বাড়তি যত্ন নিন বাড়ির বয়স্কদের

568

দিন ঘুরবে| মাস যবে| বছর গড়াবে| আর একটু একটু করে মেঘে মেঘে আপনার বয়সের বেলাও বাড়বে| কিছুদিন আগেই যে আপনি হয়ত ছিলেন টগবগে তাজা, বয়সের প্রলেপে সেই আপনিই হালকা স্থবির| অল্প ভারিক্কি| তার জন্য মন খারাপ করে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন নাকি? তাহলে যে পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ—সমস্তই বিবর্ণ হয়ে পড়বে আপনার কাছে! হাজার আধি-ব্যাধি আস্তে আস্তে গিলে নেবে আপনাকে| একাকিত্বে ভুগ্গতে ভুগতে সারাক্ষণ মনে হবে, ‘আমি কি ফুরিয়ে যাচ্ছি?’

আমাদের চারপাশের অনেক সিনিয়র সিটিজেন ইদানিং এই সমস্যার শিকার| কাজের সূত্রে, স্বাধীন জীবন যাপনের তাগিদে অণু পরিবার এখন ভানতে ভাঙ্গতে পরমাণু পরিবারে পরিণত| নেট যুগে সবাই এমন জেট গতিতে ছুটছে যে বাড়ির বয়স্কদের জন্য কারোর সময় নেই| ক্রমশ একা হতে হতে কখন যে এই মানুষগুলো মনখারাপের জমাট অন্ধকারে তলিয়ে গিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছেন, কেউ টের-ও  পাচ্ছি না| একবারও কি ভেবে দেখেছেন, আমাদের শিকড়ে এভাবে যদি ঘুণ ধরে ভবিষ্যতে একদিন আমরাই মুছে যাব! নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই না হয় বাড়তি যত্ন নিন আপনার বাড়ি বা আশপাশের বয়সের ভারে ক্লান্ত হয়ে পড়া মানুষগুলোর| জেনে নিন কত রকমের মনখারাপে ভুগতে পারেন এঁরা| কী করলে এঁদের মনের বয়স বাড়বে না—

আমার মন কেমন করে

১. কখনো কারণে কখনও অকারণেই মন জুড়ে চাপ চাপ অবসাদ| সেই অবসাদে মন ভারী| এই ভালো না লাগা কখনও থাকে কয়েক দিন| কখনও দু’সপ্তাহ বা তারও বেশি|

২. সামাজিক মেলামেশা কমিয়ে দেওয়া| বিয়েবাড়ি, জন্মদিন বা গেট টুগেদার-এ অংশ না নেওয়া| আস্তে আস্তে পড়শি-পরিজন এমনকি বাড়ির বাকি সদস্যর থেকেও নিজেকে সরিয়ে নেওয়া|

৩. আগে যে কাজ আনন্দের সঙ্গে করতেন সে সব থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা|

৪. মনখারাপ থেকে সবসময় মনে ক্লান্তি| ঘুমের প্যাটার্ন বদলে যাওয়া| অর্থাৎ, এতদিনের ঘুমের নির্দিষ্ট সময় বা ধরণ বদলে যাওয়া|

৫. ঠিক মতো ঘুম না হওয়ার ফলে মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায় না| এতে ভুলে যাওয়ার পরিমাণ বাড়তে থাকে| বেশি করে দেখা যায় শর্ট টার্ম মেমরি লস| অর্থাৎ, এক্ষুনি মনে করা জিনিস সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যাওয়া| অথচ, অনেক বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা কিন্তু বহু বছর পরেও স্মৃতিতে টাটকা!

৬. এই সব সমস্যার জন্যই বয়স্করা পরিবারে, সমাজে নিজেদের অবাঞ্ছিত, বাড়তি বোঝা মনে করতে থাকেন| অকারণে মনখারাপ হতে থাকে| নিজেদের ভীষণ অসহায় লাগে| এবং এর থেকেই নিজেকে শেষ করে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়|

৭. মন ঠিক না থাকলে শরীর তো বিদ্রোহ করবেই| মনখারাপ মানেই ঠিকমত ঘুম না হওয়া| তার থেকে হজমের গোলমাল| হয় লাগাতার পেট খারাপ, গ্যাস অম্বল| নয় কোষ্ঠকাঠিন্য| তারপর শরীর জুড়ে ব্যথা তো আছেই|

৮. বুদ্ধির ভাঁড়ারে টান ধরতে থাকে এই সময় থেকেই| ফলে, অন্যের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে| নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হয়| ভয় করে|

৯. শরীরে-মনে পরিবর্তন সাজ-পোশাকেও বদল আনে| আগের মতো সাজতে ইচ্ছে করে না| তার ওপর আমাদের দেশের রীতি, একটু বয়স হলেই হাল্কা সাজ| তাই ইচ্ছে থাকলেও অনেকে মনের মতো সাজতে পারেন না| ঘরদোর পরিষ্কার করাটাও সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়| বড় বাধা, শারীরিক অক্ষমতা|

১০. শুধু ঘর নয়, বাড়ির বাজেট সামলানোটাও বড় হ্যাপা হয়ে দাঁড়ায়| এক্ষেত্রেও সাহায্য নিতে হয় পরের প্রজন্মের|

সবখানে সব কাজে তোমাকে চাই…

এটুকু বুঝিয়ে দিন আপনার আগের প্রজন্মকে| অতীতকে সম্মান করলে পোক্ত হবে ভবিষ্যত| অসহায়তার অন্ধকার কেটে ঝলমলিয়ে উঠবে বয়সের বলিরেখা আঁকা মুখগুলোতেও| কীভাবে?

১. হাতের কাছে একটা রেডিও এনে দিন| মনখারাপ লাগলেই যাতে বয়স্ক মানুষটি তাঁর পছন্দের গান শুনতে পারেন|

২. পাড়ার লাইব্রেরিতে ভর্তি করে দিতেই পারেন| যাতে নিজে গিয়ে বই বদলে আনতে পারেন| এতে পড়ার অভ্যেস থাকবে| সময় কাটবে| যেতে-আসতে পাঁচজনের সঙ্গে দেখা-কথা হলে মন আপনা থেকেই ভালো হয়ে

৩. বয়সের ভারে একটু এলোমেলো বকলেও থামিয়ে দেবেন না| এতে তাঁদের আত্মসম্মানে লাগে| তার থেকেও গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়| ধৈর্যবান শর্ত হওয়াটাও চাট্টিখানি কথা নয়| রোজ অন্তত আধ ঘণ্টা বড়দের সঙ্গে সময় কাটালে ওঁরা কিন্তু পালকের মতই হালকা মনে করবেন নিজেদের|

৪. ঘুম বা শারীরিক অসুবিধা থাকলে প্রয়োজনে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন| চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে হালকা ঘুমের ওষুধ দিতে পারেন|

৫. কখনও একা, অন্ধকার ঘরে চুপচাপ বসে থাকতে দেবেন না| এতে অবসাদ আরো আঁকড়ে ধরবে| কথা বলুক চাই না বলুক, লোকের মাঝখানে রাখুন| অনেক সময় অন্যের কথা শুনলেও মন ভালো হয়ে যায়|

৬. কোনও বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বড়দের ডাকুন| তাঁদেরও মতামত নিন| এতে তাঁরা বুঝবেন, বয়স বাড়লেও তাঁদের গুরুত্ব কমেনি|

৭. বড় কাজ নাই বা করতে পারলেন, বাড়ির ছোটো ছোটো কাজের দায়িত্ব অনায়াসে দিতে পারেন| এতে ওঁরাও খুশি| আপনারও কিন্তু অনেক কাজ হালকা হয়ে যাবে|

৮. আর কিছু পারুন চাই না পারুন, নাতি-নাতনির দায়িত্ব এঁরা কিন্তু বেশ গুছিয়ে সামলাতে পারেন| সেই দায়িত্ব দিয়েও আপনি হাসি ফোটান এঁদের মুখে| হারানো রূপকথার দিনগুলো আবার ফিরে আসুক ঘরে ঘরে|  

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.