বরের পয়সায় মোহিনী শরীরের সঘন-চক্কর

পরিচালক রাজকুমার গুপ্তার (জন্ম ১৯৭৬) প্রথম ছবি ‘আমির’ (২০০৮) দেখিয়েছিল কীভাবে এক সাধারণ আম-নাগরিকও সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের হাতের পুতুল হয়ে উঠে বোমা দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারে যাত্রীভর্তি বাস | পরের ছবি ‘নো ওয়ান কিলড’ (২০১১) ছিল ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক নৃশংস টুকরো কাহিনির মরমী পুনর্নির্মাণ | তা সিনেমার নামে এইরকম বহুস্তরীয় টুকরো রিয়্যালিটি দেখিয়ে দর্শকদের ঘা মারাটাই যাঁর অভ্যেস, তিনি হঠাৎ নিজেকে পাল্টে ফেলে আগাপাস্তলা কমেডি ছবি বানাচ্ছেন, এটা দেখলে একটু খটকা তো লাগবেই | সেই কমেডির মুখ্য অভিনেতাদের একজন আবার হলেন গিয়ে ইমরান হাসমি, যাঁকে ইন্ডাস্ট্রিতে সিরিয়াস অভিনেতা হিসেবে কেউ দেখে না, মোটামুটি বি-গ্রেড মশালা মুভির ‘সিরিয়াল কিসার’ নামেই তিনি খ্যাত | আর তার সঙ্গের জুটি বেঁধে রইলেন আজকের বলিউডের সবচেয়ে দক্ষ অভিনেত্রী বিদ্যা বালন, কেরিয়ারে একের পর এক হিট জাঁকানোটাই যাঁর শেষ কয়েক বছরের অভ্যেস | কেমন জমলো এই দুজনের রসায়ন? ‘দ্য ডার্টি পিকচার’-এ দুজনকে একসঙ্গে যেভাবে পাওয়া গেছিল, তার প্রায় ১৮০ ডিগ্রি উল্টো কোণে এই দুজনকে রেখে ফাইনালি পরিচালক নিজে সবটা সামলাতে পারলেন তো? কমেডি দেখতে আপনার ভালো লাগুক চাই না লাগুক, কিন্তু এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার জন্য আপনার মন হয়তো কৌতূহলী না হয়ে পারবে না |

ছবির গল্পটা ছোট করে এইরকম : যে কোনও লকারের তালা খুলে ফেলার ওস্তাদ কারিগর হলো সঞ্জয় আথরে (ইমরান হাসমি) | বৌ নীতুর (বিদ্যা বালান) নরম-গরম শাসনে দিন কাটাতে কাটাতে একসময় সে ঠিক করে এই চুরিবিদ্যা মাহাবিদ্যার কেরিয়ার ছেড়ে দেবে চিরতরে | পাকাপাকিভাবে অবসর নেওয়ার আগেই অবশ্য তার শরণ নেয় তার জিগরি দুই দোস্ত পন্ডিত ( রাজেশ শর্মা) আর ইদ্রিশ (নমিত দাস) | সঞ্জয় জানতে পারে, গভীর রাতে ব্যাঙ্ক লুঠের পরিকল্পনা করেছে ওরা দুজন, কিন্তু সঞ্জয় সাহায্য না করলে ভল্টের কম্বিনেশন ভেঙে একলপ্তে প্রায় পঁয়ত্রিশ কোটি টাকা এভাবে সাফ করে দেওয়া তাদের কম্মো নয় | পরিকল্পনামতো সবকিছু ঠিকঠাক চলে, লুঠ হওয়া টাকার পুরোটাই রাখা হয় সঞ্জয়ের কাছে, ঠিক হয়, মাসতিনেক পরে, পুলিশের হৈ-চৈ একটু ঠান্ডা হলে টাকাটা সমানভাগে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেবে তিন সাথী | গল্পের আসল মোচড় আসে ঠিক এরপরেই, কারণ হঠাৎ একদুর্ঘটনায় (কী দুর্ঘটনা ভগবান জানে, ছবিতে দেখানো হয়নি) এরপরেই সঞ্জয়ের অ্যানটেরোগ্রেড অ্যামনেসিয়া (পাতি বংলায় য্াঅকে বলে স্মৃতিলোপ) শুরু হয়ে যায় | আর তাই তিন মাস পরে পন্ডিত আর ইদ্র্শ যখন সঞ্জয়ের কাছে টাকার ভাগ চাইতে আসে, তখন সেই টাকার ভাগ দেওয়া তো দূরের কথা, এমন কোনও ব্যাঙ্ক লুঠ আদৌ করেছিল কিনা, সেটাই সঞ্জয় মনে করতে পারে না | মনে করবে কী করে বলুন? নিজের বৌয়ের নামটা কিম্বা নিজের বাড়ির রাস্তাটাই যে তখন তার আর মনে থাকে না |

মুচমুচে মশলাদার ছবি তৈরির জন্য এই স্মৃতিভ্রংশ ব্যাপারটা সিনেমায় এতবার এসেছে যে বলার না | বাংলা সিনেমার সে ‘হারানো সুর’ (১৯৫৭) বলুন কিম্বা হিন্দি সিনেমার ‘হেনা’ (১৯৯১), অমিতাভ বচ্চনের ‘ব্ল্যাক’-ই (২০০৫) বলুন কিম্বা আমির খানের ‘গজিনি’ (২০০৮), সর্বত্রই স্মৃতিলোপ মানেই চূড়ান্ত নাটক আর ফাটাফাটি বক্স অফিস কালেকশন | কমল হাসানের সেই ‘সদমা’ (১৯৮৩) মনে আছে তো? ছবির শেষে শ্রীদেবীর স্মৃতি মুছে যাওয়ার সেই মোক্ষম মোচড়টা যদি মনে পড়ে, তাহলেই বুঝতে পারবেন, কীভাবে একটা ছবির ভাগ্য ফিরিয়ে দিতে পারে অ্যামনেসিয়ার মোচড় | জীবনের শেষ ছবি ‘যব তক হ্যায় জান’-এ (২০১৩) খিদ যশ চোপড়া অব্দি গল্পে চোরাবাঁক আনতে শাহরুখকে রেট্রোগ্রেড অ্যামনেসিয়ার রোগী বানিয়ে ছেড়েছিলেন, মনে পড়ে

মুশকিল হলো, রজকুমার গুপ্তার ‘ঘনচক্কর’-এ ( চতি হিন্দিতে এই শব্দের মানে বোকাস্য বোকা) হিট সিনেমার এইসব সাবেকি মার্কামারা মশলা মজুদ থাকলেও, ছবির মাঝবরাবর পৌছে কোথাও যেন তাল কেটে যায় চিত্রনাট্যের | অ্যামনেসিয়াক সঞ্জয়ের সঙ্গে যখন আপনি নিজেও প্রায় নেমে পড়েছেন পঁয়ত্রিশ কোটি টাকার রহস্য উদ্ধারে, তখন আপনি হঠাৎ টের পাবেন, যে ক্লু-গুলো ধরে সঞ্জয় নিজে এগোতে চায় রহস্য উদ্ধারে, তার সবকটাই ভাটের ক্লু, জাস্ট কোনও কাজের না | আরও বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, সঞ্জয়ের ভূমিকায় ইমরান হাসমিকে দেখে কখনোই মনে হয় না, সে সত্যিই অ্যামনেসিয়ায় ভুগছে, তার ফলে আপনি এটাও পাশাপাশি ভাবতে ভাবতে যান, যে গোটাটাই ওই ইমরান থুড়ি সঞ্জয়ের কোনও চতুর চাল নয় তো? পুরো টাকাটা একা হজম করে ফেলার জন্য? এইসব অতি গুরুতর সমস্যার সমাধান হবে কী করে, সেটা ভেবে ভেবে যখন এরপর আপনি দিশাহারা, সেইসময় আপনাকে চমকে দিয়ে গল্পের একেবারে শেষ পর্বে চলন্ত ট্রেনের কামরায় য্েভাবে একেবারে নতুন এক চরিত্রের আমদানি ঘটে, আর তার গুলিতে টপাটপ মরে যেতে থাকে ( কিম্বা আহত হয়) গল্পের সবকটা মূল চরিত্র, এমনকি গলায় কাঁটা চামচ গেঁথে মারা যায় সেই নতুন চরিত্রটিও, সেসবটা দেখে মনে হয়, রহস্যের সঙ্গে মজা মেশাতে গিয়ে শেষটা কিনা এতটা ছড়ালেন রাজকুমারের মতো পরিচালক? চিত্রনাট্যের এমন করুণ পরিণতি ওঁর আগের দুটো ছবিতে দেখা যায় নি, তাহলে এটার এই হাল হলো কেন?

সেই পঁত্রিশ কোটি টাকার রহস্যভেদ হলো কীভাবে, সেই পযাঁচটা রয়েছে এর আরও পরে, ছবির শেষ আড়াই মিনিটে | না, সেই উত্তর আমি বলে দিচ্ছি না, জানতে হলে নিজে সিনেমাহল-এ গিয়ে দেখে আসুন গে | তবে দোহাই ছবি দেখতে বসে এরকম বেয়াড়া প্রশ্ন যেন করবেন না, যে মোতে একটা স্যুটকেসে ৩৫ কোটি টাকা ঢুকলো কীভাবে ( ১০০০ টাকার নোট হলেও সাড়ে তিন ল্ক্ষ নোট) কিম্বা ব্যাঙ্ক লুঠের সময় সিকিউরিটি চেঞ্জ হয়ে রাত তিনটে পনেরোতে যে নতুন সিকিউরিটি আসার কথা ছিল, সে এলো না কেন, বা এসে থাকলে তকে লুটেরারা কী করে ম্যানেজ করলো | আরে, এইসব খুঁটিনাটি নিয়ে ভবতে বসলে পাগল হয়ে যাবেন দাদা, হিন্দি বই দেখতে বসে এসব কেউ ভাবে?

কিন্তু তার মনে কি এটা নেহাত একটা মামুলি হিন্দি ছবি, না দেখলেও চলে? মোটেও তা নয় কিন্তু | মনে রাখুন, এ ছবি এক ঐতিহাসিক হিন্দি ছবি, কারণ এবারই বিয়ের পরে প্রথমবার স্বামী সিদ্ধার্থ রায় কাপুরের টাকায় তৈরি ছবিতে অভিনয় করলেন বিদ্যা বালন ( বিদ্যা ওঁর তৃতীয় স্ত্রী, আগের দুই স্ত্রীর সঙ্গে সিদ্ধার্থের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে) | প্লিজ মাথায় রাখুন, কোনও বাংলা ছবিতে প্রযোজকের বৌ যদি নায়িকা হন, তাহলে মার-মার-কাট-কাট ব্যাপার হয়ে যায় | শুটিংয়ের সময় সেত-এ কী হয়, সেটা বাদ দিন, ক্যামেরার সামনে কোথাও নায়িকার অঙ্গস্পর্শ করার অনুমতি থাকে না নায়কের বা আর কারুরু (এমন্কি কাহিনির প্রয়োজনে হলেও না) | নামগুলো করে আর বিতর্ক বাড়াচ্ছি না, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবির প্রযোজক-পরিচালক, কিম্বা বাজারি খাস্তা ছবির নির্মাতা, সবার বৌ-ই এই ক্যাটেগরিতে পড়েন | সেইজন্যে বলিউডে ’ঘনচক্কর’ দেখতে যাবার আগে থেকেই আমার কৌতূহল ছিল তুঙ্গে, যখন-তখন স্খলিতবসনা হতে দেখেছি যে বিদ্যাকে, তিনি কি বিয়ের পরে বরের ছবিতে নিজেকে পুরো পল্টে ফেলবেন? ’সিরিয়াল কিসার’ইমরান হাসমি কি পাবে না একটাও কিস করার সুযোগ? ছবি দেখতে বসে চমকে বুঝলাম, আমি ভুল ভুল ভুল! বরের পয়সায় তৈরি ছবি তো কী হয়েছে? আরে দাদা এটা বলিউড! তাই তো ইমরানকে নিয়ে জমিয়ে শয্যাদৃশ্য করেছেন বিদ্যা | ওই দেখুন, বিদ্যার শায়িতা শরীরের ওপের নিজের শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে বিদ্যাকে পিষ্ট করতে করতে তীব্র চুমু খাচ্ছেন ইমরান | এর একটু পরেই ঠিক এর উল্টোটা, মনে ইমরান নিচে, আর তার ওপের চড়ে বসে আগের ঘটনার ’মধুর প্রতিশোধ’ নিচ্ছেন বিদ্যা | কিম্বা ও, পোশাক অনেকটা নেমে আসায় দৃশ্যমান হয়ে রয়েছে সুডৌল বুকদুটো | সেই বুকদুটো আপনার চোখ এড়িয়ে যাওয়ারও কোনও উপায় নেই, কারণ ও, বিদ্যা অমনি কপট ধমক লাগায় তকে, আর এইভাবে ছবিতে রীতিমতো অন্ডারলাইন করে দেওয়া হয় বিদ্যার মোহিনী সুস্তনী শরীরটাকে |

ভালো কমেডি ছবি দেখার জন্য নয়, বরের পয়সায় কীভাবে নিজের শরীরের মুক্ত-উৎসব করলেন বলিউডি বিদ্যা ( আর ঠিক কোথায় বলিউডি কালচারটা এই বাংলার থেকে অনেক আলাদা), সেটা দেখার আর বোঝার জন্য একবার অন্তত ’ঘনচক্কর’ দেখা যেতেই পরে | ৩৫ কোটি টাকার চক্কর কতটা , তবে মোহিনী শরীরের চক্করটা যে বেশ ভালোই ঘন, সেটা তো আপনি ঠিকই জানেন |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here