বিলেত থেকে আসা ব্যর্থ প্রেমিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেরানি হয়ে লিখলেন প্রথম বাংলা ব্যাকরণ বই

বাংলা ভাষার গদ্যরূপ নির্মাণে অন্য ভাষীদেরও যে অবদান রয়েছে সে কথা জানা । বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ বইটির লেখকও কিন্তু একজন ব্রিটিশ । ১৭৭৮ তে প্রথম প্রকাশিত সেই বাংলা ব্যাকরণ বই, লেখক নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড । বইটির নাম ‘এ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’।

কিন্তু কে এই নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড ? বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে একইসঙ্গে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে লন্ডন ছেড়ে কলকাতা পৌঁছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাইটার হিসেবে জীবন শুরু করেছিলেন । ওয়ারেন হেস্টিংসের অনুরোধে তিনি প্রথমে একটি আইনের গ্রন্থ পরবর্তীতে A Grammar of the Bengal Language রচনা করেন ।

বইটি প্রকাশের পর হ্যালহেড লন্ডনে ফিরে গিয়েও আবার কলকাতায় আসেন। ততদিনে কলকাতার সামাজিক দৃশ্যপট অনেকটাই পাল্টে যায়। হেস্টিংস কোম্পানির কোর্ট অব ডিরেক্টরদের রোষানলে পড়ে পদত্যাগ করলে হ্যালহেডও চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে লন্ডন ফিরে যান।

ইংরেজি নাম হলেও বইটির অনেক অক্ষর, শব্দ, বাক্য, পদ্যাংশ ও শ্লোক বাংলা হরফেই ছাপা হয়েছিল। কয়েকটি জায়গায় কিছু ইংরেজি ভাষা ও ফারসি লিপিও ছিল। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৪৮।

বইটি এখনকার এ ফোর (A4) মাপের থেকে খানিকটা ছোট অর্থাৎ ক্রাউন সাইজ, প্রিন্টিং এরিয়ার মাপ কমবেশি ৬.৫ x ৪.৫ ইঞ্চি। পাতার ওপরে (Header) বইয়ের নাম ও পৃষ্ঠা সংখ্যা ছাপা এইভাবে- বেজোড় সংখ্যক পৃষ্ঠার মাথার বাঁ দিকে পৃষ্ঠা সংখ্যা ও ডানদিকে ‘A GRAMMAR OF THE’ এবং জোড় সংখ্যক পৃষ্ঠার ডান দিকে পৃষ্ঠা সংখ্যা ও বাঁ দিকে ‘BENGAL LANGUAGE’ ।

বইটির নামপত্রে চারটি অংশ । মধ্য ভাগে বইয়ের নাম ও লেখকের নাম : ‘A GARMMAR OF THE BENGAL LANGUAGE BY NATHANIEL BRASSEY HALHED’, এর ওপরে লেখা: বোধপ্রকাশ শব্দশাস্ত্র ফিরিঙ্গিনামুপকারার্থ ক্রিয়তে হালেদঙ্গ্রেজী । মানে; ফিরিঙ্গিদের সাহায্য করতে এই গ্রন্থটি রচিত হয়েছে, বাংলার ব্রিটিশ রাজকর্মচারি ও বণিকদের জন্য এবং যারা বাংলা ভাষা শিক্ষায় আগ্রহী ।

হ্যালহেড ইংরেজি Grammar শব্দের অর্থ করেছিলেন ‘শব্দশাস্ত্র’ । নামপত্রের তৃতীয় ভাগে অর্থাৎ গ্রন্থ ও গ্রন্থাকারের নামের পরে লেখা হয়েছিল: ‘ইন্দ্রাদয়োপি যস্যান্ত নয়যুঃ শব্দবারিধেঃ। প্রক্রিয়ান্তস্য কৃৎস্নস্য ক্ষমোবক্তু নরঃ কথ।’ যার অর্থ; ইন্দ্র প্রমুখ দেবতাও যে শব্দসমুদ্রের কুলকিনারা পেলেন না, সেই শব্দ সমুহের কলাকৌশল মানুষের পক্ষে কী করে বলা সম্ভব !

নামপত্রের শেষভাগে মুদ্রণ এবং প্রকাশ-এর বিষয়ে উল্লেখ: ‘PRINTED AT HOOGLY IN BENGAL M DCC LXXVIII’। গ্রন্থটি বাংলা দেশের হুগলিতে মুদ্রিত এবং ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে (বাঙলা ১১৮৫ সন) প্রকাশিত। কিন্তু মুদ্রকের নাম উল্লেখ করা হয়নি; জানা যায় মুদ্রাঙ্কনে যার প্রধান ভূমিকা তিনি চার্লস উইলকিনস, যিনি লোহা খোদাই করে ছাঁচে সীসা ঢালাই করে ছাপার জন্য বাংলা অক্ষর বা টাইপ তৈরি করেছিলেন ।

বইটি হুগলিতে অ্যান্ড্রুজ সাহেবের ছাপাখানায় মুদ্রিত হয়েছিল । এর জন্য উন্নতমানের কাগজ ও কালি আমদানি করা হয়েছিল ব্রিটেন থেকে । মুদ্রণের মান ছিল উন্নত তাই প্রায় আড়াইশো বছর পরও কাগজ ও ছাপার মান অনেকাংশে অক্ষত রয়েছে । তবে অ্যান্ড্রুজ সাহেবের ছাপাখানার নাম জানা যায়নি । হয়ত সে সময় দোকান, ব্যবসায়িক দপ্তর বা কারখানা ইত্যাদির নাম দেওয়ার চল ছিল না ।

আটটি অধ্যায় রয়েছে হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণ বইতে। তাঁর নিজের লেখা দীর্ঘ ভূমিকার পর একটি বিষয়সূচী রয়েছে—– ‘ ১ম অধ্যায়ঃ ভাষার উপাদান- পৃ: ১, ২য় অধ্যায়ঃ বিশেষ্য পদ- পৃ: ১৬, ৩য় অধ্যায়ঃ সর্বনাম- পৃ: ৭৫, ৪র্থ অধ্যায়ঃ ক্রিয়াপদ- পৃ: ১০০, ৫ম অধ্যায়ঃ শব্দবিশেষণ ও শব্দযোগ- পৃ: ১৪৩, ৬ষ্ঠ অধ্যায়ঃ সংখ্যা লিখন- পৃ: ১৫৯, ৭ম অধ্যায়ঃ বাক্যে পদ সংস্থাপনের ক্রম- পৃ: ১৭৭, ৮ম অধ্যায়ঃ উচ্চারণ ও ছন্দপ্রকরণ- পৃ: ১৯০।’ আটটি পৃথক অধ্যায়ের পর রয়েছে সংযোজনী বা Appendix । সূচীপত্রের পর রয়েছে শুদ্ধিপত্র ।

ব্যাকরণ রচনা সম্পর্কে হ্যালহেড পুরোপুরি অবহিত ছিলেন। লক্ষণীয় প্রথম অধ্যায়েই তিনি বাংলা বর্ণমালা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন । ধ্বনি ও অক্ষরই ভাষার মৌল উপাদান । তাই ওই অধ্যায়টি ৪৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিস্তৃত । প্রথমেই তিনি বাংলা ভাষা বাম থেকে ডান দিকে লেখার রীতি যা আরবি ও ফারসির বিপরীত–সে কথা তুলে ধরেছেন ।  লেখার সময় বাংলার মানুষ বাঁ হাতে কাগজ ধরে নলখাগড়া-র কলম দিয়ে কীভাবে লেখালিখি করে সেকথাও সবিস্তার বর্ণনা করেছেন ।

বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে হ্যালহেডের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান তাঁর বাংলা ভাষার ব্যাকরণ। এর আগে পর্তুগিজ ধর্মযাজকরা তাঁদের নিজস্ব ভাষায় কিছু বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন, কিন্তু সেগুলি ছিল সংক্ষিপ্ত ও বিক্ষিপ্ত এবং সেগুলি রচিত হয়েছিল তাঁদের ধর্মপ্রচারের কাজে ব্যবহারের জন্য। কিন্তু হ্যালহেডের কাজটি সম্পূর্ণ আলাদা । তিনি ইউরোপীয় যুক্তি ও বিজ্ঞান-মনস্কতায় বিশ্বাসী ছিলেন । তাঁর ব্যাকরণেই সর্বপ্রথম বাংলা অক্ষরের প্রকাশ ঘটে ।

বাংলা ভাষার প্রথম মুদ্রিত ব্যাকরণ ভোকাবুলারিও পর্তুগিজ ভাষায় রচিত (লিসবন, ১৭৪৩), কিন্তু হ্যালহেডের ব্যাকরণ ইংরেজিতে হলেও তাতে বাংলায় প্রচুর উদাহরণ, উদ্ধৃতি ইত্যাদি রয়েছে । তবে হ্যালহেড বাংলা ভাষা ভাল না জেনেই বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন । তাই তাঁর প্রচেষ্টার সুদূরপ্রসারী কোনও প্রভাব দেখা যায়নি, যদিও তাঁর মাধ্যমেই বাংলা ব্যাকরণ চর্চার শুরু ।

বাংলা ভাষার প্রথম ব্যকরণ গ্রন্থ-প্রণেতা অবাংলাভাষী ব্রিটিশ হলেও তাঁকেই প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচয়িতা বলে আমদের গৌরববোধ করতে হবে । প্রসঙ্গত; বইটির দ্বিতীয় সংস্করণটি গবেষক ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর সম্পাদনায় সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ থেকে ।

11 COMMENTS

  1. এমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা এই লেখাটি পড়েই প্রথম জানতে পারলাম অথচ এত বছর আগের ব্যাপার, লেখক এবং প্রকাশক সংস্থাকে ধন্যবাদ জানাই আন্তরিকবাবে।

  2. বিষয়টি সম্পর্কে যারা আরও বিস্তারিত জানতে চান তারা অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য ও নিখিলেশ চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘হালেদের বাংলা ব্যাকরণ’ বইটি দেখতে পারেন।

  3. বাংলা ভাষা সাহিত্য-এর নির্মানে যেসব অবাঙালি ও বিদেশিরা ওবদান রেখেছেন তাদের সম্পর্কে আলোচনা আরও ব্যাপকভাবে হওয়া দরকার, এটা প্রায় একটা আলাদা বিষয়।

  4. এধরণের লেখা পড়ে সমৃদ্ধ হওয়া যায় কিন্তু নিয়মিতভাবে এধরণের লেখা পাওয়া যায় না তাছাড়া উৎসাহীদের জন্য রেফারেন্সগুলির উল্লেখ থাকাও দরকার বলে আমার মনে হয়।

  5. বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অন্য ভাষী মানুষদের অবদান নতুন কথা নয় আলোচনাও যে খুব কম আছে তেমন্টাও নয়, তাই সেই প্রসঙ্গের আলচনা যদি সম্পূর্ণভাবে নতুন কথা না বলতে পারে কিংবা নতুন কোনও দৃষ্টিভঙ্গি না দিতে পারে তাহলে পাঠকেদের পাওয়ার কিছু থাকে না।

  6. নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডকে বাংলা ব্যকরণ গ্রন্থ রচনায় উতসাহীত করেছিলে ওয়ারেন হেস্টিংস; হ্যালহেড নিজে যে খুব উতসাহী ছিলেন এমনটা কিন্তু নয়। আর হেস্টিংস-এর উতসাহের কারণ বাংলা ভাষা বা সাহিত্যের উন্নতি নয়, সম্পূর্ণতই শাসন ত্রাশনকে আরও মজবুত করা। গ্রন্থটি যে বাংলা ব্যাকরণের জন্য খুব প্রয়োজনীয় তাও নয়।

  7. বিষয়টা ভাল্ভাবে জানা ছিল না লেখাটা পড়ে জানতে পারলাম; এ ধরণের বিষয় গবেষণাধর্মী তাই যতটুকু জানলাম সেটুকু যথেষ্টর বেশী।

  8. নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড যে বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন তা কি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ভালবেসে; তা যদি হয় তো একরকম আর তা যদি না হয় তাহলে সে কাজ ব্রিটিশদের সবার্থপূরণ ছাড়া আর কিছু নয়।

  9. এই পাতায় নতুন কোনো লেখা প্রকাশিত হলে বিশেষ করে তা যদি এই লেখকের হয়; মতামত দিতে পারি আর না পারি লেখাটি যত্ন নিয়ে পড়ে ফেলতে কার্পন্য করি না।

  10. i was fascinated by the writings of same author before, because of the fact that i could read a good and beautiful writing that i am really surprised.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.