—তোরা বাঙাল না ঘটি ?
—আমরা পিওর ঘটি…
—ও তাহলে মশাকে তোরা মোশা বলিস…
—খাইসে আইসের থেকে তা তো ঢের ভাল…
—সে সব কথা ছাড়, আগে বল তো সরস্বতী পুজোর পরদিন তোদের বাড়িতে গোটা সিদ্ধ হয়?
হলে আমাকেও এক বাটি পাঠাস…
—হ্যাঁ রে হ্যাঁ, তোদের বাড়িতে পাটিসাপটা হলেও আমাদের দিস

এই তো কিছুদিন আগের কথা। ঘটি-বাঙাল অন্তরঙ্গ বন্ধুদের মধ্যে এমন আলোচনা হয়েই থাকত। হালফিলে অবশ্য এমন আলোচনা আর তেমন কানে আসে না । অথচ পিঠে-পার্বণের পর শীতল ষষ্ঠী আবার এক সঙ্গে হওয়ার দিন। দেবী ষষ্ঠীর ব্রত পালন করতেন বাংলার বৌরা সন্তানের মঙ্গল কামনায় । শিলের নীচে নোড়া রেখে মাথায় জোড়া সিম আর কড়াইশুঁটি (মটরশুঁটিও বলা হয়) । হলুদ কাপড়কে হলুদ জলে ভিজিয়ে মুড়ে রাখা হয় । এরপর সেই শীলকে পুজো করে দইয়ের ফোঁটা লাগিয়ে দেওয়া হয় সন্তানের কপালে ।

আমার মামার বাড়িতে দাদুরা বারোয়ারি সরস্বতী পুজো শুরু করেছিলেন । একটু খুলেই বলা যাক, দাদুরা ছিলেন পাঁচ ভাই । সবাই সবার বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিতেন বাড়ির বাইরের ঘরে । সেই আড্ডাখানার একটা পোশাকি নাম ছিল ‘বাণী মন্দির’। ‘বাণী মন্দির’-এ ফি বছর হতো বাণী বন্দনা। দাদুরা কেউ না থাকলেও আজও মামার বাড়িতে ‘বাণী মন্দির’-এর ব্যানারেই সরস্বতী পুজো হয়ে থাকে।

Banglalive-6

সেই উপলক্ষে আমাদের ছোটবেলায় মা-মাসিরা এক হতো । সরস্বতী পুজোর পরদিন হতো শীতলা ষষ্ঠী ব্রত। বাড়ির সব মেয়ে-বৌরা সবার কনিষ্ঠ সন্তানকে কোলে নিয়ে এক সঙ্গে ব্রত কথা শুনতো । ব্রত পালনের পর হলুদ আর দইয়ের ফোঁটা পড়ত সকলের কপালে । মা-মাসি-মামীরা সব্বাই টি দিয়ে যেতেন সকলকে । সেদিনের নিয়ম ছিল কোনও কনিষ্ঠ সন্তানই স্নান করবে না ।আর এটাই ছিল রীতি ।

Banglalive-8

দুপুরে শীতলা ষষ্ঠীর ভোগ-পান্তা ভাত, তেল, পাঁচরকমের ভাজা, বাঁধাকপির তরকারি, সজনে ফুলের তরকারি, গোটা সিদ্ধ আর কুলের অম্বল । এবার আসা যাক গোটা সিদ্ধর রান্নার প্রক্রিয়ায়—গোটা মুগ, বিবিকড়াই, গোটা শিম, গোটা আলু (অবশ্যই নতুন), রাঙা আলু, কুলিবেগুন, কড়াইশুঁটি (মটরশুঁটি), শীষওয়ালা পালংশাক নুন আর লঙ্কা দিয়ে সিদ্ধ । অনেকে মশলা দেন, অনেকে আবার এর সঙ্গে যুক্ত করেন সজনে ফুল, কুল। অনেকে গোটা মশলা দিয়ে রান্না করেন, অনেকে আবার মশলা দেন না । জায়গার বিশেষে গোটা সিদ্ধর রকমফের আছে । 

Banglalive-9

কেন এই সময় শীতলা ষষ্ঠী ? কেন গোটা সিদ্ধ ? শ্রীপঞ্চমীর দিন সরস্বতী পুজো । সেদিন ঘরে ঘরে বাগদেবীর আরাধনা । উৎসবের ম্যাজম্যাজানি থেকে যায় তো পরের দিন পর্যন্ত। তাই সেদিন অরন্ধন । আর এই অরন্ধন উৎসবকে পালন করতেই শীতলা ষষ্ঠীর ব্রত পালন করেন পদ্মার এ পারের মানুষরা। আগের দিন রান্না করে রাখা হয় ভাত, ভাজা, তরকারি, গোটা সিদ্ধ আর কুলের টক।

পল্লব সেনগুপ্ত তাঁর ‘পূজা পার্বণের উৎসকথা’-য় লিখছেন—‘শীতল খাদ্য গ্রহণের যে-প্রথা পশ্চিমবঙ্গের বহু অঞ্চলে প্রচলিত তার অন্তরালে হয়ত আঞ্চলিক কিছু শস্যকেন্দ্রিক-ধর্মধারার অবশেষ আছে । উর্বরতা-ভিত্তিক মাতৃকাদেবীরূপে যাঁর প্রাথমিক অভ্যুদয় ঘটেছিল—লোকজীবনের প্রত্যাবর্তন করে পর তাঁর অর্চনবিধির সঙ্গে এ-ধরনের প্রথা নতুন করে সংযুক্ত হয়ে যাওয়া তাই আদৌ কিছু অভাবনীয় বিষয় নয়; এটা খুবই স্বাভাবিক।’

‘বাঙালির পেটপুজো ও ষষ্ঠী’ শীর্ষক প্রবন্ধে অমিতাভ প্রামাণিক এই শীতলা ষষ্ঠীর পিছনে একটা বৈজ্ঞানিক এবং সামাজিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন । তাঁর মতে, ‘মনে রাখতে হবে, কিছুদিন আগেই সূর্যিদেব উত্তরায়ণে গমন শুরু করেছেন । শীত গিয়ে আসতে শুরু করেছে বসন্ত । এ সময় শরীরে জীবাণুর বাসা বাঁধা শুরু হয়, আধিব্যধির হাত থেকে বাঁচতে এই সব টোটকার খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সুচারু কোনো গবেষণা হয়েছে কিনা জানা নেই, তবে সন্দেহ হয়, এটাই মুখ্য কারণ। গোটা শস্যের রন্ধনে নিহিত আছে পরিবারটিকে সামগ্রিকভাবে একত্রিত রাখার পুণ্য বাসনা।’

অমিতাভ প্রামাণিকের এই ব্যাখ্যা নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য । কারণ মাকেও তো বলতে শুনেছি—‘আরেকটু গোটা সিদ্ধ খা। অ্যান্টি পক্স।’ দেখেছি, মা প্রতিবার গোটা সিদ্ধ পাঠাতেন আত্মীয়দের বাড়িতে। যার বাহক আমি।

আরও পড়ুন:  কুড়িয়ে পাওয়া পাথর বিক্রি করেই লাখপতি গ্রামবাসীরা

NO COMMENTS