কালী মূর্তি বিশ্বতত্ত্বের দার্শনিক রূপ

আজ থেকে প্রায় তিনশ বছর আগে কালীভক্ত এক সাধক কবি লিখেছিলেন, ‘বসন পরো মা’। বাংলা ভাষায় এ এক বৈপ্লবিক সঙ্গীত, যেখানে সন্তান তার জন্মদাত্রী মাকে বসন পরতে বলছে। পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র যে সম্পর্কটি মানুষ তৈরি করে নি সেটিই হল মা, সেই ‘মা’ই দেবতা রূপে সম্পুর্ণ নগ্ন! জন্মদাত্রী জননীর এই রূপ কেন ? কেন তিনি উলঙ্গিনী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একটু পিছন ফিরে তাকাতে হবে যেখান থেকে বা যে সময় থেকে কালী মূর্তি জনমানসে দেবীরূপে আবির্ভূতা হলেন।

হিন্দু শাস্ত্রমতে বেদকে ধর্মীয় উত্তরণের প্রাথমিক স্তর বলে ধরা হয় যেখান থেকে মানুষ ধর্মীয় আচার ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রাকে একটা শৃঙ্খলিত ধারায় বাঁধতে শুরু করে। এই সময়েই সমাজজীবনে আসে নিয়ম, নীতি, নিষ্ঠা এবং বিধান। আজকের দৃষ্টিভঙ্গিতে সেইসব বিধান একেবারে অপ্রাসঙ্গিক বা চুড়ান্তভাবে প্রাসঙ্গিক হলেও সেই সময়ে এই ধর্মীয় প্রচেষ্টার একান্ত প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল আধ্যাত্মিক আড়ম্বরের যেগুলি মুলত যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমেই সম্পন্ন হত। সমাজব্যবস্থার এই ভক্তিরসাত্মক বাতাবরণের মধ্যে তখনও কিন্তু কোন দেবদেবীর মূর্তির জন্ম হয় নি। মানুষ তখন বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি যেমন, অগ্নি, বায়ু, জল, সুর্য বা পৃথিবীকেই দেবতা রুপে আরাধনা করতো এবং আগুনে আহুতির মাধ্যমে সমাজের মঙ্গল কামনায় ব্রতী হত। এর পরবর্তীকালে যাকে আমরা বেদান্ত বা উপনিষদের যুগ বলে থাকি সেখানেও কোথাও কোন দেব-দেবীর মূর্তির অস্তিত্ব ছিল না। আমাদের আরাধ্য আজকের এই দেবদেবীরা সশরীরে আবির্ভূত হল বা মানুষ তার কল্পনার রথে চড়িয়ে দেবতাদের এই পৃথিবীতে নিয়ে এল উপনিষদের যুগেরও অনেক পরে অর্থাৎ পুরাণের যুগে। এই সময়েই মানুষ তাঁর কল্পনা ও দর্শনকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন শক্তিকে বাস্তবের মূর্তিতে রূপ দিতে শুরু করলো। যেগুলির সবটাই ছিল প্রতীকী। বিশ্বরহস্য সন্ধানের এক বলিষ্ঠ নজির এই কল্পিত ভাস্কর্য, যেখানে দেবদেবীর প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গই দক্ষ মানুষের দার্শনিক ভাবধারার প্রতীক।

নগ্ন কালী মূর্তির উদ্ভবও এই পুরাণের যুগেই ঘটেছিল, যার পুরোটাই বিশ্বতত্ত্বের দার্শনিক রূপ। কালীর দেহ, হাত, পা, খোলা চুল বা পরনের কাটা হাত, কাটা মুন্ড ইত্যাদি সবকিছুই খুব যত্ন নিয়ে, ভেবেচিন্তে নির্ধারিত হয়েছে। বলা যায়, বেশ কিছু বছরের অক্লান্ত গবেষণা এবং দর্শনভিত্তিক গল্প তৈরি করতে করতে এই যুক্তিযুক্ত মূর্তির জন্ম। এই অসাধারণ মূর্তিকে মানুষের আরাধ্য দেবীরুপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বেশ কিছু কাহিনির সাহায্য নেওয়া হয়েছে, যেগুলোকেই আমরা পুরাণ বলে জানি কিন্তু কালী আসলে কাল বা সময়ের প্রতীক, যে সময় অসীম অনন্ত, যার কোন আকার নেই। যে সময়ের কোন দিক, তল বা উচ্চতা নেই। সেই নিরাকার অনন্ত ব্রহ্মকে সাধারণের বোধগম্য করার একান্ত প্রচেষ্টা থেকেই আবরণহীন কালী মূর্তির আবির্ভাব। এই মূর্তির গায়ের রঙ কালো বা গাঢ় নীল, যা কিনা শূন্যতার প্রতীক। যে শূন্যতাই এই বিশ্বের একমাত্র সরল, স্বাভাবিক সংজ্ঞা। এই পৃথিবীর প্রতিটি চেতনা বা অবচেতনা অনিবার্যভাবে এক প্রবল শূন্যতায় বিমূর্ত, যেখানে নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে চেতন অবচেতন সবকিছুই বিলীন। গাঢ় নীলও এই কালো রংকে প্রতিনিধিত্ব করে… যেটি অসীমের প্রতীক। এই অসীমকেই নজরুল ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর গানে, ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন’।

চতুর্ভূজা দেবীর চারটি হাতের মধ্যে দুই হাতে থাকে বরাভয় এবং আশীর্বাদ। দেবী হিসেবে ভক্তকুলকে তিনি এগুলির মাধ্যমেই বেঁচে থাকতে সাহায্য করেন। তার অন্য দুই হাতে থাকে খড়্গ এবং কাটা মুন্ড। এই খড়্গের সাহায্যে দেবী অজ্ঞানতাকে হত্যা করে জ্ঞানের জন্ম দেন, যে জ্ঞান সংসারের মোহবন্ধনকে পার করে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে। যে জ্ঞান মানুষের মস্তকে থাকে, সেই কাটা মস্তক হাতে নিয়ে দেবী মানুষের অজ্ঞান মস্তিষ্কে বিশেষ জ্ঞান দান করছেন। দেবীর লাল জিভ সাদা দাঁত দিয়ে চেপে থাকার মানে ত্যাগের মাধ্যমে ভোগকে দমন করা, অর্থাৎ ভোগকে নিয়ন্ত্রণ করে জীবনের প্রকৃত অর্থ খোঁজার নির্দেশ। এই মূর্তির গলায় পঞ্চাশটি কাটা মুন্ড থাকে, যেটি পঞ্চাশটি বর্ণ অর্থাৎ ভাষার প্রতীক, যার মাধ্যমে জ্ঞানের প্রকাশ ঘটে। কোমরে ঝোলানো কাটা হাত কর্মের চিহ্ন, মানুষের জীবনে কর্মই একমাত্র মুক্তির পথ, যার মাধ্যমে সে জীবনত্তোর পর্বে প্রবেশ করতে পারে। এই মূর্তির তিনটি চোখ আলোর সন্ধান দেয়। পৃথিবীতে আলো মুলত তিনটি উৎস হতে আসে – সূর্য, চন্দ্র এবং অগ্নি। এই আলো থেকেই মানুষ বেঁচে থাকে, বাঁচিয়ে রাখে। কালী ঠাকুরের ত্রিনয়ন সেই আলোর কথাই বলে।

এই পৃথিবীর স্বাভাবিক অস্তিত্ব সাধারণভাবে দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল, যার একটি হল স্থিতি আর একটি হল গতি। এই দুইয়ের গাণিতিক বিক্রিয়ায় সৃষ্টি সচল থাকে। কালী মূর্তিতে দেবী শিবের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। এখানে শিব স্থিতির প্রতীক আর কালী গতির। পায়ের তলায় সময়কে বেঁধে রেখে তিনি এই পৃথিবীকে ধ্বন্সের হাত থেকে রক্ষা করছেন।

এভাবেই দার্শনিক ভাবনা থেকে জনমানসে কালী মূর্তির আবির্ভাব। এক অসাধারণ তাত্ত্বিক ভাস্কর্যকে একটি মূর্তির মাধ্যমে মানুষের কাছে ইশ্বর করে তোলার পিছনে সমাজগঠনের পরিকল্পিত লক্ষ্যই কাজ করেছিল এটা সঠিক, কিন্তু সেই লক্ষ্যই বর্তমানে উপলক্ষ্য হয়ে সমাজজীবনের পিছনের সারিতে। আজ মানুষের কাছে আড়ম্বর সর্বস্ব মেকি পূজাচারই ধর্ম, যেটি কালক্রমে মানুষের কাছে একটা দায় হয়ে উঠেছে, উঠছে। এই ধর্ম কতটা মানুষের মঙ্গল ঘটায় সে সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। কালী মূর্তি বা অন্যান্য আরও দেবদেবীর মূর্তি পিছনে যে দর্শন বা যে সামাজিক গবেষণা ছিল সেটা কিন্তু আজ একেবারেই মূল্যহীন। মৃন্ময়ী মূর্তিকে মাধ্যম করে দার্শনিক ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে বিশ্ব-রহস্য সমাধান করার যে প্রক্রিয়া সেখানে যুক্তি তর্কের অবকাশ থাকলেও দার্শনিক সদিচ্ছার অভাব ছিল না। তাই কালী মূর্তি নগ্ন হলেও দেবী হয়েই বেঁচে আছেন।

জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here