সূর্যদেবের পুজো লোকাচারে হয়ে গেল উমনো ঝুমনোর পিঠে খাওয়ার পার্বণ‚ কোথাও ষাঁড়ের লড়াই

সূর্যদেবের পুজো লোকাচারে হয়ে গেল উমনো ঝুমনোর পিঠে খাওয়ার পার্বণ‚ কোথাও ষাঁড়ের লড়াই

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

পৌষ সংক্রান্তিতে সূর্য ধনু রাশি থেকে মকরে সঞ্চারিত হয়, তাই এর নাম মকর সংক্রান্তি । একে উত্তরায়ণ সংক্রান্তিও বলে, কারণ এই দিন থেকে সূর্য উত্তরায়ণের দিকে যাত্রা শুরু করে । একসময় বাংলাদেশের বহু জায়গায় কুমারী মেয়েরা এইদিন থেকে ভোরে একমাসব্যাপী মকরস্নান-ব্রত শুরু করতো ছড়া গেয়ে—–এক ডুবিতে আই-ঢাই/ দুই ডুবিতে তারা পাই।।/তিন ডুবিতে মকরের স্নান।/চার ডুবিতে সূর্যের স্নান। /পাঁচ ডুবিতে গঙ্গাস্নান।।

রানী চন্দ-র লেখায় আছে এ দিন বসতভিটার মঙ্গলের জন্য বাস্তুপূজা হত তুলসীমণ্ডপে ঝিকা গাছের ডাল কেটে তার তলায় । পুরুতমশাই চরু রান্না করতেন পাটশলমির আগুনে, নতুন মাটির হাঁড়িতে দুধ-চাল -বাতাসা ফুটিয়ে । পৌষ সংক্রান্তি দিন উঠোনে মড়াই-এর পাশে উঠোন লক্ষ্মী-র পুজো হয় । কোথাও পৌষলক্ষ্মী ।

পৌষ সংক্রান্তির একটি লোকাচার আওনি-বাউনি বা আউরি-বাউরি । দক্ষিণ দামোদর অঞ্চলে এর নাম চাঁউনি-বাউনি বা চাউড়ি-বাউরি যা পৌষপার্বণের দু’দিন আগে মুলো খেয়ে পালিত হয়। তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’ উপন্যাসে এর বর্ণনা আছে- ‘..আউরি-বাউরি দিয়া সব বাঁধিতে হইবে, মুঠ লক্ষ্মীর ধানের খড়ের দড়িতে সমস্ত সামগ্রীতে বন্ধন দিতে হইবে, – আজিকার ধন থাক, কালিকার ধন আসুক, পুরানে নূতনে সঞ্চয় বাড়ুক’। আসলে শস্য-সম্পদের শ্রীবৃদ্ধি কামনা । বাংলার মেয়েরা ছড়া কেটে পৌষ বন্দনা করেন, ‘ পৌষ পৌষ – সোনার পৌষ / এস পৌষ যেও না / জন্ম জন্ম ছেড়ো না / না যেও ছাড়িয়ে পৌষ-/ না যেও ছাড়িয়ে / পৌষ পৌষ – সোনার পৌষ ।

পৌষ সংক্রান্তির আগের রাতে রাঢ় বাংলায় টুসু জাগরণ হয় । টুসু উত্‍সব শুরু অঘ্রাণ সংক্রান্তিতে। পৌষ সংক্রান্তির ভোরে সূর্যোদয়ের আগে টুসু বিসর্জন দেওয়া হয় । কারণ সূর্যের সঙ্গে টুসুর ভাসুর-বুয়াসি বা ভাদ্র-বউ সম্পর্ক। যেহেতু চৌডল ব্যবহার করলে সূর্যদেব দর্শিত হন না, তাই সুদৃশ্য চৌডলে টুসু ভাসান যায় । দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় এদিন মেহি পূজা হয় । মেহি মানে খুঁটি । খুঁটিতে ঝাড়াই-মাড়াই, গরু বাঁধা হয় । তাই মেহি পূজা বা খামার পূজা হল এক কৃতজ্ঞতার অনুষ্ঠান ।

পৌষ সংক্রান্তিতে বিষ্ণু ও লক্ষ্মীকে দই দিয়ে স্নান করিয়ে দধি সংক্রান্তির ব্রত করা হয় । পৌষপার্বণ পিঠেপুলিরও অনুষ্ঠান। ঠাকুরমার ঝুলির ‘ কাঁকণমালা, কাঞ্চনমালা’ ; গল্পে রয়েছে পিট-কুড়ুলির
ব্রতকথা । পৌষ সংক্রান্তিকে তিল সংক্রান্তিও বলে । এদিন তিল দিয়ে নাড়ু, মিষ্টি তৈরি করে পূজা হয় । লোকবিশ্বাস, এই দিন তিল না খেলে নাকি দিন বাড়ে না অর্থাত্‍ সূর্যের মকরযাত্রা সংঘটিত হয় না ।

বাংলার মতোই বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশেও চালের গুঁড়ো, গুড় ও দুধের তৈরি নানা স্বাদের পিঠে দিয়ে এই পার্বণ পালিত হয় । সঙ্গে থাকে তিল নাড়ু, তিলকূট । এখানে পার্বণের নাম সাকরাত বা খিচড়ি পর্ব । কারণ এখানে নতুন চাল, ডাল আর নানারকম সবজি দিয়ে খিচুড়ি ভোগ বানিয়ে সূর্যদেবকে নিবেদন করার রীতি আছে । গুজরাটে এদিন ঘুড়ি ওড়ে । তিল নাড়ু, সুরাটি জামুন, উন্ধিয়ুর স্বাদ নিতে নিতে চলে তাঁদের পতঙ্গবাজীর খেলা । তবে সেখানে পার্বণের নাম, উত্তরায়ণ ।

অন্ধ্রপ্রদেশে এই পার্বণের নাম পেডা পন্দুগা । এ-দিন বাড়ির মেয়েরা রঙ্গোলি এঁকে, তার মধ্যে ঘুঁটে, হলুদ ও সিঁদুর রেখে ঘিরে ঘিরে নাচগান করেন । তারপর সেই ঘুঁটে জ্বালিয়ে মঙ্গল কামনা করে চলে মিষ্টি খাওয়া । সংক্রান্তির স্নান সেরে কন্নড় মেয়েরা আখ, তিল, নারকেল, বাদাম আর গুড় প্রতিবেশীর বাড়িতে বাড়িতে উপহার দিয়ে শুভেচ্ছা জানান ‘এল্লু বেল্লা থিন্ডু ওল্লে মাথান্ডি’। মানে, ‘তোমরা মুখমিষ্টি করো, তোমাদের মুখে মিষ্টি ঝরুক’। কর্ণাটকে এ-পার্বণকে বলা হয়, সুগগি ।

মহারাষ্ট্রে পার্বণের নাম তিলগুল । মারাঠিরা বলে ‘তিল গুল ঘায়া, গুড গুড বোলা’ । এর মানে, ‘তিল নাড়ু খেয়ে মুখ মিষ্টি করো, আর মুখে সব সময় মিষ্টি কথাই বলো’ । তামিলনাড়ুতে পালিত হয় পোঙ্গল । এখানে পিঠের সঙ্গে চাল, ডাল, দুধ, কিসমিস, গুড় প্রভৃতি দিয়ে তৈরি পোঙ্গল নামের একটি পদ অবশ্যই থাকে । এখানে এদিন সূর্যদেবের আরাধনা করা হয় । তবে এখানে এই পার্বণের বিশেষ আকর্ষণ বিদেশি বুল ফাইটের ধাঁচে ষাঁড়ের লড়াই জালিকাট্টু ।

ষাঁড়ের লড়াই আসামেও অনুষ্ঠিত হয় । সেখানে পার্বণের নাম ভোগালি বিহু । ঘরে ঘরে তৈরি হয় সুঙ্গা পিঠে, তিল পিঠে আর নারকেল নাড়ু । নাচে-গানে মুখরিত হন সাধারণ মানুষ । তবে যেখানে যে-নামেই এ-পার্বণ পালিত হোক না কেন, মূল সুর কিন্তু সেই একটাই, নতুন ফসলের আবাহনে কৃষিজীবনের জয়গান ।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

10 Responses

  1. বাংলা ছাড়াও অন্য রাজ্যের পৌষ সংক্রান্তির কথা জানলাম বিশেষ করে বিহার-গুজরাট-মহারাস্ট্র…। লেখক ও প্রশাককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

  2. অন্য রাজ্যে হয় সেটা জানা ছিল কিন্তু সেই পাব্বনের নাম তো জানা ছিল না, এই লেখা পড়ে সেটা যেমন জানলাম তার সঙ্গে আরও কিছুও। লেখাটা পড়েও খুব ভাল লেগেছে। গদ্যটা ভারি সুন্দর।

  3. খুব সুন্দর লেখা, ঠিক সময়েই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে। আমি কলকাতা থেকে বহুদূরে, এখানে নেট সংযোগ করতে বেশ সমস্যা হয়েছে কিন্তু তারপরই বাংলা লাইভ আর তপন মল্লিকের লেখা পড়তে পেরে ভাল লাগল।

  4. শুধু নিজের রাজ্যের কথা ভাবলে কি হয়, প্রতিবেশি রাজ্যেও যে সেই একই পাব্বন অন্য নামে একটু ভিন্ন রীতিতে পালিত হয় সেকথা লেখক খুব সুন্দ্র লিখেছেন, চমতকার একটি লেখা।

  5. Lekhati pore shudhu valo laga noy bahu kichhu jante parlam ja aage jana chhilo na.thnx to tapan mallik choudhury & bangla live.

  6. অতি সহজ ও সুন্দর কথায় ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য-এর একটি বিশেষ দিক পৌষ সংক্রান্তির আগের ও এখনকার ছবি লেখক তুলে ধরেছেন আমাদের সামনে, তাকে সাধুবাদ না জানিয়ে পারলাম না।

  7. এর আগেও লেখকের কয়েকটি লেখা পড়েছি; সেগুলোর ধরন ছিল একরকম এটা একেবারেই আলাদা কিন্তু অতি চমতকার।

Leave a Reply

pandit ravishankar

বিশ্বজন মোহিছে

রবিশঙ্কর আজীবন ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের প্রতি থেকেছেন শ্রদ্ধাশীল। আর বারে বারে পাশ্চাত্যের উপযোগী করে তাকে পরিবেশন করেছেন। আবার জাপানি সঙ্গীতের সঙ্গে তাকে মিলিয়েও, দুই দেশের বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত ব্যবহার করে নিরীক্ষা করেছেন। সারাক্ষণ, সব শুচিবায়ু ভেঙে, তিনি মেলানোর, মেশানোর, চেষ্টার, কৌতূহলের রাজ্যের বাসিন্দা হতে চেয়েছেন। এই প্রাণশক্তি আর প্রতিভার মিশ্রণেই, তিনি বিদেশের কাছে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের মুখ। আর ভারতের কাছে, পাশ্চাত্যের জৌলুসযুক্ত তারকা।