একটি ফ্লপ ট্রেকের গল্প

তুঙ্গনাথ মন্দির (ছবি : লেখক)

“আজ পর্যন্ত তোমার কোনও ট্রেকিং অভিযান কি ফ্লপ হয়েছে ?”

আমার এক নবীন বন্ধু তুষারের এই প্রশ্নে আমি একটু ভেবেই জবাব দিলাম

-“ফ্লপ বলতে তুমি কি বোঝো জানিনা। আমি খুব বেশি ট্রেকিং করিনি। কিন্তু আমি যে অর্থে ভাবছি সে ভাবে ভাবলে আমার একটা ট্রেকিং অভিযান আছে যেটা ব্যার্থ হয়নি কিন্তু ফ্লপ হয়েছিল।”

-“আরেব্বাস, এতো পুরো ব্যোমকেশ বক্সীর মতো কথা বলছ দাদা।  ‘অনেক বার হয়েছে যে অপরাধীকে কে ধরতে পারিনি। কিন্তু সত্যের সন্ধান পাইনি এমন বোধ হয় কখনো হয়নি।’ ”

আমি হেসে জবাব দিলাম “উপমাটা কতটা লাগসই হলো বলা মুশকিল। কিন্তু সত্যিই সে অর্থে আমার কোনও ট্রেকিং ব্যর্থ হয়নি।”

-“তাহলে ফ্লপ বলছ কেন? আমি তো ফ্লপ বলতে ব্যর্থ ট্রেকিং অভিযানের কথাই বলছিলাম৷ যেখানে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারোনি৷”

-“উঁহু, ব্যর্থ ট্রেক আর ফ্লপ ট্রেক আলাদা গল্প রে ভাই৷”

-“তাই? তাহলে সে গল্পটা শোনা যায়?”

-“এই শীতের বিকেলে গল্প শুনতে হলে এক পেয়ালা চা আবশ্যক৷”

“চা বলা আছে৷ এক্ষুনি চলে আসবে৷ তুমি গল্পটা শুরু কর৷”

আমি আড়মোড়া ভেঙ্গে বললাম “এই গল্পের অর্ধেকটা তুমি জানো৷আমার প্রথম ট্রেক – গাড়োয়াল হিমালয়ের মদমহেশ্বর৷ ওটা নিয়ে একাধিক লেখা ও ছবি প্রকাশিত হয়েছে৷”

নবীন বন্ধুটি ভুরু কুঁচকে বলল “মদমহেশ্বর ট্রেক? সে তো জানি৷ অগাস্ট মাসে ঘোর বর্ষায় গিয়ে তুমি শীতকালের আকাশ পেয়েছিলে৷ চৌখাম্বা, মান্দানি সব পাহাড় একেবারে ছবির মতো দেখতে পেয়েছিলে৷

তার আবার একটা দ্বিতীয় অধ্যায় আছে নাকি? কোনওদিন বলোনি তো? তার কোনও ছবিও তো কোনওদিন দেখিনি৷”

এর মধ্যে চা এসে গিয়েছিলো! চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বললাম “কী করে দেখবে?…..ফ্লপ ট্রেকের ছবি কি কেউ শেয়ার করে? ও ছবি কতজন দেখেছে তা আধখানা হাতে গুনে বলা যায়৷ যাক সে কথা, আসল কথায় আসি৷ মদমহেশ্বর ট্রেকটা একটু আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল৷ ট্রেক শেষ করে উখিমঠ পৌঁছে হাতে দুটো দিন এক্সট্রা ছিলো৷ এটা তো জানো মদমহেশ্বর যেতে হলে আগে উখিমঠ পৌঁছতে হয়৷”

উখিমঠ GMVN
উখিমঠ GMVN (ছবি : লেখক)

বন্ধুটি বলল “তা জানি৷ কিন্তু হরিদ্বার থেকে উখিমঠ পৌঁছতে কতক্ষন লাগে সেটা জানি না৷”

-“প্রায় আট ন ঘন্টা৷ আমরা শেয়ার গাড়িতে হরিদ্বার থেকে রুদ্রপ্রয়াগ আর কুন্ড হয়ে সাড়ে আট ঘণ্টায় পৌঁছেছিলাম৷যাই হোক মদমহেশ্বর থেকে উখিমঠ ফিরে এসে ভাবলাম হাতে যখন বাড়তি দুদিন আছে, তুঙ্গনাথ এর ছোটো ট্রেকটা সেরেই আসি৷
মজার ব্যাপার কি জানো? তুঙ্গনাথ শিবের মন্দিরে পৌঁছতে লাগে মাত্র এক বেলা, যেখানে মদমহেশ্বরের শিবমন্দির পৌঁছতে লাগে দুটো দিন৷কিন্তু তুঙ্গনাথ মদমহেশ্বর থেকে প্রায় ১৩০০ ফুট বেশি উচ্চতায় অবস্থিত৷ ১২০৭৩ ফুট৷”

– “এত উঁচুতে আর কোনো শিব মন্দির নেই মনে হয়, তাই না?” জানতে চাইল তুষার

-“একদম ঠিক৷ তুঙ্গনাথ সবচাইতে উচ্চতায় অবস্থিত শিবমন্দির ”

চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে আবার বলা শুরু করলাম|

“মদমহেশ্বর ট্রেকে আমাদের গাইড ছিল শংকর সিং৷ খাসা  ছেলে| তাকেই বললাম আমাদের সঙ্গে তুঙ্গনাথ যেতে| যেদিন মদমহেশ্বর দেখে উখিমঠ পৌঁছেছিলাম, তার পরদিন কাক ভোরেই আমরা লোকাল বাসে করে তুঙ্গনাথের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম| আকাশের মুখ ভার হয়েই ছিল, কিছুক্ষন বাদে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হল| সেই যে মদমহেশ্বরে রোদ দেখেছিলাম, তারপর থেকেই আকাশের রং খয়েরি হয়ে আছে তো আছেই| উখিমঠ থেকে চোপতার দুরত্ব ৩০ কিলোমিটারের  কাছাকাছি| আমরা এক ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম| হাতে আরও একটা দিন থাকলে দেওরিয়া তাল যাওয়া যেত|  দেওরিয়া তালের ট্রেকটাও তেমন কিছু শক্ত নয়| আকাশ ভালো থাকলে দেওরিয়া তালে চৌখাম্বার প্রতিবিম্ব দেখার মজাই আলাদা|”

“চোপতাকেই তো মিনি সুইৎজারল্যান্ড বলে,তাই না?” জানতে চাইল তুষার

চোপতা বাসস্ট্যান্ড (ছবি : লেখক)
চোপতা বাসস্ট্যান্ড (ছবি : লেখক)

“আরে সে তো অনেক কিছুই বলে| কিন্তু মনে রেখো এটা হল ফ্লপ ট্রেকের গল্প| তাই কুয়াশাভরা রাস্তা পেরিয়ে যখন চোপতায় নামলাম, সেটা আর যাই হোক সুইৎজারল্যান্ড মনে হচ্ছিল না| টিপিক্যাল একটা উত্তরাখন্ডের বসতি| চারদিকের গাছপালার মধ্যে অনেকগুলো খাবারের দোকান, বেশ কয়েকটা টাটা সুমো গাড়ি, কিছু স্থানীয় বাস, কিছু স্থানীয় লোক আর কিছু টুরিস্ট আর একটু দুরে কয়েকটা স্থানীয় হোটেল| ঠাউর করে দেখলাম বাঁ দিকে কিছু সিঁড়ির ধাপের শেষে একটা খোলা ফটক, যার পাশে একটা সাইনবোর্ড ঝুলছে| এই রাস্তা দিয়েই তুঙ্গনাথের মন্দির যেতে হয়|”

-“আসলে তুমি ভালো জায়গার ভুল স্পটে ভুল সময় চলে গিয়েছিলে| এপ্রিলে গেলে বরফ পেতে, আকাশটাও ফাটাফাটি থাকত|”

“নিকুচি করেছে ভুল সময়ের|” একটু রাগত স্বরেই বলে উঠলাম “আরে আমি এপ্রিল মাসে সিকিম গিয়ে মেঘলা আকাশ পেয়েছি| আসলে আমি খুব আশাবাদী ছিলাম যে মদমহেশ্বরে যেমন ঝপ করে ঘোর বর্ষার মধ্যে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, তুঙ্গনাথেও সেরকম কিছু একটা হবে| তাই চোপতার বাস স্টান্ডে নেমে ওইরকম একটা পরিবেশ দেখেও ঘাবড়ালাম না| মেজাজে সামনের দোকানে ঢুকে চা আর ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিলাম। আমার ট্রেকিং পার্টনার একজনই ছিল – আমার বন্ধু নিশেষ সিং। এর মধ্যে আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিল, যদিও সে মিনিট পনরোর মধ্যে থেমে গিয়েছিল| আধঘন্টার মধ্যে আমরা হাঁটা শুরু করে দিলাম| সাইনবোর্ডে লেখা ছিল যে মন্দিরে পৌঁছতে হলে ৩.৫ কিলোমিটার হাঁটতে হবে|”

চোপতা থেকে তুঙ্গনাথ-এর গেট (ছবি : লেখক)
চোপতা থেকে তুঙ্গনাথ-এর গেট (ছবি : লেখক)

– “মাত্র ৩.৫ কিলোমিটার? এটা তো ধোতরে থেকে টুমলিঙ্গের দুরত্বের চেয়েও কম|”

– “সেটা ঠিকই| কিন্তু এই রাস্তার চড়াই বেশী| শুরুটা একদম শান বাঁধানো রাস্তা, পরের দিকটায় অবশ্য পাথরের স্ল্যাব বিছানো পথ| টুমলিঙ্গের মত অত জঙ্গুলে পথ নয়, দুদিকে বিস্তীর্ণ বুগিয়াল| আকাশ পরিষ্কার থাকলে এই রাস্তা থেকেই দুরের বরফ ঢাকা পাহাড় চূড়া দেখা যায়| কিন্তু আমরা পেয়েছিলাম কুয়াশা ঢাকা পথ| মাঝে অল্প বিস্তর রোদ উঠলেও মন্দ লাগত না, কিন্তু সে গুড়ে বালি| তবে যেহেতু তুঙ্গনাথ একদিনেই ঘুরে আসা যায়, এখানে প্রচুর তীর্থযাত্রীর সমাগম হয়|

Pligrims_on_Horseback_to_Tunganath
তুঙ্গনাথের পথে ঘোড়সওয়ার তীর্থযাত্রী (ছবি : লেখক)

সেই কুয়াশার মধ্যেও আমাদের পাশ দিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে পূন্যার্থীদের যেতে দেখেছিলাম| সাধারণ যাত্রীদের জন্য চড়াইটা একটু কষ্টসাধ্য হতে পারে, কিন্তু  ট্রেকারদের জন্য একেবারেই নয়| সোজা রাস্তা, এবং কুয়াশার জন্য চূড়ান্ত একঘেয়ে|”

– “একঘেয়ে কেন? তুমি তো বলেছিলে মদমহেশ্বরে কুয়াশার মধ্যেও প্রাকৃতিকসৌন্দর্য দারুণ ভাবে পেয়েছিলে| এখানে কি সমস্যা হলো ?” জানতে চায় তুষার

তুঙ্গনাথ ট্রেক রুট (ছবি : লেখক)
তুঙ্গনাথ ট্রেক রুট (ছবি : লেখক)

“তুঙ্গনাথের সমস্যা হল মদমহেশ্বরের মত রাস্তার দুপাশে ঘন বনানী নেই| রাস্তায় কোনো জলপ্রপাত নেই, এমনকি কোনো ছোট ঝোরাও নেই| রোদ্দুর থাকলে বুগিয়ালগুলোর অন্য রূপ|কিন্তু তা নাহলে পুরো ব্যাপারটাই একটু ম্লান গোছের| আসলে হয়ত অতটাও ম্লান নয়, কিন্তু মদমহেশ্বরের ঠিক পরে পরেই এই ট্রেকটা পানসে লাগছিল। এদিকে বৃষ্টি নামার সম্ভাবনা প্রবল| চারপাশে আশ্রয় নেওয়ার কোনও জায়গায়ও চোখে পড়ছিল না| তেমন জোরে বৃষ্টি এলে এগোব না পিছব সেটাও ঠিক করতে পারছিলাম না। ঘন্টা দুয়েক হাঁটার পর টিপ টিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো|আমি প্রমাদ গুনলাম| তুঙ্গনাথ পৌছনো না ভেস্তে যায়|”

– “এই সেরেছে| তারপর কী হলো?” – উদ্বিগ্ন গলায় জানতে চাইল তুষার

– “আর একটুক্ষন হাঁটতেই শঙ্কর সিং আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল -‘পৌঁছ গয়ে সাব| ও দেখিয়ে কালী কমলি ধর্মশালা|’ আমরা মনে বল পেয়ে দ্রুত পায়ে ধর্মশালার বারান্দায় উঠতেই জোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল| বুঝলাম আজ আর কপাল খুলবে না| নিশেষ যদিও খুব জোর গলায় ঘোষনা করল যে এই বৃষ্টি থেমে গেলেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাবে| আমি খুব একটা আশা দেখছিলাম না|”

“মন্দিরটা ধর্মশালা থেকে কতদুর?” প্রশ্ন করল তুষার

“কাছেই| কিন্তু বৃষ্টি থামলে তবে তো বেরোবো| একসময় বৃষ্টিটা সামান্য কম হতেই ধর্মশালার কেয়ারটেকারের কাছ থেকে পলিথিনের শিট নিয়ে গায়ে জড়িয়ে মন্দিরের দিকে হাঁটা দিলাম। নিশেষ একটু আপত্তি করছিল| ওর বক্তব্য ছিল যে এই বৃষ্টিতে মন্দিরের ছবি ভালো উঠবে না| আমরা যেহেতু রাতটা ধর্মশালাতেই কাটাব বলে ঠিক করেছিলাম ও চাইছিল পরদিন যেতে| ওর বিশ্বাস ছিল যে পরেরদিন মেঘ কেটে যাবেই, তখন মন্দির দর্শন হবেই আর আমরা চন্দ্রশিলাও যেতে পারব|

চন্দ্রশিলা তুঙ্গনাথ থেকে দেড় কিলোমিটার চড়াই ভেঙ্গে পৌঁছতে হয়| ভোরবেলা ওখান  থেকে দিগন্ত জুড়ে সারি সারি তুষার শৃঙ্গ দেখা যায়| আমি নিশেষকে কোনক্রমে বুঝিয়ে মন্দিরের দিকে নিয়ে চললাম| খাড়া পাথরের সিঁড়ি ভেঙ্গে একটা ফটক পেরিয়ে মন্দিরের চাতালে পৌঁছলাম| বৃষ্টি পড়া স্বত্বেও কুয়াশা কমে যাওয়ায় মন্দিরটা দেখা যাচ্ছিল| সেই সময় আবিষ্কার করলাম মোবাইলের নেটওয়ার্ক চলে এসেছে| মন্দিরের  দিকে তাকিয়ে একটা দারুণ আইডিয়া এলো|”

-“কী রকম আইডিয়া? মন্দির চত্বরে বসে মহাদেবের ধ্যান করে বৃষ্টি থামানোর চেষ্টা করবে ভাবছিলে?” তুষার ফোড়ন কেটে বলল

Tunganath_Temple
তুঙ্গনাথ মন্দির (ছবি : লেখক)

“ব্যাপারটা আর কিছুই নয়| আমার বাবার খুব ইচ্ছে ছিল মাকে নিয়ে কেদারনাথ এবং সম্ভব হলে পঞ্চকেদার ঘুরে আসা| কিন্তু সে আর হয়ে ওঠেনি| তারপর বয়স হয়ে গেছে, যাওয়ার প্রশ্নই আসে না| তাই আমি বাবা আর মাকে তুঙ্গনাথের একটা “virtual feel” দেওয়ার চেষ্টা করলাম| ইচ্ছে ছিল মদমহেশ্বর থেকেই করব, কিন্তু নেটওয়ার্ক না থাকায় করতে পারিনি| আর আমি তো কেদারনাথ কোনদিন যাইনি|”

“কী করলে? ভিডিও তুলে হোয়াটসআপ করে দিলে?” জানতে চাইল তুষার

তুঙ্গনাথ মন্দিরের গেট (ছবি : লেখক)
তুঙ্গনাথ মন্দিরের গেট (ছবি : লেখক)

“সেটা ২০০৮ সাল| হোয়াটসআপ তখন বাজারে আসেনি| আমি আরো  সহজ  রাস্তা নিয়েছিলাম| ফোন করে বাবা আর মা কে তুঙ্গনাথ মন্দিরের ঘন্টা বাজিয়ে শুনিয়ে দিয়েছিলাম| একটু চিন্তা শক্তি থাকলে এতেই রোমাঞ্চ হয়।”

“আরিব্বাস, এটাতো একেবারে হিট আইডিয়া|”

“অরিজিনাল আইডিয়া নয় যদিও| একটা মোবাইল নেটওয়ার্ক কম্পানির বিজ্ঞাপন থেকে অনুপ্রাণিত| পঞ্চ না হলেও একটা কেদারের অনুভূতি দিতে পেরেছিলাম| ভালো কথা পঞ্চকেদার কোন কোন জায়গা জানা আছে নিশ্চই?”

“ছি, ছি আমাকে এতটা আনাড়ি মনে করো? নাহয় তোমার মত ট্রেক করতে যাইনি।” ব্যথিত চোখে বলল তুষার|

তারপর গড়গড় করে বলে গেল “পঞ্চকেদার হলো কেদারনাথ, মদমহেশ্বর, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ আর কল্পেশ্বর| মহাভারতের গল্প অনুযায়ী মন্দিরগুলো পান্ডবদের বানানো|আসলে পান্ডবরা কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের পর ভ্রাতৃহত্যা আর ব্রাহ্মণহত্যার পাপ থেকে ‘ক্লিন চিট’ পেতে শিবঠাকুরের ‘রেকমেন্ডেশনের’ জন্য  দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছিলেন| এদিকে শিবঠাকুর পান্ডবদের এড়াবার জন্য ষাঁড়ের ছদ্মবেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন| কিন্তু ভীম সেই ষাঁড়ের পা ধরে এমন টানাটানি শুরু করলেন, যে সেই ষাঁড় পাতালে ঢুকে গেলো| মাটির উপরে স্রেফ কুঁজটা রয়ে গেলো| এই জায়গাটাই হল কেদারনাথ| এখানের শিবলিঙ্গটা এইজন্য একটু পিরামিডের মত দেখতে| আর বাকি শরীরের অংশ পরবর্তী কালে চারটে জায়গা দিয়ে বেরিয়ে এল | মদমহেশ্বর থেকে বেরিয়েছিল ষাঁড়ের পেট আর তুঙ্গনাথ থেকে বাহু| বাহুটা বলতে নিশ্চই ষাঁড়ের পা বোঝাচ্ছে| পরের দিকে পান্ডবরা এখানে পাঁচটা মন্দির বানিয়ে শিবের আরাধনা করে পাপ খন্ডন করেন| আর গাড়োয়াল নামটা এসেছে অনেক পরে| আগে এটাকে কেদার খন্ড বলা হত। শিবঠাকুর এখানে কেদার নামে পূজিত। সেই থেকে পঞ্চ কেদার| ”

“বাবারে, তুমি তো অনেক জানো দেখছি|” আমি কপট বিস্ময়ে চক্ষু বিস্ফারিত করে বললাম।

তুষার একটু লাজুক হাসল| তারপর বলল – “তাহলে ফুল মার্কস?”

– “ফুল মার্কস হতে পারে, যদি একটা প্রশ্নের জবাব দিতে পারো| বলো দেখি এই যে গল্পটা শোনালে এটা মহাভারতের কোন পর্বে আছে?”

– “এই রে, এটা তো একটু অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বল দিলে! কোনো আইডিয়া নেই দাদা|”

– “সত্যি কথা বলতে আমিও ঠিক জানিনা” অকপটে স্বীকার করলাম “অন্তত রাজশেখর বসুর মহাভারতে এটা পাইনি| কয়েকটা রেফারেন্স দেখে মনে হচ্ছে এটা ব্যাসদেবের মহাভারতের ঘটনা নয়, এটা আসলে পদ্ম পুরানে উল্লিখিত আছে| পদ্ম পুরানের একটা ইংরেজি ভার্সন ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করেছিলাম| কিন্তু যা প্রমাণ সাইজ – কোনো ক্লু না থাকলে এই পঞ্চকেদার নিয়ে পদ্ম পুরানে কোথায় লেখা আছে খুঁজে বের করা অসম্ভব ব্যাপার|”

-“তুঙ্গনাথের শিবলিঙ্গ কি সত্যিই ষাঁড়ের পায়ের মত দেখতে?” প্রশ্ন করল তুষার

– “পঞ্চকেদারের সব শিবলিঙ্গই স্বয়ম্ভু|  তুঙ্গনাথের শিবলিঙ্গ লম্বা একটা পাথরের মত, মাথাটা এবড়ো খেবড়ো| আরেকটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো তুঙ্গনাথ ছাড়া বাকি সব কেদারের পুরোহিতরা দক্ষিণ ভারতীয়| এই ব্যবস্হাটা স্বয়ং শঙ্করাচার্য করে গিয়েছিলেন|  মনে হয় ক্রস কালচারের জন্য| যাই হোক, মন্দিরে পুজো দিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই ধর্মশালায় ফেরত এলাম| পরদিন দশটা নাগাদ চোপতায় একটা গাড়ি আসার কথা, যেটা করে আমরা হরিদ্বার ফিরে যাবো| মনে হালকা একটা আশা ছিল যদি সকালবেলা বৃষ্টি থেমে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়| চন্দ্রশিলা থেকে তুষার শৃঙ্গ দেখতে হলে ভোর চারটে নাগাদ বেরোনো দরকার|”

– “ধর্মশালায় আর কারা ছিল?”

– “আমরা ছাড়া কেয়ারটেকার আর তার পরিবার| পুন্যার্থীরা পুজো দিয়ে নেমে গিয়েছিলো| দেবতা কিন্তু আমাদের পুজো পেয়ে প্রসন্ন হননি| সে রাতে যা বৃষ্টি নামল সেটা মারাত্মক| অত মুষলধার শিলাবৃষ্টি আগে কখনও দেখিনি|আমার যতটুকু আশা ছিলো, সব চলে গেল| বুঝতে পারছিলাম যে সকালে কিছুই দেখা যাবে না, এমনকি দশটার মধ্যে চোপতা পর্যন্ত নামতে পারব কিনা সন্দেহ ছিল| একটাই সান্ত্বনা তুঙ্গনাথের মন্দির যেতে পেরেছি| ট্রেক ফ্লপ হলেও ব্যর্থ হয়নি| সকালে উঠে দেখলাম  বৃষ্টি সমানে পড়েই চলছে| চা আর ব্রেকফাস্ট খেয়েই বৃষ্টির মধ্যেই  প্লাস্টিকের শিট চাপিয়ে মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে পরলাম| কোনক্রমে পিছল পথে আছাড় না  খেয়ে সাড়ে নটার মধ্যে চোপতায় নেমে এলাম|”

“উখিমঠ থেকে গাড়ি এসে গিয়েছিল?” প্রশ্ন করল তুষার

“বলছি না এটা ফ্লপ ট্রেক| শুধু যে কোনো তুষারাবৃত শৃঙ্গ দেখতে পাইনি তা নয়, অন্য সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল| দশটা বাজল, কোনও গাড়ীর দেখা নেই| এগারোটা বাজল, বারোটা বাজল গাড়ী আর এলো না| শঙ্কর সিং খোঁজ নিয়ে জানাল উখিমঠ যাওয়ার মাত্র দুটি বাস রয়েছে| একটি সকাল আটটায় চলে গিয়েছে,অন্যটি বেলা তিনটে নাগাদ আসবে|একটা গাড়ীও নেই যে হরিদ্বার বা নিদেন পক্ষে উখিমঠ ছেড়ে দিতে রাজি আছে| সব গোপেশ্বর বা চামোলি যেতে চায়| শেষে সেই তিনটের বাসে উঠলাম| বাস ভর্তি দেশোয়ালী লোক যার অধিকাংশই নেশা করে গায়ে দিশি মদের গন্ধ নিয়ে বসে আছে| একটাই ভালো ব্যাপার যে বসার জায়গা পেয়েছিলাম| উখিমঠে পৌঁছে জানলাম ড্রাইভারের ছেলের শরীর খারাপ হয়ে যাওয়ায় সে আসতে পারেনি| নিশেষ বলছিলো রাতটা উখিমঠে কাটিয়ে পরদিন সকালে হরিদ্বার রওয়ানা হতে| আমি রাজি হলাম না কারণ আমাদের ট্রেন পরের দিন রাতের| বৃষ্টি অনেকক্ষণ থেমে গিয়েছিল আর আমার মন বলছিল রাতে আর বৃষ্টি হবে না, কিন্তু কাল সকালে আবার মুষলধারে শুরু হলে বিপদে পড়ব| তার চেয়ে সেদিনই একটা গাড়ী ভাড়া করে রাতে হরিদ্বার পৌঁছে যাওয়া অনেক ভাল| কুয়াশা ভরা রাতের অন্ধকার রাস্তায় যাওয়া, দিনের বেলার অঝোর বৃষ্টির মধ্যে যাওয়ার থেকে বেশী সমীচীন মনে হয়েছিল|”

– “কী সাংঘাতিক! ওই পাহাড়ী রাস্তায় রাতের বেলা জার্নি| খুব ঝুঁকি নিয়েছিলে তো|” উদ্বিগ্ন গলায় বলল তুষার

– ” আমায় একটা ঝুঁকি নিতেই হতো| হয় দিনের বেলার ঝুঁকি, নয় রাতের বেলার | তবে দেবপ্রয়াগ ছাড়াবার পর যখন অন্ধকার নেমে এল, তখন ফগ লাইটের আলোয় সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে বেশ বুক ঢিপ ঢিপ করছিল| কখনো সামনে আচমকা ট্রাক এসে পড়ছিল, কখনও দেখছিলাম রাস্তার উপর বড় পাথরের টুকরো পড়ে আছে| মাঝে মাঝে বাঁদিকের নিকষ কালো অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে খেয়াল হচ্ছিল ওটা খাদ| আমাদের ড্রাইভার নির্বিকার ভাবে গাড়ী চালাচ্ছিল|ওর আত্মবিশ্বাসটাই আমাদের  সাহস যোগাচ্ছিল | তবে সব রাস্তাই এক সময় শেষ হয়| অবশেষে রাত এগারোটায় হরিদ্বার পৌছালাম| এর মধ্যে বাড়িতে ফোন করে দিয়েছিলাম| আমার এক হরিদ্বার নিবাসী বন্ধুকে আগেভাগে ফোন করে একটা হোটেল বুক করে নিয়েছিলাম|”

– ” কী কান্ড! আচ্ছা দাদা, এই গল্পটা তুমি কোথাও লেখোনি?”

– “লিখে কী করব? ফ্লপ ট্রেক যে| একটাও শৃঙ্গ দেখতে পাইনি, কুয়াশার জন্য তুঙ্গনাথের মন্দিরের একটা ভালো ছবিও ওঠেনি| তারপর শেষে ওই জার্নি|”

– “আচ্চ্ছা, সবসময় কি সুপারহিট ট্রেকের গল্প লিখবে? মানুষের জীবনে তো ওঠা পড়া লেগেই আছে| ব্যর্থতা নিয়েও লেখো| আর তুমি তো তুঙ্গনাথ পৌঁছতে পেরেছিলে, এমনকি বাবা মা কে ঘন্টাধ্বনিও শুনিয়েছিলে| তোমার তো কিছু প্রাপ্তি হয়েছিল|”

– “কে পড়বে এই ফ্লপ ট্রেকের গল্প?”

– “পড়বে,পড়বে| একবার লিখেই দেখো না|” আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল তুষার

কী আর করি, লিখেই ফেললাম আমার ফ্লপ ট্রেকের গল্প|

কেমন,এ গল্প পছন্দ হ্য়?

প্রয়োজনীয় তথ্য :

কখন যাবেন 

তুষারশৃঙ্গ দেখার জন্য আদর্শ সময় মে – জুন  মাস এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাস

কীভাবে যাবেন 

তুঙ্গনাথ ট্রেকের জন্য আপনাকে ঘাঁটি গাড়তে হবে চোপতা উপত্যকায়।  চোপতা থেকে ৩.৫ কি.মি. ট্রেক করে পৌঁছতে হবে তুঙ্গনাথ। সেখান থেকে ১.৫ কি.মি. রাস্তা অতিক্রম করে চন্দ্রশিলা পৌঁছতে হবে। এখান থেকে ভোরবেলা অসংখ্য তুষারশৃঙ্গ  দেখা যায়।  আর যদি দেওরিয়া তাল যেতে চান,সেও চোপতা থেকে যেতে হবে। চোপতা থেকে লোকাল গাড়ি ধরে সারি গ্রাম পৌঁছতে হবে । সেখান থেকে ৩ কি.মি ট্রেক করে পৌঁছতে হবে দেওরিয়া তাল।

কলকাতা থেকে ট্রেনে চেপে চলে আসুন হরিদ্বার। লোকে সাধারণত: দুন এক্সপ্রেস বা উপাসনা এক্সপ্রেস করেই হরিদ্বার যান। হরিদ্বার থেকে সরাসরি চোপতা যাওয়ার বাস নেই বললেই চলে ।  ব্রেক জার্নি করে যেতে হবে। বাসে বা শেয়ার গাড়িতে করে হরিদ্বার থেকে রুদ্রপ্রুয়াগ চলে আসুন। সেখান থেকে বাস বা ট্রেকারে পৌঁছে যান উখিমঠ। সেখান থেকে গাড়ী ভাড়া করে চোপতা চলে আসুন। কপাল ভালো থাকলে বাসও পেয়ে যেতে পারেন।  অনেকে রাতটা উখিমঠে কাটিয়ে পরদিন চোপতা সকলে যান।

হরিদ্বার থেকে উখিমঠ সরাসরি বাস আছে তবে তা সংখ্যায় কম। যাত্রাও খুব সুখপ্রদ নয়। রুদ্রপ্রয়াগ থেকে চামোলি বা গোপেশ্বর হয়েও তুঙ্গনাথ যাওয়া যায় ,কিন্তু অনেক বেশি সময় লাগে।

যদি ট্যাঁকের জোর থাকে এবং বড় গ্রুপ থাকে,সরাসরি হরিদ্বার থেকে গাড়ি ভাড়া করে চোপতা  চলে যান ।

দুরত্ব 

উখিমথ – চোপতা       – ২৯ কি.মি.
গোপেশ্বর- চোপতা     – ৪০ কি.মি
রুদ্রপ্রুয়াগ – উখিমঠ   – ৪২ কি.মি.
রুদ্রপ্রুয়াগ – গোপেশ্বর  – ৭৪ কি.মি.
হরিদ্বার  –  রুদ্রপ্রুয়াগ – ১৬২ কি.মি

কোথায় থাকবেন 

উখিমঠ 

বাজারের মধ্যে প্রচুর থাকার জায়গা আছে। তবে একটু ভালো থাকার জায়গা চাইলে গাড়োয়াল মন্ডল বিকাশ নিগমের (GMVN) বাংলোয় থাকতে পারেন।

কলকাতা থেকে বুকিং করুন এই ঠিকানায় গিয়ে :

Garhwal Mandal Vikas Nigam Ltd.,
Marshall House, Room no. 301 / 302 (3rd floor)
33/1, Netaji Subhash Road.
Kolkata-700001.
Tel. / Fax : 033-2231-5554.
Email: gmvnkol@gmail.com

চোপতা

বাস স্ট্যান্ডের কাছে অনেক ছোট ও মাঝারি মানের হোটেল আছে । একটু ভালো থাকার জায়গা চাইলে চন্দ্রিকা ক্যাম্পে থাকতে পারেন। এখানে তাঁবু এবং কটেজ দুয়েরই ব্যবস্থা আছে । চোপতা থেকে ২.৫ কি.মি  দুরে প্রিস্টিন ইকো ক্যাম্পের তাঁবুতেও থাকা যেতে পারে।

Chandrika Camp Chopta
Near Hanuman Temple,
Badrinath road Chopta,
Rudraprayag (UTTARAKHAND)
Phone: +91-9690450355, +91-9410123945
Email: chandrikacampchopta@gmail.com

Pristine Peaks Eco Camp, Chopta
+91-9599685100, +91-0875878650
mail@pristinepeaksecocamp.com

তুঙ্গনাথ 

এখানে কালী কমলি ধর্মশালা ছাড়া আরও কয়েকটা ছোট খাটো থাকার জায়গা আছে। মনে রাখবেন যারা ভোরবেলায় চন্দ্রশিলা যেতে চান,তাঁরাই মূলত এখানে থাকেন। তীর্থ যাত্রীরা চোপতা বা উখিমঠে থেকে দিনের দিনে মন্দির দর্শন করে ফিরে যান।

সারি গ্রাম 

সারি গ্রামে থাকার মতো অনেক ছোট খাটো জায়গা আছে। সেগুলো স্থানীয় লোকের সাথে কথা বলে আগে থেকে বুকিং করার চেষ্টা না করে সরাসরি গ্রামে গিয়ে কথা বললে অনেক সস্তায় ভালো থাকার জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

অমিতাভ গুপ্ত
ছিলেন নামী কোম্পানির দামী ব্র্যান্ড ম্যানেজার | নিশ্চিত চাকরির নিরাপত্তা ছেড়ে পথের টানেই একদিন বেরিয়ে পড়া | এখন ফুলটাইম ট্র্যাভেল ফোটোগ্রাফার ও ট্র্যাভেল রাইটার আর পার্টটাইম ব্র্য্যান্ড কনসাল্টেন্ট | পেশার সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছেন নেশাকেও | নিয়মিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ হয় বেড়ানোর ছবি এবং রাইট আপ |

4 COMMENTS

  1. onek dhonnobad,,flop trek kintu purotai porlamm,,,,hit purotai…(flop er moroke)tobe amar terk ta flop hoy ni,(October 2015),,,,,osadharon view,,prochur snap amar kopale juteche….r tenar ashirbad e tenar snap…valo thakun anonde thakun ,,,,

  2. দারুন লাগল।
    কোথায় যে ঠিক ফ্লপ টা হয়েছিল খুজেই পেলাম না।।।
    খুব ভাল একটা প্রকাশ।

  3. দারুন লাগল। ফ্লপ তো নয়ই: বরং বেশ ইন্টারেস্টিং।

  4. আপনি যে ভ্রমন অভিজ্ঞতা share করলেন , পড়ে খুব ভালো লাগলো । বর্ষাকালে পাহাড়ের রাস্তায় বিপদের ঝুঁকি থাকেই । নিরাপদে ফিরেছেন , ঈশ্বরকে ধন্যবাদ । ।
    এই ট্রেকটা December এ করলে কি খুব অসুবিধেতে পড়তে হবে ? একটু জানালে বিশেষ বধিত হব । নমস্কার নেবেন ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here