সালঙ্কারা দেবী নন‚ ঘরের মেয়ে টুসু-ভাদুকে কোলে বসিয়ে পুজোর মধ্যেই আছে মেঠো আন্তরিকতা

গ্রাম বাংলার লৌকিক পরবগুলি বাঙালির জীবনের এক অমূল্য সম্পদ | শহুরে সভ্যতার করাল গ্রাসে যখন আস্তে আস্তে বাংলা ও বাঙালির পূর্ব ঐতিহ্য‚ ইতিহাস ও গৌরব স্তিমিত হয়ে আসছে তখন গ্রামের তুলসিতলার প্রদীপের শিখায় টিম টিম করে জ্বলছে বাংলার পরবের প্রাণ |

গ্রাম বাংলার অতি পরিচিত জনপ্রিয় পরব বা উৎসব টুসু ও ভাদুর উৎসব | বাংলার এই দুই দীন দুঃখিনী মেয়েকে গৌরীর মত ঐশ্বর্যমন্ডিত না হলেও বাংলার বর্ষীয়সী নারীরা তাদের নিজেদের মেয়েদের মতই আদর যত্ন করে পুজো করেন |

প্রথমে বলা যাক টুসুর কথা | টুসু হলেন লৌকিক দেবী, ফসলের দেবী। আমন ধান ঘরে আসার পর অগ্রহায়ণ সংক্রান্তি থেকে পৌষ সংক্রান্তি পর্যন্ত একমাস ধরে টুসুদেবীর পূজো করেন মহিলারা। এ অনুষ্ঠানে দরকার হয় না কোন পুরোহিতের। পুরুষতন্ত্র এখানে হার মেনেছে।  মেয়েরাই এর ব্রতী।

বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলে টুসুকে তোষলা দেবী বলে। তার পরণে লাল, নীল কাগজের শাড়ি। হাতে – গলায় সোনালী রাংতার গয়না। অগ্রহায়ণ সংক্রান্তির দিন সন্ধ্যায় বাড়ির মেয়েরা বেদি তৈরী করে মাটির। মেয়েরা পিটুলি গোলা দিয়ে তার উপর আঁকে আলপনা। শাঁখলতা, ঝুমকো লতা, পদ্ম, চাঁদ, সূর্য, ধানের ছড়া সহ আরও বহু কিছু গ্রাম বাংলার ছোট ছোট চিহ্ন আঁকা হয়৷ আঁকা শেষ হলে বেদির ওপর সাজিয়ে রাখে নিজের নিজের টুসু দেবীকে, তারপর আরম্ভ করে গান।

” উঠ উঠ উঠ টুসু

উঠাতে এসেছি গো

তোমারি সেবিকা মোরা

পূজিতে বসেছি গো। ”

টুসুগানের প্রায় সবই কবি গানের মতো হঠাৎ রচনা। কোন গানই মেয়েরা আগে থেকে তালিম দিয়ে তৈরি করে আসে না। এ গানে মেয়েরা তাদের মনের কথা টুসুকে জানায়। দৈনন্দিন খবরাখবর, দেশের সাধারণ সুখ-দুঃখের কথাও উঠে আসে গানে। এই সঙ্গীতের মূল বিষয়বস্তু লৌকিক ও দেহগত প্রেম। এই গান গায়িকার কল্পনা, দুঃখ, আনন্দ ও সামাজিক অভিজ্ঞতাকে ব্যক্ত করে।

” যমুনার জলে

বাঁশি বাজে গো রাধা বলে।

যদি আমি থাকি ঘরে বাঁশি বাজে নাম ধরে।

শাশুড়ী ননদী ঘরে, কেমনে যাব চলে।

না জানে প্রেমের মরম, যাও সখি কর বারণ।

অসময়ে বাঁশি বাজে, যাব আমি কোন ছলে। ”

টুসু উৎসব পালনের সময় পৌষ মাসের শেষ চারদিন চাঁউড়ি, বাঁউড়ি, মকর এবং আখান নামে পরিচিত। চাঁউড়ির দিনে গৃহস্থ বাড়ির মেয়েরা উঠোন গোবরমাটি দিয়ে নিকিয়ে চালের গুঁড়ো করা হয়। বাঁউড়ির দিন অর্ধচন্দ্রাকৃতি, ত্রিকোণাকৃতি ও চতুষ্কোণাকৃতির পিঠে তৈরী করে তাতে চাঁচি, তিল, নারকেল বা মিষ্টি পুর দিয়ে ভর্তি করা হয়। স্থানীয় ভাবে এই পিঠে গড়গড়্যা পিঠে বা বাঁকা পিঠে বা উধি পিঠে ও পুর পিঠা নামে পরিচিত। বাঁউড়ির রাত দশটা থেকে টুসুর জাগরণ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মেয়েরা জাগরণের ঘর পরিষ্কার করে ফুল, মালা ও আলো দিয়ে সাজায়। এই রাতে কিশোরী কুমারী মেয়েরা ছাড়াও গৃহবধূ ও বয়স্কা মহিলারাও টুসু গানে অংশগ্রহণ করেন। এই রাতে টুসু দেবীর ভোগ হিসেবে নানারকম মিষ্টান্ন, ছোলাভাজা, মটরভাজা, মুড়ি, জিলিপি ইত্যাদি নিবেদন করা হয়।

গোটা পৌষ মাস ধরে এই ভাবে টুসুদেবীর কাছে নিজেদের সুখ-দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করে দেশের দশের খবর জানিয়ে সংক্রান্তির দিন তাকে ভাসিয়ে দেওয়ার পালাও এসে যায়। এর আগের দিন রাতেই হয় টুসু-জাগরণ। মকর সংক্রান্তির দিন ভোর হবার আগেই ব্রতী মেয়েরা যে যার টুসুকে কোলে নিয়ে তাড়াতাড়ি চলতে থাকে নদীর ঘাটের দিকে। যেন সবাই তার আদরের দুলালীকে কোলে নিয়ে যাচ্ছে। টুসুকে ভাসিয়ে দেওয়া হল গাঙের জলে । একে একে সকলের টুসু চলল গাঙ দিয়ে ভেসে ভেসে । ভেসে যেতে থাকে এদের সংস্কৃতি, হারিয়ে যেতে থাকে এদের গান।

এবার আসা যাক ভাদু পরবের কথায় | ভাদু উৎসব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা ও বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমা এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাঁচি ও হাজারিবাগ জেলার লৌকিক উৎসব।

ভাদু উৎসব নিয়ে মানভূম অঞ্চলে বেশ কিছু লোককাহিনী প্রচলিত রয়েছে। পঞ্চকোট রাজপরিবারের নীলমণি সিংদেওর তৃতীয়া কন্যা ভদ্রাবতী বিবাহ স্থির হওয়ার পর তাঁর ভাবী স্বামীর অকালমৃত্যু হলে মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। এই কাহিনী মানভূম অঞ্চলে সর্বাধিক প্রচলিত। বিয়ে করতে আসার সময় ভদ্রাবতীর হবু স্বামী ও তাঁর বরযাত্রী ডাকাতদলের হাতে খুন হলে ভদ্রাবতী চিতার আগুনে প্রাণ বিসর্জন করেন। ভদ্রাবতীকে জনমানসে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নীলমণি সিংদেও ভাদু গানের প্রচলন করেন। কিন্তু এই কাহিনীগুলি ঐতিহাসিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। রাজপুরোহিত রাখালচন্দ্র চক্রবর্তী রচিত পঞ্চকোট ইতিহাস নামক গ্রন্থে এই ধরণের কোন ঘটনার উল্লেখ নেই। নীলমণি সিংদেও তিনজন পত্নীর গর্ভে দশজন পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেও তাঁর কোন কন্যাসন্তানের ছিল কিনা সেই বিষয়েও সঠিক তথ্যের অভাব রয়েছে।

পয়লা ভাদ্র কুমারী মেয়েরা গ্রামের কোন বাড়ির কুলুঙ্গি বা প্রকোষ্ঠ পরিষ্কার করে ভাদু প্রতিষ্ঠা করেন। একটি পাত্রে ফুল রেখে ভাদুর বিমূর্ত রূপ কল্পনা করে তাঁরা সমবেত কন্ঠে ভাদু গীত গেয়ে থাকেন । ভাদ্র সংক্রান্তির সাত দিন আগে ভাদুর মূর্তি ঘরে নিয়ে আসা হয় । আগে ভাদুর কোন মূর্ত রূপ ছিল না। একটি পাত্রে ফুল রেখে বা গোবরের ওপর ধান ছড়িয়ে ভাদুর রূপ কল্পনা করে উৎসব পালন করা হত । পরবর্তীকালে বিভিন্ন রকমের মূর্তির প্রচলন হয়েছে। মূর্তিগুলি সাধারণতঃ হংস বা ময়ূর বাহিনী বা পদ্মের ওপর উপবিষ্টা মূর্তির গায়ের রঙ হলুদ, মাথায় মুকুট, হাতে পদ্মফুল, গলায় পদ্মের মালা ও হাতের তলায় আলপনা থাকে । কখনো মূর্তির কোলে কৃষ্ণ বা রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি থাকে।

ভাদ্র সংক্রান্তির আগের দিন রাতে ভাদুর জাগরণ পালিত হয়। এই রাতে রঙিন কাপড় বা কাগজের ঘর তৈরি করে এই মূর্তি স্থাপন করে তার সামনে মিষ্টান্ন সাজিয়ে রাখা হয়। এরপর রাত নটা বা দশটা থেকে ভাদু গীত গাওয়া হয়।

” খিরই নদীর কুল ভাইঙ্গেছে/ ভাদু নাকি আসিছে/ হাতে আছে পানের বাটা/ রুমালটি ভাঁইসে যাছে। ”

অথবা,

” কাশিপুরের মহারাজা সেও করে ভাদুপূজা/ ভাদুর শীতল, চূড়ান মিঠাই রসকরা জিলিপি খাজা। ”

– এই গানগুলি কয়েকটি পরিচিত ভাদু গান |

কুমারী ও বিবাহিত মহিলারা গ্রামের প্রতিটি মঞ্চে গেলে তাঁদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। তাঁরা এই সব মঞ্চে ভাদু গীত পরিবেশন করে থাকেন। ভাদ্র সংক্রান্তির সকালে দলবদ্ধভাবে মহিলারা ভাদু মূর্তির বিসর্জন করা হয় । অন্যান্য অঞ্চলের পালিত উৎসব থেকে বীরভূম জেলার ভাদু উৎসবের বৈশিষ্ট্য আলাদা ।

নিজস্ব সংস্কৃতি, টুসুকে ঘিরে গান হল নিরক্ষর পল্লীবাসীদের সংবাদপত্র – এর মারফৎ পল্লীবাসীরা মত গঠন করার সুযোগ পান । হাজার প্রতিকূলতা, কৃত্রিম সংস্কৃতি ধীরে ধীরে সাপের মতো গিলে ফেলছে যখন সমাজের মস্তিষ্ক, তখনও লোক কবিরা থেকেছেন স্বতন্ত্র । শহুরে মেকী সভ্যতার ধার এরা ধারেন না । হয়ত এই কারণেই টুসু ও ভাদুর পরবের মত আঞ্চলিক উৎসবগুলি বাঙালির মননকে আজও একইরকম ভাবে আকর্ষিত করে, ডাক দেয় মাটির কাছে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.