‘উড়নচণ্ডী’ : ধর্ষণের পরের দিন মেয়েরা এত খুশি হয়ে যায় বুঝি?

ধর্ষণ-দৃশ্যের কথাটা একটু পরে লিখছি, আগে ছবির ওপেনিং সিকোয়েন্সটা নিয়ে লিখি।

শুরুটা এরকম যে, প্রায় অন্ধকার ফ্রেম, তার মধ্যে দ্যাখা যাচ্ছে আবছা একটা বন-জঙ্গলের আভাস। বেশ এক দঙ্গল লোক, তাদের হাতে হাতে জ্বলছে প্রায় দশ-বারোটা টর্চ। অডিও ট্র্যাকে তাদের কলরব শুনে এটুকু বুঝতে পারা যাচ্ছে যে, মিনু নামে কোন একটা মেয়েকে খুঁজতে বেরিয়েছে তারা।

এরপর আপনি দেখতে পাবেন সেই মিনুকে (অভিনয়ে রাজনন্দিনী পাল)বন-বাদাড়-মাঠ-জলা পেরিয়ে সে ছুটছে, আর তার পেছনে ধাওয়া করেছে ওই লোকগুলো। মনে হবে মিনুকে যখন দেখতে পেয়ে গেছে ওরা, একলা একটা মেয়েকে ধরে ফেলতে বেশি সময় লাগবে না বোধহয় আর। এই সিনগুলোতে আস্তে আস্তে ভোরের আলো ফুটতে দেখবেন স্ক্রিনে।

মুশকিল হল, এরপর দ্যাখা গেল যে, সেই মিনু আর তাকে তাড়া করে আসা লোকগুলোর দৌড় কম্পিটিশন যেন থামার প্রশ্ন নেইরোদ চড়ে গ্যাছে এদিকে ভালমতোন বেশছুটতে ছুটতে একটা রেলওয়ে ট্র্যাকের ওপর উঠে পড়ল মিনু। জানেন নিশ্চয় যে, খোলা মাটিতে ছোটা, আর রেল ট্র্যাকের ওপর দিয়ে ছুটতে থাকার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ প্রায়রেল ট্র্যাকে বিছিয়ে রাখা কাঠের পাটা আর পাথর কুচিতে হোঁচট খেয়ে যে কোন মুহূর্তে অমন মেয়ের হুমড়ি খেয়ে উলটে পড়ার চান্স। কিন্তু এখানে দেখতে পাবেন যে বেশ সাবলীল ভাবেই ওই ট্র্যাকের ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে মেয়ে!

মেয়েটা আবার বধূবেশে সজ্জিতা, অর্থাৎ গায়ে ভারী বেনারসি, মাথায় সেই কনের মুকুট অবধি আছে! ওর পেছনে ছুটে আসছে যে লোকগুলো, তাদের একজনের মাথায় বরের টোপর গোছের একটা কিছু দেখতে পাবেন আপনি। এর থেকে এটা আন্দাজ করতে পারেন যে, বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছে মেয়েটা, আর কনের পিছু পিছু ছুটে এসেছে তার বরটিও।

রেল ট্র্যাকের ওপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে ট্র্যাক থেকে একটা পাথর তুলে পেছনের লোকগুলোর দিকে ছুঁড়ে মারে সেই মিনু। আর কী নিখুঁত লক্ষ্য মশাই তার, যে ওই টুকুতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল ওকে ধাওয়া করে আসা জনা কয়েক লোক

শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যেটুকু লিখেছি, এই সিনটার ট্রিটমেন্ট এরকম যে পুরোটা আমার মনে হচ্ছিল স্বপ্নদৃশ্য বলে। নইলে মাঝরাত থেকে শুরু করে এই রোদ চড়ে যাওয়া মোমেন্ট অবধি টানা একটা মেয়ে এইভাবে না হাঁফিয়ে, না থেমে ছুটতে পারে নাকি? আর পেছনের আধবুড়ো ওই দামড়া লোকগুলো? তাদেরও তো ছোটাছুটিতে বিরাম নেই কোন!

কিন্তু এরপর এটা যখন মালুম হল যে, পুরো সিকোয়েন্সটাই ট্রিট হচ্ছে রিয়্যাল ইভেন্ট বলে, তখন দাদা ঘাবড়ে গেলাম খুব!  মনে পড়ে গেল এ বছর শুরুর দিকে সেই ‘আসছে আবার শবর’ দ্যাখার কথা। অপরাধীর পিছু নিয়ে দুই চ্যালা সমেত ছুটতে শুরু করেছিল শবর দুপুর কি বিকেল নাগাদ হবে আর তারপর লাগাতার কী দৌড় সেখানে দ্যাখান হল, বাপরে বাপরে বাপ! অপরাধীকে যখন ধরা গেল তখন সন্ধে পেরিয়ে রাত নেমে গেছে প্রায়। টানা এতটা দৌড়ে এসেও শবর কিংবা তার সহকারীগুলো দেখবেন কেউ ক্লান্ত হয় নি মোটে!

‘উড়নচণ্ডী’র শুরুটা দেখছি আর মনে হচ্ছে, এ কি সেই শবর কেস নাকি? মাইলের পর মাইল ধরে রাত থেকে বেলা দুপুর অবধি দৌড় চলবে, কিন্তু হাঁফ ধরবে না কারু?

আরেকটা ব্যাপার কিছুতে ক্লিয়ার হল না যে বিয়েবাড়ি থেকে বৌ পালিয়ে গেলে জেনারেলি তার পিছু তো নেবে তার নিজের বাড়ির লোক! এখানে যে এক ঝলক দ্যাখান হল, বরবেশেও একজন রয়েছে পিছু-নেওয়া ওই লোকজনের মধ্যে! বিয়ের আসর থেকে বৌ পালিয়ে যাওয়ার পর বর নিজেও তার পিছু নিয়ে দৌড় দিচ্ছে জোরে, ঘটনা হিসেবে শুনতে এটা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য কি?

আরও মজা দেখুন, এই যে ছবির শুরুতেই এরকম চেজ সিকোয়েন্স রাখা, এটা দেখে আপনার তো খুব ন্যাচারালি এটা মনে হবে যে, এর ফাইনাল পরিণতি কী হবে, সেটাও দেখি তাহলে বসে। আর কাণ্ড দেখুন, ছবি শুরুর অল্প ক্ষণের মধ্যেই আপনি দেখতে পাবেন, ধাওয়া করে আসা ওই লোকগুলো স্ক্রিপ্ট থেকে পুরো ধাঁ!

ততক্ষণে মিনু হাইওয়ে থেকে লরি থামিয়ে উঠে পড়েছে সেটায়। লরিতে উঠে পড়ার পর ওই লোকগুলো আর মোটে একটা সিনে আছে। যে ওরাও ওই লরিটার পিছু নিয়েছে আরেকটা গাড়ি চড়ে।

কিন্তু ব্যাস ওইটুকুই। তারপরে এই গোটা ছবির আর কোত্থাও আর ওই লোকগুলো নেই। সেই রাত থেকে এই দ্বিপ্রহর অবধি যারা পিছু নিয়ে এল ওর, এই সিনটার পরেই তারা হাওয়া হয়ে গেল সব?

দিনভর দৌড় প্রতিযোগিতা দেখে যেমন ‘আসছে আবার শবর’ মনে পড়ে যাবে, সে রকম হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে হাত দেখিয়ে গাড়ি থামিয়ে সওয়ার হওয়ার সিন দেখে মনে হবে এটা ‘দিল হ্যায় কি মানতা নাকি’ (১৯৯১) শুরু হয়ে গেল নাকি! অচেনা গাড়িতে হুট করে ওঠার সাহস দ্যাখালে যে তরুণী মেয়ের ওপর রেপ অ্যাটাক হওয়ার চান্স থাকে, সাতাশ বছর আগেই তো দেখিয়ে দিয়েছিল সেই মহেশ ভাটের ছবি। ভাবুন কাণ্ড, সেম স্টোরি এই এতদিন পরে বাংলা সিনেমায় দেখতে হচ্ছে বাসি হয়ে যাওয়া ক্লিশে-চচ্চড়ির মতো!

‘দিল হ্যায় কি মানতা নাহি’তে অবশ্য রেপ হতে হয় নি নায়িকাকে, শুধু অ্যাটেম্পট অবধি দেখিয়ে সেখানে ক্ষান্ত দেওয়া হয় তারপরই নায়িকাকে সেভ করতে সেখানে হিরোবাবু চলে আসেএখানে কিন্তু গ্রাফিক ডিটেল না দ্যাখালেও ঘটনা যেটুকু দ্যাখান হল, তাতে এটা প্রায় স্পষ্ট যে অচেনা গাড়িতে ওঠার পর দু-দুখানা দুষ্টু লোকের হাতে রেপ হয়ে গেল মিনু।

এখন এই সিকোয়েন্সটা হজম করতে গিয়েও কী সব হোঁচট খাচ্ছি, শুনুন।

ছবির পটভূমি তো এইটে যে, মিনু ওরফে মিনতি পাল বুড়ো লোককে বিয়ে করবে না বলে সৎ মায়ের অ্যারেঞ্জ করা বিয়ের থেকে পালিয়ে যাচ্ছে সিটুর গ্রামে নিজের আশিক গোবিন্দের কাছে। আর ওই মেয়েকে নিজেদের লরিতে লিফ্‌ট দিচ্ছে ছোটু (অমর্ত্য রায়) আর বিন্দি (সুদীপ্তা চক্রবর্তী) নামের দুজন

এবার ঘটনা হল, ওদের লরি কী কারণে একটু খানি থমকে যেতেই হঠাৎ কী যে তাড়া উঠল মিনুর, যে তড়িৎবেগে সেই লরি থেকে নেমে পড়ে রাস্তা থেকে আরও একটা গাড়ি থামিয়ে ওকে আবার সেটায় উঠতে হল!

প্রথম হোঁচট এইটে।

যে দুজন মানুষের সঙ্গে এতটা রাস্তা এল মিনু, সেই ছোটু আর বিন্দিকে মৌখিক কৃতজ্ঞতাটুকু জানানোরও কোন দায় দ্যাখাল না ও? উলটে ওই দুটো মানুষ অসুবিধেয় পড়া মাত্র ওদের কথা মাথায় না এনে নিজের তালে ফেটে পড়ল জাস্ট! বুঝতে এটা পারছিলাম না যে, মিনু নামের মেয়েটাকে এতটা ইনসেনসিটিভ করে দ্যাখানোটা ডিরেক্টরের নিজের প্ল্যান কিনা

এর বেশ কিছুক্ষণ পরে স্টার্ট নিল ছোটু-বিন্দির লরি। আর পথ চলতে চলতে ওরা দেখতে পেল যে, মিনু যে নীল গাড়িটা চড়ে কেটে পড়েছিল, সেটা থেমে আছে রাস্তার একধারে আর গাড়িতে থাকা দুটো লোক বা সেই মিনুর কোন চিহ্নমাত্র নেই। এটা দেখে ছোটু-বিন্দি আঁচ করল যে মিনুর নিশ্চয় তাহলে বিপদ হয়েছে কোন।

কিন্তু গাড়িটা আর তার চারপাশ ছানবিন করেও যখন ওরা বুঝতে পারছে না কিছু, যে কোন দিকে গেলে কোন হদিশ পাওয়া যাবে, তখন হঠাৎ করে ওরা দুজন শুনতে পেল মিনুর আর্তরব। আর সেই চিৎকার ফলো করে এগিয়ে গিয়েই ওরা দুজন দেখতে পেল রেপড হয়ে গ্যাছে মিনু।

হোঁচট নাম্বার টু। আমার প্রশ্ন, অডিও ট্র্যাকে মিনুর চিৎকার এত পরে এলো কেন ভাই। মিনুর মতো চরম ডাকাবুকো এক মেয়ে, সারা রাত আর পুরো সকাল ধরে যে ঘোল খাইয়ে দিয়ে এলো বাপের বাড়ির একগাদা লোককে, তাকে ভর দুপুরে নিরালা পথে দুটো লোক টেনে ধরে রেপ করতে নিয়ে চলে গেল সোজা, আর ডিরেক্টরের ইন্সট্রাকশন না পাওয়া অবধি মুখ টিপে সে চুপ করে বসে থাকল নাকি?

এরপর যেটা দেখতে পেলাম, সেটা দেখে তো আরও ভোঁ-ভোঁ করতে লাগল মাথা। রেপের পর অল্প কিছু শুশ্রূষা হওয়ার পরেই দেখলাম ফিট হয়ে গেল মিনু!

আসুন রেপের ঠিক পরের দিন এবার। শরীর থেকে রেপের ‘গন্ধগি’ ধুয়ে ফেলতে মিনু নেমে পড়লো রাস্তার ধারে দীঘির মধ্যে নাইতে। সঙ্গে বিন্দি আর ছোটুও নামল। এরপর সেখানে স্নানের যে সব শট দ্যাখান শুরু হল, সেটা দেখে মনে হচ্ছিল ডিরেক্টর সাবান কিংবা শ্যাম্পুর অ্যাড শুট করছেন নাকি কোন।

যেভাবে স্লোমোশনে ধরা হচ্ছিল মাথা ঘুরিয়ে নায়িকার চুল ধোয়ার মোমেন্ট, নায়িকার এই স্টাইলের ঠমক-গমক তো জেনারেলি অ্যাড শুটিংয়েই দেখি! আর ডিরেক্টরের সেন্স অফ কনটিন্যুইটি দেখে মনে হল বলিহারি যাই ভায়া। আগের রেপ সিনে টানা-হ্যাঁচড়া যে বিস্তর ছিল, সেটা বোঝানোর জন্যেই এখানে বোধহয় হিরোইনের হাতের ব্লাউজ তিনি ছিঁড়ে রেখেছেন একটু!

শুধু এইটুকু না, এরপর মেয়েটাকে দেখবেন কখনও দোলনায় দোল খাচ্ছে মনের সুখে, কখনও ক্ষেতের মধ্যে কাগতাড়ুয়ার হাঁড়ি মাথায় নিয়ে নাচছে বিন্দির সঙ্গে। কখনও জলে ফুঁ দিয়ে বুদবুদ তৈরি করছে, কখনও আবার বিন্দির সঙ্গে স্কিপিং খেলছে চুটিয়ে। সঙ্গে আবার গান চলছে ‘মন-সুমারি আদরে, জ্বলছে মাহ ভাদরে / মিঠি মিঠি মাহি মাহি’ বলে। কষ্ট করে সিনেমা দেখতে যেতে না চাইলে ইউটিউবে দেখে নিতে পারেন এই পোস্ট-রেপ গানের সিকোয়েন্স।

কে বলবে, গত কাল এই মেয়েটাই ছটফট করছিল নিজের আশিক গোবিন্দের কাছে পৌছনোর জন্য আর কাঁচুমাচু মুখে এরকম একটা ডায়ালগও তখন দিয়েছিল যে, ‘সে আমাকে ছাড়া বাঁচবে না, আজ যদি না যেতে পারি, সে গলায় দড়ি দেবে বলেছে।’

সবে গতকাল রেপড হয়েছে, এরকম একটা মেয়ে যে এত খুশিতে এরকম আহ্লাদ করে বেড়াতে পারে, এই ছবিটা না দেখলে সে সব অজানা রয়ে যেত ভাই! ১৯৯০ সালের ৩০ মে বানতলায় একটা ঘটনা ঘটার পর প্রবীণ এক রাজনীতিবিদ বলেছিলেন যে, ‘এরকম তো কতই হয়’! আজ আঠাশ বছর পর ‘উড়নচণ্ডী’র মিনুর কার্যকলাপ দেখতে দেখতে সত্যি এটা মনে হচ্ছিল যে, রেপ নিয়ে মাথা ঘামানোর তেমন কিছুই নেই, বেশ করেছি রেপ্‌ড হয়েছি, এরকম তো কতই হয়ে থাকে!

আর মিনুর উচ্চারণ-টুচ্চারণ তো শুনে মনে হচ্ছিল যে, মেয়েটা বাংলা-ঝাড়খণ্ড বর্ডারে থাকে, নাকি গড়িয়াহাটের কেউ। চোখ বন্ধ করে ভয়েস শুনে দেখবেন যে, মনে হচ্ছে কম বয়সের অপর্ণা সেন বা কঙ্কনা এসে কথা বলছে যেন!

ছবিটা যত এগোচ্ছিল, তত খালি মনে হচ্ছিল, অন স্ক্রিন যা দ্যাখান হবে, সেগুলো নিয়ে তলিয়ে তলিয়ে ভাবা-বোঝার ইচ্ছে কিংবা সময় বোধহয় ছিল না নির্মাতাদের কারুর। যা হোক একটা ঝটাপটি করে লিখে নিয়ে ভাই শুট করতে বেরিয়ে পড় জাস্ট!

শুধু স্ক্রিপ্টটাই যে বেহেড বেখেয়ালি, সেটা কিন্তু নয়। একেক সময় তো মাথা মুণ্ডু খুঁজে পাচ্ছিলাম না এডিটেরওযেমন ধরুন স্টোরির শুরু থেকে তো দেখছি যে, আশিক গোবিন্দের কাছে যাওয়ার জন্য সিটুর গ্রামে গিয়ে পৌঁছতে চায় মিনু। কিন্তু সেই সিটুর থেকে যে ঠিক কত দূরে আছে ও, সেটা স্পষ্ট করে বলা হয় নি কোথাও। আক্কেল দেখুন, ডায়ালগে কোথাও বলা না হলেও, কোন আক্কেলে এডিটর একবার এমন একটা শট ছবিতে পুরে দিলেন যেখানে এটা মাইলফলকে দ্যাখা গেল যে সিটুর মোটে ১২ কিলোমিটার বাকি! এখন এই শট দ্যাখানর পরেও যখন দেখি, সিটুর গিয়ে পৌঁছতে লরির টাইম লাগছে একদিনেরও বেশি, হেঁচকি তখন উঠবে না কেন বলুন!

গল্পে তো দ্যাখান হচ্ছে যে, সবাই পালাচ্ছে তাদের নিজের নিজের খাঁচা-বন্দী জীবন ছেড়ে দূরেমিনুর কেস তো আগেই জানেন, বাকিদেরগুলোও সেম। লরিওয়ালা বরের অত্যাচার সইবে না বলে সেই লরির খালাসিকে সঙ্গে করে পালিয়ে যাচ্ছে বিন্দি, আর ছেলের অত্যাচার সইতে না পেরে পালিয়ে যাচ্ছে সাবিত্রী দিদা (অভিনয়ে চিত্রা সেন)। কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝতে পারছিলাম না যে, নিজেদের চেনা জীবন ছেড়ে বেরিয়ে পড়লে হঠাৎ যে ধাক্কাটা খেতে হয় রিয়্যালিটির কাছে, সেই ধাক্কাটা ছবির কোথাও তেমন ভাবে দ্যাখান হল না কেন? ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে পড়াটা গ্লোরিফায়েড করছ কেন, ভাই? ইমতিয়াজ আলির ‘হাইওয়ে’ (২০১৪) থেকে কোর কনসেপ্ট ঝাড়তে গেলে যে আরও ঢের বেশি দম লাগবে গো, স্যর!

এখানে আপনি কী দেখবেন শুনুন। লরি চুরি করে আনার মতো গণ্ডগোলের কেস অবধি সল্‌ভ হয়ে যাচ্ছে মাখনের মতো প্রায়। দিনের পর দিন ধরে পথে পথে কাটাতে গেলে টয়লেট নিয়ে যে প্রবলেম মহিলাদের হয়, সেটা নিয়ে পুরো ছবিতে একটা শব্দ নেই! উলটে পাহাড়ি টিলার খাঁজে রাতভোর কাটাতে গিয়ে পরম সুখে খাবার রেঁধে গান ধরছেন দিদা, যেটা দেখে মনে হবে দল বেঁধে সব ছেলে-বুড়ো মিলে পিকনিকে এল বুঝি!

বাঁধনহীন জীবন দ্যাখানোর নামে এটা কী ধ্যাস্টামি দ্যাখান হল, আমায় বলুন আপনি স্যর!

ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি তো যেই একটু সুযোগ পাচ্ছেন, অমনি ক্যামেরা সটান তুলে দিচ্ছেন ড্রোনে। এখন এতে হচ্ছে কী, পুরুলিয়ার রাস্তাঘাট, নারকেল গাছের সারি, পলাশ ফুলে ছেয়ে থাকা গাছ – এই সব কিছু আকাশচারী ড্রোন থেকে দ্যাখাচ্ছে তো অস্বাভাবিক ভাল, যেন ক্যালেন্ডারের ছবির মতো প্রায়ব্যাস, জীবনের রুক্ষ দিক আর বুঝবেন কী, ওটা দেখেই তো জুড়িয়ে যাচ্ছে চোখ।

পেছনের সিট থেকে একজনকে বলতে শুনলাম, ‘আরিত্তারা – এ যে পুরুলিয়া ট্যুরিজমের অ্যাড হয়ে গ্যাছে গুরু’!

মিলিয়ে নেবেন ছকটা। গ্যাং রেপ হওয়ার পরেই দেখবেন গুঁজে দেওয়া আছে জমজমাট ছৌ নাচের সিন।  আর ছবির ক্লাইম্যাক্স জুড়ে আপনি পাবেন রঙের উৎসব হোলিএকটা সময় মনে হবে, ঘর তো নেহাত ফালতু জায়গা, যত সুখ সব বুঝি ঘরের বাইরে রাস্তা-ঘাটেই আছে!

অথচ একটু যদি মাথা খাটিয়ে ভাবতে যান, দেখবেন গণ্ডা গণ্ডা বিষয়ের মানে-টানে নেই কিছুবিশাল পুরুলিয়ার মধ্যে থেকে আড়াই দিনের মধ্যে নিজের পালিয়ে যাওয়া বৌয়ের সামনে এসে পড়ল সেই লরিওয়ালা বর? সস্তার দিশি মদ খেয়ে রাতের আসরে যেই নাচতে নামলো বিন্দি, অমনি ইলেকট্রিকের আলো নিভে গিয়ে সভা ভরে উঠলো আগুনের আলো দিয়ে? গ্রামের লোকজন মিলে সবে-চেনা একটা লোকের জন্যে মশাল হাতে মিছিল করে আটকে দিচ্ছে পুলিশের জিপ গাড়ি? ছবির ফ্রেম হিসেবে এগুলো হয়তো দেখতে ভাল লাগেকিন্তু ভেবে বলুন, এগুলোর কি আদৌ কোন ফিজিবিলিটি আছে?

আর যে রোলটাতে হেলা-ফেলার এক্সট্রা নিলেই হত, সেই পুঁচকে এইটুকুনি রোলে নাটকের পরিচালক-কাম-অভিনেতা কৌশিক করকে হঠাৎ কাস্ট করা হল কেন, সেটা তো আমার কাছে এক মহা-রহস্যের মতো।

এবার শুনুন পুরো গল্পের সবচেয়ে বড় গণ্ডগোলের কথাযে চারটে মানুষকে নিয়ে ছবির গল্প, ভাবতে পারেন, তাদের কাছে এই আজকের দিনেও কোন মোবাইল ফোন নেই! অবশ্য মোবাইল আর আসবে কী করে, ওদের হাতে মোবাইল দিলে গল্পের এই ফ্রেম যে তুবড়ে যাবে দ্রুত!

ছবির প্রাপ্তি বলতে শুধু একটা জিনিষ – সুদীপ্তার অভিনয়। কিন্তু সতের-আঠার বছর আগে জাতীয় পুরস্কার জিতে বসে আছে যে মেয়ে, এতদিন পর তাঁকে নিয়ে আমি এক্সট্রা কী লিখি, বলুন?

সংসদ বাংলা অভিধান স্পষ্ট বলছে ‘উড়নচণ্ডী’ শব্দের মানে অপব্যয়ী, অমিতব্যয়ী নারী। এই ছবিতে চরিত্ররা তো আদৌ কেউ অপব্যয়ী বা অমিতব্যয়ী নয়! তবু কেন এই ছবিটার এমন ধারা নাম? নাকি ছবির নামকরণ করতে গিয়ে ডিকশনারি উলটে দ্যাখার টাইম পান নি কেউ?

ইন্টারভিউতে পড়লাম, পরিচালক বলছেন যে, ওঁর ফার্স্ট প্রায়োরিটি নাকি ছিল প্রযোজক মানে বুম্বাদাকে হ্যাপি করে দেওয়া। আর অডিয়েন্স তার পর

এখানে ছোট্ট একটা সাজেশন দিই ভাই? যদি পরের ছবি তৈরি করার সুযোগ পান তো, ফার্স্ট প্রায়োরিটি অডিয়েন্সকে রাখবেন একটু প্লিজ। আর স্ক্রিপ্ট লেখার সময় কাণ্ডজ্ঞানের স্যুইচখানাও অন রাখবেন যেন।

ভাল ছবি মানে তো শুধু ঝাঁ-চকচকে ছবিই নয়, ভেতরে ভেতরে অনেস্টিটাও চাই। পরের বার সেই অভাবটা পূরণ হয় যেন।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.