ব্যালটের বদলে হাততালি আর পাথর‚ ইভিএম-এর জায়গায় বাক্স‚ দুনিয়াজুড়ে আজব নির্বাচন

ভোটের বাজারে ভোট নিয়ে যে ব্যাপক তোড়জোড় চলবে সেটাই স্বাভাবিক। ১২৫ কোটি মানুষের দেশে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ভোটার। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশেই কি ভোটাভুটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি মাতামাতি ? হতে পারে; তবে ঘটনা হল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় নির্বাচন এমনই বিচিত্র যে রীতিমতো অবাক হতে হয়।

ফিরে যাই দু’হাজার বছর আগে। যেখানে গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল। গ্রিসের স্পার্টা শহরে। ওই নগররাষ্ট্রটি পরিচালনা করত এপ্পেল্লা নামে একটা পরিষদ। তিরিশের-এর বেশি বয়সী স্পার্টা নাগরিক এপ্পেল্লার সদস্য হতে পারত। তবে এর জন্য তাকে নির্বাচিত হতে হত। সেই নির্বাচন প্রক্রিয়া ছিল ভারি অদ্ভুত। যে বা যারাই এপ্পেল্লায় সদস্য হতে চাইত তাদের একজন একজন করে জনতার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হত। সেই প্রার্থীকে সমর্থন জানতে জনগণ চিৎকার করত আর হাততালি দিত । ওই আওয়াজ পাশের একটা বন্ধ ঘরে বসে শুনত নির্বাচকরা। শেষ পর্যন্ত যেসব প্রার্থীর কপালে জুটত সবচেয়ে বেশি চিৎকার আর হাততালি, তারাই নির্বাচিত হত এপ্পেল্লার সদস্য হিসেবে ।

এত গেল প্রাচীন নির্বাচন পদ্ধতি। আধুনিক সময়ের কথায় প্রথমেই বলতে হয় আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার কথা। ভোট সাধারণভাবে হয় ব্যালট অথবা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম মারফত। কিন্তু গাম্বিয়ায় প্রচলিত ভোট দেওয়ার পদ্ধতি পুরোপুরি আলাদা। সেখানে ব্যালট হিসেবে কাগজের বদলে ব্যবহৃত হয় পাথর। প্রতিটা ভোটকেন্দ্রে ব্যালট বাক্স বা ইভিএম-এর বদলে থাকে কয়েকটা করে ড্রাম। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক প্রার্থী জন্য বরাদ্দ করা হয় নির্দিষ্ট রঙের ড্রাম। তারপরে সেই ড্রামে সেঁটে দেওয়া হয় প্রার্থীর ছবি ।

ভোটাররা বুঝতে পারে ভোটটা সে কাকে দিচ্ছে। ভোটারের কাজ ভোট-কেন্দ্রে গিয়ে একটা পাথর তুলে তার পছন্দের প্রার্থীর ছবিওয়ালা ড্রামে ফেলে দেওয়া। একটার বেশি পাথর বা ভোট দিতে না পারার জন্যও আছে ব্যবস্থা। ড্রামের ভিতর একটা সাইকেলের ঘণ্টা এমনভাবে থাকে যে প্রত্যেকটা পাথর ভিতরে পড়ার সময় একবার করে শব্দ হয়। বাইরে থাকা পোলিং এজেন্টরা বেল বাজার শব্দ একটার বেশি হলো কিনা সেদিকে খেয়াল রাখে। ভোট শেষে গণনা, একটি ড্রাম থেকে পাথর ঢালা হয় ২০০ বা ৫০০ ঘরের একটা কাঠের ফ্রেমে। সেইগুলি যোগ করে হিসাব করা হয় কোন কেন্দ্রে কতগুলো ভোট পেল একজন প্রার্থী। ভোটের জন্য এরকম বিচিত্র পদ্ধতি ব্যবহারের কারণ মূলত গাম্বিয়ার মানুষের নিরক্ষরতা ।

প্রথম যখন গাম্বিয়ায় ভোটের ব্যবস্থা চালু হয়েছিল তখন মনে করা হয়েছিল প্রচলিত ব্যালট পেপার-প্রতীক-সিলের ভোটব্যবস্থা চালু করতে গেলে অধিকাংশ মানুষ বুঝবেই না সে কাকে কীভাবে ভোট দিচ্ছে। তবে দেশে শিক্ষার হার বাড়ার সাথে সাথে এইভাবে ভোট নেওয়ার প্রয়োজন ধীরে ধীরে কমে আসছে বলে গাম্বিয়া সরকারও চাইছে আস্তে আস্তে অন্যান্য দেশের মতোই ভোট চালু করতে।

এবার বলছি সবথেকে আশ্চর্যের নির্বাচিত প্রার্থীর কথা । শুনে বিশ্বাস করা কঠিন হলেও এইটাই সত্যি। ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরের সিটি কাউন্সিলে ১৯৫৮ সালে নির্বাচিত হয়েছিলো একটা গণ্ডার । এমন অকল্পনীয় ঘটনা কীভাবে ঘটল ? সেইসময় শহর সাও পাওলোর নাগরিকরা রাজনীতি করিয়ে মানুষদের দুর্নীতিতে এতটাই বিরক্ত
হয়ে গিয়েছিল যে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় কাকারেকো নামের একটা গণ্ডারকে। নির্বাচন কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিকভাবেই ভোট-প্রার্থী হিসাবে একটি গণ্ডারের মনোনয়ন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। পরে অবশ্য মানুষের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়।

কিন্তু তার থেকেও আশ্চর্যের ঘটনা হল যখন ভোটের ফলাফল বের হল তখন দেখা গেলো কাকারেকো পেয়েছে এক লক্ষেরও বেশি ভোট । শুধু তাই নয় এত সংখ্যক ভোট অন্য কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীর ভাগ্যে জোটেনি । যদিও শেষ পর্যন্ত এই ভোটগুলো বৃথাই গিয়েছে, কারণ ব্রাজিলের আইন অনুসারে কাউন্সিলের সদস্য হতে হলে অবশ্যই কোনও একটা দল থেকে মনোনয়ন পেতে হয় । ভোটে গণ্ডারের প্রার্থী হওয়া এবং জেতার পর অনেকেই অবাক হয়েছিলেন, সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু এবার সেরকমই আরেকটি ঘটনার কথা বলব যেটি আগের চেয়েও অদ্ভুত মনে হতে পারে। ১৯৬৭ সালে এই ঘটনাটি ঘটে ইকুয়েডোরের পিকোয়াজা নামের একটা শহরে। সে বছর ওই শহরের মেয়র নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল পালপাভাপাইস নামের একটি ফুড পাউডার। নির্বাচনের বাজারে পাউডারের বিজ্ঞাপন করতে ওই ফুড
পাউডার কোম্পানি বেশ কিছু চটকদার লাইন বের করেছিল, যার মধ্যে একটা ছিলঃ Vote for any candidate, but if you want well-being and hygiene, vote for Pulvapies । কিন্তু ভোটের ফলাফল যখন প্রকাশিত হল তখনই সেই আশ্চর্য ঘটনাটি ঘটল। দেখা গেল বিজ্ঞাপনের ওই লাইনটাকে শহরের মানুষ এত বেশি করে নিয়ে নিয়েছে যে রাইট-ইন ভোটে জিতে শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছে পালভাপাইস ! যদিও সেই দায়িত্ব সেই কোম্পানি আদৌ নিয়েছিলো কিনা কিংবা ভালো থাকার আর পরিচ্ছন্নতার যে প্রতিশ্রুতি সে দিয়েছিল তা আদৌ রক্ষা করেছিল কিনা সেই তথ্য আজ আর জানার উপায় নেই।

কিম জং উনের দেশ উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দল একটি ব্যালট নির্ধারণ করে । সেই ব্যালটে থাকে একটি মাত্র নাম। সেখানে বিকল্প প্রার্থী বাছাইয়ে কোনও সুযোগ রাখা হয় না। কিন্তু সেই দেশেও নির্বাচন হয়। কিম জং উনের একচ্ছত্র আধিপত্য যেখানে ধার্য সেখানে আবার ভোট কীভাবে সম্ভব ? হ্যাঁ, সম্ভব। তবে পদ্ধতিটি ভিন্ন। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মতো নয়। উত্তর কোরিয়ার এই নির্বাচনকে ভোট ভোট খেলা বলা যেতে পারে। প্রতি পাঁচ বছরে সেখানে একটি নির্বাচনের আয়োজন করা হয়।

২০১৫ সালে শেষবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে ভোটে অংশগ্রহণ করে ৯৯.৭ শতাংশ ভোটার। কিন্তু হাস্যকর হলেও এটা ঘটনা যে, ভোটারদের পছন্দসই প্রার্থী বেছে নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। ভোটাররা শুধু সেই ব্যালটের নির্দিষ্ট ঘরে প্রার্থীর নামের পাশে স্বাক্ষর করে। পাশে আলাদা একটি বাক্স রাখা থাকে। সেখানে ভোটাররা সরকারের বিপক্ষে অর্থাৎ শাসক প্রত্যাখ্যানের মত দিতে পারে। কিন্তু সেটি আর গ্রহণযোগ্য হয় না। অপরদিকে যে বাক্সে রাষ্ট্রপ্রধানের নাম লেখা ব্যালট ফেলা হয় সেটিই গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এতে নির্বাচিত প্রার্থী শতভাগ ভোট পেয়েছেন বলে প্রচার করা হয়। এর অর্থ হল কেউই এখানে শাসককে প্রত্যাখ্যান করেনি। খেলা হলেও এমন ভোট প্রতি পাঁচ বছর অন্তর হয়ে আসছে।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.