ফেরারি ফেলুদা

কালভৈরব-দরবার স্কোয়ার-কাঠমান্ডু (ছবি : লেখক)

লখনউ শহরে ফেলুদা প্রথম গিয়েছিল নাইনটিন ফিফটি এইটে, ক্রিকেট খেলতে | এটা সেই যেবার ঔরঙ্গজেবের আংটি চুরির কেসটা সলভ করল আর ক্লাইম্যাক্সে বনবিহারীবাবুকে ঘায়েল করল গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে, তারও বছর আষ্টেক আগের ব্যাপার | ক্রিকেট মাঠে কত স্কোর করেছিল জানা নেই, তবে সেবারই ফেলুদা হদিশ পেয়ে যায় খাস লখনউ এর তিনটে স্পেশাল মিষ্টির – সান্ডিলা লাড্ডু, ভুনা পেঁড়া আর গুলাবি রেউড়ি |

ব্যাপারটাকে মাথায় রেখে স্টেশনে নেমেই টাঙাওয়ালাকে বললাম একটু ঘুরপথে, আমিনাবাদ হয়ে হোটেলে যাব | লখনভী মিঠাইয়ের ওটাই সেরা ঠিকানা | একটা বেশ জমকালো দোকানে ঢুকে জিজ্ঞাসা করা গেল ‘সান্ডিলা লাড্ডু হ্যায়?’ মাঝবয়সী দোকানদার হাত তুলে শো-কেসের একটা কোণ দেখিয়ে দিলেন |

‘এ হি সান্ডিলা লাড্ডু হ্যায় কেয়া?’

‘লাড্ডু হ্যায় | আখির সান্ডিলা হো সকতা হ্যায়, নহি ভি হো সাকতা হ্যায় |’ – টিপিক্যাল লখনউ জবানে এই ফিলোজফিক্যাল জবাবে ঘাবড়ে গিয়ে আমরা কিনেই ফেলি এক বাক্স লাড্ডু | নাম যাই হোক, চমত্কার খেতে | বেরোবার সময় সাদা শেরওয়ানি পরা দোকান মালিক মুখে পান দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ‘লেকিন ইয়ে সান্ডিলা লাড্ডুকে বারে মেঁ আপকো কিসনে বাতায়া?’ ‘ফেলুদা’ –বলেই, আর কোন প্রশ্ন আসার আগেই, আমরা টাঙায় | পরের কয়েকদিন শহর চষে ফেলার ফাঁকে ফাঁকে গুলাবি রেউড়ি আর ভুনা পেঁড়ার খোঁজখবর চলেছিল কিভাবে সেটা অন্য গল্প, কিন্তু রেসিডেন্সির আনাচে কানাচে বা ভুলভুলাইয়ার গোলকধাঁধায় যে বইটা রেডি রেফারেন্স হিসেবে বারবার উঠে এসেছিল – সেটা বাদশাহী আংটি |

Benaraser Bhor
বেনারসের ভোর (ছবি : লেখক)

এই অকিঞ্চিত্কর আখ্যান থেকে একটা আন্দাজ পাওয়া যেতে পারে যে আসলে আমরা ফেলুদার গোয়েন্দাগিরিতে যতটা মুগ্ধ ছিলাম, গল্পগুলোর আনুষঙ্গিক আবহে তার চেয়ে কিছু কম ছিলাম না | আর এই জিনিসটা শুরু হয়েছিল যখন ফেলুদা নেহাতই সাতাশ বছরের এক ছোকরা, যে তখনও তার ভিজিটিং কার্ডটাও ছাপায়নি | রাজেনবাবুর  মুখোশের ব্যাপারটায় তিনকড়িবাবু কেভেন্টার্সে বসে ফেলুদা আর তোপসেকে হট চকলেট খাওয়ালেন আর আমরাও জেনে গেলাম যে দার্জ্জিলিং-এ গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা তো দেখতেই হবে, সঙ্গে কেভেন্টার্সের খোলা ছাতে বসে হট চকলেটটাও অবশ্যকর্তব্য !

বাঙালির ভ্রমণতালিকায় ফেলুদা-কৃত সবচেয়ে বড়ো সংযোজন জয়সলমেরের ত্রিকুট দুর্গ – গল্পটা, আরো বেশি করে ছবিটা বেরোনোর পর যেটা প্রায় তার আইডেন্টিটি বদলে ফেলে হয়ে ওঠে সোনার কেল্লা | আর সেখানকার গাইডরা বাঙালি টুরিস্ট পেলেই মহা উত্সাহে দেখাতে শুরু করেন কোথায় ছিল মুকুলের বাড়ি আর কোথায়ই বা লুকিয়ে থাকতে পারত সেই জাতিস্মরের গুপ্তধন | তবে বলতেই হবে, একটা শহরের যে ভিসুয়াল টেক্সচার যেখানে জায়গাটা তার গলিঘুঁজি, মহল্লা, ঘাট, পুরনো বাড়ি সমস্তটা মিলিয়ে উঠে আসছে বইয়ের পাতায় আর ছড়িয়ে যাচ্ছে পাঠকের মগজে সেটা অবশ্যই বেনারস | ঘোষালবাড়ির গনেশমূর্তি চুরির মামলার ঠাসবুনোট প্লটের পাশাপাশি কাশীর গঙ্গা, বাঙালিটোলা, সেখানকার প্রবাসী বাঙালিরা সবটাই গল্পের এক একটা জরুরী এলিমেন্ট, যেগুলো দিয়ে বাঙালি ট্যুরিস্ট জারিয়ে নিতে পারে তার চিরকেলে চেনা বেনারসকে |

Residency, Lucknow
লখনউ রেসিডেন্সি (ছবি : লেখক)

আর ফেলুদার নিজের শহর ? যেখানে ফেলুদা থাকে দক্ষিণপাড়ায়, রজনী সেন রোডের বাড়িতে | নিউ মার্কেটে কলিমুদ্দির দোকানে ডালমুট কিনতে গিয়ে পেয়ে যায় নতুন রহস্য কিম্বা ট্রামে চেপে যেতে যেতে চট করে নেমে কিনে ফেলে স্বেন হেডিনের বই, চেনা দোকান থেকে | সেই কলকাতার এক আধচেনা টুকরো তার অনতিপ্রাচীন ইতিহাসের গল্প নিয়ে ঘুরপাক খায় পার্ক স্ট্রীটের গোরস্থানে | ছোটবেলা থেকে দেখা ওরকম একটা ঝলমলে রাস্তা যে তার দক্ষিণ কোণে নিঝুম একটা কবরখানা লুকিয়ে রেখেছে তা তো জানা ছিল না ‘গোরস্থানে সাবধান’ বইটা পড়বার আগে ! কলেজে ঢোকার মাসখানেকের মধ্যেই বারকয়েক ছানবিন করে ফেলেছিলাম ওই সাউথ পার্ক স্ট্রীট সিমেট্রি যেখানে উইলিয়াম জোন্সের বিশাল সমাধিটার কাছেপিঠেই নিশ্চিন্তে শুয়ে আছেন টমাস গডউইন | কবরের মধ্যেই রয়েছে নবাব সাদাত আলির কাছ থেকে পাওয়া তাঁর প্রথম বখশিশ – সেই পেরিগ্যাল রিপিটার | এই দুষ্প্রাপ্য পকেট ঘড়ি নিয়ে গল্পেই আমরা একটা দরকারী তথ্য জেনে গিয়েছিলাম – ধর্মতলার বোর্ন এন্ড শেফার্ড দোকানটায় সযত্নে আর্কাইভ করা আছে ব্রিটিশ কলকাতার একটা ধারাবাহিক ফোটোগ্রাফিক ইতিহাস (১৯৯১ সালে আগুন লেগে যার প্রায় পুরোটাই নষ্ট হয়ে যায়) |

ফেলুদা যেহেতু একজন আগাপাশতলা শহুরে গোয়েন্দা, রহস্যের মোড়কগুলো খোলার সঙ্গে সঙ্গে শহরগুলো, তা সে কাঠমান্ডুই হোক বা লখনউ, তার নিজস্ব মেজাজে হাজির হয়েছে আমাদের কাছে | গোঁসাইপুর বা ঘুরঘুটিয়ার মত অজ-পাড়াগাঁয়ে বা উত্তরবঙ্গের জঙ্গলেও রহস্য সমাধানে গেছে বটে প্রদোষ মিত্তির, তবে সেখানে তদন্ত কাহিনিটাই মূল, জায়গাগুলোর হালহকিকত তুলনায় একটু কম জায়গা পেয়েছে গল্পে | একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন কি ? ফেলুদা-তোপসে প্রথমদিকে থাকত দার্জ্জিলিং-এর লুই জুবিলি স্যানাটোরিয়ামে বা গ্যাংটক-এর মধ্যবিত্ত হোটেলে | পরে যখন লালমোহনবাবু টিমে যোগ দিলেন, তখনও থ্রি মাস্কেটিয়ার্স দিব্যি আস্তানা গেড়েছে বেনারসের ক্যালকাটা লজে, ফোর-বেডেড রুম শেয়ার করেছে অচেনা লোকের সঙ্গে | পাশাপাশি সিমলার বিলাসবহুল ক্লার্কস হোটেলও ছিল বটে, তবে সেই ট্রিপটা স্পনসর করেছিলেন দীননাথ লাহিড়ী ; ফেলুদাকে বাক্স ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে | পরের দিকের কেসগুলোয় একটু দামী হোটেলে ব্যবস্থাপনা হয়েছে তিনমূর্তির, যাতায়াতও প্রায়ই আকাশপথে | ততদিনে অবশ্য গোয়েন্দার পসার আর লেখকের নামডাক দুটোই বেড়েছে, কারুরই সংসার নেই, তাই ওই বিলাসিতাটুকু করলে কারুর কিছু বলার নেই |

সত্যজিৎ রায়ের ছবির ক্রমপর্যায়টা লক্ষ্য করলে আরো একটা তথ্য উঠে আসে | ফেলুদার গল্পের পটভূমিকাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই তৈরি হয়েছে ওই সময়ের কোন ছবির লোকেশনে | যেমন সত্তর দশকের শুরুতে সিকিম’ তথ্যচিত্র বানানোর পাশাপাশি সত্যজিৎ লিখে ফেললেন ‘গ্যাংটকে গন্ডগোল’ | আর বাঙালি প্রথম শুনল মঙ্গন, চুং থাং , লাচেন, লাচুং এই জায়গাগুলোর নাম যেখানে সে পৌঁছবে তারও বছর কুড়ি বাদে | একইভাবে, সোনার কেল্লা গল্পের যে অবিস্মরনীয় দৃশ্যকল্প, তার একটা প্রাথমিক খসড়া হয়ত তৈরি হয়ে গিয়েছিল ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবির জন্য রাজস্থানে লোকেশন শ্যুটিং-এর সময়েই |

কিন্তু গল্পের পর গল্পে এই যে পাঠককে প্রায় সঙ্গে করে সেই জায়গায় নিয়ে ফেলা – এই জিনিসটা বেশ খানিকটা ফিকে হয়ে আসে ফেলুদার শেষের দিকের কাহিনিগুলোয় | আমাদের একটু আক্ষেপ থেকে যায় যে লন্ডনের রাস্তাঘাট, কাশ্মীরের সৌন্দর্য বা কেদারনাথের পাহাড়ি বাঁকগুলো একদম ধরা পড়ল না কলমের আঁচড়ে | পুরনো মৌতাতটা আর পাওয়া গেল না |

সেই আক্ষেপটুকু নাহয় থাক | পাশাপাশি এটাও মাথায় থাক – লখনউকে, বেনারসকে, দার্জিলিংকে, ইলোরার গুহাগুলোকে একটু অন্যভাবে চিনতে শেখাল যে লোকটা তার ঠোঁটের কোণে একপেশে হাসিটার সঙ্গে ঝুলছে সদ্য ধরানো একটা চারমিনার |

************************************************************************************************************************************

যদি যেতে চান ফেলুদার তিনটে প্রিয় শহরে –

বেনারস : প্রচুর ট্রেন আছে | এক রাত্তিরের জার্নি | থাকার সেরা ঠিকানা দশাশ্বমেধ ঘাটের আশেপাশের হোটেল, একদম গঙ্গার কাছেই | মছলিবাবার আস্তানাটা আর খুঁজে পাবেন না, তবে একটা নৌকো নিয়ে গঙ্গায় ভেসে পড়লেই মাথার ভেতর বেজে উঠবে রেবা মুহুরীর গলায় ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর ঠুংরি | পরখ করতে ভুলবেন না গোধূলিয়া মোড়ের ঠান্ডাই, কচৌরি গলির কচুরি আর বিশ্বনাথ গলির মশলা |

দার্জিলিং : বৃটিশ আমলের বেশ কয়েকটা হোটেল কিন্তু এখনও রয়েছে শহরটায়, মধ্যবিত্তের পকেটের মাপে | ফায়ারপ্লেস জ্বালিয়ে সন্ধেবেলা অর্ডার করুন সেরা দার্জিলিং টি | ফেলুদার স্টাইলে খানিকটা মকাইবাড়ির স্টক সঙ্গে রাখতেই পারেন | কেভেন্টার্স-এর পাশেই গ্লেনারিজ, ঢুকে পড়ুন স্যান্ডউইচ আর চকলেটের জন্য | আর সকাল বিকেল হেঁটে বেড়ান জলাপাহাড় আর মহাকাল মন্দিরের রাস্তায় |

কাঠমান্ডু : ট্রেনরাস্তার ঝক্কি এড়িয়ে আকাশপথই ভালো | থামেল অঞ্চলটাই সবচেয়ে জমজমাট, কাছেই দরবার স্কোয়ার | জোড়া ভূমিকম্পে অসম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মল্লরাজাদের আমলে তৈরি এই ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট | একটু সেরে ওঠার সময় দিয়ে তারপর ঘুরে আসুন | হিমালয় তো রয়েছেই আশেপাশে ধূলিখেল আর নাগরকোটে | নেপালের মানুষ কিন্তু চাইছেন পর্যটক আসুক দেশে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.