‘উত্তমকুমারের মহালয়া’ : সত্যিই কতটা খারাপ হয়েছিল? (সঙ্গে অনুষ্ঠানের অডিও লিঙ্ক)

“আরে ছ্যা ছ্যা, ঐ কী একটা মহালয়ার অনুষ্ঠান! জঘন্য, লুডিক্রাস!” পাড়ার জ্ঞানী কাকু চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে বলে উঠলেন, “কোথায় বীরেন ভদ্র আর কোথায় উত্তমকুমার! ফিলিম-স্টার দিয়ে কি আর একটা ইয়ে, যাকে বলে, পবিত্রতার ভাব ফোটে!”

ষষ্ঠীর সকাল। পুজোর গন্ধ ম ম করছে আকাশে বাতাসে। ভোরবেলা আচমকাই রেডিওটা খুলে আপনি, এই প্রথমবার, শুনে ফেলেছেন ছিয়াত্তর সালের রেকর্ড-হওয়া সেই বিতর্কিত মহালয়ার রেডিও-প্রোগ্রাম— ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীং’। অধিকাংশ বাঙালির মতোই আপনার জানা ছিল না, ষষ্ঠীর ভোরে রেডিওতে এটা প্রতি বছর বাজে। সকালে চায়ের দোকানে বসে আপনি যেই সোৎসাহে প্রসঙ্গটা তুলেছেন, পোড়-খাওয়া পক্বকেশ কাকুটি একেবারে মাছি-তাড়ানোর মতো উড়িয়ে দিলেন। সঙ্গে বিদগ্ধ টিপ্পনি যোগ করলেন, “আসলে, তোমাদের জানার কথা নয়, নতুন প্রোগ্রামটার একটা গুপ্ত উদ্দেশ্য ছিল। এমার্জেন্সির হাওয়া, দেশজোড়া ধিক্কার, তার মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীকে মা দুর্গা বলে প্রোজেক্ট করার একটা প্ল্যান নিয়েছিলেন কর্তারা। কংগ্রেসের এই ব্লু-প্রিন্টে হাত মিলিয়েছিল তখনকার কট্টর জাতীয়তাবাদী আরএসএস। স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন ধ্যানেশ নারায়ণ চক্রবর্তী— তিনি তো এবিভিপি’র লিডার!”

বাপ রে! এসব কী! আপনি একটু বোমকে গেলেন। আমতা-আমতা করে বললেন, “ইয়ে… স্ক্রিপ্টটা তো আমার শুনতে বেশ লাগল! একটু অন্য অ্যাঙ্গেলে লেখা… অজ্ঞানতা সরিয়ে জ্ঞানের উদয়, মোহের অন্ধকার ছিঁড়ে মানব-চেতনার উন্মেষ, এইরকম রূপকের সঙ্গে অসুরনাশিনী দেবীকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে মনে হল। ইন্দিরা গান্ধীর কথা তো মনেই আসেনি! আর হ্যাঁ, কয়েকটা গানে দেবী আর দেশ মিশে গেছে। দেশের শত্রুই যেন অসুর, এইরকম…”

কাকুর মুখে ঘাঘু হাসি। —“বুঝলে না? চার বছর আগের বাংলাদেশ ওয়ার! ওইখানেই তো ইন্দিরা দুর্গা হয়ে গেছলেন। বাজপেয়ীর স্পীচ মনে নেই? সাধে কি বলছি কংগ্রেস-আরএসএস’এর মিলিত প্ল্যান?”

আপনি এই অকাট্য যুক্তিজালে হাঁসফাঁস করছেন, কাকু ততক্ষণে গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করেছেন, “আকাশবাণীর কর্তারা এই চক্রান্তে সামিল হয়ে, পঙ্কজ মল্লিক আর বীরেন ভদ্র দুজনকেই হঠিয়ে দেন রেডিও থেকে। জুন মাসে পঙ্কজবাবুকে চিঠি ধরিয়ে দিয়ে সঙ্গীত-শিক্ষার আসরটা বন্ধ করে দেওয়া হল আচমকা, আর সেপ্টেম্বরেই বীরেন ভদ্রর বদলে উত্তমকুমার! বীরেনবাবুর কাছ থেকে চেপে রেখেছিল পুরো ব্যাপারটা, কী শকিং ভাবো তো!”

এত ইতিহাস আপনি জানতেন না। বললেন, “আমি শুনেছি সে-সময় কাগজেপত্রে নাকি লেখালিখি হত যে, এই একই প্রোগ্রাম প্রতি বছর, একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে… সেই জন্যেই নতুন কাউকে দিয়ে করার কথা ভাবা হয়। তা, জনপ্রিয়তার বিচারে উত্তম-হেমন্তর চেয়ে বেটার সাকসেস-কম্বিনেশন আর ছিল কি, সে সময়?”

“হ্যাঁ, তা অবিশ্যি, একটা সময় আলোচনা হত পেপারে। কিন্তু তা বলে ফিলিম-স্টার দিয়ে মহালয়ার প্রোগ্রাম!” কাকু নাক কুঁচকে ফেলেন, “উত্তমের বাস্তববোধ কাজ করলে তিনি নিজের পায়ে এই কুড়ুলটা মারতেন না। কংগ্রেসি-মাইন্ডেড ছিলেন তো, পলিটিক্সের প্যাঁচে ফেঁসে গেলেন। পরে বেগতিক দেখে অবিশ্যি ক্ষমাটমা অবধি চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, পুজোর ঘর ভেঙে ড্রয়িংরুম করা ঠিক হয়নি… না কি ওই রকমই কিছু একটা!”

“আর, হেমন্ত? তিনিও কি যোগ্য ছিলেন না এইরকম একটা অনুষ্ঠানের সুরারোপের জন্যে? অত বহুমুখী প্রতিভাধর কম্পোজার!”

কাকু নড়ে বসলেন। “হেমন্ত ডেফিনিটলি যোগ্য। কিন্তু এই কাজটা জমাতে পারলেন না। একটা জিনিস ভেবে দ্যাখো, ঝপ করে সুর দিতে চলে এলেন, তাঁর একসময়ের আইডল পঙ্কজ মল্লিকের ওপর যে-অবিচারটা হল সে-কথা ভাবলেন না একবারও! …আসলে কী জানো তো? হেমন্ত অনেক বছর ঐ ‘জাগো তুমি জাগো’ গাইতেন লাইভ প্রোগ্রামে। পঙ্কজবাবুকে মিউজিক-ডিরেকশনে অ্যাসিস্টও করতেন। পাকাপাকি রেকর্ড করে নেওয়ার সময় তাঁকে বাদ দিয়ে ঐ-যে বাণীকুমার দ্বিজেনকে দিয়ে গাইয়ে অমর করিয়ে নিয়েছিলেন গানটা, জাস্ট রিহার্সাল নিয়ে একটা ইগোর লড়াইয়ের কারণে— পঙ্কজবাবুও কিছু বললেন না— বোধহয় সেই ঘা’টা ছিল হেমন্তর মনে, কে বলতে পারে!”

আপনি একটু মাথা চুলকে বললেন, “তা ঠিক, সিনিয়র শিল্পীদের অমন হুট করে খারিজ না-করে তাঁদের পরামর্শ নিয়ে কাজটা করাই যেত। ভাল দেখাত সেটা। কিন্তু, কাকু, প্রোগ্রামটা কি সত্যিই অতটা খারাপ হয়েছিল, যতটা বলা হয়? মানে, আপনার মতো পুরোনো লোকজন যতটা নিন্দেমন্দ করেন… আমার তো শুনে ততখানি খারাপ লাগল না…”

“আরে দূর দূর! তোমরা সেই ইমোশনের কী বুঝবে ছেলেছোকরার দল! রেডিও-অফিসে সকাল থেকে এত নিন্দের ফোন এসেছিল, টানা দু’মাস ধরে নিন্দের চিঠির পাহাড়! কর্তারা মুখ লুকোনোর পথ পাননি। এত লোক, তাদের মধ্যে ইন্টেলেকচুয়ালরাও— সক্কলে খেপে বোম হয়ে গেছল এমনি এমনি? এক্কেবারে থার্ড-ক্লাস অনুষ্ঠান! উত্তমকুমারের তখন জিভ মোটা হয়ে গেছে, শব্দ জড়িয়ে যাচ্ছে, ভুল উচ্চারণ করছেন একের পর এক! গোবিন্দগোপাল কী-এক হাস্যকর টান মেরে কেটে-কেটে সংস্কৃত বলছেন! লোকে শুনছে আর মুখ বেঁকাচ্ছে, তাদের কানে বীরেন ভদ্র বসে আছে কত বছর ধরে, ওই দুর্ধর্ষ চণ্ডীপাঠ, ওই ভয়েস, ওই ইমোশন— হায় হায় করছে সবাই, কী ফেলে কী নিয়ে এল আকাশবাণী! উত্তমকুমারকে সামনে রেখেই অনুষ্ঠানটা প্রোজেক্ট করা হয়েছিল, তবু বাঙালি নেয়নি। ভাবো তবে, কতখানি খারাপ হলে এই বঙ্গদেশে উত্তম-ম্যাজিকও ফেল হয়, সেই সেভেন্টিজ্‌-এ!”

“কিন্তু কাকু, উত্তমকুমার তো একা ছিলেন না ভাষ্যপাঠে! বসন্ত চৌধুরী ছিলেন, অমন অভিজাত গলা। পার্থ ঘোষ-গৌরী ঘোষ ছিলেন, তাঁদের বাচিক শিল্প নিয়ে তো কথাই উঠবে না। দক্ষ পাঠিকা ছন্দা সেন ছিলেন। সংস্কৃত স্তোত্রে গোবিন্দগোপালকে যদিও বা ভাল না-লাগে, তাঁর সঙ্গে ছিলেন মাধুরী মুখোপাধ্যায়, তখনকার দিনের নামী স্তোত্রগায়িকা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নিজেও গেয়েছেন সংস্কৃত শ্লোক ক’জায়গায়, কী সুন্দর!”

কাকু চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “লোকে তো পার্থ-ঘোষ আর মাধুরী মুখুজ্যের নামে ভোরবেলা এলার্ম দিয়ে রেডিও শুনতে বসেনি খোকা! বীরেন ভদ্রের বদলে ‘উত্তমকুমারের মহালয়া’ শুনতে বসেছে, ব্যস! উত্তম ফ্লপ তো প্রোগ্রাম ফ্লপ, বসন্ত কী ভাষ্য বললেন আর হেমন্ত ক’খানা কী শ্লোক পড়লেন সে আর কে পাত্তা দেয়! আর, ভাষ্যই বা কী শুনবে! ধ্যানেশবাবুর ওটা একটা স্ক্রিপ্ট হয়েছে? পাণ্ডিত্য ফলানোর দিকেই যেন জোর বেশি! দাঁতভাঙ্গা থান-ইট সংস্কৃতে ঠাসা, ভার্বের ইউজগুলো কেমন বেখাপ্পা-মতো, মাঝখানে আখাম্বা শ্লোক ঢুকিয়ে দিচ্ছে গোটা-গোটা! বাণীকুমারের গ্রন্থনায় বীরেন ভদ্র একাই কেমন একটা টানা গল্পের মতো বলতেন, মধু-কৈটভের কাহিনি থেকে মহিষাসুরের অত্যাচার, দুর্গার উৎপত্তি, যুদ্ধ, শেষে অসুর-নিধন… তার পর ওই উদাত্ত চণ্ডীপাঠ, কেঁদে ফেলতেন মাঝখানে! ভোরবেলা শুনে গায়ে কাঁটা দিত। আর এখানে কেমন খাপছাড়া, চার-পাঁচজন মিলে বলছে তবু একটুও ছবি ফোটে না। ”

আপনি তবু যুক্তি দেখাচ্ছেন, “আহা, স্টোরি-এলিমেন্ট তো সেই একই, সেটাকে একটু আলাদা ঢঙে রিপ্রেসেন্ট না করলে তখন তো আবার লোকে বলত, এ আর নতুন কী হল, এ তো সেই পুরোনো থেকে টোকা! এগোলেও দোষ, পিছোলেও দোষ। আমার কিন্তু স্ক্রিপ্ট ভালই লেগেছে। ‘যা দেবী’ বলে চণ্ডীপাঠের সুরটিও কেমন নতুন-স্টাইলে, মিঠে গানের মতো! এত নিন্দে করার মতো কিছু নয়। আসলে বাঙালি যতই মুখে বলুক, নতুনকে মানতে তার বরাবর মেন্টাল ব্লক কাজ করে।”

“মোটেই না হে। উল্টোটা ভাবো। একটা কিংবদন্তী জিনিসকে রিপ্লেস করতে যাচ্ছ, লোকে দেঁড়েমুষে হিসেব-কষে বুঝে নেবে না? হিরের বদলে কাচ ধরিয়ে পার পেয়ে যাবে, অত সহজ?”

আপনি এবার উঠবেন। তার আগে প্রশ্নটা না করে পারলেন না, “কিন্তু গানগুলো…? সেগুলোতে তো একদম সেরা-সেরা গাইয়েরা ছিলেন! পুরোনো অনুষ্ঠানের অধিকাংশ স্টার, যেমন শ্যামল মানবেন্দ্র দ্বিজেন তরুণ সন্ধ্যা প্রতিমা আরতি প্রমুখ তো রয়েইছেন, তার সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন মান্না লতা আশা অনুপ নির্মলা বনশ্রী পিন্টু… আর হেমন্ত স্বয়ং! সুরও তো ভালই দিয়েছেন। এমন স্টারকাস্টও পছন্দ হল না লোকের! এটা বেশ অবিচার!”

কাকু ভাঁড়টা ছুঁড়ে দিলেন পিচরাস্তায়। ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসলেন, “আচ্ছা, দ্বিজেন নতুন প্রোগ্রামে যে-গানটা গেয়েছিলেন সেটার লিরিক বলতে পারবে কেউ? হেঃ! ‘জাগো তুমি জাগো’ গানটা কিন্তু ট্রেনের ভিখিরিরাও জানে। সুপ্রীতি ঘোষের ‘আলোর বেণু’, মানবের ‘তব অচিন্ত্য’, সন্ধ্যার ‘বিমানে বিমানে’, তরুণের ‘হে চিন্ময়ী’, শ্যামলের ‘শুভ্র শঙ্খরবে’— এগুলো লিজেন্ড হয়ে গেছে হে। এসব গান পুজোর পরিবেশ সেট করে দেয়। নতুন প্রোগ্রামে আর্টিস্টদের গলায় কী-কী গান আছে তাঁরা বোধহয় নিজেরাই ক’বছর পর মনে রাখতে পারেননি। গানের লিরিক এক্কেবারে মনে বসার মতো নয়! কোথায় বাণীকুমারের বৈদগ্ধ্য, আর কোথায় রম্যগীতি-লিখিয়ে শ্যামল গুপ্ত!”

“আর, হেমন্তর সঙ্গীত-পরিচালনা?”

“সত্যি বলি ভায়া”, কাকু একটু কেশে নিলেন, “হেমন্তবাবুও কিন্তু সুরগুলো করেছেন একটা হাফ-রবীন্দ্র হাফ-মডার্ন সঙের স্টাইলে, ওই সলেম্‌ অ্যান্ড স্যাক্রেড ব্যাপারটাই আনতে পারেননি পঙ্কজ মল্লিকের মতো! পঙ্কজবাবুর সুর— শুধু পঙ্কজবাবুর নয়, আরও কয়েকজন ওস্তাদের কন্ট্রিবিউশন ছিল— ওগুলো কী অপূর্ব রাগাশ্রিত, ভাবো! সেই শেষ রাত থেকে ঝলমলে সকাল পর্যন্ত মিলিয়ে মিলিয়ে মালকোষ-ললিত-ভৈরবী-তোড়ি লাগিয়ে গেছেন। হেমন্তর সুর অনেক লাইট, সে তুলনায়। আরেকটা জিনিস খেয়াল কোরো। পঙ্কজবাবু কিন্তু বেশিরভাগ সোলো গান সোলো-ই রেখেছিলেন, কোরাস যখন হবে ফুল কোরাস। হেমন্ত এখানে প্রায় সব গানেই দুজন বা তিনজন করে ঢুকিয়ে রেখেছেন। মেল প্লাস ফিমেল। তাতে কী ক্ষতি হয় বলো তো? একক-গায়কের যে একটা ‘ক্যারেকটার’ বলে জিনিস থাকে, যা গানকে খোলতাই করে, যেটা পুরোনো অনুষ্ঠানটার সল্ট, এখানে সেটা মার খেয়ে গেছে। লোকের মনে বসেইনি গান!”

“মনে যে বসেনি সেটার দায় কিন্তু গায়ক-সুরকার-গীতিকার কারোরই নয়, কাকু। একটিবার মাত্র শুনিয়েই বাতিল করে দেওয়া হল যে! গান কি আর বারবার না-শুনলে কানে বসে? পুরোনো গানগুলো আপনি রেডিওতেই শুনেছেন অর্ধশতাব্দী ধরে, তা-ছাড়া নিজের ইচ্ছেমতো রেকর্ড-ক্যাসেট-সিডিতেও অজস্রবার। নতুন অনুষ্ঠানের গানগুলোও ওইরকম একটানা বছরের পর বছর শুনলে হয়তো…”

কাকু ফের হাত নাড়লেন, “না হে, না। পেতল কি বারবার ঘষলেই সোনা হয়ে যায়? ব্যাপারটা বোঝো। বীরেনবাবুরা গঙ্গাস্নান করে গরদ পরে ধূপ জ্বালিয়ে একসঙ্গে সকলে মিলে রেকর্ড করতেন। তার একটা মেজাজই আলাদা। আর এখানে, একসঙ্গে রেকর্ডই হয়নি। সব আলাদা-আলাদা খাপচে-খাপচে তুলে এনে মিক্স করা। শুনে দেখবে, পরিষ্কার বোঝা যায়। গানের ঘাড়ে ভাষ্য, ভাষ্যের ঘাড়ে চণ্ডীপাঠ, চণ্ডীপাঠের ঘাড়ে মিউজিক। একটা হোমোজেনিয়াস মুডই নেই!”

আপনি আর তর্ক বাড়ালেন না। বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গেল। কাকুর সঙ্গে তর্কে পারা মুশকিল, কাকুর ফান্ডা বিপুল, লজিকও ততোধিক নিশ্ছিদ্র।

গভীর রাতে আপনি স্মার্টফোনে ইউটিউব খুলে হেডফোন কানে লাগালেন। আরেকবার শুনতে ইচ্ছে করছে পুরো প্রোগ্রামটা।

বিজ্ঞ কাকু যেভাবেই পেঁচিয়ে দেখান না কেন, অত রাজনৈতিক প্যাঁচপয়জার আপনি কিচ্ছু খুঁজে পান না অনুষ্ঠানটার মধ্যে। ইন্দিরা আরএসএস কংগ্রেস এমার্জেন্সি কিছুই ধরা পড়ে না। আপনার শুধু মনে হয়, অনেক দুর্বল জায়গা আছে, তবুও কিন্তু…! চার দশক আগে বাংলার শ্রেষ্ঠ কয়েকজন পারফর্মার একসঙ্গে একটা দুঃসাহসিক কাজে হাত দিয়েছিলেন। বলা যায়, একটা পাহাড় টপকানোর চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। চেষ্টা করেছিলেন, পারেননি। এই হল আসল কথা।

‘দেবীং দুর্গতিহারিণীং’ আসলে একটা পরাজিত অ্যাডভেঞ্চারের নাম। কথাটা ভেবে আপনার বুকের মধ্যে কেমন একটা ব্যথা ওঠে। আপনি ভাবতে চেষ্টা করেন, কেমন দুঃখী মুখে, বিষণ্ণ মনে, হেরোর মতো বিশ্বসংসারের দুয়ো শুনতে-শুনতে সেই ছিয়াত্তর সালের তেইশে সেপ্টেম্বর তারিখটা কাটিয়েছিলেন কুশীলবরা! উত্তমকুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়! গোবিন্দগোপাল, পার্থ-গৌরী, বসন্ত চৌধুরী… আরও সব প্রতিভাধর গায়ক-বাদকের দল! কিংবা লেখক-গীতিকার! এতদিনের ভাবনা-শ্রম-স্বপ্ন একটামাত্র সকালে যখন ধুলোয় মিশে যায়…

পাহাড় কি সবাই টপকাতে পারে? ওঁরাও পারেননি। তবু, এতদিন পর খোলা-মনে, নিরপেক্ষভাবে শুনতে শুনতে আপনার মনে হয়, হ্যাঁ, আগেরটির মতো হয়নি নিশ্চিত— কিন্তু চেষ্টাটি বড় ভাল ছিল, সৎও। অন্তত আজকের এই অশিক্ষা-চালাকি-লঘুতার নৈরাজ্যে দাঁড়িয়ে তো স্বর্গীয় মনে হয়! মন্দ্রকণ্ঠে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সুরেলা স্তোত্র গাইছেন, মাধুরী মুখোপাধ্যায় তাঁর শিক্ষিত গলাটি মেলাচ্ছেন। কানে হেডফোনটি গুঁজে আপনি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন, কোথায় যে খারাপ আছে কিছু, ধরতেই পারছেন না। কী মোহাচ্ছন্ন লাগছে যখন প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কিন্নরীকণ্ঠে অনুষ্ঠানের প্রথম গানটি ধরেছেন, ‘আলোকের মঞ্জীরে উঠিল রণি’/ তব চরণধ্বনি, জননী!’ ওই মানবেন্দ্র গাইছেন, ‘সুধাতরঙ্গিনী, হে লীলারঙ্গিনী,/ কখন থাকো কী-যে রঙ্গে মা’— আপনার চোখে জল আসছে। ‘নমো বরবর্ণিনী, বহু-রূপ-নামিনী…’, দুর্লভ গানটি মান্না দে’র গলায় শুনে আপনি স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছেন। শেষলগ্নে শান্তিবারির মতো হেমন্তর নিজের গলায় ‘তোমারি করুণাধারা ঝরাল শান্তিসুধা,/ ভরিল ভুবন-মন হরষে’ শুনতে শুনতে আপনার ঘাড় দুলছে তালে-তালে। আর, আপনার চেতনা চকিত হয়ে উঠছে যখন লতা মঙ্গেশকর গেয়ে উঠছেন, ‘তুমি বিশ্বমাতা/ ব্রহ্মময়ী মা তুমি,/ জঠরধারিনী,/ আমার জন্মভূমি’— দেবী, গর্ভধারিনী আর দেশমাতৃকা একাকার-করা এক নতুন অভিমুখ!

আপনি টের পাচ্ছেন, আপনার কানে দিব্যি বসে যাচ্ছে সুর। হ্যাঁ, আবার শুনতে ইচ্ছে করছে, আবার। বাঙালি শুনতে চায়নি, ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। এতটা অসম্মান প্রাপ্য ছিল, সত্যিই? কয়েকজন প্রতিভাবান মানুষ মিলে একটা আন্তরিক প্রয়াস তো করেছিলেন নতুন কোনও-একটা পথ খুঁড়ে বের করার, সেই চেষ্টার সম্মানটুকু বাঙালি দেয়নি।

আজ, বিয়াল্লিশ বছর পর, যখন তাঁদের অধিকাংশই মৃত বা মৃতপ্রায়— তাঁদের শ্রমের মূল্য-না-পাওয়া সেই গীতি-আলেখ্য শুনতে শুনতে এক অদ্ভুত মায়া আপনাকে ঘিরে ধরে। পরাজিত, পরিত্যক্ত, অবহেলিত, নিন্দিত উদ্যোগটিই আজ বুঝি বড় ভাল লাগে আপনার, সব ভুল-ভ্রান্তি-খামতি সমেত একটি সাহসের ইতিবৃত্ত। কে বলতে পারে, পঞ্চাশ বছর টানা পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এইটিও হয়তো মিথ হয়ে যেত!

চায়ের দোকানের প্রাজ্ঞ কাকু শুনলে হাসবেন হয়তো। আপনার সরল মুগ্ধতাকে ফালা-ফালা করে দেবে তাঁর ধারালো সমালোচনা। তা বেশ। তাঁকে আর না জানালেই হল। ইউটিউব তো আছে, আপনার তৃষ্ণাও। আপনি কানে হেডফোন গুঁজে শুনুন-না যতবার খুশি। কারও সঙ্গে তর্ক করার দরকার নেই। ভালোবাসা নিয়ে তর্ক হয়?

https://www.youtube.com/watch?v=2e4Zxkf_59w

সৌরভ মুখোপাধ্যায়
শূন্য-দশকে উঠে-আসা কথাকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম। জন্ম ১৯৭৩, আশৈশব নিবাস হাওড়ার গ্রামে, পেশায় ইংরাজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক। গত দেড় দশক নিয়মিতভাবে সমস্ত অগ্রণী বাংলা পত্রিকায় গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। পাঠক-প্রশংসিত উপন্যাস ‘ধুলোখেলা’, ‘সংক্রান্তি’ ও ‘প্রথম প্রবাহ’ এবং অনেক জনপ্রিয় ছোটগল্প তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। লিখতে ভালবাসেন ছোটদের জন্যেও, ‘মেঘ-ছেঁড়া রোদ’ তাঁর এক স্মরণীয় কিশোর-উপন্যাস। সাহিত্য ছাড়াও সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রে অনুরাগ প্রবল। ঘোর আলস্যবিলাসী ও আড্ডাপ্রিয়।

5 COMMENTS

  1. লেখক জোর করে পাঠকদের নিমের রস খাওয়াতে চাইলেন,মানছি নিমের রস শরীরের জন্য ভালো কিন্তু সুখাদ্য না। বীরেন্দ্র ভদ্র এর গলায় মহালয়ার চন্ডি পাঠ বাঙালির এক নস্ট্রালজিয়া,যেমনটি শরতের সকালে শিউলি ফুল কুড়ানো,পূজায় ঠাকুর দেখা বাঙালি শৈশব এর এক ভালো লাগা তেমনি বীরেন্দ্র ভদ্রের মহালয়ার চন্ডি পাঠ একে অপরের সমার্থক তার জায়গা বাঙালি কিছুতেই ছাড়তে রাজি না,সে হোক না উত্তম কুমারের উপস্থিতি।

  2. Khub sundar protibedan….42 bachar ager ei anusthan niye anek charcha hoye chilo…desh jurey hoi hoi rob, sanskriti rasatoley gelo…mahalaya niye cheley khela ittadi. Bangali pray kaladibash palan korar upokrom. Kintu nijey utsahito hoye ei anusthan sonar je potikriya ..boltey pari anusthan hishebey safal. Amader durbhagya amra kichu anadikal er pratha..choley aschey seta bad kortey khub kuntha bodh kori…notun ke meney nitey parina…..ei anusthaner durbhagya ..paribarten chinta beshi agey hoye chilo…ajker diney prochar holey mahanayak ke eto apomanito hotey hoto na……notun ke sakalei sagata janato…

  3. Uttamkumar’s & Shri Hemanta Mukhopadhya’s joint effort in which many other scholarly persons participated to make this “Mahalaya” an appropriate & acceptable programme, people of that period just rejected, only because due to lack of their courage to express their inner core of mind which was thoroughly remained confused to understand the positive effect of a collaborative harmonious venture.
    Why don’t you give responsibility for a newer presentation of Mahalaya to new generation so called highly talented composers like Pt. Jayanta Bose, Nachiketa Chakrabarty, Suman, etc.
    শ্রী পীযুসকান্তি সরকার তো গত হয়েছেন ( বেঁচে গেছেন) নইলে সমবেত ভাবে এঁরা পীযুসকান্তির দুয়ারে গিয়ে কড়া নাড়তেও পারতেন হয়তো বা।
    তিনি একজন মহান উপদেষ্টা হতে পারতেন হেমন্তবাবুর অবর্তমানে। 1976 এর পরে এখন তো 2018।প্রায় পঞ্চাশ বছর বাদে এই নতূন প্রজন্ম কে দেবেন নাকি মহালয়ার দায়িত্ব ? Any gurantee that show will be more brilliant than joint venture of Hemantkumar + Uttamkumar !

  4. প্রায় পঞ্চাশ বছর তো কেটে গেছে। পন্ডিতমনস্ক প্রতিভাধর শিল্পীদের তো কম কিছু দেখিনা।
    Pt. Jayanta Bose, Nachiketa, Suman etc.এঁদেরকে try করে দেখবেন নাকি ঐকবার নতূন মহালয়া প্রস্তুত করানোর ব্যাপারে ? Will these new generation performing artistes be able to present MAHALAYA far better than Uttamkumar + Hemanta Mukhopadhyay ?

  5. motei kharap programme noi.asole tokhon to binodon er eto upokoron chilo na.manush er sanskritik bodh o porimito chilo.anekdin er avyyas er poriborton howay sakal e khepe gechilo.ekhon manush er chetona r anek poriborton o prosar hoyeche.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here