এক সন্ধ্যায় খাওয়া দাওয়ার পর থমাস আলভা এডিসন এবং তাঁর সহযোগীরা গল্পগুজব করে চলেছেন । সে সময় টেলিগ্রাফের উন্নতি নিয়ে কাজ করছেন তাঁরা । টেলিগ্রাফ মেসেজ কীভাবে রেকর্ড করা যায়, সে নিয়ে পুরোদস্তুর পরীক্ষা চলছে । তখনই মাথায় আসে. টেলিফোনের মাউথপিসে কথা বললে, সেটা কি রেকর্ড করা যায় না ? এডিসনের সহযোগীরা অনেকেই মাথা নাড়লেন । অনেকেই না বুঝেই সম্মতি জানালেন । এডিসনের পরামর্শে সে কাজে লেগে পড়লেন কয়েকজন ।

Banglalive

ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সাফল্য এল । একজন টেলিফোনের মাউথ পিসে বললেন, ‘Mary had a little lamb’। সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা রেকর্ড হল—‘অ্যারি অ্যাড এল অ্যাম’। সকলেই উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়লেন। তবে উচ্ছ্বাসে ভেসে গেলেন না। রাতভর তাঁরা কাজ করলেন। আবিষ্কার হল নতুন রেকর্ডিং মেশিনের ।

কিন্তু কী হবে এই নয়া মেশিনের নাম ? তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়ে গেল। কেউ বলল ‘অমফ্লেগ্রাফ’ (omphlegraph), কেউ বলল ‘অ্যান্টিফোন’(antiphone), আবার কেউ বলল  ‘ডিডাসকো ফোন’  (didaskophone)। তবে শেষ পর্যন্ত এই নতুন যন্ত্রের নাম হল ফোনোগ্রাফ । এই তথ্য পাওয়া যায়, এডিসনের ল্যাবোরেটরি থেকে উদ্ধার হওয়া লগ বুক থেকে। ১৮৭৭ সালের জুলাইয়ে এই লগ বুকে কে বা কারা লিখে গিয়েছেন এই তথ্য।

জুলাইয়ে আবিষ্কার হলেও ফোনোগ্রাফের পেটেন্ট পেতে সময় লেগে যায় পরের বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত । ১৯ ফেব্রুয়ারি থমাস আলভা এডিসন ফোনোগ্রাফের পেটেন্ট পান। আমেরিকার মানুষের কাছে এডিসনের পরিচিতি হয় ‘দ্য উইজার্ড অফ মেনলো পার্ক’। নিউ জার্সির মেনলো পার্কে বসেই ফোনোগ্রাফ আবিষ্কার করেছিলেন এডিসন।

তবে ফোনোগ্রাফ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে কিন্তু স্পষ্ট ধারণা ছিল না এডিসনের। তিনি সব সময় বলতেন, “Anything that won’t sell, I don’t want to invent.” বিশ্বাসও করতেন। কিন্তু ফোনোগ্রাফের ব্যবহার নিয়ে সুস্পষ্ট ধারনা করতে পারেননি । তাই ফোনোগ্রাফের প্রাথমিক ব্যবসায়িক স্লোগান কী হওয়া উচিত, তা তিনি ঠাওর করতে পারেননি।  

ফোনোগ্রাফ বিক্রির জন্য একটি কোম্পানি তৈরি করেন এডিসন। কোম্পানির নাম এডিসন স্পিকিং ফোনোগ্রাফ কোম্পানি। সেই কোম্পানি তার বিজ্ঞাপনে জানায়, শ্রুতিলিপি বা ডিকটেশন নেওয়ার জন্য আদর্শ এই মেশিন। শিশুদের ভাল খেলনা তৈরিতে (কোনও পুতুলকে কাঁদাতে বা কথা বলাতে) কিংবা পরিবারের সকল সদস্যদের গলার স্বর রেকর্ড করে রাখার জন্য একটা দারুণ যন্ত্র।

তবে কিছুদিনের মধ্যেই এ যে কী যন্ত্র, তা বোঝা গেল। বুঝতে পারলেন এডিসন নিজেও। এই যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে আমেরিকায় রেকর্ডিং একটা শিল্প হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে এই যন্ত্রের ওপর ভর করেই কাজ শুরু করলেন আরও অনেকে। তৈরি হল আরও আধুনিক ফোনোগ্রাফ। ফোনোগ্রাফে শুরু হল গান রেকর্ডিং-ও।

লেখার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে একটি কথা না উল্লেখ করলেই নয়—প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এডিসনের কোম্পানি ফোনোগ্রাফের একটি স্পেশাল মডেল তৈরি করে। সেই ফোনোগ্রাফের দাম ধার্য হয় ৬০ ডলার। অনেক সেনা দলই সেই ফোনোগ্রাফ নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিলেন। সেখানে গান শুনেই অবসর সময় কাটাতেন সেনারা।

আর শেষে আরেকটা কথা না বললেই নয়। এডিসন যদি ফোনোগ্রাফ না তৈরি করতেন, তাহলে হয়তো লতা মঙ্গেশকরের কিন্নর কণ্ঠ পৌঁছে যেত না ঘরে ঘরে। তৈরি হতেন না রাহুল দেব বর্মণ বা পঙ্কজকুমার মল্লিক। এমনকী প্রতি শরতে মহিষাসুরমর্দিনী বাজতো না রেডিওয়।   

আরও পড়ুন:  দূষণ কমাতে অভিনব পদক্ষেপ‚ দিল্লি বিমানবন্দরের ভেতরে লাগানো হলো ৩৫‚০০০ গাছ

NO COMMENTS