কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা কৃষকের, অপরাজিতা স্ত্রী লড়ছেন ভোটে

265

তাঁর স্বামী কীটনাশক খেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। ফসল সেভাবে হয়নি সেবার। ধারদেনায় ডুবে গিয়ে নিজের জীবনকে শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সুধাকর। কিন্তু বৈশালী হার মানেননি। দুই সন্তানের মা ২৮ বছরের বৈশালী এবারের লোকসভায় ভোটে দাঁড়িয়েছেন। মুম্বইয়ের অদূরে যাভাত্মল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তিনি।

আগামী সপ্তাহে জানা যাবে বৈশালী জিততে পারবেন কিনা। কিন্তু হিসেব বলছে মোদীরাই জিতে যাবেন ওই এলাকায় হওয়া পুনর্নিবাচনে। কিন্তু গরিব কৃষক ভোটাররা অনেক হিসেব উল্টেও দিতে পারেন— সেই মতও জোরালো হচ্ছে ক্রমে। এক গরিব স্বামীহীন নারী, যিনি কৃষি-শ্রমিক হিসেবে কাজ করে নিজের পরিবারের ক্ষুন্নিবৃত্তির ব্যবস্থা করেন, তিনি ক্ষমতায় এলে স্বপ্ন দেখাবেন, এমন মত অনেকের।

এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বৈশালী বলেন, ‘‘মোদী বলেছিলেন তিনি সব বদলে দেবেন। কিন্তু তিনি কী আর বদলালেন, কেবল রাস্তা বানানো ছাড়া? আজও বহু আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে চলেছে এই এলাকায়।’’

হেরে গেলেও তিনি দুঃখ পাবেন না, জানিয়ে দিয়ে বৈশালী জানাচ্ছেন, ‘‘আমাকে দেখে যদি মহিলা কৃষিজীবীরা সাহস পান, তাহলেই আমি মনে করব আমি সফল।’’

আজও দেশের পঁচিশ কোটি মানুষ কৃষিজীবী। কিন্তু আজও এই ক্ষেত্রটি ক্রমাগত বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে চলেছে। বীজ ও অন্যান্য সামগ্রীর দাম বাড়ছে। অথচ প্রধান ফসলের দাম এমন রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে কৃষকরা দেনায় ডুবে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

তাছাড়া ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে নোটবন্দির ফলে রাতারাতি পাঁচশো, হাজারের নোট বাতিল হওয়ার ধাক্কাতেও স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুব খারাপ হয়ে যায়। তার প্রভাব এখনও রয়েছে।

বিদর্ভের বাসিন্দা নতুন কৃষক আন্দোলনের নেতা যোগেন্দ্র যাদব জানিয়েছেন, ‘‘মোদীর সাফল্য হল তিনি রোগীদের আইসিইউতে পাঠিয়েছেন।’’ যোগেন্দ্র মহারাষ্ট্রের সেই এলাকায় থাকেন, সেখানে কৃষক আত্মহত্যা প্রায় নিয়মিত ঘটনা। বেশির ভাগ কৃষকরাই অত্যন্ত দরিদ্র। পাঁচ একরের বেশি জমি প্রায় কারওই নেই। এক সময় এখানকার তুলোকে ‘সাদা সোনা’ বলা হত, এমনই দাম ছিল। কিন্তু এখন চাষের খরচ অনেক বেড়ে গিয়েছে।

বিজয় জওয়ান্ধিয়া, যিনি সেই সাতের দশক থেকে কৃষিকাজ করে আসছেন, সেই কৃষিনেতা জানাচ্ছেন, পরিস্থিতির উন্নতি করায় মোদী সরকারের ব্যর্থতায় কৃষিজীবীরা রেগে রয়েছেন। তবে বিপক্ষকেও তাঁরা বিশ্বাস করেন না।

এই পরিস্থিতিতে ভোটে দাঁড়িয়েছেন বৈশালী। আঠেরো বছর বয়সে নিজের জাতের সুধাকরের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। স্বামীর কথা মনে পড়ে বৈশালীর। মানুষটা খেতে ভালোবাসত। মিষ্টি হোক বা নিরামিষ কোনও খাবার— সমান আগ্রহে চেটেপুটে খেতেন তিনি। দারিদ্রেও তাঁরা সুখেই ছিলেন। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের মাসখানেক পরে, বৈশালী যখন বাপের বাড়ি, তখন তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, তাঁর কিছু ভালো লাগছে না। সেই শেষ। আর দেখা হয়নি তাঁদের। এক বিকেলে দিগন্ত বিস্তৃত ক্ষেতের ভিতর দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন সুধাকর। কীটনাশক হাতে। ফিরেছিলেন মৃতদেহ হয়ে।

সেই বছরটা, ২০১১ সালে ১৪ হাজার কৃষিজীবী আত্মহত্যা করেছিলেন। সুধাকর ছিলেন তাঁদেরই অন্যতম। পরিস্থিতি আজও বদল‌ায়নি। বরং আরও খারাপ হয়েছে। এবছর এখনও পর্যন্ত সাড়ে বারো হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে সংখ্যাটা! বছর শেষ হতে যে ঢের বাকি!

ভোটের প্রচারে বিরাট ব্যস্ততা ছিল বৈশালীর। একের পর এক জনসভা, লোকের বাড়ি বাড়ি যাওয়া সব করেছেন। তাঁর মা-বাবাও মেয়ের জন্য ঘুরে ঘুরে ভোটের প্রচার করছেন।

কিন্তু জয় পাবেন কি? বৈশালীর স্পষ্ট উত্তর, ‘‘আমি দুই পুরুষ প্রার্থীর ভোট খেয়ে নিয়েছি। আমি ওদের গুঁড়িয়ে দিয়েছি।’’

এখন দেখার, ২৩ মে ফলপ্রকাশের দিন বৈশালীর স্বপ্ন পূরণ হয় কিনা।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.