‘অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন দুর্বাশা মুনি’ ছিলেন পি.সি সরকার সিনিয়রের দীক্ষাগুরু…আজ বিবর্ণ দেওয়ালে বাঁধানো ছবি

‘অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন দুর্বাশা মুনি’ ছিলেন পি.সি সরকার সিনিয়রের দীক্ষাগুরু…আজ বিবর্ণ দেওয়ালে বাঁধানো ছবি

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

একেবারে সবটাই নিয়মমাফিক । কোনও কিছু ভুল হওয়ার উপায় নেই । সব ঠিকঠাক রাখতেই হবে। নাহলে কপালে দুঃখ ! রুক্ষ মেজাজের কড়া ভাষণ থেকে কেউ রেহাই পাবেন না । সবাইকে দু-চার কথা শুনিয়ে দেবে ‘দুর্বাশা মুনি’। ‘দুর্বাশা মুনি’ নামেই আড়ালে তাঁকে ডাকতেন ‘প্রফেসার বোসেস গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’-এর প্রায় সকল সদস্য । তিনি যাদুকর গণপতি চক্রবর্তী । বলতে গেলে সার্কাস মালিক প্রিয়নাথ বসুর কোলের ছেলে। সার্কাসকে যে কোন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া যায়, তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন গণপতি চক্রবর্তী, সুশীলাসুন্দরীরা । তাই দলে তাঁদের এক বিশেষ জায়গা ।

ভারতীয় শিল্পকলার অন্যতম যাদুবিদ্যা। তাই গান গাওয়ার সময় যেমন সুরের প্রতি শৃঙ্খলা থাকতে হয়, ছবি আঁকার সময় যেমন রঙ আর তুলির শৃঙ্খলা প্রয়োজন, তেমনই যাদু প্রদর্শনের শেষ কথা ডিসিপ্লিন। তাছাড়া যাঁদের উদ্দেশে যাদু প্রদর্শন, সেই দর্শকরা তো নিজেরাই এক একজন যাদুকর । স্টেজের পারফরমার ম্যাজিসিয়ান যদি একটু ভুল করেন, তবে দর্শক চেঁচিয়ে উঠে বলবেন ‘ধরে ফেলেছি’। যাদুকর অপদস্থ, শোয়ের বারোটা থেকে তেরোটা ।  সে কারণই ম্যাজিসিয়ানরা প্রত্যেকটি পদক্ষেপ ফেলেন একেবারে মেপে মেপে । আধুনিক যাদুবিদ্যার জনক গণপতি চক্রবর্তী সেই শৃঙ্খলে আরও বাঁধুনি এনেছিলেন ।

আর এই শৃঙ্খলাই তাঁকে করে তুলেছিল প্রকৃত অর্থেই ‘শোম্যান’। অনেক ক্ষেত্রেই ম্যাজিক পাগলরা গণপতির খেলা দেখতেই সার্কাস দেখতে টিকিট কাটতেন। অর্থাত্ সার্কাসের জন্য ডাল-ভাত- রুটি জোগারের দায়িত্বটা যে তাঁর কাঁধেই ছিল। তাই তাঁর যে মেজাজ থাকবে, এ তো স্বাভাবিক । সে নিন্দুকেরা ‘দুর্বাশামুনি’ বলুন আর যা-ই বলুন না কেন ।

একেবারে মালিকের মত কর্মচারী । মানে প্রিয়নাথের মতই গণপতি ।  দারুণ মিল দুজনের জীবনে । দুজনাই উচ্চবংশের ছেলে। একজন সার্কাসের জন্য ঘর ছাড়লেন, আরেকজন যাদুবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য সংসারত্যাগী । গণপতি চক্রবর্তীর জন্ম শ্রীরামপুরের চাতরায় । ১৮৫৮ সালে। ছেলেবেলায় পড়াশোনার চেয়ে মন পড়ে গানবাজনাতে । সেখান থেকেই পাল্টে গেল ইচ্ছেটা । ঝাড়ফুঁক, অলৌকিক উপায়ে রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি শেখার জন্য ঘর ছাড়লেন । সাধুসঙ্গও করলেন । যাদুকরদের ডেরাতেও কাটালেন । তবে কয়েকটি হাত সাফাইয়ের খেলা ছাড়া আর বিশেষ কিছুই লাভ হল না । অলৌকিক শিক্ষা হল না বটে, তবে লৌকিক শিল্পের হাতেখড়িটা হয়ে গেল ।

এরপর কাজের সন্ধানে প্রিয়নাথ বসুর সার্কাস দলে।

সার্কাস দলের বিজ্ঞাপনের ছবি আঁকার চাকরি থেকেই শুরু করেন গণপতি । কথায় আছে, প্রতিভা চাপা থাকে না । গণপতির ক্ষেত্রেও বিষয়টি একেবারে সত্যি । তাঁর প্রতিভা দেখে চমকে গেলেন প্রফেসার বোস । ছবি আঁকা থেকে সরাসরি সার্কাসের কমেডিয়ান। উত্তরণ মোড় ঘুরিয়ে দিল গণপতি চক্রবর্তীর জীবনের।চ্যালেঞ্জটা আরও জোরালো করে নিলেন তিনি । ব্যাস, সাফল্য একেবারে মুখোমুখি ।গণপতি হলেন ম্যাজিসিয়ান ।

সার্কাসে যাদু প্রদর্শন সত্যিই বড় কঠিন। সাধারণত ম্যাজিক শোয়ে যাদুকরের সামনে লোক থাকে। এক্ষেত্রে তিন দিকে দর্শক। ফলে একেবারে মেপে মেপে পদক্ষেপ । একটু হেরফের হলেই সব কিছু ওলট পালট। শৃঙ্খলাকে সঙ্গী করে গণপতি এখানেও সাফল্য পেলেন । এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে, ভারতের প্রথম আধুনিক যাদুকরের তকমাটা তো তাঁরই দখলে।

যাদুকর গণপতির হাতে তৈরি ‘ইলিউশন বক্স’ এবং ‘ইলিউশন ট্রি’ খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপরই তাঁর অন্যতম খেলা ‘কংসের কারাগার’ । তা দেখেও দর্শক তো মুগ্ধ । শুধু মুগ্ধ বললেই কম বলা হবে, এই খেলা দেখে দর্শকরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, গণপতি চক্রবর্তীর সত্যি সত্যিই অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে। তবে বোসের সার্কাসেই সারা জীবন কাটিয়ে দেননি গণপতি চক্রবর্তী । নিজের দলও করেন । দেশে তো বটেই, বিদেশের মাটিতেও গণপতি চক্রবর্তীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ।

শেষ জীবনে বরানগরে বাড়ি করেন। সেখানেই রাধাগোবিন্দের মন্দির। ধর্মকর্মে জীবনের শেষ দিনগুলি কাটিয়ে দেন খেলা এবং জীবনের সঙ্গী হিঙ্গলবালার সঙ্গে। তাঁর রচিত গ্রন্থ ‘যাদুবিদ্যা’ আজও বেস্ট সেলার। সম্ভবত তিনি বিশ্বাস করতেন বিদ্যার্জনই শেষ কথা নয়। বিদ্যাদানেও লুকিয়ে থাকে পরম তৃপ্তি। শুধু ইলিউশনের খেলায় নয় । এই বিশ্বকে গণপতির আরও একটি উপহার আছে । তিনি পি. সি সরকার (সিনিয়রের) দীক্ষাগুরু । এবং এখান থেকে সম্ভবত তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়—জীর্ণ বাড়ির ভিতরে রাধামাধব মন্দিরের দেওয়ালে বিবর্ণ হলেও স্পষ্ট গণপতি চক্রবর্তীর বাঁধানো ছবি। সারা গায়ে মেডেল । দু’হাতে তাস । ছবির তলায় লেখা জাদুকর পি. সি সরকার (সিনিয়র)-এর যাদুগুরু যাদুকর গণপতি চক্রবর্তী, মৃত্যু ১২ নভেম্বর ১৯৩৯।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

pandit ravishankar

বিশ্বজন মোহিছে

রবিশঙ্কর আজীবন ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের প্রতি থেকেছেন শ্রদ্ধাশীল। আর বারে বারে পাশ্চাত্যের উপযোগী করে তাকে পরিবেশন করেছেন। আবার জাপানি সঙ্গীতের সঙ্গে তাকে মিলিয়েও, দুই দেশের বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত ব্যবহার করে নিরীক্ষা করেছেন। সারাক্ষণ, সব শুচিবায়ু ভেঙে, তিনি মেলানোর, মেশানোর, চেষ্টার, কৌতূহলের রাজ্যের বাসিন্দা হতে চেয়েছেন। এই প্রাণশক্তি আর প্রতিভার মিশ্রণেই, তিনি বিদেশের কাছে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের মুখ। আর ভারতের কাছে, পাশ্চাত্যের জৌলুসযুক্ত তারকা।