প্রাচীনত্বের আকর ৪৫০ বছরের রাজ পরিবারের পাঠাগার আজও নিবারণ করছে জ্ঞানতৃষ্ণা

বিশ্বের শক্তিধর সব শাসকই নিজেদের পাঠাগার নিয়ে দম্ভ প্রকাশ করতে ভালবেসে এসেছে | জ্ঞান ও শক্তির সম্মিলিত প্রতীক যেন পাঠাগার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় পাঠাগার হল সেই স্থান যেখানে স্থির হয়ে থাকে জ্ঞানসমুদ্র | প্রত্যেক জমিদার-রাজা-সম্রাট-নবাব-সুলতানের নিজস্ব পাঠাগার থাকাটা ছিল আভিজাত্য ও ক্ষমতার চিহ্ন | সে তিনি পাঠাগারে সময় অতিবাহিত করুন‚ বা না-ই করুন | কারণ সবাই তো আর সম্রাট হুমায়ুন নন | পাঠাগারের সিঁড়ি দিয়ে আনমনে নেমে আসার সময় পড়ে গিয়ে আহত হয়েছিলেন বাবর-পুত্র | সেটাই হয়ে দাঁড়ায় তাঁর মৃত্যুর কারণ |

রাজপাঠাগারে সাধারণের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ | কিন্তু ভারতের মাটিতে আজও বহাল সেরকমই এক পাঠাগার | যা স্থাপিত রাজবংশের দ্বারা | কিন্তু এখন তাতে উপক্রিত সাধারণ মানুষ | তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুরের সরস্বতী মহল লাইব্রেরি শুধু ভারতেই নয়‚ সারা এশিয়ায় প্রাচীনতম পাঠাগারের মধ্যে একটি‚ যেটি রাজ পরিবারের উদ্যোগে শুরু হলেও এখন উপভোক্তা হলেন আমজনতা | তাঞ্জোর বা তাঞ্জাভুরের মহারাজা দ্বিতীয় সরফোজি তৈরি করেছিলেন এই পাঠাগার | এই শাসকের আমলেই তাঞ্জোর চিত্রকলা ও ভরতনাট্যম প্রভূত বিকশিত হয়েছিল |

চেন্নাই থেকে ২৭৯ কিমি দূরে অবস্থিত তাঞ্জোর মধ্যযুগে ছিল চোলদের রাজধানী | রাজ রাজ চোলের তৈরি বিখ্যাত মন্দির এখনও সেই স্মৃতির বাহক | এরপর দীর্ঘ এক যুগ তাঞ্জোর শাসন করেছেন মারাঠারা | ১৬৭৫ থেকে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি তাঞ্জোর শাসন করেছে মরাঠা শক্তি | তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন মহারাজা সরফোজি | তিনি চিলেন শিল্প সংস্কৃতির গুণগ্রাহী ও পৃষ্ঠপোষক | তিনি তাঞ্জোরের প্রাচীন পাঠাগার সংস্কারসাধনে ব্রতী হলেন | 

১৫৩৫ থেকে ১৬৭৩ অবধি তাঞ্জোর শাসন করেছিলেন নায়েক রাজারা | তাঁরাই প্রথম তৈরি করেছিলেন এই পাঠাগার | মারাঠা আমলে এই পাঠাগারে আনা হয় বিশ্বের বহু প্রাচীন ও বিখ্যাত দুষ্প্রাপ্য পুঁথি | আজও এই পাঠাগারে সযত্নে রক্ষিত ভূর্জপত্রে হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি‚ তামিল‚ হিন্দি‚ তেলুগু‚ ইংরেজি‚ মরাঠি ও অন্যান্য ভাষায় | ষাট হাজার মুদ্রিত বই‚ পয়ঁতাল্লিশ হাজার পাণ্ডুলিপির আধার এই পাঠাগার | প্রাচীন মোড়ি বা মোদি হরফে আছে বারো হাজার নথি | বিংশ শতাব্দীর শুরু অবধি এই হরফেই লেখা হতো মরাঠি ভাষা |

সরস্বতী পাঠাগারের দুর্লভ উল্লেখযোগ্যতম বইয়ের মধ্যে অন্যতম ব্যাকরণ ও চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে বই ও রান্নাবান্নার উপর বই | সেই রন্ধনপ্রণালী সংক্রান্ত বই হল ভোজন কুট্টুকলম সরভেন্দ্র ফক্ষস্ত্রম | যে বইয়ে বর্ণিত ছিল মরাঠা রাজদরবারের হেঁশেলের যাবতীয় খুঁটিনাটি | 

আরও একটি আকর্ষণীয় ও বিরল পাণ্ডুলিপি হল শব্দার্থ চিন্তামণি | রচয়িতা চিন্তামণি কবি | তাঁর সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না | তবে এই বইটির বিশেষত্ব হল‚ এটা যদি বাঁ থেকে ডান দিকে পড়া হয়‚ তাহলে মহাভারতের গল্প বলে | ডান থেকে বাঁ দিকে পড়লে তা তখন রামায়ণের আখ্যান তুলে ধরবে | সরফোজি এতই বইপ্রেমী ছিলেন‚ নিজের উদ্যোগে গড়ে তোলেন ছাপাখানা | সেখানেই প্রথম দেবনাগরী হরফে লেখা হয় সংস্কৃত | তার আগে দেবভাষার লিখিত রূপ ছিল আঞ্চলিক ! 

সরফোজির উত্তরাধিকার ছিলেন শিবাজি | যাকে ইতিহাস চেনে শিবাজি অফ তাঞ্জাভুর বলে | তিনি অবশ্য বেশিদিন শাসন করেননি | সিংহাসনে ছিলেন ১৮৩২ থেকে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি | তিনি অপুত্রক ছিলেন | তাঁর দত্তক পুত্রকে মান্যতা দেয়নি ব্রিটিশরা | ফলে শিবাজির মৃত্যুর পরে তাঞ্জাভুর বকলমে হয়ে যায় ব্রিটিশদেরই | কিন্তু অবহেলিত হতে থাকে সরস্বতী পাঠাগার | 

সেরকম কিছু দুষ্প্রাপ্য সংযোজন হয়নি তলিকায় | তবে ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হতে থাকে পাণ্ডুলিপির লিখিত রূপ | ১৯৮০ সাল অবধি এই প্রকাশ অক্ষুণ্ণ ছিল | সরস্বতী মহল পাঠাগার এখন দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ কেন্দ্র | সেইসঙ্গে একটি জাদুঘরও | তাঞ্জাভুর স্টেশন থেকে তিন কিমির মধ্যে থাকা এই ভবনে আছে কয়েক হাজার দুষ্প্রাপ্য বই‚ যাদের পৃষ্ঠা ওল্টানো হয়নি কয়েক যুগ |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here