৩০ অক্টোবর মধ্য রাত থেকে জম্মু ও কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় শাসন

113

৩১ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, স্বাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাস দেখল এক অন্য রকম সকাল। রাজ্যের সংখ্যা একটি কমে গিয়ে দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল যুক্ত হল উপমহাদেশের মানচিত্রে। গত ৯ অগস্ট রাষ্ট্রপতির ঘোষণায় জম্মু ও কাশ্মীরের যে সাংবিধানিক পালাবদলের সূত্রপাত হয়েছিল, তা কার্যকর হল গত বৃহস্পতিবার থেকে। গুজরাটের প্রাক্তন আমলা জি সি মুর্মু জম্মু ও কাশ্মীরের সামরিক প্রধান নিযুক্ত হলেন। জম্মু-কাশ্মীরের পাশাপাশি লাদাখকেও পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আর এক প্রাক্তন আমলা রাধাকৃষ্ণ মাথুর বহাল হলেন সেখানকার দায়িত্বে। লক্ষণীয় যে, মোদী সরকার সম্প্রতি ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা স্বাধীনতা সংগ্রামী সর্দার বল্লভভাই পটেলের জন্মদিনে যে জাতীয় সংহতি দিবস ঘোষণা করেছে, সেই দিনটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে কেন্দ্রশাসিত জম্মু কাশ্মীরের জন্মদিন হিসেবে। 

লাদাখে আপাতত কোনও বিধানসভা থাকছে না। লেফটেনান্ট গভর্নরের মাধ্যমে সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে থাকছে এই অঞ্চল। কাশ্মীরে অবশ্য বিধানসভা থাকবে। প্রশাসনিক কাজকর্ম  চলবে দিল্লি মডেলের অনুসরণেই। তবে জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন আইন ২০১৯-এর ধারাগুলি এখনও পর্যন্ত খুব স্পষ্ট নয়। সেই আইন কার্যকর হতে সময় লাগবে আরও কিছুদিন।

চলতি বছরের লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধান হাতিয়ারই ছিল জম্মু-কাশ্মীরকে কেন্দ্রীয় শাসনের আওতায় আনার শপথ। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসার পরই যে সেই শপথকে কার্যকর করার লক্ষ্যে নেমে পড়বে কেন্দ্রীয় সরকার, এমনটা অবশ্য অনেকেই ভাবেননি। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় একক ভাবে ৩০৩ টি আসনে জয়ী বিজেপির নেতা হিসেবে ৩০ মে দ্বিতীয় বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী। তার দু’মাসের মধ্যে, ৫ অগস্ট, নবগঠিত লোকসভার প্রথম অধিবেশনেই জম্মু কাশ্মীর সংক্রান্ত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয় সরকার। 

এরকম যে একটা কিছু হতে চলেছে, তার আঁচ অবশ্য পাওয়া যাচ্ছিল ঘোষণার দিন কয়েক আগে থেকেই। জম্মু কাশ্মীরে আচমকাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ইন্টারনেট, টেলিফোন-সহ সমস্ত রকম যোগাযোগ ব্যবস্থা। এলাকার মুখ্য রাজনৈতিক নেতাদের গৃহবন্দি করে ফেলা হয়। জরুরি ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনা হতে থাকে সমস্ত পর্যটকদের। কড়া সামরিক নিরাপত্তায় মুড়ে দেওয়া হয় গোটা উপত্যকা। লোকসভায় জম্মু-কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার তিন দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে বক্তৃতা করেন। ৪০ মিনিটের সেই বক্তব্যে তিনি বারবার বলেন কেন্দ্র উপত্যকার মানুষের পাশে আছে। তাঁদের কল্যাণ এবং উন্নয়নই কেন্দ্রীয় সরকারের একমাত্র লক্ষ্য বলেও আশ্বস্ত করেন নরেন্দ্র মোদী। তিনি আরও জানান, কাশ্মীরে পর্যটন এবং পরিকাঠামো উন্নয়নে ইতিমধ্যেই নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। 

এই সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায় বিদ্বৎসমাজ। কেউ কেউ একে “সাহসি এবং ঝুঁকিপূর্ণ” পদক্ষেপ বলে প্রশংসা করেন। এতে জম্মু কাশ্মীরের সঙ্গে মূল ভারতীয় ভূখণ্ডের সংহতি প্রক্রিয়া এক ধাপ এগিছে বলেও মন্তব্য করেন তাঁরা। তবে বিরোধীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়, যাঁরা মনে করেছেন এ ভাবে আচমকা জবরদস্তি কাশ্মীরিদের বিশেষ সুযোগসুবিধা কেড়ে নেওয়ায় তাঁদের অপমানিত বোধ করার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। রাজনৈতিক ভাবেও কংগ্রেসের তরফে এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা করা হয়। রাহুল গাঁধী তাঁর প্রতিনিধিদল নিয়ে কাশ্মীরে গেলেও তাঁকে বিমানবন্দর থেকেই ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপরেই কংগ্রেসের তরফে জোরদার সওয়াল ওঠে, কাশ্মীরে কী এমন ঘটছে যা লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার? প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানও এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তবে তাতে বিশেষ লাভ হয়নি। রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে শুরু করে সব আন্তর্জাতিক মহলই একে “ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা” বলে দায় সেরে দেয়। 

তার পরে আড়াই মাস কেটে গেলেও কাশ্মীর পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে কিনা, তা নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে। কারণ আজও সেখানে বন্ধ ইন্টারনেট পরিষেবা, কাজ করছে না প্রি-পেড মোবাইলও। পরপর ঘটে চলেছে একের পর এক জঙ্গি হামলা। মারা যাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। যদিও সরকারের দাবি, পরিস্থিতি নাকি একেবারেই শান্তিপূর্ণ রয়েছে।  

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.