আমি, শেক্সপিয়র আর আমার সঙ্গিনী – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

(ভাবলিখন :তন্ময় দত্তগুপ্ত)

আমি বহু ভ্রমণ করেছি ।আবার করিওনি।ভ্রমণের সাথে মিশে আছে দুটি শব্দ।ভ্রম এবং মন।আমার জীবনের অনেক ভ্রমণই “মন  মোর ভ্রমণের সঙ্গী”।আবার অনেক ভ্রমণই ভ্রমপূর্ণ।উপযুক্ত সঙ্গিনী বিহীন ভ্রমণ অর্থহীন।আবার মানস ভ্রমণের মধ্যেও ভ্রমণের আস্বাদ পরিপূর্ণ।মানস ভ্রমণ বা মনের ভ্রমণের প্রতি আমার আকর্ষণ বরাবরই একটু বেশি।আমার দুটি ভ্রমণ খুব স্মরণীয়।প্রথম ভ্রমণ শেক্সপিয়রের বার্থপ্লেস।সেটা স্ট্যার্টফোর্ড অন এভন।সত্তরের দশকের শেষে।আশির দশকের আগে আমি স্পর্শ করি শেক্সপিয়রের জন্মস্থান।পরেও গিয়েছি।তখন আমার সঙ্গে ছিলেন আমার সঙ্গিনী।সেই অনুভূতি যেন শত সহস্র সুগন্ধী ফুলের মতো।আমাদের মনের মিলনস্থলে ছিল ইংরাজি সাহিত্য।আমার সঙ্গিনীর গবেষণার বিষয় ইংরাজি সাহিত্য।আর আমিও ইংরাজি সাহিত্যের একজন।পরবর্তী সময়েও ওখানে গিয়েছি।তখন একটু যান্ত্রিক মনে হয়েছে।কিন্তু  জায়গাটা তথ্যবহুল এবং নাটকীয়  শেক্সপিয়রের বাসগৃহের আশপাশের জায়গাটা সময়ের প্রতিনিধি।সময়ের স্বাক্ষর ক্রমাগত গ্রাস করছিল আমাদের।শুধু তাই নয়।সেখানে স্বয়ং শেক্সপিয়র(মানে ওনার রেপলিকা)।আমি দেখেছি মার্লোকে।আলো আঁধারির মাঝে উদ্ভাসিত ক্রিস্টোফার মার্লো।মার্লোর মার্ডার সিন ওইখানেই রিক্রিয়েটেড।

বিদেশের শৃঙ্খলা অসামান্য।কবির প্রতি  শ্রদ্ধাও অগাধ।চারশো বছর আগে শেক্সপিয়রের জন্মভিটে সংরক্ষণ বিস্ময়কর।মনে হয়েছে শেক্সপিয়রের সময়ের ভেতর আমাদের চলাচল।আমার কিছুটা একই অনুভূতি হয়েছিল কানাডায়।কানাডার ওভারহ্যামটনের কাছে শেক্সপিয়রের জন্মস্থানের থিম নির্মিত।আসল জন্মস্থান ইংল্যান্ডের তুলনায় এর সৌন্দর্য বেশি।শেক্সপিয়রের বাড়ি,বাগান,ভাসমান হাঁস সবই পুননির্মিত।খুব ইন্টারেস্টিং ওখানকার রেস্টুরেন্ট।সেই সঙ্গে এলিজেবিথিয়ান খাদ্য এবং পানীয়।পরম যত্নে যা মহিলা এবং পুরুষেরা সার্ভ করে।তারা সবাই এলিজেবিথিয়ান পোশাক পরিহিত।একদম নিঁখুত সেই পোশাক।তাদের ইংরাজি কথন সেই সময়ের নয়।এই সময়ের আধুনিক ইংরাজি।দেখলে মনে হয় চারশো বছর আগের ইংল্যাণ্ড।

আমার প্রত্যক্ষ ভ্রমণের মধ্যে স্মরণীয় আর একটি জন কীটসের বাড়ি।সেটা হ্যামস্টেডে।যার অবস্থান লণ্ডনের এক অংশে।কাচের ঘর থেকে যে বাগান কীটস দেখতেন,সেই বাগান থেকে কীটস লিখেছিলেন “ওড টু দ্যা নাইটিঙ্গেল”।যে বাগানে ওই পাখি বাসা বেঁধেছিল সেই গাছের ছবি দেখেছি।কী অপূর্ব অনবদ্য হাতে আঁকা ছবি।গাছের কাছে বসে আছেন কীটস।বাগানে প্রবেশের মুহূর্তে রেকর্ডে মৃদু স্বরে ভেসে আসা গান।কীটস যেভাবে বসতেন ঠিক সেভাবেই কোণাকুণি দুটি চেয়ার।ওই একই রাস্তায় একটু দূরে  রবীন্দ্রনাথের বাড়ি।ওইখানে আমরা অনুষ্ঠান করেছি।সেদিন ছিল তীব্র শীত আর বৃষ্টির দাপট।এই বৃষ্টি যেমন প্রাকৃতিক তেমনই বৌদ্ধিক।আমি এখন

কলকাতায়।আমার চতুর্দিকে একটু মেঘলা, বৃষ্টি বৃষ্টি ।অতো বছর আগের স্মৃতি আজ বৃষ্টির ভেতর অনুভূত।বৃষ্টিমুখর স্মৃতি।বা স্মৃতির বৃষ্টি।মাঝে মধ্যে আমার চেতনায় জেগে ওঠে কিছু লাইন

—- “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশির বিন্দু …”।

মনের ফ্রেমে সঞ্চিত অজানা কতো তৃষ্ণা।কাছের মানুষ,কাছের প্রকৃতির রহস্য হয়ত আজও অপ্রকাশিত।গঙ্গা তুমি আজও অচেনা।অজানা।আমি টেমসের জলে ভেসেছি বহুবার।টেমসে সুরা পান করতে করতে ভেসে যাওয়া।ভেসে ভেসে শুধুই ভেসে চলা।বন্ধনহীন সময়।সময়ের সুবর্ণ দৃশ্য।গঙ্গায় কি এসব সম্ভব?জানি না।উত্তর অধরা।

একটা ট্রেন জার্নির কথা আমার মনে পড়ে।ইউরিক থেকে লোকাডো।ট্রেনের ছাওনি ছিল ট্রান্সপারেন্ট।পান এবং গান সহযোগে আমাদের যাত্রা ক্রমশঃ ঘনীভূত।চারপাশের দৃশ্যাবলী ছবির মতো।দৃশ্যগুলি পিছন দিকে সরছে।সুন্দরের ভেতরে আরো ভেতরে প্রবেশ করছি আমরা।সে এক অবর্ণণীয় অধ্যায়।

ভারতীয় ভ্রমণের মধ্যে পুরী মর্মস্পর্শী।কতবার গিয়েছি।তবুও অপূর্ণ স্বাদ।জগন্নাথের মন্দির অসাধারণ।অদূরের কোনও কিছু আমার আত্মাকে স্পর্শ করে।পুরীর সমুদ্রের ধারে দাঁড়ালে মনে হয় অন্তহীনের মাঝে একা।

শান্তিনিকেতন আমার প্রিয়।রবীন্দ্রনাথের জন্য আমি বারে বারে ছুটে যাই।ছুটি বলে একটা জায়গা আছে।সেখানে আছে “মহর্ষি ভবন” হোটেল।দূর থেকে দেখলে মনে হয় সমস্তটাই খড়ের।কিন্তু ভেতরে এয়ার কণ্ডিশন।আজকের রক্তাক্ত রাজনীতির কথা ভাবলে কষ্ট হয়।আজকের বীরভূমের ভাষা রবীন্দ্রনাথের ভাষা নয়।শান্তিনিকেতনের আকাশে বাতাসে তবুও রবীন্দ্র নিঃশ্বাস।

আমার মানস ভ্রমণের অন্যতম উপনিষদ।সরস্বতী নদীর ধারে আমি বসে থাকি।সেই ঋষির কথা বেজে ওঠে —“ অমৃতস্য পুত্রাঃ”।অর্থাৎ শোনো তোমরা সবাই অমৃতের পুত্র।তোমাদের মৃত্যু নেই।ভারতবর্ষের আর একটি অসামান্য উচ্চারণ আমি শুনতে পাই — ত্যাগের মধ্যে দিয়েই ভোগ করবে।কখনও লোভ করবে না।ভোগ করো কিন্তু ভোগাসক্ত হয়েও না।উপনিষদ ভ্রমণে আমি একটা সোনার শব্দ পেয়েছি।শব্দটা হচ্ছে “অপাবৃণু”।অর্থাৎ উন্মোচিত হও হে সত্য।আঁধার তুমি দূরে সরে যাও।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.