আফ্রিকায় নেকড়ে না মেরেই বিশ্ব জুড়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার শরিক বাস্তবের মন্দার বোস

অসচ্ছল পরিবারে অকালে ছত্রভঙ্গ হলে যা সাধারণত হয়‚ তাই হল | বন্ধ হয়ে গেল ছেলের পড়াশোনা | বাবার মৃত্যুতে অষ্টম শ্রেণীর পরেই ইচ্ছে না থাকলেও স্কুলছুট রামনাথ বিশ্বাস | কাজ জুটল সিলেটের জাতীয় ভাণ্ডার সমিতিতে | স্বদেশী আন্দোলনের অংশ হিসেবে গৃহীত উদ্যোগ | সেখানেই গাড়ি সারানোর জায়গায় চাকরি হল রামনাথের | মেকানিকের কাজ করতে করতেই শেখা হয়ে গেল গাড়ি চালানো | চার চাকার পাশাপাশি দু পায়ে দিব্যি পোষ মেনে গেল দু চাকাও | সেই সাইকেলই যে একদিন রামনাথের একান্ত বাহন হবে‚ তা হদিশ তখনও অবধি পাওয়া যায়নি |

তবে যে অশনি সঙ্কেতের হদিশ পাওয়া গিয়েছিল‚ তা হল আবার রামনাথের সামনে ফের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ | ইতিমধ্যে অনুশীলন সমিতিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি | সে কথা আর গোপন থাকল না | ফলে জাতীয় ভাণ্ডার ছেড়ে যে নতুন কাজের জায়গায় তিনি গিয়েছিলেন‚ সেখানে মেয়াদ ফুরোলো | স্বদেশী ঘেঁষা কাউকে সেখানে রাখা হবে না | এই সময়ে বাঁধল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ | ডাকাবুকো রামনাথ যোগ দিলেন ব্রিটিশ সেনার বাঙালি পল্টনে | পোস্টিং হল সুদূর মেসোপটেমিয়ায় | ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে যোগ দিয়ে রামনাথ এবার পাড়ি দিলেন ব্রিটিশ মালয়ে |

শ্রীহট্ট বা সিলেটে বন্দি না থেকে জগৎটাকে দেখবেন বলেই যেন জন্ম রামনাথ বিশ্বাসের | ১৮৯৪-এর ১৩ জানুয়ারি | তখনকার অসমের সিলেট জেলার বানিয়াচং গ্রামে,বিরজানাথ বিশ্বাস ও গুণময়ী দেবীর সংসারে |  | এখন এই গ্রাম পড়ে বাংলাদেশের হাবিগঞ্জ জেলার সিলেট ডিভিশনে | গ্রামের হরিশ্চন্দ্র হাই স্কুলেই অষ্টম শ্রেণী অবধি পড়াশোনা রামনাথের | স্কুলের পড়াশোনার বাইরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করে ছিল আরও বৃহত্তর জীবনপাঠ | যা এনে দিয়েছিল দু চাকার যান |

সেই পাঠ নেবেন বলেই রামনাথকে প্রলুব্ধ করতে পারল না নিশ্চিত গৃহকোণের হাতছানি | প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক বছর পরে রামনাথ বের হলেন তাঁর প্রথম বিশ্বভ্রমণে | সম্বল বলতে তাঁর সাইকেল‚ সাইকেল সারাইয়ের যন্ত্রপাতির বাক্স‚ এক জোড়া চটি আর সামান্য কিছু পোশাক | সাইকেলে ঝুলত বোর্ড‚”Round the world, Hindoo traveller”. ১৯৩১-এর সাতই জুলাই যাত্রা শুরু হয়েছিল রামনাথের | সিঙ্গাপুরের কুইন স্ট্রিট থেকে | 

মালয়‚ শ্যাম ‚ ইন্দোচিন‚ চিন‚ কোরিয়া‚ জাপান চষে তিনি পৌঁছলেন কানাডা | সেখানে ইমিগ্রেশন ইত্যাদির ঝামেলায় মাসখানেক তাঁকে কারাদণ্ডও পোহাতে হয় | আরও নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাত্রা সমাপনে ভারতে ফিরলেন ১৯৩৪-এ | তাঁকে দেশের মাটিতে সংবর্ধনা জানানো হয় | কিন্তু যাঁর পায়ের নিচে সর্ষে‚ তাঁকে ঘরের চার দেওয়ালে বাঁধা মুশকিল | কয়েক মাসের মধ্যে আবার বিশ্ব সফরে ভূপর্যটক রামনাথ | 

এবার অন্য রুট | ভারত‚ আফগানিস্তান‚ পারস্য‚ ইরাক‚ সিরিয়া‚ লেবানন‚ তুরস্ক‚ বুলগেরিয়া‚ যুগোস্লাভিয়া‚ হাঙ্গেরি‚ অস্ট্রিয়া‚ চেকোশ্লোভাকিয়া‚ জার্মানি‚ নেদারল্যান্ডস‚ বেলজিয়াম‚ ফ্রান্স হয়ে পৌঁছলেন ইংল্যান্ড | বাদ গেল না স্কটল্যান্ডও | এই বিশ্বসফরে মন মেজাজ ভাল থাকলেও বেঁকে বসল ভূপর্যটকের শরীর | যাত্রা শুরুর দু বছর পরে‚ ১৯৩৬ সালে লন্ডন থেকে পোর্ট সৈয়দ হয়ে তিনি ফিরে আসেন ভারতের সাবেক বম্বে‚ আজকের মুম্বইয়ে |

এর দু বছর পরে তৃতীয় ও তথা শেষ বিশ্বভ্রমণ ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের | ১৯৩৮ সালে‚ এবার গন্তব্য আফ্রিকা | মুম্বই থেকে মোম্বাসা গেলেন জাহাজে | মোম্বাসা থেকে সাইকেলসফর শুরু | কেনিয়া‚ উগান্ডা‚ রোডেশিয়া বা আজকের জিম্বাবোয়ে হয়ে সাউথ আফ্রিকা | দেশে প্রত্যাবর্তন ১৯৪০-এ | 

আর কোনও পর্যটনে না যাওয়া ভূপর্যটক বেঁচেছিলেন আরও পনেরো বছর | দেশভাগের পরে গিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে‚ নিজের জন্মভূমিতে | কিন্তু ফিরে আসেন কলকাতায় | সে সময় তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত প্রকাশিত হতো দেশ‚ বসুমতী-সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় | কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল‚ বইপ্রকাশের সময় প্রকাশক পাননি রামনাথ | শেষে তিনি নিজেই প্রকাশনী সংস্থা খুলে বই প্রকাশ করেছিলেন | ১৯৫৫ সালের ১ নভেম্বর কলকাতায় প্রয়াণের আগে অবধি তিরিশটিরও বেশি বই লিখেছিলেন বিপ্লবী‚ সৈন্য ও ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস | 

প্রাক গুগল আর্থ ও নেভিগেটর যুগে সাইকেলে ৫৩ হাজার‚ পদব্রজে সাত হাজার‚ রেলে দু হাজার‚ জাহাজে ২৫ হাজার মাইল বা বা ১ লাখ ৪০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি | ছিলেন সংস্কারহীন ও নির্লোভ | নিরাপত্তার খাতিরে সাইকেলে হিন্দু পরিচয় লেখা থাকত | কারণ ‘ ইন্ডিয়ান’ পরিচয় তখন সর্বত্র সুস্বাগতম ছিল না | তাই বলে ভারতীয়্ত্ব নিয়ে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত ছিলেন না | বিশ্বের যেখানেই গেছেন‚ বলেছেন বানিয়াচং গ্রামের থেকে বড় গ্রাম আর দুটো নেই | দক্ষিণ আফ্রিকা তো বটেই‚ ইউরোপীয়ান দেশেও বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন প্রতিবাদে | 

সেই একই নীতিবোধ থেকেই ফিরিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং হিটলার-মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ | তার বরং ভাল লাগত আমজনতার সঙ্গে প্রাণখোলা আলাপে | আর ভাল লাগত সর্বভুক পরিচয় | তবে সবথেকে পছন্দ করতেন খিচুড়ি | প্রয়োজনে শূকরের চর্বি ভক্ষণেও ছিলেন দ্বিধাহীন | বিশ্বের রকমারি খাবারে অভ্যস্ত জিভ নিয়েই হাজির হয়েছিলেন চিনে | ভেঙেছিলেন মিথ | দেখেছিলেন‚ চিনের মানুষমাত্রেই আরশোলাভাজাপ্রেমী নন | আর‚ চিনের মহাপ্রাচীর দিয়ে সাতজন ঘোড়সওয়ার একসঙ্গে পাড়ি দিতে পারে না | রীতিমতো মেপে দেখেছিলেন তিনি |  অথচ এই সর্বভুক স্বভাবের জন্যই আত্মীয়পরিজনরা ঘনিষ্ঠতা ত্যাগ করেছিলেন | কারণ‚ জাত চলে যাওয়ার ভয় |  

তাতে কিছু এসে যায়নি এই অকুতোভয়ের | বলতেন‚ অর্থলোভ ছেড়ে নিষ্কাম না হলে ভ্রমণপিপাসু হওয়া যায় না | যাঁর কিছু পাওয়ার আশা নেই‚ হারানোরও উদ্বেগও ছিল না যে | ঘরের বাঁধনছেঁড়া এই বনের পাখি একবার পরম নীড়ের আশ্রয় পেয়েছিলেন | শান্তিনিকেতনে‚ স্বয়ং গুরুদেবের সামনে | যখন দেখেছিলেন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে শুধু পড়েইছেন‚ তা নয়‚ রীতিমতো লেখার নিচে আন্ডারলাইন করে রেখেছেন ! মনে হয়েছিল‚ এই মাহেন্দ্রক্ষণের কাছে বোধহয় তুচ্ছ বিদেশের মাটিতে অতি মূল্যবান অভিজ্ঞতাও |

সেই অমূল্য অভিজ্ঞতা‚ যা একষট্টি বসন্ত ধরে সঞ্চয় করে গিয়েছিলেন ম্যাট্রিকে ভূগোলে ছাপ্পান্ন না পাওয়া‚ বলা ভাল‚ ম্যাট্রিকে বসারই সুযোগ না পাওয়া‚ বাস্তবের মন্দার বোস | যিনি সত্যিই ক্যানিবলের হাঁড়িতে সিদ্ধ হওয়া ছাড়া বাকি সব রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পরখ করেছিলেন আফ্রিকায় নেকড়ে না মেরেই | 

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.