মানস, বাঘের পায়ের ছাপ অথবা ভুটানি ওয়াইন

1545
Manas National Park Travelogue
মানস নদী

একটা জবরদস্ত জঙ্গলে থাকার কথা ভেবেই মানস ন্যাশনাল পার্কে যাবার ইচ্ছেটা হয়েছিল | অসম প্রদেশ চষে ফেলা দুঁদে সাংবাদিক দীপঙ্করকে চিনি তাই ওর মারফৎ ওখানকার এক বিট অফিসার পিন্টুবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলাম অনেক আগে থেকেই | ফলে আপার মাথানগুড়ির বন্ বাংলোতে নভেম্বরের শেষাশেষি তিনদিনের জন্য আমাদের ঘরের বুকিং হয়ে গেল সহজেই | দীপঙ্করের কথায় এবং নেট ঘেঁটে জেনেছিলাম বাংলোটির দোতলায় টানা বারান্দার কোলে চারখানা ঘর আছে | পিন্টুবাবুকে জোরের সঙ্গে বলা হয়েছিল ওপরের দুটো ঘর যেন আমাদের দেওয়া হয় | শিয়ালদা থেকে সরাইঘাট এক্সপ্রেসে চড়ে নামলাম গিয়ে অসমের বঙ্গাইগাঁও স্টেশনে, সকাল সাতটায় | গাড়ি বলাই ছিল, চালকটি বেশ কেঁদো চেহারার এবং গম্ভীর | নাম জিজ্ঞেস করায় শুধু বলল ‘বর্মণ’ | এটা নাম না পদবি বুঝলাম না | মানসের জঙ্গলে ঢোকার মুখেই বাঁশবাড়ি রেঞ্জার অফিস চত্বর, তিন ঘন্টা লাগল পৌঁছতে |

আপার মাথানগুড়ির বনবাংলো

পিন্টুবাবু ডিউটিতে ছিলেন | আমাদের থাকা, আর গাড়ির খরচা সব আগেভাগে নিয়ে নিলেন | অফিসের দেওয়ালে চোখে পড়ল মানসের এক বিশাল মানচিত্র যেখানে আঁকা রয়েছে অন্তত পঞ্চাশ রকমের পাখি আর জন্তুজানোয়ারের ছবি | দেখে উল্লসিত হলাম বটে কিন্তু বুঝিনি যে এরা আমাদের সঙ্গে সারাক্ষণ শুধু লুকোচুরি খেলে কাটাবে | জঙ্গলের সিংদরজা থেকে ছোট বড় গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে মাটির রাস্তা গেছে এদিক সেদিক, মাথানগুড়ি বনবাংলো অবধি যেতে লাগল আরো ঘন্টাখানেক | ভারত আর ভুটান সীমান্ত বরাবর যেখান দিয়ে মানস নদী বয়ে চলেছে তারই ধারে একটা টিলার ওপর এই কাঠের তৈরী বাংলো | ওদের কী একটা বোঝাবুঝির ভুলে দোতলার ঘর জুটল না তবে বারান্দাটা আমরা দখলে নিয়ে নিলাম | দুটো তলাতেই সেরা পজিশনের ঘরগুলোকে এরা সরকারি বাবুদের অফিস আর খাবার ঘর বানিয়ে তালা মেরে রেখেছে |




যতদূর চোখ যায় সবটাই ভুটান

এদিকটায় গাছপালা কম তবে সামনেই নদী আর ওপারে বিস্তীর্ণ চড়া পেরিয়ে ঘন জঙ্গল আর যতদূর চোখ যায় পাহাড়ের সারি, সবটাই ভুটান | বসে থাকলে ভাবুক ভাবুক লাগে বটে তবে সব মিলিয়ে তেমন শান্ত আর নির্জনতা কোথায় ? বন দপ্তরের একগাদা লোক খালি দুড়ুম দড়াম করছে, দিনভর গাড়ি চেপে হুড়মুড়িয়ে লোকজন আসছে চটজলদি জায়গাটার হাল হকিকত জেনে নেবার তাগিদে | এমনকি স্কুলের ছেলেমেয়েরা দেখলাম বিরাট দলে এসে পিকনিক অবধি শুরু করে দিয়েছে পাশেই একটা খোলা জায়গায় | তারা যে বক্স বাজিয়ে তারস্বরে নাচাগানা চালাতে পারবে না এমন ফরমান বনদফতর জারি করবে কোন দু:খে ?




দাইসা দাইমারি

এখানকার কর্মচারীদের মাথা হল ‘দাইসা দাইমারি’, ছেলেটি বেশ প্রকৃতি প্রেমিক, আমাদের ডেকে নিয়ে গিয়ে পাখি টাখি দেখাবার চেষ্টা করল, মোবাইল ফোনে দেখাল গত বছর বাংলোর কাছে বাঘ ঘোরাফেরা করেছে তার ভিডিও | ব্যাপারটায় কতখানি জল মেশানো ঠিক বোঝা গেল না | পরদিন সকাল সাড়ে ছ’টায় জিপসি চেপে আমরা বেরোলাম জঙ্গলে ঘুরতে, ড্রাইভার ছেলেটি অসমীয়া, নাম ভোবলা এবং তার সঙ্গে এসেছে এক বন্দুকধারী, দেখে বেশ রোমাঞ্চিত হলাম | তবে কী বাঘের দেখা পাব ? পোড়খাওয়া জঙ্গলবাজরা বলেন শুধুমাত্র জন্তুজানোয়ারের খোঁজ করেন যাঁরা তাঁদের জঙ্গলে না যাওয়াই ভালো | এখানে আসল হল পরিবেশটা | সেই হিসেবে মানস খারাপ লাগার কথা নয়, তবু ভোবলা আর বন্দুকধারী মেহেদি আমাদের সারাক্ষণ একটা চাপা উত্তেজনার মধ্যে রাখার চেষ্টা করে গেল | কখনো একটা ছোট্ট মত পুকুর দেখিয়ে বলে এখানে বাঘ জল খেতে আসে, কখনো ওয়াচ টাওয়ারে উঠিয়ে দূরে আঙ্গুল দেখিয়ে বলে রোজ ভোরবেলা এখানে একপাল হরিণ ঘুরে বেড়ায় | শেষমেশ দুজনে একটা জায়গায় গাড়ি থামিয়ে নরম গুঁড়ো গুঁড়ো মাটির ওপর বাঘের পায়ের ছাপ পর্যন্ত্য আবিষ্কার করে ফেলল | হাঁটু মুড়ে বসে গম্ভীরভাবে সেটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে করতে মেহেদি ঘোষণা করল … ‘ব্যাটা সদ্য সদ্য এখানে এসেছিল, এখন বোধহয় ভুটানের দিকে পালিয়েছে,’ ব্যাস আমাদের এতেই পয়সা উসুল | আমার নিজের কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ওই ওয়াচ টাওয়ারগুলোকে সব চেয়ে বেশি মনে ধরল | বনদপ্তরের যেসব লোকেরা এখানে থাকে তাদের বলে-কয়ে একটা গোটা রাত যদি ওখানে কাটানো যেত | ফিরে এসে দুপুরের খাওয়া সেরে আমরা এখান থেকে পনেরো মাইল দূরে ভুটানের ছোট্ট শহর প্যানব্যাং ঘুরতে গেলাম | রাস্তা খারাপ বলে ভোবলা ওর গাড়ি নিয়ে যেতে রাজি হল না, আমাদের অন্য্ গাড়ি নিতে হল | দেখলাম রাস্তার সত্যিই তিন অবস্থা মানে ‘ভেরি ভেরি ব্যাড’ | তবে পাহাড় আর নদী মিলিয়ে চারপাশের দৃশ্য ভারী সুন্দর, চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই আমরা ভুটানে ঢুকে পড়লাম | অবশ্য তার আগে নিয়মমাফিক একটা চেকপোস্ট পেরোতে হল, যদিও বিদেশ, তাও ভারতীয়দের পাসপোর্ট দেখানোর বালাই নেই | তবে আসল পরিচয়পত্র জমা রাখতে হয় ওদের কাছে | বললাম ‘রেখে তো নিচ্ছ, ফেরার সময় যদি দেখি অফিসের ঝাঁপ বন্ধ ?’ চিন্তা নেই, ওরা সন্ধে অবধি আছে | প্যানব্যাং- এর দেখার জিনিষ বলতে মানস নদীর ওপর কাঠের লম্বা একটা ঝুলন্ত সাঁকো দুপাশ মোটা তারের জাল দেওয়া | পাশেই ২০১৪ সালে চালু হওয়া ঝকঝকে নতুন পাকা সেতুটিও আছে | আমরা ওই ঝুলন্তটা দিয়েই দুলতে দুলতে এপার ওপর করলাম, বেশ মজা লাগল | চারপাশে উঁচু পাহাড় আর নীচে নদী, ফিরে আসতে ইচ্ছে করছিল না | খুব ছোট অথচ ভারী পরিচ্ছন্ন জায়গা এই প্যানব্যাং |

প্যানব্যাং-এর ঘরবাড়ি

বাড়ি ঘর, লোকজন সবই আছে অথচ কারো কোনো তাড়াহুড়ো নেই, হইহল্লা নেই | হাতে গোনা কয়েকটা দোকান টুকিটাকি জিনিষ রাখা আর রয়েছে ‘ওয়াইন শপ কাম বার’ | অভিজিৎ গিয়ে বেশ কাম দামে এক বোতল ভুটানি ওয়াইন কিনে আনল আর আমি বসলাম স্কেচ করতে | এই সময় পুরুষেরা সব কাজে যায়, মহিলা আর বাচ্চারা কেউ ঘরদোরের কাজকর্ম করে, দোকান সামলায় বা স্রেফ রাস্তার ধরে বসে সময় কাটায় | বেশ গাবলু মার্কা একটি মেয়েকে এঁকে ওকে দেখাতে ভীষণ ঘাবড়ে ছুটে পালাল | ওর নাম অবশ্য অন্যদের থেকে জেনে নিয়েছিলাম |

গাবলু মার্কা ‘সঙ্ঘে কিনচ্যাপ দেওয়াং’

ঘুরে ঘুরে আরো কিছু ছবি আঁকার ইচ্ছে ছিল কিন্তু ড্রাইভার তাড়া লাগাল, ফিরতে সন্ধে হয়ে যাবে তাছাড়া পরিচয়পত্রগুলো ফেরত নেওয়ার চিন্তাটাও রয়েছে | কাল সকাল হলেই মানসকে বিদায় জানিয়ে শিলং- এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া আছে | শেষে শুধু একটা কথা, অভিজিতের ভুটানি ওয়াইনের বোতল আমরা সেই রাতেই শেষ করে দিয়েছিলাম … জিনিষটি সরেস ছিল |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.