পীতম সেনগুপ্ত
প্রাক্তন সাংবাদিক। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় কর্মরত। ষোলো বছর বয়স থেকে কলকাতার নামী পত্রপত্রিকায় লেখালেখির হাতেখড়ি। ছোটোদের জন্য রচিত বেশ কিছু বই আছে। যেমন 'বিশ্বপরিচয় এশিয়া', 'ইয়োরোপ', 'আফ্রিকা' সিরিজ ছাড়া 'দেশবিদেশের পতাকা', 'কলকাতায় মনীষীদের বাড়ি', 'ঐতিহাসিক অভিযান', 'শুভ উৎসব' ইত্যাদি। এছাড়া বর্তমানে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নানা গবেষণার কাজে নিবেদিত। ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। 'রবীন্দ্র-জীবনে শিক্ষাগুরু' এবং 'রবীন্দ্র-গানের স্বরলিপিকার'। পড়াশোনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

চেনা কবি — অচেনা রবি ()

১৯১১সাল!! মীরা দেবী অসুস্থ, তাই রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় চলে এসেছেন। সেবার শান্তিনিকেতনে ৭ পৌষ তাঁকে ছাড়াই অনুষ্ঠিত হল।

বছরের শেষ একেবারে!! কলকাতায় তখন শীতের পরশ!! এরই মধ্যে ডিসেম্বর মাসের ২৬ থেকে ২৮ এই শহরে কংগ্রেসের ২৬তম বার্ষিক অধিবেশন বসল!! দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ২৭ তারিখ, বুধবার দুপুর বারোটায় অধিবেশন শুরু হল সরলাদেবী চৌধুরী,অমলা দাশ, দিনেন্দ্রনাথ, অমল হোম প্রমুখের কন্ঠে একটি সমবেত গান দিয়ে!!

সেবছরই দিল্লিতে ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে পঞ্চম জর্জের অভিষেক হবার পর ১৯০৫ সালে ১৫ অক্টোবরের বঙ্গভঙ্গ আদেশটি রদ করার ঘোষণাও নির্দিষ্ট হল। এই ঘটনাটি সেই সময়ে ভারতের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলে চিহ্নিত হয়ে আছে।

Banglalive-8

তা অধিবেশন শুরু হল। সেদিন এই গানটির পর সম্রাট পঞ্চম জর্জ ও তাঁর স্ত্রীকে সৌজন্যবশত স্বাগত জানায় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ। পাশাপাশি বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণার জন্য পঞ্চম জর্জের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে অধিবেশনে দুটি প্রস্তাব আলোচিত ও গৃহীত হয়। সেইদিনের এই ঐতিহাসিক ঘটনাটির সংবাদ ২৮ তারিখে The Bengalee পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল এমনভাবে

Banglalive-9

” The proceedings commenced with a patriotic song composed by Babu Rabindranath Tagore……. A Hindi song paying heart-felt homage to Their Majesties was sung by the Bengali boys and girls in chorus”!!

এই খবরটি পরিবেশনে খুব সুচতুরভাবে তথ্য বিকৃতি করা হল এবং পরে The Englishman এবং The Statesman পত্রিকাতেও একই রকম বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ ছাপা হল ! ব্যস্ মৌচাকে যেন ঢিল পড়ল।

রবীন্দ্রবিরোধীরা এই সংবাদকে পুঁজি করে সেদিন আসরে নেমে পড়লেন। আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সেই ভ্রান্ত সংবাদ। এমনকী বিদেশের মাটিতে এজরা পাউন্ড পর্যন্ত একটি চিঠিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে,

..How can one speak of patriotism of Bengal, when our greatest poet has written this ode to the King?..”

আগুন তো ছড়ালো, অথচ মজার ব্যাপার এই যে, গানটির পান্ডুলিপি নাপাওয়া এবং কবে,কোথায় রচিত এই তথ্য নাপাওয়ায় এই বিতর্কের প্রসঙ্গটি তেমন জোরদার হল না!! রবীন্দ্রনাথ সেই সময়ে কলকাতাতে থাকলেও কংগ্রেসের অধিবেশনে উপস্থিত হয়েছিলেন কিনা এ তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। অথচ ওই একই সময়ে কলকাতা শহরে একেশ্বরবাদীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সিটি কলেজ প্রাঙ্গনের সেই সম্মেলনের সভায় যে রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন তা জানা যায় সীতা দেবীর ‘পুণ্যস্মৃতি’ গ্রন্থে। সীতা দেবী লিখছেন,

পুরাতন সিটি কলেজ গৃহে এই কনফারেন্স হইয়াছিল।রবীন্দ্রনাথ আসিবেন শুনিয়া সেদিন যে কি বিপুল জনতা উপস্থিত হইয়াছিল তাহা, যাঁহারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁহারাই মনে করিতে পারিবেন।প্রার্থনার ভিতরেই প্রচন্ড করতালিধ্বনি শুনিয়া বুঝিতে পারিলাম যে রবীন্দ্রনাথ ভিড় ঠেলিয়া উপরে উঠিতে পারিয়াছেন।রবীন্দ্রনাথ আসিয়া সভাপতির পাশে আসন গ্রহণ করিলেন, সভার কাজ আবার আরম্ভ হইল।…”

রবীন্দ্রনাথের এই উপস্থিতির কথা তত্ত্বকৌমুদী পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছিল।

কংগ্রেসের অধিবেশনে উপস্থিত থাকলে নিশ্চয় সে সংবাদ কোনো না কোনো সংবাদপত্রে ছাপা হত আশা করা যায়। তবে অধিবেশনের উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে গানটি কীভাবে কংগ্রেসের নেতারা জোগাড় করেছিলেন কবির থেকে সেটি জানা যায় অধিবেশনের অভ্যর্থনা কমিটির সহকারী জ্ঞানাঞ্জন নিয়োগীর কথায়। তিনি বলেছেন,

ডাক্তার নীলরতনের নির্দেশে তিনিই রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে গানটি এনে তাঁকে দেন।” কংগ্রেসে গাইবার আগে হ্যারিসন রোডে নীলরতন সরকারের বাড়িতেই গানের রিহার্সল হত।

গানটিকে নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক চলে এবং মাঝে মধ্যেই এদিক সেদিক বিতর্কের আগুন জ্বলে ওঠে। এই বিতর্কের আশু সমাধানের উদ্দেশ্যে বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্র, পুলিনবিহারী সেনের এই গানটির প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে জানার ইচ্ছে হয়। তিনি কবির কাছে পত্র লিখে সরাসরি জানতে চান গানটি রচনার উপলক্ষ কী ।। কবি তরুন পুলিনবিহারীর এই কৌতুহল মিটিয়ে ছিলেন একটি চিঠি লিখে !! চিঠিটি ১৯৩৭ সালের ২০ নভেম্বর তারিখে‘জনগণমন অধিনায়ক গানটি কোন উপলক্ষ্যনিরপেক্ষভাবে আমি লিখেছি কিনা’ প্রসঙ্গে লিখলেন,

“…সে বৎসর ভারতসম্রাটের আগমনের আয়োজন চলছিল!! রাজসরকারে প্রতিষ্ঠাবান আমার কোনো বন্ধু সম্রাটের জয়গান রচনার জন্যে আমাকে বিশেষ করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন!! শুনে বিস্মিত হয়েছিলুম, সেই বিস্ময়ের সঙ্গে মনে উত্তাপেরও সঞ্চার হয়েছিল!! তারই প্রবল প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় আমি জনগণমনঅধিনায়ক গানে সেই ভারতভাগ্যবিধাতার জয় ঘোষণা করেছি; পতনঅভ্যুদয়বন্ধুর পন্থায় যুগযুগধাবিত যাত্রীদের যিনি চিরসারথী, যিনি জনগণের অন্তর্যামী পথপরিচায়ক, সেই যুগযুগান্তরের মানবভাগ্যরথচালক যে পঞ্চম বা ষষ্ঠ বা কোনো জর্জই কোনোক্রমেই হতে পারেন না সে কথা রাজভক্ত বন্ধুও অনুভব করেছিলেন!! কেন না তাঁর ভক্তি যতই প্রবল থাক বুদ্ধির অভাব ছিল না!!”

মজার ব্যাপার ১৯১১ থেকে ১৯৩৭ হয়ে আজ ২০১৯দীর্ঘ একশ বছরেরও অধিক সময়ের এই যাত্রাপথে সেই বিতর্ক কিন্তু গানটির পিছু ছাড়েনি!! যদিও স্বাধীনতার পর এই বিতর্ককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত স্বাধীন ভারত রাজনৈতিকভাবেই এই গানটির প্রথম স্তবকটিকে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দিয়ে এই সমস্ত অপপ্রচারের যোগ্য জবাব দিয়েছে!!

প্রসঙ্গত বলা যায় পাঁচটি স্তবকের এই গানটির সম্পূর্ণ স্বরলিপি রচনা করেছিলেন আনন্দসঙ্গীত পত্রিকার কার্যাধ্যক্ষ ব্রজেন্দ্রলাল গঙ্গোপাধ্যায়। পরে দিনেন্দ্রনাথও স্বরলিপি করেছিলেন যা আজ স্বরবিতান ১৬ এবং ৪৭ মুদ্রিত।

[গ্রন্থ ও তথ্য ঋণঃরবিজীবনী ৬ ৭ খন্ডঃ প্রশান্তকুমার পাল; পুণ্যস্মৃতিঃ সীতা দেবী; রবীন্দ্রজীবনী ২ খন্ডঃ প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়; শারদীয় দেশ ১৯৮৬; অন্যান্য সাময়িক পত্র]

আরও পড়ুন:  প্রকাশ্য গণ-স্বমেহনে নীলনদে বীর্যদান ছিল প্রাচীন মিশরের পবিত্র রীতি

NO COMMENTS