শনিবাসরীয় ব্রিগেডের সূত্রে মিলবে কি ভোটযন্ত্রের সমীকরণ ?

১৯ জানুয়ারি শনিবাসরীয় ব্রিগেড সমাবেশ কি শুধুই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শো ছিল । এ কথা ঠিক যে মমতা তাঁর ২১ জুলাই-এর মঞ্চ থেকে ১৯ জানুয়ারির ব্রিগেডের ডাক দিয়েছিলেন। সেদিক থেকে তিনিই
উদ্যোক্তা। লক্ষ্য ২০১৯-এর লোকসভা ভোট। আদতে যা কেবল রাজ্যের ইস্যু নয়, দিল্লির এবং রাজধানীতে পালা বদলের। ওই ভোট ইস্যুর মুখ পুরোপুরি দিল্লির দিকে ঘুরিয়ে দিতে হবে। রাজ্যের মানুষকেও বোঝাতে হবে, তাই ব্রিগেড।

সমাবেশ মঞ্চ তৈরির আগে খুঁটি পুজো, নারকেল ফাটানো ইত্যাদির মধ্য দিয়ে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের আবহ রচনা করে সমাবেশকে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা আসলে তীব্রভাবে বিজেপিকে নিশানা করা । এবং লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁর উদ্যোগে এই সমাবেশকে মমতা তুলে ধরতে চেয়েছিলেন বিরোধী ঐক্যের নিদর্শন হিসাবেও ।

ব্রিগেডে হাজির হওয়া মানুষ, সর্বভারতীয় নেতাদের উপস্থিতি, মমতার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তা এসব কিছুই বলে দেয় তাঁর চাওয়ার প্রায় সবটাই পেয়েছেন তিনি । মমতা কি ভোটের ইস্যু দিল্লির দিকে ঘুরিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছেন ? এ প্রশ্নের জবাবে অন্তত এ কথা তো বলতেই হবে যে ২৩টি দলের প্রত্যেকের গলায় নানা সুরেই শোনা গিয়েছে মোদির চরম বিরোধিতা । সেইসঙ্গে
তারা মোদি বিরোধী ঐক্য জোটের জন্য মমতার উদ্যোগকে যেভাবে গ্রহণ করেছেন এবং সমাবেশে মানুষের ঢল দেখে যতখানি আশ্চর্য হয়েছেন তা প্রশংসার ভাষায় প্রকাশ করতে কার্পণ্য করেননি ।

কেবল তাই নয়, বেশ কয়েকজন সর্বভারতীয় নেতা তাদের বক্তব্যে পশ্চিমবঙ্গ প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং তাঁর রাজ্যে যে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত সে কথাই বলেছেন।
বামেরা এই সমাবেশে থাকবে না তা আগে থেকেই বলেছিল । প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব; তারাও গোড়া থেকে চায়নি মমতার ব্রিগেড সমাবেশে কংগ্রেসের কোনও হেভিওয়েট নেতা যোগ দিন । মমতা জানতেন সোনিয়া গান্ধী কিংবা রাহুল গান্ধী এই সমাবেশে সশরীরে হাজির হবেন না ঠিকই কিন্তু তাঁর এই উদ্যোগে তাঁরা সদর্থক সাড়া দিতে বাধ্য হবেন ।

কিন্তু প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব এটা বোঝার চেষ্টা করেনি যে কংগ্রেস সভাপতি বেশ কিছুদিন আগে থেকেই বিজেপি বিরোধী মহাজোটকে পাখির চোখ করেছেন । তাছাড়া লোকসভা ভোটের প্রাক্কালে মমতার ডাকা এমন একটি সমাবেশে তাদের অনুপস্থিতি যে সমগ্র দেশে নেতিবাচক বার্তা হাজির করবে। তাই কগ্রেসের পক্ষ থেকে লোকসভায় দলের নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে ও রাজ্যসভায় নির্বাচিত দলীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভিকে সমাবেশে পাঠিয়ে রাহুল গান্ধী বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর কাছে বিজেপি হটাও প্রথম ও একমাত্র প্রায়োরিটি । তাছাড়া এই জোটে জাতীয় রাজনীতিতে মমতার গুরুত্ব বুঝে তাঁকে চাইছেনও রাহুল।

অতীতেও জাতীয় রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় অনেক সময়েই প্রদেশ নেতৃত্বের কথায় কান দেয়নি কংগ্রেসের হাইকম্যান্ড। বরং মমতার সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপিবিরোধী জোট গড়তে কংগ্রেসের নেতৃত্বদান নিয়ে আড়ষ্টতা থাকলেও কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী তাতে আমল না দিয়ে সমাবেশের প্রাক্কালে ব্যক্তিগতভাবে মমতাকে চিঠি লিখেছেন। এক্ষেত্রেও শনিবাসরীয় ব্রিগেড থেকে মমতার চাওয়া প্রায় একশো ভাগই মিলেছে ।

মমতার সাফল্য ছাড়াও ব্রিগেডের সেদিনকার সামগ্রিক ছবি প্রথমেই জানায় ১৯-এর লোকসভা মোদির জন্য মোটেই সহজ লড়াই নয়। ফের মসনদ পেতে হলে তাঁকে অনেক দাম দিতে হবে, কিন্তু তাতেও তাঁর নিরঙ্কুশ জয় মিলবে না। ওডিশা ও তেলেঙ্গানা সমাবেশে যোগ দেয়নি বলে ভাবার কোনও অবকাশ নেই যে বিজেপি বিরোধী লড়াইয়ের ধার তাতে এওকটু হলেও কমবে।

অধিকাংশ রাজ্যেই বিরোধীরা ভোট লড়বে মোটামুটি ‘একের বিরুদ্ধে এক’ প্রার্থী দিয়ে। সেদিন ব্রিগেডে
সারাক্ষণ গমগম করে বেজেছে একটাই সুর- মোদি হটাও। সমাবেশে হাজির প্রত্যেক নেতাই স্পষ্ট ভাষায়
বলেছেন লড়াইয়ের অভিমুখ মোদির একনায়কতন্ত্র–এর বিরুদ্ধে, প্রত্যেকেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন গণতন্ত্র হন্তারক মোদির দিকেই। প্রত্যেকেই তীব্র ভাষায় বলেছেন মোদি মানবিক অধিকার, স্বাধীনতা, সংবিধানের মর্যাদা যেমন ধ্বংস করছেন একই সঙ্গে দুর্নীতি-বেনিয়ম-বিশৃঙ্খলাকে সুরক্ষা করছেন ।

মমতার বক্তব্যেও মোদি বিরোধিতার সুর ছিল চড়া, কিন্তু বিজেপির সমালোচনায় কি মমতা ততটাই
আক্রমণাত্মক ছিলেন ? না; কোথায় যেন তাঁর নিশানা একটু রক্ষণাত্মক ভঙ্গিমা অবলম্বন করেছে। তা না হলে বিজেপির বিরোধিতায় সে দলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী বিন্যাসের প্রসঙ্গ টেনে এনে বিজেপি দল ও সরকারে রাজনাথ সিং, নীতিন গড়কড়ি, সুষমা স্বরাজ প্রমুখের মূল্যায়নে মমতা কেন তার বক্তব্যকে দীর্ঘ করবেন। তাতে তো এই বার্তাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তিনি আসলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির যতটা সমালোচক, ততটা বিজেপির নন।

তপন মল্লিক চৌধুরী
টেলিভিশন মিডিয়ায় বেশ কিছুকাল সাংবাদিকতা করেছেন । নানা ধরনের কাজও করেছেন টেলিভিশনের জন্য । সম্পাদনা করেছেন পর্যটন, উত্তরবঙ্গ বিষয়ক পাক্ষিক পত্রিকা। নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় । চর্চার প্রিয় বিষয় আন্তর্জাতিক সিনেমা, বাংলা ও বাঙালি।

6 COMMENTS

  1. একথা ঠিকই সেদিন ব্রিগেড যতটা না বিজেপি এবং সাপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল তার থেকে বেশী ছিল মোদির বিরুদ্ধে, আর মমতা তো পরক্ষে যেন বিজেপিকে একটু সমর্থন করে গেলেন, এর মানেটা কি দাড়াল।

  2. এমনিতেই চাপে আছে মোদি তাঁকে আরও একটু চাপেই ফেলে দিয়েছেন মমতা গত ১৯ জানুয়ারির ব্রিগড থেকে।

  3. মমতার ব্রিগেড কিন্তু প্রদেশ কগ্রেস নেতৃত্বকে যথেষ্ট অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।

  4. জোট কি আদৌ গড়ে উঠবে, সন্দেহ থেকেই যায়।

  5. খুবই ভাল লেখা কারণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখা তো বটেই সেই একই জায়গা থেকেই বিশ্লেষণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here