শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়
শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায় এক চল্লিশ ছুঁয়ে ফেলা সাহিত্যপ্রেমী। পদার্থবিদ্যায় সাম্মানিক স্নাতক। জন্ম, বেড়ে ওঠা, থাকাথাকি সবই হাওড়া জেলার এক বর্ধিষ্ণু মফস্‌সল জনপদে। পছন্দের ক্ষেত্র মূলত গদ্য। চারপাশে ঘটে চলা আর হারিয়ে যাওয়া সময়। মজার মিশেল অথবা অন্যভাবে ভাবা। গল্প লেখার ব্যাপারে আলসেমি। এখনো অবধি একমাত্র প্রকাশিত গল্পের বই 'জেড মাইনাস' (২০১৪)। পেশাগত ভাবে একটি অগ্রণী ইংরাজি প্রকাশনা সংস্থায় যুক্ত।

রাষ্ট্রসঙ্ঘ এপ্রিলের ২ তারিখটিকে অটিজম সচেতনতা দিবস এবং গোটা এপ্রিল মাসটিকেই অটিজম সচেতনতার প্রসার-উদ্দেশ্যে চিহ্নিত করেছে। এদিকে লেজ খসে যায়, দুনিয়ার নিয়মে। চারটে জিনিস কেনার জন্য বাজারে বেরিয়ে চার নম্বরটি ভুলে যাওয়া বা গানের মুখড়া মনে রেখে শেষদিকটা উঁ উঁ করে সুরে গুনগুনোনো আজকের নতুন কথা নয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘ নির্দেশিত তারিখাবলীর ক্ষেত্রেও স্মৃতির লেজ খসে যাওয়া আমাদের দেশ বা রাজ্যে কোনো ব্যতিক্রম নয়। আর তাই, এপ্রিলের ২ তারিখ নিয়ে যেটুকু হইচই, তা মিলিয়ে যেতে থাকে ৩ তারিখ থেকেই।

Banglalive

অটিজম নিয়ে এত কথার কী আছে? আছে। শুকনো তথ্য বলছে, বাড়তে বাড়তে বর্তমানে প্রতি ৬৮ জন সদ্যোজাতর মধ্যে একটি চিহ্নিত হচ্ছে ‘উইদ অটিজম’। ভারতে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় কুড়ি লক্ষ। সামগ্রিক জনসংখ্যার মাত্রই ০.১৫ শতাংশ। মাত্রই? ভারতে আটের দশক পর্যন্ত সাধারণের কাছে এই শব্দটিই ছিল অজানা, না-শোনা। অটিস্টিক কেউ ছিলেন না তাহলে? ছিলেন। ওই বৈশিষ্ট্যাবলী দিয়ে আলাদা নামকরণ হয়নি তখনো। সকলকেই গড়পড়তা দেগে দেওয়া হত অ্যাবনর্মাল, পাগল বলে। 

উন্নত পাশ্চাত্যের গবেষণা এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অচিরেই অটিজম বাড়বে। এবং বছরের পর বছর সেই ইঙ্গিতের সমর্থনই মিলছে বাস্তবে, পৃথিবী জুড়ে। অর্থাৎ এটি কোনো ভীতি প্রদর্শনকারী ভিত্তিহীন খবরের বোলবোলাও নয়। ঘটনা হল, অটিজম কোনো রোগ বা অসুখ নয় যে ইঞ্জেকশন, অপারেশন, ওষুধ ইত্যাদির প্রয়োগে ব্যাপারটা আটকানো বা কমানো যাবে।

 

করণীয় তাহলে?

১) সঠিক জায়গায় গিয়ে ডায়াগনোসিস। কোন লেভেলে আছে তার বুদ্ধি? প্রশ্নে বা সামনে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনায় তার প্রতিক্রিয়ার অনুপাত এবং স্পষ্টতা কতটা ইত্যাদি।

২) সঠিক জায়গায় গিয়ে থেরাপি ও প্রশিক্ষণ, রোজকার জীবননির্বাহের জন্য, যতটা সম্ভব অন্যের ওপর ভরসা না-করে, নিজে নিজে।

আর এসবের আগে দরকার :

 

৩) অটিস্টিক শিশুটির বাবা-মা এবং পরিবারের অন্যদের কাছে সে যেমন, তেমন অবস্থাতেই সানন্দে গ্রহণ করা।          

এই তৃতীয় পয়েন্ট সবার আগে পর্বতসমান প্রতিবন্ধকতা নিয়ে হাজির হয়। এরও কয়েকটি ধাপ আছে, যথা :

আরও পড়ুন:  আড় মাছের আলু-বেগুন-ডাঁটা-বড়ির ঝোল

ক) বাবা এবং মায়ের নিজস্ব অথবা পারিবারিক পাপের ফল ওই সন্তান, যেন দুনিয়ায় বাকি সকলেই খানদানি পুণ্যবান পুণ্যবতী!

খ) সুসম্পর্ক আছে যেসকল আত্মীয়ের সঙ্গে, তারা ঘন ঘন খবর নেবে শিশুর। এখন বলিয়ে-কইয়ে নিউরো-টিপিক্যাল (অটিস্টিক, অ্যাসপার্জার ইত্যাদিরা পরিভাষায়— নিউরো-স্পেশ্যাল) বাচ্চার মতো আজ এটা বলছে, কাল সেটা গেয়ে শোনাল, পরশু টিভিতে ওইটা দেখতে জেদ করল এমন কোনো খবর তো হয় না জানানোর মতো। সংকটে পড়ে শিশুর বাবা-মায়েরা, কেউ জিজ্ঞেস করলে এবার কী খবর দেওয়া যায়…

গ) কর্মক্ষেত্রে বা বন্ধুরা, জানতে চাইবে, কোন ক্লাস হল মেয়ের বা ছেলের? উত্তরে সব শুনেঃ

গ-অ) অতি-সিমপ্যাথেটিক হয়ে সহানুভূতির কল খুলে দেবে কেউ কেউই

গ-আ) যেন অটিজম ইত্যাদি তেমন কিছু ধর্তব্যের বিষয়ই নয়, কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঝেড়ে ফেলে দিতে দিতে কেউ কেউ আবার বলবে, ইশকুলে ভরতি করিয়ে দাও হে, সব ঠিক হয়ে যাবে। বিকেলে খেলার মাঠটাট থাকলে বাড়ির কাছে, নিয়ে যেও। আরে, পাঁচজনের সঙ্গে মিশতে তো দাও।

গ-ই) আরেকদল সেই যে চুপ করে যাবে, কখনোই আর ওই সন্তান বিষয়ে কিচ্ছুটি জিজ্ঞেস করবে না। প্রসঙ্গ ভুলবশত উঠলেও, সেই দলভুক্তরা সামান্য শব্দও খরচ করবে না। ভাবখানা যেন, ইরিবাবা, কী থেকে কী মানে হয়, ঝামেলা বাড়িয়ে দরকার নেই…    

এইসব পাহাড় পেরোনোই হয় না অগুনতি পরিবারে। আমার জানা একটি পরিবারের কথা বলি। বড়ো ভাই অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মী। তার পরের ভাইয়ের একমাত্র ছেলে অটিস্টিক উইদ হাইপার অ্যাকটিভ ডিসঅর্ডার। বড়ো ভাইয়ের জবানিতে : আমাদের পরিবারের ওই একটি কালো দাগ। অনেক কিছু করা হয়েছিল। কত সাধুসন্ত, কত ডাক্তার। কবিরাজি, ইউনানিও। ভেলোর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ভেলোরে পরিষ্কার বলে দিয়েছে তো, কিচ্ছু হবার নেই। আর কিছুই করা হয় না, তা তাও প্রায় বছর দশেক হয়ে গেল।

প্রতিবন্ধকতা শারীরিক হলে তার জন্য সামান্য সাহায্যের হাত অচেনা পরিবেশেও, এমনকী অপরিচিতজনেদের থেকেও পাওয়া যায়। তা নিয়ে খবর হয় তো হামেশাই, দৈনিকে বা টিভিতে ফলাও করে সেসব পরিবেশিত হয়। বাসে ট্রেনে আলাদা আসন, রাস্তা থেকে সরাসরি বাসে এবং প্ল্যাটফর্ম থেকে সরাসরি ট্রেনে ওঠার সহজ-সোজা বন্দোবস্তও। এদানি আমাদের রাজ্য জুড়ে সরকার-পোষিত ইশকুলগুলির নানা পরিসংখ্যান তুলে ধরল একটি দৈনিক পত্রিকা, তাতে একটি পয়েন্ট ছিল, র‍্যাম্প আছে কি না। ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোরেল আগামী শারদোৎসবের আগেই চালু হবে, তার রেক এসে গেছে, সেখানে আধুনিক ব্যবস্থা শারীরিক প্রতিবন্ধীদের। ট্রেনে ওঠার, বসার।

আরও পড়ুন:  লেবুপাতা দিয়ে ট‍্যাংরার টক

মানসিক প্রতিবন্ধীদের র‍্যাম্পের দরকারই নেই। বিশেষ আসন বা বাথরুমের দরকারই নেই। আমজনতা তাদের অনেককেই দেখে তেমন কিছু আলাদা হয়তো বুঝবেই না। কারণ অটিস্টিকদের চ্যালেঞ্জগুলো বেশিরভাগই ইনভিজিবল! আর এমনিতেই, মানুষ মানুষকে যত দেখে, তত লক্ষ্য তো করে না, কখনোই। কী হবে এদের?

অটিস্টিকদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা যোগাযোগ, সংযোগ— কমিউনিকেশন। বুঝতে পারে, অনুভূতি আছে, অথচ তার প্রকাশ আমাদের (নিউরো-টিপিক্যালদের) মতো নয়। কেউ কেউ ভারবাল, মানে কথা বলে, কিন্তু প্রায় সবটাই অসমঞ্জস, রিপিটিটিভ। আর যারা নন-ভারবাল, তাদের মুখে থেকে কথা বের হয় কালেভদ্রে। শব্দ এবং রং ওদের কানে ও চোখে উপস্থিত হয় কয়েকগুণ বেশি প্রাবল্য নিয়ে। অন্যের চোখে চোখ রেখে স্থির থাকা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের, ওদের ক্ষেত্রে। অটিস্টিকদের দ্বারা কোনো ঘটনার পুনর্নির্মাণ প্রায় অসম্ভব। ধূর্ততার সঙ্গে ঘটনার অতিরঞ্জন বা সে ব্যাপারে জাজমেন্টাল আচরণ সম্পূর্ণত অসম্ভব।         

এখান থেকেই জাম্পকাটে ওপরে লিখিত প্রথম ও দ্বিতীয় পয়েন্টে চলে যাওয়া যায়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে একটি নতুন ‘বিল’ লোকসভার দুটি কক্ষেই সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়, ‘রাইট অফ দ্য পারসনস উইদ ডিজএবিলিটিস’। কিন্তু বাস্তবায়নে বিশেষ কিছুই নজরে আসে না। দিল্লি-কলকাতা-বেঙ্গালুরু দিয়ে এই ‘বিল’-কে তেমন কিছু ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রতিটি রাজ্য এবং প্রতিটি জেলা ধরে দরকার এগোনো। সঠিক ডায়াগনোসিস এবং সেই অনুযায়ী সঠিক কাউন্সেলিং ও থেরাপি ইত্যাদির জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত মানুষজন ও পরিকাঠামো দরকার।

আর দরকার প্রশাসনের স্বচ্ছ নিরপেক্ষ নজরদারি। নাহলে, এ-দেশ যতই আমার হোক, সুযোগ পেলে আর কেউ না দেখলে, নিজ দেশেরই ঝেড়ে ফাঁক করে দেওয়া, অনিয়ম করা, অ্যাঁকব্যাঁক করা ইত্যাদিতে আমরা খুব পটু। সততা দেশবাসীর সত্তার সঙ্গে মিশতে তো পারল না আজও, স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও।

অটিস্টিক শৈশবের পরেই আসবে অটিস্টিক কৈশোর, যৌবন। সেসব নিয়েও ভাবনাচিন্তা দরকার। মূলস্রোতে নিয়ে যাওয়া তবেই তো সম্পূর্ণ হবে।

আরও পড়ুন:  ঘরোয়া পদ্ধতিতে সান ট্যান বা রোদে পোড়া ত্বকের দাগ তুলবেন কী করে?

মুশকিল হল, অটিজম পরিলক্ষিত হচ্ছে এমন বাচ্চাদের মা-বাবাকে বাচ্চার সঙ্গে ঘরে কী কী করণীয় সেসব শেখানো হচ্ছে ছোট-মাঝারি কোর্সের মাধ্যমে। কোর্স শেষে কোনো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে শংসাপত্র ইত্যাদি ব্যতিরেকেই সে বা তাঁরা আরও জনাকয়েক অটিস্টিক বাচ্চার সঙ্গে নিজের বাচ্চাকে নিয়ে একটি ছোটোখাটো থেরাপি কাম ইশকুল চালু করে দিচ্ছে, যার তথাকথিত কোনো অনুমোদন নেই! সেখানে হয়তো বাচ্চা তিন-চার বছর থেকে আট-নয় বছর পর্যন্ত রইল। তার পর? কাজটা কেমন অর্ধসমাপ্ত, দায়হীন হয়ে যাচ্ছে না? আর ব্যাঙের ছাতার মতো এমন প্রতিষ্ঠান অলিতে গলিতে। কেউ দেখবে না?

অটিজম নিয়ে বলাবলি করবে শুধুই অটিস্টিক পরিবারের লোকজন? নিজেকে অন্ধ রেখে প্রলয় কি বন্ধ করা যায়? ঢেউ যতক্ষণ না আমায় স্পর্শ করবে, কুমীর তোর জলকে নেমেছি!

অটিজম নিয়ে কিছু উড়ো ব্যাবসা হয়। যা বলে এই রচনায় ইতি টানব। একটি জনপ্রিয় টিভি ধারাবাহিকে বছর কয়েক আগে, একটি নারীচরিত্র অটিস্টিক। সে আবার চূড়ান্ত জাজমেন্টাল! ন্যায়-অন্যায় নিমেষে নির্বাচন করে ফেলে! ধারাবাহিকটির নাম মনে নেই, মনে পড়ছে, চরিত্রটিতে অভিনয় করেছিলেন ততধিক জনপ্রিয় এক টেলি-অভিনেত্রী। তেমনই সিনেমায়। ব্যোমকেশ কাহিনি ‘চিড়িয়াখানা’ ফিরে এল আবার বড়ো পর্দায়। ছয়ের দশকের শেষভাগের কাহিনী, পিরিয়ড ড্রামা। গোলাপ কলোনির মালিক নিশানাথ সেন পরিচয় করাচ্ছেন পানুর সঙ্গে, বলছেন ছেলেটি অটিস্টিক! আদতে পানু একটু বোকাসোকা ছেলে, কানে কম শোনে এবং তোতলা, উত্তেজনায় কথা জড়িয়ে যায়। আরেকটি ‘মিসেস সেন’। সিনেমায় দ্বিতীয় নায়িকার দাদা অটিস্টিক। সে অভিযোগ করে পরপর, গুছিয়ে। একজনের চোখের আড়ালে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা নিয়ম করে তাকে জানায় পরপর, গুছিয়ে।   

এই ধ্যাষ্টামোগুলো অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার।

3 COMMENTS

  1. অভিযোগের অতিরিক্ত ঝাঁঝে আলোচনার অভিপ্রেত অভিমুখ কিঞ্চিৎ ধেবড়ে গেছে। এই ছোট পরিসরে যদি আরেকটু গুছিয়ে ও আরেকটু নৈর্ব্যক্তিক স্বরে প্রাসঙ্গিক তথ্যাদির আপডেট তথা কিছু সদর্থক ভাবনার দিশা দেওয়া যেত— যাঁরা বিষয়টি সম্পর্কে অনবহিত এবং যাঁরা পথ খুঁজে ফিরছেন, উভয় তরফেরই ঈষৎ বেশি উপকার হতে পারত।

  2. এই ধরনের সমস্যায় কি করনীয় বিশদে বললে ভাল হোতো‌।