১২০০ বছরের প্রাচীন ইন্দো গ্রীক গান্ধার ঘরানার এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে পাণ্ডবদের নাম

810

বৈচিত্রপূর্ণ ভারতে এমন মন্দিরও আছে যা নির্মিত হয়েছিল সম্পূর্ণ গ্রীক বা হেলেনিস্টিক শিল্পকলায় |  প্রচলিত ধারার থেকে বহুদূরে থাকা সেই ক্রিমচি মন্দির লুকিয়ে আছে পীরপঞ্জাল পর্বতশ্রেণীতে | জম্মু কাশ্মীরের উধমপুর জেলায় | জম্মু থেকে সত্তর কিমি দূরে হিমালয়ের কোলে প্রত্যন্ত এক গ্রামে রয়েছে এই মন্দির | স্থানীয় বিশ্বাস আর প্রাচীন গ্রীক সুষমায় সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে আছে এই স্থাপত্য |

চত্বরে আছে মোট সাতটি মন্দির | তার মধ্যে মাত্র পাঁচটির অবস্থা ঠিকঠাক | এই দেবালয়গুলি যে ঘরানায় তৈরি হয়েছিল তা খুবই জনপ্রিয় ছিল খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দ অবধি | ওই সময়ে ইন্দোগ্রীক‚ পার্থিয়ান ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন যাযাবর জাতি এই অঞ্চলে বসতি গড়েছিল | তাদের উদ্যোগেই মন্দিরগুলি রূপ পেয়েছিল‚ সম্ভবত খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে | নির্দিষ্ট নির্মাণ-ক্ষণ জানতে আরও ঐতিহাসিক গবেষণা প্রয়োজন |

ক্লাসিক্যাল ঘরানায় তৈরি এই মন্দিরের কেন্দ্রে আছে গর্ভগৃহ | শীর্ষে শিখর‚ তার উপরে মুকুটের মতো অলঙ্কার অমলক | গর্ভগৃহের সামনেই প্রশস্ত মণ্ডপ | মণ্ডপ ও গর্ভগৃহের মাঝে অন্তর্বর্তী অংশ হিসেবে আছে অন্তরাল | তবে যা বিস্ময়কর‚ তা হল এই মন্দিরে বেশি শিলালিপি নেই | মন্দিরের ভাস্কর্যের মধ্যে নেই দ্বারপাল বা অন্য দেবদেবীদের বিগ্রহ | যা অন্যান্য ভারতীয় মন্দিরে খুবই প্রচলিত | বরং তার পরিবর্তে আছে হেলেনিস্টিক বা গ্রীক সুষমায় নির্মিত বিগ্রহ | যেমন মূল মন্দিরের সামনেই আছে সিংহ | যার ঘাড়ের শোভা একরাশ কোঁকড়ানো কেশর | এই বিগ্রহ গান্ধার শিল্পকলায় খুবই প্রচলিত | মূলত ভারতীয় ও গ্রীক শিল্পকলা মিলেমিশে তৈরি হয়েছিল এই শিল্পধারা | 

এই চত্বরে যে মন্দির আছে তার মধ্যে মাত্র দুটিতে আছে শিবলিঙ্গ‚ বাকিগুলিতে কোনও বিগ্রহ নেই | মন্দির কর্তৃপক্ষ কিছু মূর্তি সংরক্ষণ করেছেন | তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বেলেপাথরের গণেশ‚ একটি সিংহ‚ পদ্মাসনা দেবী লক্ষ্মী | পাশাপাশি রয়েছে কিছু পাথরের স্তম্ভ | ক্রিমচি মন্দিরের পাশ দিয়েই বয়েছে দেবিকা নদী | তার পাশে খনন করে পাওয়া গিয়েছে পদচিহ্ন খোদাই করা প্রস্তরফলক | 

ক্রিমচি মন্দিরের দেওয়ালে আছে জ্যামিতিক নকশা | ব্যাতিক্রম নয় স্থাপত্যের দ্বারও | অভিনবত্ব আছে মন্দিরের অন্যান্য ভাস্কর্যেও | মানবমূর্তিগুলিতে ভারতীয়ত্ব কম | বরং তাদের উন্নত নাসিকা মনে করিয়ে দেয় গ্রীক দেবদেবীকেই | 

ক্রিমচি মন্দিরের নির্মাণকাল নিয়ে সঠিক তথ্য জানা যায় না | তবে মনে করা হয়‚ পীরপঞ্জাল পর্বতশ্রেণীর রহস্যময় ঘোড়সওয়ারিদের ভাস্কর্য যে সময়কার‚ এই মন্দির তার সমসাময়িক | সমগ্র পীরপঞ্জাল পর্বতই গান্ধার শিল্পকলার ভরকেন্দ্র |

ক্রিমচি মন্দির নিয়ে গবেষণাও বিশেষ হয়নি | স্থানীয় বাসিন্দারা নিজের মতো করেই আকার দিয়েছে দেবালয়কে | এমনকী এই স্থাপত্যে এখনও পুজো অর্চনা হয় | অনেকেরই বিশ্বাস‚ এই দেবালয় বানিয়েছিলেন পাণ্ডবরা | যখন তাঁরা ক্রিমচি এলাকায় অজ্ঞাতবাসের সময়ে এসেছিলেন | তাঁদের আশ্রয় দিয়েছিলেন স্থানীয় রাজা কীচক | বছরে দুবার এখানে সমবেত হন জম্মুবাসী | কুলদেবতা দিবস পালনের উদ্দেশে | 

কীচকের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ক্রিমচি ছিল নৃপতিহীন | কবে কার দ্বারা ক্রিমচি মন্দির নির্মিত হয়েছিল তার প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া দুষ্কর | ঐতিহাসিকদের ধারণা‚ এই মন্দির গড়ে উঠেছিল অষ্টম খ্রিস্টাব্দে | এই অঞ্চলে ইন্দো-গ্রীক শাসন বেশ কয়েক বছর চলার পরে |

ইতিহাস আর বিশ্বাসের টানে এখনও জনসমাগম হয় ক্রিমচিতে | তবে এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের প্রয়োজন সচেতনতা আর যত্ন | অনাদরের ছায়া দীর্ঘতর হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ধরাই দেবে না গান্ধার শিল্প

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.