রাতের শেষ লোকাল

1719

এক পৃথিবী ঘুমের মধ্যে দিয়ে চলেছে আরেক পৃথিবী।

দ্বিতীয়টি অবধারিত লাস্ট লোকাল ট্রেন। তবে প্রথম পৃথিবীর ঘুমিয়ে পড়ারই কথা। কারণ ঘড়ির কাটা রাত বারোটার দিকে, ক্রমশ ঘন হচ্ছে অন্ধকার। এ হল ছাপোষা জীবন গুটিয়ে নেওয়ার সময়। আরেকটু পরেই সেলফোনের ডিসপ্লে দেখাবে—দিন বদলেছে, তারিখও। মানে ইহজন্মের আরেক চব্বিশ ঘণ্টা বাঁচা হয়ে গেল আমাদের! তা বলে সবাই ঘুমে? না, তা নয়। এত রাতেও শহর ও শহরতলির স্টেশনমুখী পথেঘাটে রয়ে গেছে কিছু মানুষ। যেমন, মাঝরাত অবধি খিদের সঙ্গে জোর লড়াই দেওয়া হকার, পাইস হোটেলকর্মী, বার কাম রেস্টুরেন্টের তরুণ ওয়েটার, রদ্দি মাতাল, চোর চোট্টা, যুবক সাংবাদিক, পুলিশ, ‘খারাপ মেয়ে’ আর এপাড়া ওপাড়া পাহারা দেওয়া নেড়ি কুত্তার গ্যাং।  

কুকুর বাদ। বাকি যাদের কথা উঠল, তারাই ঘুম ঘুম লাস্ট ট্রেনের আচ্ছন্ন যাত্রীসকল। এরাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে, শুয়ে বসে চলেছে জেনারেল, ভেন্ডর আর লেডিজ ভরিয়ে। সামান্য ভুল হল। লেডিজ কামারার বিষয়টা খানিক গোলমেলে।

লেডিসের দার্শনিক পুলিশ

আসলে লেডিজে লেডিজ নেই। কারণ যে অল্প ক’জন দিনের শেষের মহিলা প্যাসেঞ্জার তাঁরা তাঁদের জন্য নির্ধারিত কামরায় ওঠেন না। ঠিক করে বললে, সাহস পান না ফাঁকা কামরায় চড়ে বসতে। তবে দু’জন পুলিশ কর্মচারী থাকেন। স্বভাবতই ওই পাহারদারদ্বয় দার্শনিক হয়ে ওঠেন। যা পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব তাঁদের সেই জিনিসটাই উধাও। তবু পাহারা দিতে হয়, ডিউটি। এরপর দার্শনিক না হয়ে উপায় আছে! অবশ্যি ভেন্ডর আর জেনারেলই কাফি।

এক জেনারেলেই কত রঙের চরিত্র, কত আশ্চর্য যাপনের ছবি। যেমন মফিজুলদের ‘ঘটিগরম লোকাল’।  

 

ঘটিগরম লোকাল

লাস্ট ট্রেনের অভিজ্ঞতাহীন আপনি হঠাৎ এ গাড়িতে চড়ে বসলে ভাবতে পারেন, আরিব্বাস! এ তো পাক্কা ‘ঘটি গরম লোকাল’! কারণ যে কামরায় আপনি উঠেছেন ততক্ষণে তার দখল নিয়েছে সনাতন, কার্তিক, বাবলু, মফিজুলরা। ডাউনে চেপে শহরে আসে ওরা, সূর্যাস্তেরও ঢের আগে। গাঁ গ্রাম থেকে গলায় ঘটিগরমের দোকান ঝুলিয়ে ছড়িয়ে পড়ে দিকবিদিক। প্রথমে ট্রেনে-বাসে, ভিড় জমায়েতে, পার্কে। সন্ধেবেলায় কেরোসিন-লম্ফ জ্বেলে র‍্যাটেল স্নেকের মতো ঝুমঝুমি বাজিয়ে ঘুরে বেড়ায় শহর, আধা শহরের অলিগলিতে। কাস্টোমারের হাতে সস্তায় পৌঁছে দেয় টক-ঝাল জীবনের স্বাদ। তবে এখন, সমস্ত দিনের শেষে কানা গলির ঘাম শুকিয়ে কাঠ। কারণ রাতের স্তব্ধতায় ভোঁ শব্দ তুলে হেলতে দুলতে শহর ছেড়েছে শেষ ট্রেন।

ট্রেনের গতি অনুযায়ী জানলা দিয়ে কখনও জোর, কখনও হালকা হাওয়া আসছে। সনাতনরা প্যান্ট গুটিয়ে সিটের উপর বসেছে পা তুলে। বিড়ি টানছে, খৈনি ডলছে। দরজার কাছে যারা বসে বা দাঁড়িয়ে তাদের হাতে হাতে ঘুরছে ‘বোম ভোলে’। দুই সিটের মাঝের লাইনে রাখা রং ওঠা নাইলনের ব্যাগ। ব্যাগে বোতল, জলে ‘দেশি’। রোজকার মামলা ফলে হকারও চেনা-জানা। অতএব এক ইশারাতে বাদামওলা তিন টাকার প্যাকেট অর্ধেক ব্লেড দিয়ে খচ করে কেটে এগিয়ে দিচ্ছে জনে জনে।

গাড়ির গতি বাড়লে দুলুনিও বাড়ে, ঘুম পায়। অতএব কেউ কেউ কাঁধের ঝোলাকে বালিশ বানিয়ে ফাঁকা সিটে টান টান। ট্রেনের গেটের কাছে ঝিমোচ্ছে আরেক দল। লাস্ট ট্রেনের এ এক চরিত্র—যত লোক বসে যায় তার চেয়ে বেশি লোক শুয়েই। এবং সিটের অভাব নেই। ফলে যারা দাঁড়িয়ে তারা শখে দাঁড়িয়ে। চিঁড়েচ্যাপ্টা সকাল সন্ধের ভিড়ে এ জিনিস ভাবা যায়! ভালোই হয়েছে, গরিবের ট্রেনের সব কম্পার্টমেন্টের সব আলো জ্বলে না। ফলে আলো-আঁধারি বেডরুম এফেক্ট। যেন অলৌকিক ছুটন্ত শোবার ঘরের স্বাদ মিটিয়ে দেয় লাস্ট ট্রেন। এ সময় জানলা টপকে বাইরে চাইলে দেখা যায় সাদা টিউবের, হ্যালোজেনের আলোয় নিরালা রাস্তা। কোথাও বা ঘোলা বাল্বের খয়েরি রঙে ভেসে ওঠে বন্ধ দোকান, ঝিম মারা গাছগাছালির রহস্য। কিন্তু ঘোর কেটে যায়। কারণ হঠাৎ হঠাৎ ট্রেনের জলদগম্ভীর হর্নে কেঁপে ওঠে জগৎ সংসার।

এদিকে ক্রমশ ঘোলাটে হয় মফিজুলদের চোখ। তবে সকলেই ‘মদন’ (মদাসক্ত) না। কেউ কেউ ‘মদনা’ (মদ খায় না)। আড্ডা চালু। আয় উপায়ের কথা, অভাব অনটনের জংধরা গল্প, আদিরস। ধরুন আমরা যাকে সনাতন ডাকছি সে কার্তিকের পেছনে লাগল—কার্তিক ঠাউর পর্যন্ত নিজির বউরি রক্ষা করতি পারলেন না! ধুয়ো দিল মফিজুল—অন্যে মধু খেলি ওর কী দোষ? শুনে কার্তিক হয়তো আরও এক ঢোক আগুন ঢালল গলায়। বলল, তোমারডা ডাগর। ধার দিবা? মিচকে হেসে সনাতন বলল, দেবখানে। কিন্তু শিউলি ফিরলি কিন্তু আমার। কথা শুনে ঘটিগরমের গ্যাং খ্যাক খ্যাক করে হেসে গড়িয়ে পড়ে এ ওর কাঁধে।   

‘ভদ্রলোকে’র মতো আসতে কথা বলতে পারে না মফিজুলরা। অতএব নিজেদের গালগল্প থামিয়ে কার্তিক, সনাতনদের রাখঢাকহীন এমন কথোপকথন গেলে বহু ধোপদুরস্ত প্যান্ট-শার্টরা।

পাঁচমিশেলি জেনারেল

শেষ গাড়ি বারো বগি। একেক কামরায় যেন একেকটা আস্ত সমাজ ঢুকে বসে আছে।

দেরিতে রিহার্সাল শেষ হওয়া দুই তরুণ থিয়েটার শিল্পী হয়তো নিজেদের জগৎ বিষয়ে আলাপচারিতায় অক্লান্ত। এক দিকে তাস পেটাচ্ছে শহরতলিতে বাড়ি কিন্তু শহরের ফুটে দোকান যাদের, সেই তারা। আলাদা আলাদা কাগজে কিংবা টিভি চ্যানেলে কাজ করা দুই বন্ধু সাংবাদিকের আলোচনায় ফিরে ফিরে আসে রোজকার টপিক—সংস্থার উপরমহলের প্রতি রাগ এবং সেই মতো খিস্তি। কোম্পানি ছোট হলে—কাগজ টিকবে তো! পুজোর বোনাস?

একই ক্ষোভ, চিন্তার কথা উঠে আসতে পারে কোনও এক কম্পার্টমেন্টের তরুণ রেস্টুরেন্ট কাম বার কর্মীর মুখেও। সাথে টিপসের হিসেব। এই পাওয়া না পাওয়ার কাহিনি যতই সিরিয়াস হোক, মুখ কিন্তু চলছে। বিরামহীন খুচরো খাওয়া-দাওয়ায়। শেষ ট্রেনে একজনও ভিখারি থাকে না (কেন থাকে না? ভিখারিরাও তাহলে জানে, সারাদিন জীবনের কাছে ‘ভিক্ষে’ চেয়ে ক্লান্ত মানুষগুলোর উল্টে ভিক্ষে দেওয়ার মানসিকতা থাকে না।) কিন্তু হকার থাকে পাইকারি হারে। তবে রুমাল-মানিব্যাগ-খেলনাওলা পাবেন না, পাবেন না স্পোকেন ইংলিশ-জেনারেল নলেজ-লক্ষ্মীর পাঁচালী। শুধু খাবার বেচা হকাররা ঘুর ঘুর করে আচ্ছন্ন লাস্ট লোকাল ট্রেনের পেটের ভিতরে। আসলে অভিজ্ঞ হকাররা বোঝে, দিন শেষে খিদে পায়। অথচ রাতের খাবার দূরের স্টেশনেরও দূরে! অতএব সিদ্ধ ডিম, ঝাল ঘুঘনি, সস্তা চিপস, দিলখুস, বাদাম-ছোলা-মটর-মুগডাল-ঝুরিভাজা, চালের পাঁপড়, ঘটিগরম চলতে থাকে। চলতে পারে জোয়ান, আমলকি, লেবু চা। এর মধ্যে ‘ঝামেলা’ ওঠে গাড়িতে। ঝামেলার নাম ‘মাতাল কিশোর’। যে কামরায় ওঠে এই ভয়ঙ্কর গায়ক সে কামরায় কারও সাধ্য নেই কথা বলার, ফোনে প্রেমালাপের।

অনেকেই বিরক্ত কাঠির উপর আলুর দম চেহারার মাতাল কিশোরকণ্ঠীর উপর। অনেকে আবার ছদ্ম সাবাশি দেয়—গুরু ফাটিয়ে দিয়েছ, আবার হয়ে যাক। বসে না গায়ক। ট্রেনের দরজায় কাছে বিপজ্জনকভাবে এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে টলতে টলতে ভাঙা গলায় চরম বেসুরে একটাই গান গায়, ‘হামে অর জিনে কি চাহত না হোতি…’। এসব হইহল্লায় কিচ্ছু এসে যায় না একজনের। কামরার মানসিক ভারসাম্যহীন সেই যুবকের। যার ডাক নাম পাগল। যে ছেঁড়া পলিথিন, শতছিন্ন চামড়ার ব্যাগভর্তি জগৎসংসারের যাবতীয় নোংরা সঙ্গে করে উঠেছে ট্রেনে। যেখানে উঠেছে সেখানকার দু’ধারের গোটা সিট তার। কারণ ওই গা থেকে বেরোচ্ছে এক হাজার ভাগারের গন্ধ। কে জানে কীসের প্রয়োজনে এত রাতে কোথায় চলেছে সে! এতসব দেখেশুনে মনে হয় লাস্ট ট্রেনটা আদৌ ট্রেন না, হয়তো মহা অন্ধকারে ভাসমান মহাকাশযান, হয়তো যে যানটির নাম ‘সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার’।  

দীপালিও ওঠে জেনারেলে।

 

দীপালিদের নাম-মাহাত্ম্য 

আপনি লাস্ট ট্রেনের সত্যি যাত্রী হলে আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছেই দীপালির। হতে পারে কর্মস্থলে ওর নাম সুইটি। দীপালিদের নাম-মাহাত্ম্য থাকবেই। কারণ ওদের বাড়ির লোকেরা জানে ওরা পার্লারকর্মী। আসলে ইচ্ছে-অনিচ্ছের তালগোল পাকানো পথে দীপালিরা জড়িয়ে যায় দেহ-ব্যবসায়। ওদের ইনকামেই গরিব সংসার টেকে, ভালো থাকে বাপ-মা ভাই-বোন। ভাগ্যিস শরীরটা ছিল। অবশ্য সকালে যখন শহরমুখী ট্রেনে ওঠে দীপালি, তখন সে আর পাঁচটা বাঙালি বাড়ির চেনা মেয়ে। বিকেলে সেই ‘সেক্সি’। পোশাকের সবখানে ফুটে উঠছে শরীর। সাজও তেমনি—মেকআপে মুখ ফর্সা, চোখ ভ্রু আঁকা। ঠোঁটে উগ্র রঙের লিপস্টিক। স্লিভলেস জামার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে রঙিন ব্রার স্ট্র্যাপ। মোদ্দা কথা, যেরকম মেয়ে দেখলে একদলের ‘খিদে’ পায়, কুকুরের মতো লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। আরেক দল নোংরা ডিঙিয়ে যাওয়ার মতো করে পাশ কাটায়…।

          দীপালির অবশ্য ওসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। গভীর রাতের হাওয়ায় তার খোলা চুল উড়ছে। জানলার ধারের সিটে বসেছে সে। এদিক-ওদিক তাকানো নেই। জানে সমস্যা আছে। বরং ধীরে ধীরে তুলতে থাকে সে রংদার শহরের মেকআপ। নির্দিষ্ট স্টেশনটি আসার আগে তাকে শরীর ও মন থেকে মুছে ফেলতে হবে সুইটিকে। হয়তো সবটা হবে না, তবু যতটা সম্ভব। কারণ মা-বাপ-ভাই-বোনের কাছে সকালের দীপালি হয়ে ফিরতে হবে তাকে।

ভেন্ডরের ইন্ডাস্ট্রিয়াল রক

লাস্ট ট্রেন বলে না, কোনও ট্রেনের ভেন্ডরেই ‘সুস্থ’ মানুষের পক্ষে ওঠা অসম্ভব। কারণ এক বিপজ্জনক গন্ধ। গন্ধের উৎস হরেক মাল। শয়ে শয়ে ছানার ড্রাম, দুনিয়ার সব রকমের শাক, সবজি, মাছ। প্লাস্টিকের খেলনা, চামড়ার ব্যাগ, পিসবোর্ডের বাক্সের মতো হাজারটা জিনিস। শহরতলির একদল দোকানি যেমন বড় বাজার থেকে মাল কিনে ফেরে ভেন্ডরে চাপিয়ে, তেমনি আরেক দল কারিগর মাল বানিয়ে এই কামরাতেই ঠেসেঠুসে ঢুকিয়ে শহরে আসে বেচবে বলে। দিন শেষে দুই পক্ষের কেউ থাকে না। থেকে যায় প্রকৃতই অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার মতো ঝাঁঝালো ঘ্রাণ। এর সঙ্গে নিয়মকানুনহীন লাস্ট ট্রেনে যোগ হয় বিড়ি-সিগারেট-গাঁজা-মদ, (ভেন্ডরে যে পরিমাণ নেশা চলে তা দশটা জেনারেলের ডাবল। যেন গরিবের লাস ভেগাস।) তার উপর খেটে খাওয়া মানুষগুলোর শরীর বেয়ে নামা ঘাম। একেই কি নরক বলে?

অথচ বিড়ি টানতে টানতে লুঙ্গি পরা খালি গা মানুষগুলো হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে কত না রসের কথায়! মাছের লাইনে কাজ করা পাজামা-স্যান্ডো গেঞ্জি পরা ছেলেটা, যার গা থেকে তীব্র আঁশটে গন্ধ বেরোচ্ছে, সে তার প্রেমিকার সঙ্গে ফোনালাপে ব্যস্ত। যেন ওই ছেলের শরীর নরকে কিন্তু মন পড়ে রয়েছে স্বর্গে! ফলে মাঝে মাঝেই লাজুক হাসি ভেসে ওঠে ঠোঁটে, চোখে। আরেক কোণে চলছে এক দিনের লাভ-লোকসানের খতিয়ান, ঘর-গৃহস্থালির কথা, নোংরা জোক, কার ছেলেটা উচ্ছন্নে যাচ্ছে, কার মেয়েটার বিয়ের বয়স হল কিন্তু…। একেক সময় একেক গ্রুপ মেতে উঠছে হুল্লোড়ে। কখনও খিস্তি-খেউরে কানপাতা দায়, পার্টি পলিটিক্স নিয়ে হাতাহাতি হবার জোগাড়। মারপিট বাধার আগে বয়স্ক হাফ মাতাল থামিয়ে দিচ্ছে গোলমাল। সাইড ঘেঁষে ইয়ং ছেলের দল দেখছে সানি লিওন, দু’এক পিস সিং ভাঙা বাছুরও আছে। খাবার বেচা যে হকারদের কথা আগেই হয়েছে, তাদের পশরার সিংহভাগ বিক্রিবাটা হয় এই ভেন্ডরেই। কারণ ‘চাট’ লাগে। একদল উদ্দাম নেশা না করলে সংসার চলে না আরেক দলের!

অদ্ভুত, এই ‘নরক’-এই কেউ অসুস্থ হলে ভিড় সরিয়ে তার শোওয়ার ব্যবস্থা করে সহযাত্রীরা! জানলার সিট ফাঁকা করে দেয় সক্কলে। যাতে করে হাওয়া পায় অসুস্থ। এক মাতালই হয়তো শতছিন্ন ব্যাগ ঘেটে খুঁজে বের করল গ্যাসের ট্যাবলেট। জলের বোতল এগিয়ে দিল অচেনা মানুষটার হাতে। আশ্চর্য!    

এবং অন্যদের কথা

এও সব না। এর বাইরেও আছে কিছু লোক। প্রতি কামরায় থাকে চুপচাপ মানুষ। হয়তো জানলার ধারে বসে বই খুলে বসেছেন। অথবা যিনি কাঁধের অফিসব্যাগটাকে একধারে রেখে বাইরের ঘুমন্ত অন্ধকারে তাকিয়ে অপলক, কম্পার্টমেন্টের হট্টগোলের মধ্যে থেকেও নেই! যাদের কানে হেডফোন তারা অনেক রকম। এক দল গোটা জার্নিটা কথা বলে যাবে, আরেক দল গান শুনবে, কেউ কেউ দেখবে সিনেমা, অনেকে ব্যস্ত গেম খেলতে। কিন্তু রাত বাড়ছে। কালো রাতকে বিশ্বাস করে না বাড়ির লোক। ফলে ফোন আসে—কোথায়? কত দূর? ঘরের মানুষগুলোকে আশ্বস্ত করতে হয় উত্তরে।  

এদিকে গতি বাড়িয়ে কমিয়ে লাস্ট ট্রেনও শহর পেরিয়ে ঢুকতে থাকে শহরতলির আঁধারে। ভূতুড়ে স্টেশনে দাঁড়ায়, নামে যাত্রীরা। ওঠে কদাচিৎ কেউ, যেমন বিয়ের নেমন্তন্ন ফেরত পরিবার। অথবা চ্যাংড়া চারজন। কিংবা ট্রেন মিস করা জনৈক। বিপদে না পড়লে কে আর লাস্ট ট্রেনে ওঠে।  

অতএব ভেবে দেখলে অফিস টাইমের নিত্যযাত্রীরাও জানেন না, চেনেন না দিনশেষের ‘বড়দের’ ট্রেনটিকে। আসলে সকাল থেকে প্রথম রাত অবধি চলে ‘সাদা’ ট্রেন। গভীর রাতের ট্রেনটি শুধু সাদা না। সে হল ‘সাদা-কালো’ জীবনের ককটেল। কালোর দিকে খানিক বেশিই ঝোঁকা। এক পৃথিবী ঘুমের মধ্যে দিয়ে চলা আরেক পৃথিবী…।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.