অমার্কসবাদী কথা – ‘কত পেলে বাবু?’

students after results

দশ কিংবা বারো ক্লাসের বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল বের হওয়ার ঠিক পরের দিন প্রতি বছর খবরের কাগজে একটা ছবি ছাপা হয়। ছবিতে দেখা যায়, স্কুলের ইউনিফর্ম পরা দশ বারো জন ছেলেমেয়ে সবাই মিলে একসঙ্গে লাফ দিচ্ছে। লাফ নয়, লম্ফ। যুধিষ্ঠিরের রথের চাকার মতো কুড়িখানা পা-ই যখন শূন্যে ভাসছে, ঠিক তখন শাটার স্পিডটা প্রবল করে এমন শট নেন ফোটোগ্রাফার। একবারেই শট ওকে হয়ে যায় কিনা জানিনা। না হলে হয়ত প্রাণে খুশির তুফান ওঠার কথা ওদের বারবার লাফিয়ে প্রমাণ করতে হয়।

এ নিয়ে কোনও সমীক্ষা হয়েছে কিনা জানা নেই। তবে প্রতিবারই এমন ছবি দেখলে মনে হয়, আগের বছরের থেকে বুঝি লাফটা এবার আরও কয়েক ইঞ্চি বেশি। ঠিক যেন নম্বর।

ছোটবেলায় শোনা, বহু প্রচলিত একটা চুটকির কথা মনে পড়ছে আবার। ‘কিরে, পরীক্ষায় কত নম্বর পেলি?’ ‘দাদার থেকে তিন নম্বর কম।’ ‘দাদা কত পেল?’ ‘তিন।’ এমন মজার গল্প দেবাংদের মতো পড়ুয়াদের বলা বৃথা। দেবাংকুমার আগরওয়াল এবার আইএসসি-তে চারশয় চারশ পেয়েছে। বেস্ট অফ ফোর না করলে পাঁচশয় চারশ নিরানব্বই পেত। অঙ্কে এক নম্বর কাটা যাওয়ার জন্য দেবাং মন খারাপ করেছে কি না জানিনা। তবে অনেকের মনই খারাপ। ইস, আর একটা মাত্র নম্বর দিয়ে দিল না। ইসস। ভাল ছেলেটার ব্যাড লাকটাই খারাপ।

বাবাদের আমলে শুনেছি, মাধ্যমিকে কেউ স্টার পেলে ওদের বাড়িতে দর্শনার্থীদের লাইন পড়ে যেত। সোনার চাঁদটি কে, কার মাথায় এত বিদ্যে তা দেখতে পড়শির পরে পড়শি হামলা করত। আজও কেউ স্টার, মানে পঁচাত্তর শতাংশ নম্বর পেলে ওদের বাড়িতে লাইন পড়ে। মূল দরজায় না হলেও আধ-ভেজানো জানলায়, গ্রিলের ফাঁকে, ভুরু উঁচিয়ে থাকে ডজনখানেক চোখ। এই বাজারে স্টার কে পেল একবার দেখতে চায় লোকে। নব্বই শতাংশের নিচে যে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া মহাপাপ, আশি শতাংশের নিচে যে পরীক্ষায় নম্বর তোলাই আসলে একটা কষ্টের পরীক্ষার মতো, সেখানে পঁচাত্তর শতাংশকে দেখার জন্য লোকে হন্যে হবে বইকি। এতগুলো নম্বর কাটানো তো ঠিক সোজা ব্যাপার নয়। প্রতিভা আছে।

আমরা যখন মাধ্যমিক দিই, মাহেন্দ্রক্ষণের কিছুকাল আগে স্যারেরা আমাদের অনেক সাজেশন দিতেন। বলতেন, খাতা হতে হবে পরিস্কার। একেবারে নিট অ্যান্ড ক্লিন, যেন উত্তরপত্রটির দিকে এক ঝলক চাইলেই মাস্টারমশাইয়ের মন ভাল হয়ে যায় নিমেষে। খাতা পেলেই চারধারে মার্জিন টানতে হবে, প্রতি দিকে এক ইঞ্চি জায়গা ছেড়ে। টু দি পয়েন্ট উত্তর দিতে হবে। বুলেট পয়েন্ট দিয়ে সাজাতে হবে প্রতিটা উত্তর। এসব করলে নাকি যে কোনও বড় প্রশ্নের উত্তরপিছু হাফ নম্বর করে বেশি আসবে। মানে বারো নম্বরের প্রশ্নের উত্তরে যেখানে সাত পাওয়ার কথা, এসব কারিকুরি করলে সাড়ে সাত হয়ে যাবে। আমাদের স্কুলের এক মাস্টারমশাই বার্ষিক পরীক্ষার সময় আটানব্বই নম্বরের প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নপত্রে লেখা থাকত, পরিচ্ছন্নতার জন্য বরাদ্দ দুনম্বর। খাতার সবকটা পাতা মিলিয়ে একশোয় সাইতিরিশের বেশি তুলতে না পারলেও পরিচ্ছন্নতার দুইয়ে দুই বরাবর পকেটে পুরত হিমাদ্রি। খাতার চারধারে চারটে রং দিয়ে মার্জিন টানত। প্রতি পাতায় বারো লাইনের বেশি লিখত না, হয়তো লেখার মতো ব্রেনের ভাঁড়ারে আর কিছু মজুত থাকত না বলেই। খবরের কাগজের মতো উত্তরপত্রের প্রতি পাতার শেষে লিখে দিত, ‘এর পর পরবর্তী পৃষ্ঠায়’। শেষ পাতায় লিখত, ‘সমাপ্ত। আর পৃষ্ঠা ওলটানো নিষ্প্রয়োজন।’ এমন অদ্ভুত পরিস্কার ও সাজানো-গোছানো খাতার জন্য মাস্টারমশাইকে দু নম্বর দেওয়া থেকে ঠেকানো যেত না।

এ যুগের ভাল ছেলেদের ভালবেসে জিজ্ঞেস করুন, ‘ইতিহাসে কত পেলে বাবু?’ উত্তর পাবেন একশ। আমাদের স্কুলজীবনে ইতিহাসে একশ মানে ছিল টিফিনটাইমে ঊর্মিলা মাতন্ডকরের সঙ্গে চুপিচুপি আইসক্রিম খাওয়ার মতো। একটা পাপী শখ। ইতিহাসে যেন পাতিহাঁস না হতে হয়, তার জন্য কত উপায় আবিষ্কার করতে হয়েছিল নিজেদেরকেই। বারো নম্বরের কয়েকটা বড় বড় প্রশ্ন থাকত। কেউ কেউ বলতেন, ইতিহাসে যত লিখবি তত নম্বর। ফলে দুনম্বরের প্রশ্নের উত্তরেও তিন পাতা লিখে ফেলেছি। ভাবতাম, যত বেশি কোটেশন দেওয়া যাবে, পরীক্ষকের নজর কাড়া যাবে তত বেশি। মানে ইমপ্রেস করা যাকে বলে আর কি। রমেশচন্দ্র মজুমদার, ইরফান হাবিব, রোমিলা থাপারের লিপে একটা কুড়ি পাতার খাতায় আর কত গান বসানো যায়! কত নতুন ইতিহাসবিদ জন্ম নিয়েছেন আমাদের খাতার পাতায়। দক্ষিণ ভারতীয় নাম হলে সুবিধা হত বেশি। ‘প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ওয়াই ভি পুত্তুভেরা বলেছেন, তুঘলকের রাজত্বকাল খুব একটা সুবিধার ছিল না। তবে এ নিয়ে অন্য এক ইতিহাসবিদ এম ভি নায়ারের সঙ্গে পুত্তুভেরার বিরোধ আছে…।’ আমাদের স্কুলজীবনে কথিত ছিল, বহু কচি মাস্টারমশাই নাকি এমন নামের বাণেই ভয় পেয়ে ভাল নম্বর বসিয়ে দিতে দায় সারতেন। উল্টে তাঁরা ভাবতেন, ছেলেটি কি খেটেছে দ্যাখো! কত রেফারেন্স। তবে ঘাঘু লোকের পাল্লায় পড়লে খাতার কপালে বহু দুঃখ ছিল। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকের খাতা তো আর নিজের চোখে দেখার উপায় ছিল না। প্রিটেস্টের কথা বলি। বারো নম্বরের প্রশ্ন ছিল, শের শাহের শাসনকালকে কেন স্বর্ণযুগ বলা হয়, লিখ। মনে আছে স্পষ্ট, হাতে আর দেড় মিনিট। ঘণ্টা পড়ে গিয়েছে। এবারে সুতো দিয়ে খাতাভরা জ্ঞান বেঁধে ফেলার পালা। ঝড়ের গতিতে লিখে দিয়েছিলাম, ‘শের শাহ ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক মহীরুহের মতো। তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা ছিল, আছে, থাকবে।’ বারোয় এক পেয়েছিলাম। ফ্রিতে কে দেয়? কপাল পুড়েছিল শশাঙ্কের। শুনেছিলাম, হাতে বেশ কিছুটা সময় বেঁচে যাওয়ার ফলে আড়াই পাতা শের শাহ লেখার পরে ও পাতার মধ্যেই প্ল্যান করে ছেড়ে রাখা জায়গায় শের শাহের স্কেচ করে দিয়েছিল। একটা দাড়িওয়ালা মুখের সাইড ভিউ। বইয়ে যেমন থাকে আর কি। শশাঙ্কও ওই প্রশ্নের উত্তরে বারোয় এক পেয়েছিল। লাল পেনে লেখা ছিল, প্রাপ্ত নম্বর ৮ – ৭ (অতিরিক্ত পাকামোর জন্য) = ১। এই শশাঙ্কই এক বার অঙ্ক পরীক্ষায় উপপাদ্য প্রমাণ করার পরে সবুজ কালিতে লিখে দিয়েছিল, ‘শ্রীযুক্ত কেশবচন্দ্র নাগের উপায়ে করিলাম’। সেবারও ওর একই রকম গতি হয়েছিল।

অবজেক্টিভ, মাল্টিপল প্রশ্নের জমানায় এসব বড় বড় প্রশ্নের উত্তর লেখার পাট চুকে বুকে গেছে কবে। আগেকার দিনের শিক্ষকরা তেড়ে মার্কস বাদ করতেন। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বোর্ডে অত নম্বর না ওঠাটা নাকি ছিল এ রাজ্যের অহঙ্কার। এখন শুনেছি, সরকারি বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরাই মাস্টারমশাইদের হাতে খাতা দিয়ে বলে দেন ঢালাও নম্বর দিতে। পরীক্ষা খারাপের দিকে হলে আগে চিন্তা হত, পাশ করব তো? আর এখন উত্তর খারাপের দিকে হলে পরীক্ষকমহাশয় চিন্তা করেন, পাশ করাতে পারব তো? ক্ষ্যাপার পরশপাথর খোঁজার মতো আবর্জনাভরা উত্তরের গাদা থেকে নম্বর খুঁজে চলেন বেচারা মাস্টারমশাই। লর্ড ক্লাইভের বদলে ক্লাইভ লয়েড লিখলেও আধা নম্বরের গ্র্যান্টি! আর দশ ক্লাসের পরীক্ষা দিয়ে এসে, সবুজ সাইকেল চেপে ছাত্ররা একগাল হেসে আওড়ায়, বারো এক্কে বারো, বারো পাঁচে আটান্ন।

যারা একশোয় একশো পায়, চারশোয় চারশো পায়, খবরের কাগজ তাঁদের ছেঁকে ধরে। সন্ধেবেলা ঘণ্টাখানেক শুধু তারায় তারায়। সিক্রেটটা কি। অসাধ্যসাধন করলে কিভাবে? কত ঘণ্টা পড়তে দিনে? কে বেশি উৎসাহ দিতেন? মা না বাবা? গর্বিত অভিভাবক তাঁদের ত্যাগের কথা বলেন। ‘সেই অন্নপ্রাশনের পরে একবার পুরী নিয়ে গিয়েছিলাম। তারপরে আর কোথাও বেড়ানো হয়নি। পড়াশোনার যা চাপ।’ তারারা বলে, সিলেবাস একেবারে খুঁটিয়ে পড়েছি। রেফারেন্স টেফারেন্স নয়। পাঠ্যবইয়ের প্রতিটা শব্দ স্ক্যান করে ঢুকিয়ে দিয়েছি গ্রে ম্যাটারে। গৃহশিক্ষক ছিল না বললে হালে আরও জাতে ওঠা যায়। অথচ কি আশ্চর্য। যে মুখগুলো পাঠ্যবই খুঁটিয়ে পড়ার কথা বলেছিল বড় মুখ করে, তারাই আবার মাসখানেক যেতে না যেতেই অমুক প্রকাশনীর সহায়িকা বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমার ভাল রেজাল্টের জিয়নকাঠি লুকিয়ে ছিল এই বইতেই।

বোর্ড পরীক্ষার রেজাল্ট বেরনোর দিনে খারাপ ছেলেদের মতো মন খারাপ হয় তাদেরও। বিজ্ঞাপনের মুখটা এবারে পাল্টে যাবে যে। এক তারা অন্য তারাকে বলে ওঠে, তুমিও চারশ। আমিও। তুমি তো জ্বললে বারো মাস। এবারে আমি জ্বলি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.