একাকিত্ব আর অবহেলায় স্বাধীন ভারতের পথের পাশে মৃত্যু হয় এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর

৬ ফেব্রুয়ারি‚ ১৯৩২ |

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হল | বার্ষিক সমাবর্তন | বাংলার তৎকালীন গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনের হাত থেকে ডিগ্রির শংসাপত্র গ্রহণ করবেন কৃতী ছাত্রছাত্রীরা | উত্তেজনায় বুক ঢিপঢিপ করছে বীণা দাসের | এই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় তো ছিলেন তিনি | ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হয়েছেন বীণা | 

সামনে‚ খুব কাছেই লক্ষ্য | মন এবং দৃষ্টি স্থির করে ট্রিগারে চাপ দিলেন তরুণী | এক‚ দুই‚ তিন‚ চার‚ পাঁচপরপর গর্জে উঠল আগ্নেয়াস্ত্র | গর্জানোই সার হল‚ লক্ষ্যে বর্ষালো না | অক্ষত রইলেন গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসন | টিকিও ছোঁয়া যায়নি তাঁর | 

ব্যর্থতায় কেঁদে ফেললেন বীণা | সবে শিখেছিলেন পিস্তল চালানো‚ অতটা ভাল আয়ত্ত হয়নি | আর জ্যাকসন ছিলেন ক্রিকেটার | দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতায় নিজেকে বাঁচিয়েছিলেন |

৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছিল ২১ বছরের বীণাকে |

***************

২৬ ডিসেম্বর‚ ১৯৮৬

হরিদ্বারের হৃষিকেশ তখনও উত্তর প্রদেশে | কনকনে ঠান্ডায় পথচারীরা দেখলেন পথেই পড়ে রয়েছেন এক বৃদ্ধা | কয়েকদিন ধরেই ছিলেন | কেউ ভ্রূক্ষেপ করেনি | এমন তো কত গৃহহীনই থাকে | শেষে কয়েকজন মানবিকতার খাতিরে কাছে গেলেন | দেখলেন বৃদ্ধা প্রাণহীন | খোঁজ করতে জানা গেল তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী বীণা দাস | 

যে স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন সেখানেই এভাবেই মৃত্যু বরণ করেছিলেন এই স্বাধীনতা সংগ্রামী |

# ১৯১১-র ২৪ অগাস্ট নদিয়ায় জন্ম বীণার | বাবা বেণীমাধব দাস ছিলেন ব্রাহ্মনেতা এবং স্কুলশিক্ষক | ছাত্রাবস্থায় তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস | নিজের দুই মেয়েকেও সেই আলোকের সন্ধান দিয়েছিলেন বেণীমাধব | স্ত্রী সরলা দেবী ছিলেন সমাজকর্মী এবং যোগ্য সহধর্মিণী |

# বীণা পড়তেন সেন্ট জন ডায়োসেশনস স্কুলে | বেণীমাধব চেয়েছিলেন খ্রিস্ট ধর্মের আদর্শে ও পাশ্চাত্য সহবতে বড় হোক মেয়ে | স্কুল পাশ করে বীণা ভর্তি হন বেথুন কলেজে | পরে ফিরে আসেন ডায়োসেশন কলেজেই | ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী হয়ে |

# দিদি কল্যাণীকে দেখে দেশের কাজে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন বীণা | দুই বোনই আধা বিপ্লবী সংগঠন ছাত্রীসঙ্ঘে সক্রিয় ছিলেন | 

# পাশ্চাত্য শিক্ষাই বীণার চোখ খুলে দেয় | তিনি উপলব্ধি করেন ব্রিটিশরা খ্রিস্টান বটে | কিন্তু তাঁদের শাসনে খ্রিস্টধর্মের ক্ষমা‚ সহনশীলতার লেশমাত্র নেই | ধর্মীয় শিক্ষা‚ অনুশাসন সব বন্ধ গির্জার চৌহদ্দিতেই | রাজদণ্ড হাতে নিলেই ব্রিটিশরা অত্যাচারী শাসক |

# প্রথমে মহাত্মা গান্ধীর ভক্ত হলেও নেতাজির ভাষণে অনুপ্রাণিত হন বীণা | উপলব্ধি করেন সহিংস আন্দলন চাই ব্রিটিশকে উৎখাত করতে |

# যুগান্তর দলের সদস্য বীণার হাতে পিস্তল পৌঁছে দিয়েছিলেন আর এক বিপ্লবী কমলা দাশগুপ্ত | কিন্তু বীণা সফল হতে পারলেন না | জ্যাকসনকে হত্যার চেষ্টার অপরাধে তাঁকে দণ্ডিত করা হল ৯ বছর সশ্রম কারাবাসে | ততদিনে বীণার দিদি বিপ্লবী কল্যাণীও কারাদণ্ডে দণ্ডিত |

# ১৯৩৯ সালে যন্ত্রণাদায়ক কারাদণ্ড থেকে মুক্তি পান বীণা | যোগ দেন কংগ্রেসে | ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নিয়ে ফের জেল খেটেছিলেন ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ অবধি | ১৯৪৬-৪৭ সাল অবধি বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি-র সদস্য ছিলেন | ১৯৪৭-১৯৫১ পর্যন্ত ছিলেন ওয়েস্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি-র সদস্য |

# ১৯৪৭ সালে বিয়ে করেন বীণা দাস | আর এক স্বাধীনতা সংগ্রামী যতীশচন্দ্র ভৌমিককে |

# ১৯৬০ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন বীণা | কিন্তু ভারত সরকারের কাছ থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে কোনওরকম পেনশন নিতে অস্বীকার করেন‚ বলেছিলেন‚ দেশসেবার কোনও পেনশন হয় না | শৃঙ্খল ঝঙ্কার এবং পিতৃদান তাঁর দুটি আত্মজীবনী |

# স্বামীর মৃত্যুর পরে বীণা চলে গিয়েছিলেন ঋষিকেশ | একান্তে নিভৃতে হিমালয়ে দিন কাটাবেন বলে | এক বছরও থাকতে পারেননি | নিঃসীম একাকিত্ব আর অবহেলায় মৃত্যু হয় এই অগ্নিস্ফুলিঙ্গের |

যে সেনেট হল দিয়ে শুরু‚ ফিরি সেখানেই | সেদিনের পরে বীণা জীবিত অবস্থায় ডিগ্রির শংসাপাত্র পাননি | তাঁকেও মরণোত্তর ডিগ্রি ও শংসাপত্র দিয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় | প্রীতিলতা ওয়েদ্দেদারের সঙ্গে | ২০১২ সালে |

Advertisements

1 COMMENT

  1. Etai India , joggyo manush kodor pai kom , durnitir desh Bharot , Beimani ebong Biswasghatok niyei chole ebong chalai erai , history tai bole . Sei bhibhishon theke suru kore neheru gandhi rabindronath sobai beiman . Dhongi mithachar , sottike ghuriye mitthyachar korei naam kinechye , jatiotabodh kom e desher maximum people r . KHUDIRAM ke na hole loke boka bole …..?.Bhiru kapurushuta Durnitiporayonota rjonnyei Baire theke sohojei probesh korte perechye bare bare bideshi ra . Aar luttoraje kore gechye . Er jonnye amrai dai , aar keou na , kono niti adorshyo nei ,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.