লাহোর থেকে রেলে এল ‘নবীন দধীচি’-র নিথর দেহ‚ হাওড়া স্টেশনে তা গ্রহণ করলেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

এক কণা সত্য বা গোপন তথ্য বের হয়নি | 
ঢোকেনি এক কণা খাবারও |
ব্রিটিশ সরকার একটুও খোলাতে পারেনি চব্বিশ বছর বয়সী তরুণের দুই ঠোঁট |
টানা ৬৩ দিন বা ২ মাস ৩ দিন অনশন আন্দোলন করে প্রয়াত হন বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ দাস |  

# জন্ম ১৯০৪ সালে ২৭ অক্টোবর‚ কলকাতায় | কিশোর বয়সেই দীক্ষা অনুশীলন সমিতিতে | যোগদান করেছিলেন গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনেও |

# ১৯২৫ সালে তখন তিনি বিদ্যাসাগর কলেজে বি.এ-এর ছাত্র | রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করে পুলিশ | বন্দি ময়মনসিংহ কারাগারে |

# জেলে ভারতীয় রাজবন্দিদের নিদারুণ অবস্থা দেখে তীব্র প্রতিবাদ জানান | ইওরোপীয় বন্দিদের তুলনায় অতি নিকৃষ্ট ভাবে থাকতে দেওয়া হতো ভারতীয় বন্দিদের | প্রতিবাদে আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন যতীন্দ্রনাথ দাস |

# জেলের সুপার এসে দুঃখপ্রকাশ করেন তাঁর কাছে | অবস্থা পরিবর্তনের আশ্বাস পেয়ে অনশন ভঙ্গ |

# বিপ্লবী ভগৎ সিং-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি | বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন স্বয়ং শচীন্দ্রনাথ সন্যালের মতো বিপ্লবীর কাছ থেকে |

# লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িয়ে যায় যতীন্দ্রনাথ দাসের নাম | গ্রেফতার হন ১৯২৯-এর ১৪ জুন | বন্দি করে পাঠানো হয় লাহোর কারাগারে |

# ব্রিটিশ বন্দিদের সঙ্গে সমমর্যাদা দিতে হবে ভারতীয় রাজবন্দিদেরও | লাহোর জেলে এই দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন তিনি | পাশে পান অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দিদের |

# ১৩ জুলাই শুরু হয় যতীন্দ্রনাথের অনশন | তাঁকে একফোঁটা খাবারও খাওয়াতে ব্যর্থ হয় ব্রিটিশ শক্তি | শত নির্যাতনেও হার মানেননি বিপ্লবী | 

# ব্রিটিশ শাসনে জেলে শোচনীয় অবস্থায় রাখা হতো ভারতীয় বন্দিদের | পরতে দেওয়া হতো নোংরা পোশাক | তা দিনের পর দিন কাচা হতো না | তাঁদের সেলে ঘুরে বেড়াত আরশোলা ইঁদুর | খাবারের মানও ছিল নিম্ন | দেওয়া হতো না কোনও সংবাদপত্র বা পত্রিকা | অথচ ব্রিটিশ বন্দিদের জন্য চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত |

# যতীন্দ্রনাথ ও তাঁর সহযোগী বন্দিদের অনশন চলেছিল টানা ৬৩ দিন | ১৩ সেপ্টেম্বর‚ ১৯২৯ প্রয়াত হন যতীন্দ্রনাথ | তাঁকে শেষ অবধি নিঃশর্তে মুক্তি দিতে চেয়েছিল জেল কর্তৃপক্ষ | কিন্তু অনুমতি দেয়নি ব্রিটিশ সরকার | তাঁর মৃত্যুর পরে অধিকাংশ বন্দি অনশন ভঙ্গ করেন | শুধু দুজন চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন আন্দোলন | ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত |

# লাহোর থেকে কলকাতার উদ্দেশে ট্রেনে পাঠানো হয়েছিল যতীন্দ্রনাথের দেহ | তরুণ বিপ্লবীর দেহ নিয়ে সর্বাগ্রে ছিলেন দুর্গাভাবি বা দুর্গাবতী দেবী | তিনি ছিলেন বিপ্লবী ভগবতীচরণ ভোহরার স্ত্রী‚ এবং নিজেও একজন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ |

# হাওড়া স্টেশনে শহিদ বিপ্লবীর দেহ গ্রহণ করেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু | শ্মশানঘাট অবধি বিশাল শোভাযাত্রা করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এই তরুণের দেহ | শোভাযাত্রার সর্বাগ্রে ছিলেন নেতাজি | অগণিত মানুষ চোখের জলে যোগ দিয়েছিলেন বিপ্লবীর অন্তিম যাত্রায় |

# মাত্র ২৪ বছর বয়সে এই তরুণের মৃত্যু গভীর প্রভাব ফেলেছিল জাতীয় জনমানসে | সমাজের সব স্তর থেকে নিন্দার ঝড় উঠেছিল | এই ঘটনাকে তীব্র ধিক্কার জানিয়েছিলেন মতিলাল নেহরু‚ জওহরলাল নেহরু-সহ অন্যান্য বর্ষীয়ান নেতৃবৃন্দ | 

# বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ দাসকে নেতাজি বলতেন  ভারতের নবীন দধীচি | রাক্ষসকুলকে বিনাশ করতে নিজের জীবন দান করেছিলেন দধীচি মুনি | তাঁর হাড় দিয়ে তৈরি হয়েছিল ব্রহ্মাস্ত্র | ঠিক তেমনই‚ দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন এই আগুনের পাখি |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here