৭৫ পয়সায় উদয়াস্ত শ্রমের চুক্তিপত্রেই লুকিয়ে থাকত চাবুকের সপাং শব্দ

1316

১৮৩৮ থেকে ১৯১৬-র মধ্যে কয়েক লক্ষ ভারতীয় মহিলা ও পুরুষ পাড়ি দিয়েছিল অতলান্তিক ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দুর্লভ যাত্রায় | ভবিষ্যতের সুখস্বপ্নে বিভোর মানুষগুলো জানতেন না তাঁরা বন্ডেড লেবার হয়ে পাচার হচ্ছেন | ক্যারিবিয়ান বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জে তাঁরা ছিলেন ব্রিটিশদের ব্যবসার মূল স্তম্ভ | বন্ডেড লেবার হয়ে তাদের জীবন কাটত আখের ক্ষেতে | কিন্তু এই ক্রীতদাসদের কান্না বাইরের জগতকে শুনতে দেওয়া হয়নি ‚ তাঁদের কণ্ঠরোধ করেছে কালের ইতিহাস | তাঁদের পরিচয়‚ তাঁরা গিরমিটিয়া | যে চুক্তিপত্রে আঙুলের টিপসই দিতেন‚ নিজের অজান্তে সেই কাগজগুলোই তাঁদের কফিনে শেষ পেরেক হতো | শোষণযন্ত্রে নিষ্পেষিত হওয়ার প্রতীক তাঁরা‚ গিরমিটিয়া |

আজকের উত্তর প্রদেশ‚ বাংলা ও বিহার জুড়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে | গ্রামের পর গ্রামে ধানি জমিতে ব্রিটিশরা আফিম চাষ করছে তখন | জমির উর্বরতা ও কৃষকের মাংসপিণ্ড‚ দুটোই তখন রক্তশূন্য | ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে দেখা দিল ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্য |

সে সময় বিশ্ব জুড়ে নিজেদের উপনিবেশে অর্থকরী ফসল চাষে মন দিয়ে উঠেপড়ে লেগেছে ব্রিটিশরা | ভারতে যেমন নীল আর আফিম‚ ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে তেমন আখ বা চিনি | ভারতে কর্মহীন অসংখ্য কৃষক-শ্রমিকদের তখন দলে দলে পাঠানো হচ্ছে বাইরে | পশুদের থেকেও অধম হিসেবে দেখা হতো তাদের | জান্তব পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়া হতো পাশবিক নির্যাতনের মুখে |

অন্যান্য ইউরোপীয়ান উপনিবেশের মতো ভারতেও দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে প্রচলিত ছিল মানুষ পাচার তথা দাস ব্যবসা | কিন্তু নিজেদের নিয়মে নিজেদেরই ফ্যাসাদ হল ব্রিটিশদের | গ্রেট ব্রিটেনে ১৮৩৩ সালে বিলুপ্ত হয়ে
গিয়েছে দাস ব্যবস্থা | ওদিকে যে আফ্রিকান ক্রীতদাসরা এতদিন কাজ করেছে তারা আর অত কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি নয় একেবারেই |

এই অবস্থায় লোকাভাবে চিনিকলের ধোঁয়া বন্ধ হতে বসেছে প্রায় | ভেবে চিন্তে আইনের ফাঁক বের করা হল | এতে আইন থাকল | আবার আইনের ফাঁক গলে কাজের লোকও পাওয়া গেল | এ বার আর দাস বা ক্রীতদাস নয় | নতুন নাম হল লেবার বা শ্রমিক | এতে সাপ মরল, আবার লাঠিও ভাঙল না | আইন রক্ষা হল | আবার বেগার পরিশ্রমের মজুরও হাজির | আফ্রিকানদের তুলনায় এশীয় বা ভারতীয়রা বেশি দক্ষ ছিল কাজে | তার উপর‚ তারা শত অত্যাচারেও মনিবের বেশি অনুগত থাকত |

তবে ব্রিটিশদের কাজ সফল করে দেয় ভারতীয়রা | দেশীয় আড়কাঠিরা না থাকলে বিদেশিরা অত সহজে এভাবে মানুষ পাচার করতে পারত না | এইসব ফড়ে বা দালালরা বিহার উত্তরপ্রদেশের গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়াত | অসহায় চাষিদের স্বপ্ন দেখাত ‘অচ্ছে দিন’-এর | চোখে রঙিন চশমা পরা এই সহায়সম্বলহীন লোকগুলো কাগজে টিপসই দিত | যে তারা স্বেচ্ছায় মজুর খাটতে ইচ্ছুক |

তারপর তারা গিয়ে বসত স্টিমারে |  ব্রিটিশ ইন্ডিয়া স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির অসংখ্য স্টিমার অগুনতি বার যাতায়াত করত | প্রধানত বিহার ও উত্তরপ্রদেশের সর্বহারা চাষিরা কলকাতা আর মাদ্রাজ
বন্দর থেকে যেত ফিজি‚ জামাইকা‚ গায়ানা‚ মরিশাস‚ সুরিনাম‚ ত্রিনিদাদ-টোব্যাগো‚ নাতালের মতো ব্রিটিশ উপনিবেশে | মোটামুটি ১৮৩৮ থেকে ১৯১৬ অবধি ৪০ এর বেশি জাহাজ অন্তত ৮২ বার ফেরি খেটে শুধু ফিজিতেই নিয়ে গেছে ষাট হাজারের বেশি মজুর | শেষে এমন হল‚ এক সময়ে এই দেশগুলোর নামই হয়ে গেল গিরমিটিয়া কান্ট্রিজ | যেখানে ভারতীয়রা নতুন মজদুর শ্রেণী তৈরি করল‚ যার নাম ‘ কুলি’ | 

মালিক ও মজুর পক্ষের মধ্যে একটা চুক্তি সই হতো | যার নাম ছিল এগ্রিমেন্ট | এই ইংরেজি শব্দের অপভ্রংশই হল গিরমিট | নিরক্ষর মানুষগুলোর মুখে মুখেই জন্ম নিয়েছিল তাদের পরিচয়‚ ‘ গিরমিটিয়া ‘ | কন্ট্র্যাক্ট-কে তারা বলত কন্ত্রকি | তাতে লেখা থাকত‚ তাদের দৈনিক মজুরি পুরুষদের জন্য ৭৫ পয়সা বা ১২ আনা | মহিলা হলে ৫৪ পয়সা | একই কঠোর নিয়ম শিশুদের জন্যও | পনেরো বছর বয়্সী কম শিশুদের জন্য কোনও নির্ধারিত মজুরিই ছিল না | সারা দিন যেমন কাজ‚ দিনের শেষে তেমন মজুরি |

মজুরদের দিন শুরু হতো ভোর চারটেয় | প্রখর রোদে একটানা মাঠে কাজ করতে হতো | এক চুল এদিক ওদিক হলেই নির্মম চাবুক | খাবার সামান্য | চিকিৎসা কিছুই না | নির্বিচারে মারা যেত শ্রমিকরা | আত্মহত্যা করত | পালানোর চেষ্টা করে বিফল হলে তার পরিণতি ছিল সবথেকে ভয়াবহ | জঘন্য এই প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী | তাঁর এবং আরও বহু কণ্ঠের প্রতিবাদে ১৯১৭ সালে বিলুপ্ত হয় এই মজুর প্রথা |
বলা যায়‚ বকলমে আরও একবার বিলুপ্ত হয় দাসব্যবস্থা |

এত নির্যাতন সয়েও যারা জীবিত ছিল তার নতুন দেশের জনজীবনে মিশে যায় | প্রতিষ্ঠিতও হয় জীবনে | মরিশাসে তো রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রিত্বের দফতরেও সম্মানের সঙ্গে দায়িত্বপূর্ণ কাজ করেছেন অতীতের গিরমিটিয়ার বংশধররা | ভারতেও আসেন গিরমিটিয়ার উত্তরসুরিরা | বিবর্ণ হয়ে যাওয়া শুকনো হলুদ পাতার মতো ছবি বা চিঠি সম্বল করে | যদি কান পাতলে শোনা যায় তাঁদের পূর্বপুরুষদের ফেলে যাওয় ভোজপুরী গানের ধুন |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.