মীরজাফরের উপহার দেওয়া এই বাড়িতেই থাকতেন হেস্টিংস‚ কাছেই লড়েছিলেন বিখ্যাত ডুয়েল

নবাবি আমল থেকে ব্রিটিশ যুগ পেরিয়ে এখন | আলিপুর বরাবরই অভিজাতদের ঠিকানা‚ যাকে বলে ‘পশ’ | আলিপুরের বেলভেডেয়ার এস্টেট ছিল ওয়ারেন হেস্টিংস-এর বসবাসের ভবন | বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেলের দায়িত্বে হেস্টিংস ছিলেন ১৭৭৩ থেকে ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি | দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতির পরেও তিনি এই ভবনে থাকতেন বলে জানা গিয়েছে | সে সময় কলকাতায় বেশ কিছু বাড়ি নির্মাণ করিয়েছিলেন মীর জাফর | বিশ্বাসঘাতকতা করে সিরাজকে সরানোর পরে ব্রিটিশদের হাতের পুতুল-নবাব ছিলেন মীর | অল্প কিছুকাল সিংহাসনে থাকলেও স্থাপত্যে মনোনিবেশ করতে ভোলেননি |

পলাশীর যুদ্ধের পরে সিংহাসনে বসে মীর জাফর টের পেলেন ব্রিটিশরা কোন ধাতুতে গড়া | ক্রমাগত অর্থের চাপে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়লেন | দাবিমতো অর্থ না দিতে পারায় তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করলেন তৎকালীন বাংলার গভর্নর হেনরি ভ্যান্সিটার্ট | তখন আলিপুরে এসে থাকছিলেন মীর জাফর | শোনা যায়‚ এখানে তাঁর একটি আলাদা সুরম্য বাড়ি ছিল | পরে তাঁকে ফের ক্ষমতায় এনেছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস | কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁকে বেলভেডেয়ার এস্টেট উপহার দিয়েছিলেন নবাব মীরজাফর |

তাঁর সঙ্গে হেস্টিংস-এর সখ্যতা শুরু সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র দিয়ে | সিরাজ তাঁকে যতটা নাস্তানাবুদ করেছিলেন কড়ায় গণ্ডায় তা উশুল করেছিলেন হেস্টিংস | যাই হোক‚ পলাশীর যুদ্ধে ক্লাইভের খঞ্জর লাল হয়ে বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের পত্তন হল | তার পনেরো বছর পরে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে হেস্টিংস দায়িত্ব পেলেন গভর্নর অফ দ্য প্রেসিডেন্সি অফ বেঙ্গল‚ ফোর্ট উইলিয়ম বেঙ্গল-এর | তার আগে ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে বক্সার যুদ্ধের পরে হেস্টিংস ফিরে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ড | আবার ফিরে এসে একেবারে গর্ভর্নরের দায়িত্ব এবং বেলভেডেয়ার এস্টেট প্রাপ্তি |

আরও যা প্রাপ্তি হয়েছিল‚ তা হল ব্যারনেস ইনহফ | এই অভিজাত সুন্দরীর সঙ্গে হেস্টিংস বেলভেডেয়ার হাউজে সহবাস করতেন বলে শোনা যায় | তার আগে হেস্টিংস বিয়ে করেছিলেন ব্ল্যাকহোলকাণ্ডে নিহত এক ব্রিটিশের স্ত্রীকে | বেলভেডেয়ার এস্টেটে হেস্টিংস-এর ব্যারনেস প্রীতির জন্য ডুয়েল পর্যন্ত হয়েছিল|

হেস্টিংস-এর লিগ্যাল অফিসার ফিলিপ ফ্রান্সিসও নাকি মুগ্ধ ছিলেন এই ব্যারনেসের রূপে | তবে অনেক ঐতিহাসিক বলেন‚ ডুয়েলের কারণ নারী বা প্রণয়ঘটিত নয় | বরং তা ছিল রাজনৈতিক ও সম্পূর্ণ ক্ষমতার সংঘাত | কারণ ফরাসি সুন্দরী ক্যাথরিন গ্রন্দের সঙ্গে প্রণয়ে লিপ্ত ছিলেন ফিলিপ ফ্রান্সিস |  

যে কারণেই হোক‚ ডুয়েল হবে বলে ঠিক হল | দিন নির্ধারিত হল‚ ১৭৮০-র ১৪ অগাস্ট | নির্ধারিত দিনে ভোর সাড়ে পাঁচটার সময় পুরোদস্তুর সাহেবি কেতা মেনে হাজির দুই ডুয়েল লড়িয়ে | প্রথমে ঠিক হয়েছিল এস্টেটের ভিতরেই হবে খেলা | কিন্তু পরে একটি নির্জন রাস্তায় মুখোমুখি দুই পিস্তলধারী | হেস্টিংস বা ফিলিপ‚ কেউই আদৌ বন্দুকবাজিতে দক্ষ ছিলেন না | ডুয়েলে জয়ী হয়েছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস | তাঁর গুলিতে আহত হয়েছিলেন ফিলিপ | সেই ইতিহস বহন করে আলিপুর চিড়িয়াখানার কাছে আজও বিস্তৃত ডুয়েল অ্যাভিনিউ |

১৭৮২-১৭৮৫ হেস্টিংস ছিলেন ফোর্ট উইলিয়ম প্রেসিডেন্সির গভর্নর জেনারেল | তখনও তাঁর বাসভবন ছিল বেলভেডেয়ার এস্টেট | এরপর আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম | পরের অধ্যায় নন্দকুমারের ফাঁসি | খাজনা আদায়ের দায়িত্ব দিয়ে তাঁকে হেস্টিংস ফাঁসিয়েছিলেন বলেই বিশ্বাস অধিকাংশ ঐতিহাসিকের | প্রশাসনিক হেস্টিংসের দিন ফুরোতে তিনি ফিরে যান জন্মভূমিতে | তবে তিনি নাকি কলকাতার মায়া কাটাতে পারেননি | এখনও ফিরে আসেন নিউ ইয়ার্স ইভ-এর রাতে‚ বেলভেডেয়ার এস্টেটে | 

জাগতিক ভাবে ছেড়ে যাওয়ার আগে তিনি নাকি এই ভূসম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে গিয়েছিলেন | ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে এই বাড়ি তিনি বিক্রি করে দিয়েছিলেন মেজর টলি-কে‚ ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে | ১৭৮৪-তে মেজরের মৃত্যুর পরে আবার এটা মালিকানা বদল হয়ে যায়‚ ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে | ১৮৫৪ থেকে ১৯১১ অবধি বহু গভর্নরের বাসভবন ছিল এই রোমান স্থাপত্যের ভবন | এরপর ১৯১২ সালে রাজধানী স্থানান্তরিত হয় দিল্লিতে | প্রাক্তন রাজধানীর বেলভেডেয়ার হাউজও হারায় রাজভবনের গরিমা | আলিপুরে ৩০ একর জমির উপর বেলভেডেয়ার এস্টেট আজ জাতীয় গ্রন্থাগার‚ সরকারি কার্যালয়‚ সরকারি কর্মীদের থাকার জায়গা ছাড়াও ডুয়েলের বারুদগন্ধে ভরপুর জীবন্ত
ইতিহাস |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.