যখন সময় থমকে দাঁড়ায়‚ জীর্ণ দেওয়ালে বট অশ্বত্থের শিকড় দুহাত বাড়ায়

কলকাতার ডানে বাঁয়ে আগে পরে এমনকি মাঝেও দাঁড়িয়ে আছে ঘড়ি-মিনার । একটা নয়, একাধিক । সাহেবি ভাষায় ক্লক টাওয়ার । সেগুলির অবস্থান গির্জার চূড়ায়, ডাকঘরের গম্বুজে, বাজারের টঙে, রেল ইষ্টিশনের মাথায় এবং রাস্তার মাঝ বরাবর । এর মধ্যে নিউ মার্কেটের ওয়েস্ট মিনস্টার ক্লক, মানিকতলা বাজারের জার্মান ক্লক, ধর্মতলার মেট্রোপলিটন বিল্ডিঙের নন স্ট্রাইকিং ক্লক, ধর্মতলা
গির্জার ডিং ডং কোয়ার্টার চাইমিং ক্লক, মৌলালির জোড়া গির্জার ডিং ডং আওয়ারলি চাইমিং ক্লক, রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবের এবং অতি সাম্প্রতিককালে লেকটাউন ভিআইপি রোডের ওপর ও গৌরীবাড়ি এলাকার মুচিবাজারে অরবিন্দ সরণির ওপর কলকাতার একমাত্র বাংলা ঘড়ি মিনারটির উল্লেখ করতেই হয় ।

তবে বয়সের ভার, রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা ইত্যাদি কারণে পুরনো ঘড়িগুলির কলকব্জা আজ নয়, অনেককাল আগে থেকেই যথেষ্ট ঢিলেঢালা । কালের নিয়মে ইতিমধ্যে দু-একটি দেহ রেখেছে । কিন্তু বাকিগুলির অবস্থা  ? কলকাতার ঘড়ি মিনার প্রসঙ্গে এসেই পড়ে ঘড়ি নির্মাতা সংস্থার নাম যেমন; জেমস ম্যাকেড, হ্যামিলটন, কুক অ্যান্ড কেলভি, সেথ টমাস, জে ডব্লিউ বেনসন, রায় কাজিন
পাশাপাশি গ্র্যান্ড ফাদার, স্ট্রাইকিং, ওয়েস্ট মিনস্টার, চাইমিং ইত্যাদি । এগুলি অবশ্য নাম নয়, ঘড়ি যেভাবে চলে তার চরিত্রগত নাম ।

মিনারঘড়ির নামের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ঘড়িটির চালচলন । সেই নামের আড়ালেই রয়েছে তার ইতিহাস ঐতিহ্য আর আভিজাত্য । ধরা যাক নিউ মার্কেটের ওয়েস্ট মিনস্টার ক্লক। যদি সেটি সচল থাকে তবেই ১৫ মিনিট অন্তর সেই সুরেলা চাইমিং বেজে উঠবে চারবার, আধঘন্টা অন্তর বেজে উঠবে আটবার, ৪৫ মিনিটে বারো বার এবং টাইম পয়েন্ট কাঁটা ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে ষোলবার চাইমিং হওয়ার পরই বেজে উঠবে ঘন্টা । অন্যদিকে দেখে মনে হবে ঘড়ি এইমাত্র অচল হয়েছে কিংবা গতকাল-পরশু যেকোনও দিন কিন্তু লক্ষ করলে অবাক হতে হয় ঠিক এক মিনিট অন্তর কাঁটা লাফিয়ে লাফিয়ে
চলছে । এটা মানিকতলা বাজারের মাথায় বসানো ঘড়ি । তবে এই মজা দেখা যাবে ঘড়িটি
সচল থাকলেই ।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত কলকাতায় একমাত্র বিগ বেনে-র আদলে তৈরি লেকটাউনের ঘড়ি মিনারে সময় মেলাতে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়েছেন অনেকেই । কখনও কোনও একটি মুখের ঘড়ি বন্ধ থাকছে, তো কখনও বা একেকটি ঘড়ি সময় বলছে একেকরকম । বিগ বেনের প্রসঙ্গে প্রথমে আসে হাওড়া স্টেশনের বড়ঘড়ি । ১৯১৯ সালে বসেছিল সেই ঘড়ি । ঘড়িটি তৈরি করেছিল বিলেতের বিখ্যাত ঘড়িবাবু এডওয়ার্ড জন ডেন্টের কোম্পানি । লন্ডনের বিগ বেনও ডেন্ট কোম্পানির তৈরি ।

কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র হরিশঙ্কর পালের ছিল ঘড়ির শখ । ১৯৩৬ সালে হরিশঙ্কর পাল লন্ডন যান । সেখান থেকে বহু ঘড়ি নিয়ে আসেন বাড়িতে শোভা বাড়ানোর জন্যে । তাঁর হাটখোলা রোডের সুবিশাল বাড়ির চারপাশে আজও লাগানো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ঘড়ি । যদিও সেগুলির বেশিরভাগই খারাপ । কলকাতার বাড়ির চেয়ে অনেক বেশি ঘড়ি তাদের দার্জিলিঙের বাড়িতে টাঙানো রয়েছে ।

পুরনো আমলের ৩৬৫ আপার চিৎপুর রোড । ঠিকানা বদলে ২৭৯ রবীন্দ্র সরণি । গ্র্যান্ড ফাদার ক্লক থেকে, টিনি মিনি অ্যান্টিক ! বাড়ির ছাদে, রাস্তার ধার ঘেঁষে বসানো কুক অ্যান্ড কেলভি-র পুরনো আমলের বড় একটা ঘড়ি । আর এই ঘড়িটার জন্যই, সেই কোন আমল থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে এই বাড়ির প্রচলিত নাম—-ঘড়িওয়ালা মল্লিকবাড়ি । কিন্তু বেশিরভাগ ঘড়ির সময় থমকে রয়েছে ।

কলকাতায় প্রাচীনতম টাওয়ার ক্লক রয়েছে আর্মোনিয়ান হোলি চার্চ অফ নাজারেথ-এ । ১৭৯০ সালে ৫ ফুটের কাছাকাছি ডায়াল সাইজের ওই ঘড়িটি লাগানো হয় । কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঘড়িটি অকেজো । বিলেতের হাইল্যান্ড ক্যাসেলের ধাঁচে তৈরি ২৬ প্রসন্ন কুমার স্ট্রিটের টেগোর ক্যাসল কলকাতায় এখনও পর্যন্ত আর একটিও নেই । বাড়িতে ঢোকার মুখে ছিল ক্লক টাওয়ার । সেই ঘড়িটিও এসেছিল ইংল্যান্ড থেকে । ওয়েস্ট মিনস্টারের বিগ বেন-এর সঙ্গে একই তালে চলত সেই টাওয়ার ক্লক। কোথায় সে বাড়ি আর ঘড়ি !

চিৎপুরের খগেন চ্যাটার্জি রোডে গান শেল ফ্যাক্টরি গেট সংলগ্ন ক্লক টাওয়ারটিও অতি প্রাচীন । ক্লক টাওয়ারটি কলকাতা পুরসভার হেরিটেজ তালিকাভুক্ত । কিন্তু আরও অনেক ঐতিহ্যের মতো তার অবস্থাও সঙ্গিন । অচল ঘড়ি, জীর্ণ টাওয়ারের গায়ে বেড়ে ওঠা বট গাছ, আর ওই মিনারের ওপর স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়িটার দিকে তাকালে মনে হয় আমাদের ঐতিহ্য আমাদেরই অবহেলায় কী করুণ আর মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে পড়ে আছে ।

এইসব হেরিটেজ ঘড়ির মূল্য কি টাকাপয়সা দিয়ে হয় ?

তপন মল্লিক চৌধুরী
টেলিভিশন মিডিয়ায় বেশ কিছুকাল সাংবাদিকতা করেছেন । নানা ধরনের কাজও করেছেন টেলিভিশনের জন্য । সম্পাদনা করেছেন পর্যটন, উত্তরবঙ্গ বিষয়ক পাক্ষিক পত্রিকা। নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় । চর্চার প্রিয় বিষয় আন্তর্জাতিক সিনেমা, বাংলা ও বাঙালি।

12 COMMENTS

  1. চমৎকার একটি নিবন্ধ হাজির করার জন্য বাংলা লাইভকে ধন্যবাদ আর লেখককেও সেইসঙ্গে জানাচ্ছি সাধুবাদ।

  2. কলকাতায় ক্লক টাওয়ার বা মিনার ঘড়ির অবস্থাঙ্গুলি যেমন জানা গেল একই সঙ্গে তাদের করুণ দশার অবস্থাও। লেখকের থেকে মাঝে মধ্যে এমন লেখা যেন পাই।

  3. কলকাতার মিনার ঘড়িগুলির দিকে কোনওদিন চেয়ে দেখিনি লেখাটি সত্যি আমাকে ভাবনায় ফেলে দিল, এবার শুধু তাকিয়ে দেখব না,ভাল করে খেয়াল করব, আরও যদি কিছু জানার থাকে সে চেষ্টা করব। লেখা তাহলে এমন করে ভাবিয়ে দেয়।

  4. এটাও লেখকের আরেকটি প্রয়োজনীয় এবং সময়োপযোগী লেখা, ধন্যবাদ লেখক ও প্রকাশককে

  5. কলকাতার ঘড়ি মিনার বা ক্লক টাওয়ার সে তো আসলে গোটা দেশের ঐতিহ্য তার প্রতি অবহেলা মানে ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা। আমাদের আর যে কবে চেতনা হবে!

  6. ঘড়ি মিনার গুলি তো কেবল ঐতিহ্য নয় অমূল্য সম্পদ তার প্রতি আমাদের নজর নেই কেন? সবই কি অবহেলা আর উদাসিনতায় গোল্লায় যাবে? মোচ্ছোবে কোটি কোটি টাকা উড়ে যাচ্ছে, মেলায় খেলায় পুজোতে হিসাবহীন টাকা ব্যায় হচ্ছে আর হেরিটেজ বাঁচাতে কার্পন্য!

  7. সময় কি আর থমকে দাঁড়ায় যদি না আমরাই চলার গতি স্তব্ধ করে রাখি! আর বট অশ্বত্থের শিকড় যে দু হাত পা বাড়িয়ে দিয়েছে সেও তো আমাদেরই অপদার্থতা আর অক্ষমতার কারণে। ভাল লেখা তারিফ না করে পারলাম না। ধন্যবাদ প্রকাশককেও।

  8. হেরিটেজ রক্ষার দায়ভার কলকাতা পুরসভার, তারা সে দায় যথাযথ পালন করতে পারে না, কোথাও কোথাও খুব সক্রিয় এবং যথযথ কিন্তু অধিকাংশক্ষত্রে যে ব্যর্থ তারই বিভিন্ন নমুনা হাজির হয়েছে এই লেখায়। আসল কথা এগুলোকে বাচানো; না হলে পুরসভার কিছু এসে যাবে না কলকাতার মানুষের এসে যাবে।

  9. রাজনীতি-সমাজ-অর্থনীতি নিয়ে আপনার লেখালেখি এতদিন অনেক পড়েছি, মাঝেমধ্যে এরকম লেখা তো লিখতেই পারেন। অবশ্য সিনেমা,গান ও খাদ্য সংস্ক্রিতি নিয়ে আপনার দু-একটা লেখা পড়েছি, ভাল হয় আবার যদি লেখেন।

  10. ভাল লেখা, দরকারি লেখা, সময়োপযোগী লেখা তার চেয়ে বড় কথা প্রসঙ্গ হেরিটেজ, একটা জাতির শিল্প-সংস্ক্রতি-সাহিত্যের মতো ঐতিহ্য তার প্রধান পরিচয়; সেটা যদি ক্রমশ শেষ হতে থাকে বুঝতে হবে জাতিটার দিন ঘনয়ে এসেছে।

  11. কলকাতার সবকটি ঘড়ি মিনারের অবস্থা এই মুহুর্তে ঠিক কি জানতে পারলে ভাল হত অবশ্য করার কিছু নেই, দায় তো সবারই আছে …

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here