটা সতেজ চারাগাছের পাতাগুলো যদি মুচড়ে ছেঁড়া হয়? স্পর্শ এত ভয়ানক হতে পারে! কত বছর আগের ঘটনা, তবু স্মৃতি আজও ধরে রেখেছে সেই কলুষ…

 

ক্লাস ফাইভে উঠতে না উঠতেই উরু বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে দেখে চমকে ওঠা। শরীর জুড়ে বসন্তের অশান্ত কড়ানাড়া। বাড়ি থেকে নানান বিধিনিষেধ, এখানে যেও না, একা বেরিও না। তবু দোলের দিন পাড়ায় রং খেলতে বারণ ছিল না এতদিন। ক্লাস এইটে উঠতে সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। মন খারাপ  করে জানলায় দাঁড়িয়ে ছিল মঞ্জিমা। যত বেলা বাড়ছে, রাস্তা তত রঙিন হয়ে যাচ্ছে। নানান বয়সীদের আলাদা আলাদা দল, কাউকেই চেনা যাচ্ছে না। শুধু যখন কেউ মঞ্জিমাকে ডাকছিল নিচে নেমে রং খেলার জন্যে, তখনি বুঝতে পারছিল সে কে। একটু বেলা হতে মা বলল ‘এখন রাস্তা খানিক্টা ফাঁকা হয়েছে, যা মেসোমশাইয়ের পায়ে আবির দিয়ে আয়’। পাঁচ ছটা বাড়ির পরে অমল মেসোমশাই আর হাসি মাসীমা থাকেন, মার কীরকম যেন দিদি হন হাসি মাসীমা, প্রতিবছর দোলে ওদের পায়ে আবির দিতে যায় মঞ্জিমা। মার কথায় সে একটা শত পুরনো রং চটা সালোয়ার কামিজ পরে নিল, ওপরে ওড়না চাপাতেও ভুলল না। ওঁদের পায়ে আবির দিয়ে মঠ, মুড়কি বুটকড়াই খেয়ে ফিরছিল, হঠাত চার-পাঁচটা ছেলে অতর্কিতে তাকে ঘিরে ধরল। সারা গায়ে বাঁদুরে রং, গন্ধে টের পেল নেশা করে আছে। তারা মঞ্জিমাকে চেপে ধরে রং মাখাতে লাগল। তাদের হাত ওর সারা শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। একজন কামিজের নিচে হাত গলিয়ে ওর সদ্য জাগা চরের মতো বুক দুটো সাংঘাতিক জোরে চেপে ধরল। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল মঞ্জিমা। শুধু যন্ত্রণা নয়, ভিজে স্যাঁতসেঁতে নোংরা হাতের স্পর্শে তার শরীর ঘেন্নায় শিউরে উঠছিল । সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে চাইছিল, কিন্তু গলা দিয়ে কোন স্বর বেরোল না। আতঙ্কে তার শরীর অবশ হয়ে আসছিল। সে তার মধ্যেই হতবাক হয়ে দেখল আশপাশের বাড়ির বারান্দা থেকে দ্রুত লোকজন ঘরের ভেতরে চলে যাচ্ছে, জানলা দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এক এক করে। সে বুঝতে পারছিল কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে না। ছেলেগুলো ওকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছিল। একজন ওর সালোয়ারের দড়ি ধরে টান মারল। ঠিক সেই মুহূর্তে মহাপ্রভুতলা থেকে সংকীর্তনের একটা বড় দল খোল করতাল বাজিয়ে আবির ছড়াতে ছড়াতে রাস্তায় দেখা দিল। দৈবপ্রেরিতের মতো মনে হয়েছিল তাদের। বিরাট সেই দলটাকে আসতে দেখে ভয় পেয়ে ছেলেগুলো ওকে ফেলে দৌড় দিল। মঞ্জিমা তবু  ওইভাবেই দাঁড়িয়ে রইল  আরও কতক্ষণ। তার পা দুটো যেন মাটিতে গেঁথে গিয়েছিল।

আরও পড়ুন:  প্রেম, ভূত ও চুমু

সেই দিনটা তার জীবনের শেষ দোল শুধু নয়, শেষ পুরুষস্পর্শও। অথচ সময়টা তো তখন ছেলেদের নিয়ে রঙিন জাল বোনবার। বন্ধুদের কানাকানি, সদ্য দেখা আমির খানের কয়ামত সে কয়ামত তক, সাইকেল আরোহীর চোরা দৃষ্টি -তার মনটাকে তো তখন হাল্কা বুদবুদের মতো ভাসিয়ে রেখেছিল। হঠাত নোংরা কয়েকটা হাত বুদবুদগুলো ফাটিয়ে দিল।

 

গতবছর চারদিকে পলাশের ঘোর নিয়ে সে যখন রাঁচি শহর ছাড়িয়ে বুন্দুর সূর্য মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াল, তার যেন চোখ ঝলসে গেল। মূল মন্দিরের সামনে সূর্যের রথের সামনে সাতটি ঘোড়ার মূর্তি। কী বিশাল পুরুষাঙ্গ ঘোড়াগুলোর। সারা শরীরে রক্ত ঝিমঝিম করে উঠল। এক পাশে বিবাহ মণ্ডপে বিয়ে হচ্ছিল তখন। আশেপাশের কোন গ্রামের প্রায় কিশোর বর কনে। কনের পলাশ রঙের শাড়ি আর চারপাশে হলুদ মাখা চাল ছিটিয়ে। তার মধ্যে পুরুষ সংসর্গরহিত মঞ্জিমা লাতেহারের সেই নিষ্পত্র শিমুলটার মতো দাঁড়িয়ে ছিল।

এবছর কলকাতার রঙের হুল্লোড় থেকে পালাতে নিজে উদ্যোগ নিতে হয়নি। অফিসের একটা কাজ পড়ে গেল দিল্লিতে। একটা ফ্যামিলি বিজনেস, নিজেদের ঢেলে সাজাচ্ছে। যার একটা বড় ধাপ কম্পিউটারাইজেশন। তাদের সঙ্গে কথা বলতেই মূলত আসা। এছাড়াও কয়েকটা ক্লায়েন্ট মিট আছে। এরা শাড়ি মার্চেন্ট। কোমল শাড়িস।  বাড়ি অফিস দুইই দরিয়াগঞ্জে। তাই আগ্রা হোটেলের ওঠাই তার পক্ষে সুবিধাজনক। এমনিতে দিল্লিতে এলে এখানেই ওঠে সে। ঘিঞ্জি গলিঘুঁজি পেরিয়ে সাদা গোলাকার দোতলা হোটেল, সামনে অনেকখানি উঠোন, পুরনো আর রহস্যময়। হঠাত  করে ঢুকে পড়লে চোখে ভারি আরাম লাগে।

পরশু রাজধানীতে চেপে কাল সকালে পৌঁছেছে মঞ্জিমা, বিকেলেই  গাড়ি পাঠালেন মি. সাংঘি। গাড়ি থেকে যে নামল, তাকে দেখার জন্যে তৈরি ছিল না মঞ্জিমা। এ তো পুরো রণবীর কাপুর। তারপর যখন শুনল অক্সফোর্ড বিজনেস স্কুল ফেরত, তখন সে রীতিমতো অবাক হয়ে গেল। সাংঘি পরিবারের এই নতুন প্রজন্ম!। এ শাড়ির বিজনেস দেখবে! নাম জিজ্ঞেস করতে মুচকি হেসে বলল ‘রাহুল। নাম তো শুনা হোগা’

কেজো মুখোশটা সরিয়ে মঞ্জিমা ঝরঝর করে হেসে ফেলল। সাংঘি ম্যানসনের সামনে গাড়ি থামতে রাহুল গাড়ির দরজা খুলে হাত বাড়িয়ে দিল। ধরবে না মনে করেও হাতটা ধরে ফেলল মঞ্জিমা আর ধরতেই ওর সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। পুরুষস্পর্শ বলে যে ক্ষত ওর স্মৃতি ধরে রেখেছে, এটা তার থেকে কত অন্যরকম। নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করল সে। তার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে রাহুল বলল ‘ বড়ে বড়ে শহরো মে ইয়ে সব ছোটে ছোটে বাত হো যাতে হ্যায় সেনোরিটা!’

মিটিং -এর সময় মঞ্জিমা রাহুলের দৃষ্টির উত্তাপ ওর শরীরে টের পাচ্ছিল। ও বারবার অকারণে নিজের টপটা টানছিল। ওঠার সময় মিঃ সাংঘি বারবার করে বললেন পরের দিন ওঁদের বাড়িতে সারাদিনের জন্যে ওর হোলির নেমন্তন্ন।

আরও পড়ুন:  শাড়ি

‘হোলি!’ শব্দটা শুনলেই সারা শরীরে নোংরা স্যাঁতসেঁতে হাতের স্পর্শ পায় মঞ্জিমা। ওর সদ্য ফোটা ফুলের মতো বুক মুচড়ে নেবার যন্ত্রণা ওকে ছেয়ে  ফেলে। ও খানিকটা রুক্ষ ভাবেই বলে

‘সরি মিঃ সাংঘি। আমি হোলি খেলি না। আমার রঙে অ্যালার্জি আছে। ‘

‘কোয়ি বাত নেহি বেটি। আপ স্রিফ আইয়ে। আপকো খেলনে নেহি হোগা। ইধর নাচা গানা খানা পিনা হোগা। একবার তো দেখ লিজিয়ে হামারা স্টাইল কি হোলি’

মঞ্জিমা আর একটু কঠিন স্বরে বলল ‘সরি মিঃ সাংঘি। কাল আমি আসতে পারব না। আমাকে একটা কনফারেন্স কল নিতে হবে’

মিঃ সাংঘির স্মিত মুখে সত্যিকারের দুঃখ ও বিস্ময় খেলে গেল। তিনি নিশ্চয় ভাবলেন একটা চব্বিশ পঁচিশ বছরের তরুণী হোলির দিনেও কাজ করবে! কি অনাসৃষ্টি কাণ্ড রে বাবা!

রাহুল সাংঘি মাঝখানে কোন কথা বলেনি। ফেরার পথেও সে চুপচাপ। মঞ্জিমারই কেমন অস্বস্তি লাগছিল। সে আবহাওয়াটা স্বাভাবিক করার জন্যে বলল

‘আপনার দাদাজীকে বলবেন কিছু যেন মনে না করেন। আমি সত্যি হোলি খেলি না।’

রাহুল কোন উত্তর না দিয়ে একটু হাসল। গাড়ি আগ্রা হোটেলের সামনে এসে দাঁড়াল। রাহুল আগে নেমে দরজা খুলে দিল। মঞ্জিমা আবছা হাসির চেষ্টা করে বলল ‘বাই’

তার উত্তরে রাহুল বলল ‘ আপনি কাল সন্ধেবেলা তৈরি হয়ে থাকবেন। আই উইল কাম অ্যাট ডট সিক্স।’

মঞ্জিমাকে হতচকিত করে গাড়িটা চলে গেল।

 

বংশীলালের লাঠি ঠোকার শব্দে মাঝরাতে একবার ঘুম ভেঙেছিল মঞ্জিমার। তারপর অনেকক্ষণ ঘুম আসেনি। ছটফট করতে করতে একসময় আবার ঘুমিয়েও পড়েছিল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে স্বপ্ন দেখল বুন্দুর সূর্য মন্দিরের। সাতটা ঘোড়া তার দিকে এগিয়ে আসছে, ওদের অতিকায় পুরুষাঙ্গ তার মুখের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। স্বপ্নের মধ্যেই টের পাচ্ছিল সে ভিজে যাচ্ছে। তার ঊরুসন্ধির সোনালি বদ্বীপে ছলছল করছে জল।

ঘুম ভাঙল হোয়াটসঅ্যাপ আর মেসেঞ্জারে অগুন্তি মেসেজ ঢোকার টুংটাং আওয়াজে। হ্যাপি হোলি। হ্যাপি হোলি। মোবাইলের স্ক্রিন জুড়ে শুধু রঙের বন্যা। এত রং আর আনন্দ আছে পৃথিবীতে! হঠাত একটা সেন্ডার নেম দেখে চমকে গেল সে। রাহুল সাংঘি! অনেক ইমেজই আজকাল ডাউনলোড করে না, এত জায়গা খায়। রাহুলের পাঠান জি.আই.এফ. ছবিটা সে ক্লিক করল পরম কৌতূহলে।  ছবিটা খুলতেই তার কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। সম্ভবত রবি বর্মার বায়োপিক রং রসিয়ার দৃশ্য। ন্যুড মডেলটির গায়ে পোশাক বলতে শুধু রং আর সেই দিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছেন শিল্পী। রাহুল সাংঘি কি ক্যাসানোভা টাইপ? সে কি ভাবছে এই  বাইরে থেকে দেখতে নরমসরম বাঙালি মেয়েটা এতই সস্তা, তাকে এসব নোংরা ছবি পাঠালেই কাত হয়ে যাবে? কিন্তু ছবিটা সত্যি সত্যি নোংরা ভাবতেও পারছিল না তো। বারবার ওর চোখ ওদিকেই চলে যাচ্ছিল। জীবনে এই প্রথম ওর মনে হল, শরীর শুধু ভয় পাওয়ার, আগলে রাখার  জিনিস নয়, শরীর একটা সেলিব্রশন। রং সেই উৎসবের ভাষা।

সারা দিন কেমন একটা গা ম্যাজমেজে ভাব। যেন খুব জ্বর হয়েছে ওর। এমনিতে আগ্রা হোটেলে এই সময় বোর্ডার খুবই কম। দোতলায় একটি পরিবার ছিল, মেয়েকে কোন কম্পিটিটিভ পরীক্ষা দেওয়াতে এসেছিল ভুবনেশ্বর থেকে, তারাও কাল চলে গেছে। নিচের ঘরগুলোয় দু-চারজন আছে বোধহয়।

ঘর থেকে বারান্দায় এসে বসল মঞ্জিমা। হোটেলটার চারপাশে লোকবসতি। সামনের বাড়ির ছাদে প্রবল হোলি খেলা চলছে। আবির, রঙের পিচকিরি তো আছেই, ছাদের এককোণে চৌবাচ্চায় রং গোলা, সবাইকে পালা করে চুবনো হচ্ছে। শুধু বাচ্চাদের নয়, বড়দেরও। বাড়ির মাঝবয়সী কর্তা, হঠাৎ স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কামিজের ফাঁক দিয়ে একমুঠো আবির ঢুকিয়ে দিয়ে হেঁড়ে গলায় গেয়ে উঠল ‘রং বরষে ভিগি চুনরবালি রং বরষে’ । গা শিরশির করে উঠল মঞ্জিমার। জোর করে কাজে মন বসানোর চেষ্টা করল, পারল না। মনের মধ্যে একটা অপেক্ষা তৈরি হয়েছে। কেউ আসবে, অন্তত একটা ফোন।

আরও পড়ুন:  বাঘ-টাঘ

অনেক ফোন এল। কাজের, অকাজের। কিন্তু প্রতীক্ষিত ফোনটা এল না। দুপুরে খেয়ে উঠে ভাবল একটু গড়িয়ে নেয়। অফিস থাকলে এই ভাতঘুমের জন্যে কত আফসোস থাকে।  অথচ আজ কিছুতেই ঘুম এল না, সন্ধেবেলা না যাওয়াটা কি খুব অভদ্রতা হবে? একবার ঘুরে এলে কি হয়? কিন্তু সমস্যা হল কী পরে যাবে? সবই তো জিন্স আর টপ এনেছে। একটা অবশ্য এমব্রয়ডারি করা সালওয়ার আছে। গেলে ওটাই পরতে হবে। কিন্তু ম্যাচিং দুল টুল কিছুই নেই। অবশ্য বিকেলে বেরিয়ে কিনে নেওয়া যায়। কিন্তু কেন আদৌ? কোথাকার কে যে তার জন্যে এত সাজগোজ লাগবে?

টুং করে হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ ঢুকল। বুকটা ধক করে উঠল অমনি।  তাড়াতাড়ি খুলে দেখল রাহুল সাংঘি। লিখেছে-

‘সরি। দি ইমেজ ওয়াজ সেন্ট টু ইউ বাই মিস্টেক। ইট ওয়াজ ইন্টেন্ডেড ফর মাই জি.এফ. হু লিভস ইন অস্ট্রেলিয়া নাউ। এনিওয়ে হ্যাপি হোলি।’

ঠাস করে চড় বসাল যেন কেউ গালে। মনে হল ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তবু সে মাথা ঠান্ডা করে লিখল ‘ইটজ ওকে। এনিওয়ে হ্যাপি হোলি’

শরীরে জ্বালা জ্বালা ভাব নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল একসময়। ঘুম থেকে উঠে চা খেল, এখন অনেক ঝরঝরে লাগছে। ঠিক করল নিতে এলে যাবে। তবে বাহারি সালওয়ার নয়, টপ আর জিন্স পরেই যাবে, চোখে কোল আর ন্যুড লিপ্স। রোজ যেমন থাকে তেমনি।

দিল্লিতে সন্ধে দেরি করে নামে। কিন্তু আজ তাড়াতাড়ি চারদিক অন্ধকার করে এল কেন? আকাশের দিকে তাকিয়ে চমকে গেল মঞ্জিমা। তীব্র নীল রঙের মেঘ, যেন রাধার অভিসারের শাড়ি। তখনি শোঁ  শোঁ করে ঝড় উঠল। চোখে বালি ঢুকছিল,  চোখ বন্ধ করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল মঞ্জিমা। সারা শরীরে ঝড়ের আদর মাখছিল বুঁদ হয়ে। একটু কি নিশ্চিন্তও  লাগছিল না এই ঝড়ের মধ্যে কেউ নিতে আসতে পারবে না ভেবে?

বারান্দাটা গোল হয়ে ঘরগুলোকে ঘিরে আছে। মঞ্জিমা দাঁড়িয়ে ছিল পেছন দিকটায়। এদিকটায় প্রচুর গাছ। ঝড়ের দাপটে গাছগুলো নুয়ে পড়ছে আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। মঞ্জিমা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল গাছগুলোর প্রাণপ্রাচুর্য।

হঠাৎ সে টের পেল নিচের সিঁড়ি দিয়ে কেউ উঠে আসছে। এখন কে আসতে পারে? রুম সার্ভিস তো সকালেই হয়ে গেছে। চায়ের পাটও শেষ। তার তো বলাই আছে কেউ যেন অকারণে তাকে বিরক্ত না করে।

পায়ের শব্দটা এগিয়ে আসছে। ধীরেসুস্থে কিন্তু অমোঘ গতিতে। মঞ্জিমা  জানে কে আসছে। বারান্দার রেলিঙে ঠেস দিয়ে সে অবশ্যম্ভাবীর প্রতীক্ষা করছিল। দীর্ঘদেহী সেই পুরুষ ওর সামনে এসে ডান হাতের মুঠো ওর মুখের সামনে খুলে ধরল।  পুরনো আমলের হোটেলের আলোগুলোও কবেকার কে জানে। সেই মিটমিটে বাল্বের আলোয় রাহুলের মুঠো ভরতি আবিরের রংটা যেন ঠিক বুঝতে পারল না মঞ্জিমা। তবু সে বলল ‘মুঝে রং দিজিয়ে না’

রাহুল ওর গালে মাখাতে গেল সেই আবির, মঞ্জিমা বাধা দিয়ে বলল ‘উধর নেহি, ইধর’

এই বলে সে তার লং স্কার্টের ওপর পরে থাকা শার্টের ওপরেরর দুটো বোতাম পটাপট খুলে ফেলল।

তারপর রাহুলের হাতটা তার পলাশ রঙের দুটি স্তনের গহনে টেনে নিয়ে বলল ‘ অ্যায়সে রং দো, জ্যায়সে কোয়ি দেখ না পায়ে’

ঝড়ের গতি ক্রমশ বাড়ছিল।

 

4 COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ