ভালবাসলে এভাবেই বাসতে হয়, যাতে যুগ যুগ ধরে সকলের আশ্চর্যের বিষয় হয়ে থাকে সে ভালবাসা

Banglalive

সিরফ ইশারো মে হোতি মহব্বত আগর
ইন আলফাজুন কো খুবসুরত কৌন দেতা ?
বাস পাত্থর বান কে রেহ জা তা তাজমহল
আগার ইশক ইসসে আপনি পেহচান না দেতা

একটি স্মৃতি শৌধ । আর তাতেই অমর হয়ে আছেন শাহজাহানের জান মুমতাজ ।  অমর হয়ে আছে শাহজাহানের ভালবাসা ।ভালবাসার উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাজ । যমুনা কিনার যেমন কৃষ্ণ-রাধার লীলার সাক্ষী, তেমনই তো শাহজাহান-মুমতাজের প্রেম জীবনের সাক্ষ্য বহন করে।

আগর হাম না হোতে তো গজল কৌন কেহতা
আপকে চেহরে কো কামাল কৌন কেহতা
ইয়ে তো করিশমা হ্যায় মুহাব্বত কা
ওয়ারনা পাথ্থর কো তাজমহল কৌন কেহতা

একেবারেই সাধারণ এক মেয়ে আরজুমন্দ বানু বেগম । তাঁর বাবা সম্রাট জাহাঙ্গীরের শ্যালক । নূরজাহানের ভাই। উনিশে পৌঁছে আরজুমন্দের সৌন্দর্য সকলের নজর কেড়েছিল। পড়শিদের খুব প্রিয়। স্বভাব চরিত্রেও মিষ্টি মেয়ে আরজুমন্দ । একদিন তাঁকে দেখে ফেলেন যুবরাজ খুররম। বিয়ের প্রস্তাব আসে। ধুমধাম করে বিয়ে হয় খুররম আর আরজুমন্দের । আর এরপরই শুরু হয় দুনিয়া কাঁপানো সেই প্রেম কাহিনী। খুররম আর আরজুমন্দের প্রেম কাহিনী । সেদিনের মত যে প্রেম কাহিনী নিয়ে আজও ঈর্ষা প্রকাশ করেন অনেকেই। হয়তবা গালিবের কথায় আরজুমন্দকে পাওয়ার পর নিজের প্রতি নিজেরও ঈর্ষা হয়েছিল খুররমের—

দেখনা কিসমত,
কি আপ আপনেপে রশক আয় যায়ে হ্যায়,

ম্যায় উসে দেখু
ভলা কব মুঝসে দেখা যায়ে হ্যায়।

সোহাগ করে আরজুমান্দের নাম মুমতাজ রাখেন খুররম । খুররম নিজে হন সম্রাট শাহজাহান । তবে মুমতাজের আগেও আর একটি বিয়ে ছিল শাহজাহানের । কিন্তু মুমতাজের প্রেমে কার্যত পাগল হয়ে যান তিনি ।

জান তুম পর,
নিসার করতা হুঁ
ম্যায় নেহি জানতা
দুয়া কয়া হ্যায়

আরও পড়ুন:  রীতি অনুযায়ী নামের মধ্যে থাকতে হবে পূর্ব পুরুষের নাম‚ কী নাম হলো প্রিন্স উইলিয়মের সদ্যোজাত ছেলের

তবে সব কিছু যেমন শেষ হয়, এটাও শেষ হল । মাত্র ১৯ বছরের বিবাহিত জীবন শেষ । চোদ্দতম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হল মুমতাজের। শোকে পাথর হয়ে গেলেন শাহজাহান । জয়নাবাদ বাগানে সমাহিত করা হল খুররমের প্রিয় মুমতাজকে (পরে অবশ্য তাজমহলেই সমাহিত করা হয়)।

বড়ই একা হয়ে গেলেন সম্রাট । রাজ্য আছে, প্রজা আছে, হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, হীরে, মণি-মাণিক্য-জহরত—তবু একা সম্রাট । এভাবেই কাটল দু’বছর ।

প্রিয়তমার স্মৃতিতে একটি স্মৃতিশৌধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিলেন শাহজাহান । কিন্তু কোথায় হবে এই স্মৃতিশৌধ ? ঠিক হয় যমুনা কিনার। মহারাজা জয়সিংহের একটি জমি পছন্দ হয় শাহজাহানের। মধ্য আগ্রায় একটি প্রাসাদের বিনিময়ে সেই জমি কিনে নেন শাহজাহান। ঈশা মহম্মদের নকশার ওপর ভিত্তি করেই তাজমহল তৈরি হয় প্রায় কুড়ি বছর ধরে । তবে প্রিয়তমার স্মৃতিতে বানানো তাজে একাধিক বিতর্কের কালো ছাপ পড়ে । নকশাকার ঈশা মহম্মদ তাজমহলের নকশাটি তৈরি করেন তাঁর স্ত্রীকে উপহার দেওয়ার জন্য । ঈশা মহম্মদ আর তাঁর স্ত্রীকে উপহারের জন্য কোনও নকশায় আর তৈরি করতে পারেননি । কারণ, তাজমহলের নকশা কিনে নেওয়ার পর নকশাকারের চোখ খুবলে নেন শাহজাহান। যেমন কব্জি কেটে নেওয়া হয় তাজমহল নির্মাণে নিযুক্ত প্রায় সমস্ত শ্রমিকের। এর কারণ যাতে আর দ্বিতীয় তাজমহল তৈরি না হয়।

পি এন অক তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘তাজমহল : দ্য ট্রু স্টোরি’-তে লিখছেন, এই আশ্চর্য স্মৃতিশৌধ আদতে শাহজাহানের উদ্যোগে তৈরিই হয়নি। আগে থেকেই ছিল। এটি ছিল তেজ মহালয়, একটি মন্দির। সেখান থেকেই তাজমহলের নামকরণ হয়েছে । শাহজাহান সেই
মন্দিরটিকেই তৈরি করেন প্রিয় বেগমের স্মৃতিশৌধ হিসেবে । তবে এসব বিতর্ক শাহজাহানের রূপকথার ভালবাসার কাহিনীর কাছে খুবই ম্লান  ।

বহুদিন একভাবে শুয়ে আছো, ভারতসম্রাট ।
বহুদিন মণিমুক্তো, মহফিল, তাজা ঘোড়া, তরুণ গোলাপ
এবং স্থাপত্য নিয়ে ভাঙাগড়া সব ভুলে আছো ।
সর্বান্তঃকরণ প্রেম, যা তোমার সর্বোচ্চ মুকুট, তাও ভুলে গেছো নাকি ?
পাথরের ঢাকনা খুলে কখনো কি পাশে এসে মমতাজ বসে কোনোদিন ?
সুগন্ধী স্নানের সব পুরাতন স্মৃতিকথা বলাবলি হয় কি দুজনে ?

আরও পড়ুন:  হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ২১ বছর বয়সে মৃত্যু প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ডাক্তারি পড়ুয়া ছেলের

হ্যাঁ প্রিয়তমার পাশে শুয়ে আছেন শাহজাহান । তাঁকেও সমাহিত করা হয় এখানে । হয়ত ভালবাসার দিনগুলির স্মৃতি রোমন্থন করেন দুজনে । রাগ হয়, অভিমান হয়, আবার কাছাকাছিও আসেন খুররম আর আরজুমান্দ । আজও । কয়েকশো বছর পর । প্রেমের কাছে সময় যে বড়ই তুচ্ছ। আর এসবের সাক্ষী হয়েই দাঁড়িয়ে আছে তাজমহল।
          হীরা মুক্তামাণিক্যের ঘটা
যেন শূন্য দিগন্তের ইন্দ্রজাল ইন্দ্রধনুচ্ছটা
          যায় যদি লুপ্ত হয়ে যাক,
              শুধু থাক্‌
          একবিন্দু নয়নের জল
     কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল
              এ তাজমহল।

NO COMMENTS