চারবার ফাঁসির দড়ি ছিঁড়ে ফেলা এই বিদ্রোহী নেতাকে নাকি চুনগোলায় ডুবিয়ে হত্যা করেছিল ব্রিটিশরা

7400

ভাঙতে না পারলেও ব্রিটিশ শক্তিকে নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা দিয়েছিল ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ | সিপাই বিদ্রোহের উৎপত্তি কেন্দ্র ছিল মীরাট | ১৮৫৭-র ১০ মে ভারতীয় সিপাইরা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে | তারপর এর আগুন ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি | বিদ্রোহের বেশিরভাগ নেতাই আজ বিস্মৃত | তাঁদের মধ্যে একজন বাবুরাও সেড়মাকে | তিনি ছিলেন গোন্ড উপজাতির নেতা | আজকের মহারাষ্ট্র মধ্যপ্রদেশ জুড়ে বিস্তৃত অঞ্চলে বসবাস ছিল এই উপজাতির |

বাবুরাও ছিলেন চন্দ জেলার বসবাসকারী | আজকের মহারাষ্ট্রর গড়চিরৌলি ও চন্দ্রপুর তখন ব্রিটিশ শাসিত সেন্ট্রাল প্রভিন্সের চন্দ জেলা | নাগপুরের রাজা অপুত্রক অবস্থায় প্রয়াত হলে লর্ড ডালহৌসির কুখ্যাত স্বতবিলোপ নীতির ফলে এই জেলা ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনের আওতায় এসেছিল | 

তখন সেখানে জমিদারি ব্যবস্থা পূর্ণমাত্রায় বহাল | রাজ-গোন্ড সম্প্রদায়ের মানুষ বেশিরভাগ স্থানে ছিলেন জমিদার | তাঁরা মারাঠা অভ্যুত্থানের আগে থেকেই রয়েছেন | জমি হস্তগত করতে এলে ইংরেজদের প্রবল বাধ দিলেন তাঁরা | এরকম এক জমিদারি ছিল মোলাম পাল্লি | চব্বিশটা গ্রামের সেই জমিদারির জমিদার তখন বাবুরাও সেড়মাকে ‚ পঁচিশ বছর বয়সের তরতাজা যুবক | তাঁর জন্ম ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে‚ গড়চিরৌলি জেলায়‚ আহেরি তহশিলে | এর বেশি তাঁর পূর্ব জীবন নিয়ে বিশেষ জানা যায় না | 

১৮৫৮-র মার্চে বাবুরাও এক বিশাল প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তুললেন | গোন্ড‚ মারিয়া ও রোহিল্লা জেলা থেকে দলে দলে যুবক যোগ দিলেন তাঁর সেনাবাহিনীতে | চন্দ জেলার রাজগড় পরগনা দখল করল বাহিনী | এই খবর পৌঁছোলো চন্দ্রপুর জেলার সদরে | ব্রিটিশ প্রশাসন বাহিনী পাঠাল | বাবুরাও ও ব্রিটিশ‚ দুজনের বাহিনী মুখোমুখি হল নন্দগাওঁ ঘোসাড়ি এলাকায় | সেটা ১৮৫৮-র মার্চ মাস | দু পক্ষের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জয়ী বাবুরাও | তাঁর পরাক্রমে ব্রিটিশ বাহিনীর প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল | 

এরপর বাবুরাওয়ের পাশে দাঁড়ালেন আড়পল্লী ও ঘোটের জমিদার বনকত রাও | দুজনে সম্মিলিত বাহিনী গড়ে তুললেন | রোহিল্লা ও গোন্ড সম্প্রদায়ের বারোশর বেশি যুবককে নিয়ে তৈরি হল বাহিনী | জানার পরে আরও একবার বাহিনী পাঠাল পাঠাল ব্রিটিশরা | কিন্তু এবারও তাদের পিছু হঠতে হল | পাহাড়ের উপর থেকে পাথরবৃষ্টি করে তাদের তাড়িয়ে দিল দুই জমিদারের মিলিত বাহিনী | 

এরপর আরও দুবার বাবুরাওয়ের হাতে পর্যুদস্তু হয় ইংরেজ বাহিনী | শেষে তারা পাল্টে ফেলল যুদ্ধনীতি | শক্তিতে না পেরে তারা এগোলো কূটনীতিতে | ব্রিটিশরা হাত মেলাল আহেরির জমিদারনি লক্ষ্মীবাঈয়ের সঙ্গে | বলল‚ যে করে হোক‚ দমাতেই হবে বাবুরাওকে | এ বিষয়ে যদি তিনি ব্রিটিশদের সাহায্য না করেন‚ তবে নিয়ে নেওয়া হবে তাঁর জমিদারী | 

হুমকিতে কাজ হল | লক্ষ্মীবাঈয়ের লোকলস্কর ১৮৫৮-র জুলাইয়ে বন্দি করল বাবুরাওকে | ভোপালপতনম থেকে তাঁকে যখন বন্দি করে আহেরি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল‚ তখন রোহিল্লাদের সাহায্যে পালাতে সক্ষম হন বাবুরাও | এরপর তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গুপ্ত আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকেন | কিন্তু তা বেশিদিন চলল না | ক’মাস পরেই ধরা পড়লেন আবার লক্ষ্মীবাঈয়ের লোক লস্করের হাতে | বিদ্রোহী যোদ্ধাকে পেশ করা হল ব্রিটিশ শক্তির সামনে |

বিচারে নানা অপরাধে দণ্ডিত করে বাবুরাওকে ফাঁসি দিতে বিলম্ব করেনি ইংরেজরা | চন্দ্রপুর জেলে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল | জনশ্রুতি‚ তিনি এতই শক্তিধর ছিলেন যে চারবার ফাঁসির দড়ি ছিড়ে পালিয়েছিলেন | শেষ অবধি নাকি তাঁকে চুনগোলায় চুবিয়ে হত্যা করেছিল ব্রিটিশরা | আরও একটি কিংবদন্তি বলে‚ তাঁকে নাকি চন্দ্রপুর জেলের সামনে একটি অশ্বত্থ গাছে ঝুলিয়ে নির্মম অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছিল তিলে তিলে | তাঁর বেশিরভাগ সঙ্গীকেও ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল | কয়েকজনকে পাঠানো হয়েছিল দ্বীপান্তরে |

তবে একজন ব্রিটিশ নজর এড়িয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন | তিনি বনকত রাও | পালিয়ে গিয়েছিলেন বস্তারে | সেখানকার শাসক তাঁকে প্রথমে আশ্রয় দিলেও পরে ধরিয়ে দেন ইংরেজদের কাছে | সব সম্পত্তি হস্তগত করে ব্রিটিশরা তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল | এর সঙ্গেই এই অঞ্চলে সিপাহি বিদ্রোহ অস্তমিত হয় |

অন্যদিকে জমিদারনি লক্ষ্মীবাঈ পুরস্কৃত হয়েছিলেন | আরহপল্লী ও ঘোটের জমিদারি ছিল ৬৭ টি গ্রামের | সে সব অর্পণ করা হয়েছিল তাঁকে | আর তাঁর সাহায্যে বুদ্ধির জোরে বিদ্রোহ দমন করে পদোন্নতি হয় মেজর ক্রিশটনের | পেয়েছিলেন ‘ Companion of the Bath’ খেতাব | আর বাবুরাও ? তাঁর প্রাপ্য ? চন্দ্রপুরে যেখানে ফঁসি হয়েছিল‚ সেখানে একটা ফলক‚ একটা ডাকটিকিট আর বিস্মরণ |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.