কয়েকশো বছর ধরে চিনে পূজিত ভারতীয় দেবদেবীরা

কমিউনিস্ট দেশ চিন নাকি হিন্দু দেব-দেবীর আদি বাসস্থান! অন্তত ঐতিহাসিকদের মত খানিকটা সেইরকমই। তাঁরা মনে করেন, শিল্পবেষ্টিত শহর গুয়ানঝাউ-তে রয়েছে বহু হিন্দু দেবতার মন্দির আর তাতেই নাকি ডজনখানেক হিন্দু দেব-দেবীর বাস। গুয়ানঝাউ শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরত্বে অবস্থিত গ্রাম ছেডিয়ান। কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন এই গ্রামের রাস্তা অত্যন্ত পাথুরে এবং কর্দমাক্ত। রয়েছে অনেক প্রাচীন ভিত্তিপ্রস্তর।

এই গ্রামেই রয়েছেন ভগবান বুদ্ধদেব বা বোধিসত্ত্বের স্ত্রীরূপ, নাম গুয়ানাইন। পাথর দ্বারা নির্মিত ছোট্ট  মন্দিরে বিরাজ করছেন দেবী গুয়ানাইন। গ্রামবাসীরা প্রতিদিন সকালে পুজোপাঠ করেন। চিনের এই মন্দিরের বিগ্রহের সঙ্গে অন্য কোনও মন্দিরের বিগ্রহের রূপ মেলে না। দেবীর চারটি হাত রয়েছে, এবং একটির ওপর আর একটি পা রেখে বিরাজ করছেন। বিগ্রহের দুই পাশে দু’জন অতন্দ্র প্রহরীর মূর্তি। আর দেবীর পায়ের তলায় রয়েছে এক দানব। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই দেবী খুবই জাগ্রত বলে মনে করা হয়। যদিও সেখানকার বিশেষজ্ঞরা এই দেবীর সঠিক পরিচয় কী, তা নিয়ে আজও নিশ্চিত নন। তবে মনে করা হয়, ছেডিয়ানের এই দেবীর সঙ্গে চিনের কোনও যোগসূত্র নেই, বরং ভারতেই এই দেবীর আদি নিবাস হতে পারে বলে মত তাঁদের। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলা যায় দক্ষিণ ভারতই এই দেবীর আদি নিবাস।

স্থানীয় পণ্ডিতরা মনে করেন, আজ থেকে প্রায় ৮০০ বছর আগে কর্মসূত্রে চিনে বসবাস করতেন তামিল ব্যবসায়ীরা। সেইসময়ে সেদেশে বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল গুয়ানঝাউ। মনে করা হয়, দক্ষিণ ভারত থেকেই চিনা বানিজ্যনগরী গুয়ানঝাউ-তে নিয়ে আসা হয়েছিল এই বিগ্রহের পাথর। এই পাথর থেকেই প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল দেবী গুয়ানাইনের। বা এও হতে পারে সেই সব তামিল ব্যবসায়ীদের নির্দেশেই ভারতীয় আদলে নির্মাণ করা হয়েছে মন্দিরের ভাস্কর্যশিল্প। ছেডিয়ান গ্রামের বাসিন্দা লি সাং লং-এর কথায়, চিনে সম্ভবত এটিই একমাত্র হিন্দু মন্দির যে হিন্দুদেবীর পুজো আজও করে চলেছেন তাঁরা। ওই ব্যক্তির কথায়, আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে এই মন্দিরটি ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু গ্রামের মানুষরাই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেবীর মূর্তিটি উদ্ধার করে মন্দিরটি সংস্কারের কাজ করেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল এই হিন্দুদেবীই তাঁদের সৌভাগ্যের দিশা দেখাবেন। সেই বিশ্বাস কিন্তু এত শতাব্দী পরেও অটুট রয়েছে।

গুয়ানাইন দেবী যে, কোনও এক হিন্দুদেবীরই পরিবর্তীত রূপ সেই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, কেবল ছেডিয়ানের এই মন্দিরই নয়, চিনে প্রায় ডজনখানেক হিন্দু দেব-দেবীর মন্দির রয়েছে, যেখানে আজও দেবতারা চিনাদের দ্বারাই পূজিত হয়ে আসছেন। ইতিদাসবিদ্‌রা মনে করেন, এই শতাব্দী প্রাচীন এই মন্দিরটি ছাড়াও গুয়ানঝাউ সংলগ্ন অঞ্চলে অতীতে আরও বেশকিছু হিন্দুমন্দির ছিল যা কালের নিয়মে হারিয়ে গিয়েছে। আর কিছু মন্দির ধ্বংসস্তূপের নীচে হারিয়ে গিয়েছে। আর সেইকারণে আজকের দিনে একথা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল যে, ঠিক কোন অঞ্চলে কতগুলি মন্দির অবস্থিত ছিল।

তবে গুয়ানঝাউ মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে যে ভারতের যোগসূত্রে রয়েছে তা ১৯৩০ সাল পর্যন্ত মানুষের অজানাই ছিল। ১৯৩০ সালে চিনা প্রত্নতাত্ত্বিক অয়ু ওয়েনলিয়াং প্রথম আবিষ্কার করেন যে, গুয়ানঝাউ-এর একাধিক ভিত্তিপ্রস্তরে বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারের ছবি রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন মূর্তি থেকেও হিন্দু পূরাণে বর্ণিত বিষ্ণু এবং মহাদেব-সম্পর্কিত বিভিন্ন গাথার বিবরণ পাওয়া যায়। যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সমসাময়িককালে তামিলনাড়ু এবং অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন মন্দির এবং স্থাপত্যের সঙ্গে চিনের গুয়ানঝাউ-এর মন্দিরের মিল রয়েছে।

তবে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসার কয়েকদশক পরে প্রাচীন ওই প্রস্তরখণ্ড এবং মূর্তিগুলিকে যাদুঘরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল। এই যাদুঘরই বর্তমানে গুয়ানঝাউ মেরিটাইম মিউজিয়াম নামে পরিচিত ছিল। তবে এখানেই শেষ নয়, আনুমানিক সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত মন্দির কাইউয়ান বৌদ্ধ মন্দির, যা গুয়ানঝাউ-এর অন্যতম বড় মন্দির বর্তমানে পুরনো শহরের মধ্যস্থলে অবস্থিত। বৌদ্ধ চৈনিক এই মন্দিরে প্রতিদিন প্রায় হাজার ভক্তের সমাগম হয়। এই মন্দিরের প্রায় অধিকাংশ স্তম্ভে বহু হিন্দু পৌরাণিক গাথা খোদাই করা রয়েছে। এখানেও বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারের রূপ চোখে পড়ে। কাইউয়ান মন্দিরে থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে বিখ্যাত ব্যাম্বু স্টোন পার্কে রয়েছে কয়েক মিটার উচ্চ একটি শিব-লিঙ্গ। এইরকম আরও অনেক হিন্দু দেবদেবীর অস্তিত্ব আজও খুঁজে পাওয়া যায় সুদূর কমিউনিস্ট দেশে, যাঁদের অস্তিত্ব সত্যিই বিস্ময়কর।

1 COMMENT

  1. How does this justify the very first sentence? The Hindu practice was taken to China by Tamil merchants… then how come China becomes the original place?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here