“…২৩ অগ্রহায়ণ রবিবার আমার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক…”

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৯৮ তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে পুনর্মুদ্রিত হল এই নিবন্ধ—-আজ শেষ পর্ব |

বিদ্যাসাগর ও বিধবা

( প্রথম পর্বের পরে…)

‘ বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না ‘ — এই বিষয়ে একটি পুস্তিকা লিখে বিধবাবিবাহ আন্দোলন শুরু করলেন তরুণ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর |

সেই পুস্তিকা সর্বকালের বেস্টসেলার !
ক‘দিনের মধ্যে ১৫০০০ পুস্তিকা বিক্রি হয়ে গেল |
আজও সেই রেকর্ড আর কোনও বাংলা বই ভাঙতে পেরেছে কি না সন্দেহ | ওই পুস্তিকাটি পড়ে সেই সময়ের কাগজ ‘সমাচার সুধাবর্ষণ‘ লিখল —

               সাজগো বিধবাগণ ফুটিয়াছে ফুল |

               তোমাদের সৌভাগ্যে ঈশ্বর সানুকূল | |

তবে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তর্কে যে বিধবাবিবাহ-বিরোধী সনাতন পণ্ডিতেরা হালে পানি পাবে না‚ সেকথাও বলল ‘সমাচার সুধাবর্ষণ‘ —

               শাস্ত্রীয় প্রমাণ ছাড়া গোঁড়া অবতার |

               চলিতে না পারিবেন বক্র পথে আর | |

               নিবারণ করিবেন কী প্রমাণ দিয়া ?

               টানাটানি পড়িবেক নবদ্বীপ নিয়া | |

বিদ্যাসাগর একদিন শুনলেন‚ কলকাতারই এক ধনীগৃহে পণ্ডিতেরাও উপস্থিত | তাঁকে খুন করার চক্রান্ত চলছে সেখানে | তিনি একা হঠাৎ উপস্থিত সেই ধনীর বৈঠকখানায় | অনেকেই আছেন সেখানে | খুনের মতলব হচ্ছে |

— কী ব্যাপার‚ আপনি এখানে ? বিস্মিত গৃহস্বামী প্রশ্ন করলেন বিদ্যাসাগরকে |

— আপনারা আমাকে খুন করতে চান | তা-ই নিজেই চলে এসেছি | আমাকে আর খুঁজেপেতে খুন করতে হবে না | এখানে এখুনি খুন করুন | বৈঠকখানায় কারও মুখে রা নেই |

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দৃপ্ত পদক্ষেপে বেরিয়ে গেলেন বিদ্যাসাগর | 
পণ্ডিতেরা বলল‚ লোকটার আস্পর্ধা দেখেছো ?

***********

এবার মহাপণ্ডিতদের মুখের ওপর তুরূপের তাস ছুঁড়ে মারলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর !

আপনারা পরাশরের দোহাই দিয়ে হিন্দুবিধবাদের ওপর যুগ যুগ ধরে এই অত্যাচার করছেন কেন ? পরাশর-ই তো বলেছেন …

— কী বলেছেন পরাশর ? হুঙ্কার প্রাচীনপন্থী পণ্ডিতদের  |

বিদ্যাসাগর সিংহের মতো গম্ভীর গলায় বললেন — শুনুন তাহলে পরাশরের উক্তিঃ

‘ নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ | পঞ্চস্বাপৎসু নারীণাং পতিরণ্য বিধীয়তে |‘

— ওগো বিদ্যাসাগর‚ তুমি মানে জানো এই শ্লোকের ?

— আমিই জানি | আপনারা জেনেও জানেন না | ইচ্ছে করে যুগ যুগ ধরে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন | শুনে রাখুন পরাশরের ঠিক অর্থ

—- ‘ স্বামী যদি নিরুদ্দেশ হয়‚ মারা যায়‚ প্রব্রজ্যা বা সন্ন্যাস নেয়‚ ক্লীব বা জরাগ্রস্ত‚ পুরুষত্বহীন বা অক্ষম হয়‚ যদি পতিত হয়‚ তাহলে এই পঞ্চপ্রকার আপদে নারীর অন্য পতি গ্রহণ বিধেয় | ‘ এই উক্তি স্বয়ং পরাশরের !

পণ্ডিতদের মাথায় বাজ পড়ল | পরাশরের এই ব্যাখ্যা করলে তো হিন্দু সমাজ ভেঙে পড়বে | পণ্ডিতেরা কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে একটি দুর্বল খঞ্জ যুক্তি খাড়া করলেন | তাঁরা বললেন‚ পরাশর এই শ্লোকে স্বামীর কথা বলেননি‚ বলেছেন বাগদত্ত পাত্রের কথা | পাঁচটি আপদে কন্যাকে ওই পাত্রের হাতে না দিয়ে অন্য পাত্রের সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া যেতেই পারে | কিন্তু বিধবার বিয়ে ? অসম্ভব !

বিদ্যাসাগর পণ্ডিতদের এই মূর্খামিতে হাসবেন না কাঁদবেন ! সিংহবিক্রমে গর্জে উঠলেন বীরসিংহ গ্রামের ঈশ্বর —

— শুনুন আপনারা‚ পরাশরে বিধবাবিবাহের কথা থাকুক বা না থাকুক‚ বিধবাবিবাহ হবেই | কারণ আমি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বলছি !

**********

বিধবাবিবাহ আইন পাশ হওয়ার পর ছ‘ মাস কেটে গেছে |
আজ ১৮৫৬-র ৭ ডিসেম্বর |
১২৬৩ সনের ২৩ অঘ্রাণ |
কলকাতায় ১২ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে বিপুল ভিড় |
বাড়িটি রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের |
এত ভিড় কেন আজ সেই বাড়িতে ?
আজ সন্ধ্যায় সেখানেই যে হতে চলেছে প্রথম বিধবাবিবাহ |
বিধবাবিয়ের প্রথম কনে বর্ধমান জেলার পলাশডাঙানিবাসী ব্রহ্মানন্দ মুখোপাধ্যায়ের দশ বছরের বিধবা মেয়ে কালীমতি |
আর এই বিধবাকে বিয়ে করার সাহস দেখালেন কে ?
তিনি খাটুরা গ্রামের বিখ্যাত কথক রামধন তর্কবাগীশের পুত্র‚ সংস্কৃত কলেজের কৃতী ছাত্র‚ অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন |
এই বিয়ের জন্যে প্রায় ৮০০ নিমন্ত্রণপত্র ছাপা হয়েছে | সেই ঐতিহাসিক পত্রটি উদ্ধৃত না করে পারছি না —

            শ্রী লক্ষ্মীমণি দেব্যাঃ সবিনয়ং নিবেদনং | ২৩ অগ্রহায়ণ রবিবার আমার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক | মহাশয়েরা অনুগ্রহ পূর্ব্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেশ ষ্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম সম্পন্ন করিবেন‚ পত্রদ্বারা নিমন্ত্রণ করিলাম ইতি | |

মায়ের নামে মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র !

তবু এই বিয়েতে অতিথিদের মধ্যে ছিলেন বাবু দিগম্বর মিত্র‚ বাবু প্যারীচাঁদ মিত্র‚ বাবু কালীপ্রসন্ন সিংহ |

রাজপথ মানুষে আচ্ছন্ন | সাহেব সার্জেনরা জনতা নিয়ন্ত্রণ করছে | রাত ১১ টায় বর এল | কন্যাদান করলেন মা লক্ষ্মীমণি | দম্পতির পরিবারের কেউ আসেনি |

ঠিক পরের দিনই আর একটি বিধবার বিয়ে হল |

এবার পানিহাটি গ্রামে কুলীন কায়স্থ বংশের মধুসূদন ঘোষের সঙ্গে কলকাতার ঈশানচন্দ্র মিত্রের বারো বছরের বিধবা মেয়ের বিয়ে | এবার কিন্তু মেয়ের বাবাই সম্প্রদান করলেন !
বিরোধী হিন্দুরা বলল‚ কলিকাল ক্রমে ঘোর হয়ে উঠছে  

******

চোদ্দ বছর কেটে গেছে |
ঘটল আর এক ঐতিহাসিক ঘটনা |
১২৭৭ সনের ২৭ শ্রাবণ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্র 
বিয়ে করলেন একটি বিধবা মেয়েকে !
মেয়েটি খানাকুল – কৃষ্ণনগরের শম্ভুচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বিধবাকন্যা ভবসুন্দরী |

৩১ শ্রাবণ বিদ্যাসাগর তাঁর সহোদর শম্ভুচন্দ্রকে একটি চিঠি লিখলেন — যে-চিঠি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক দলিল :

           ‘ ইতিপূর্বে তুমি লিখিয়াছিলে‚ নারায়ণ বিধবাবিবাহ করিলে আমাদের কুটুম্ব মহাশয়েরা আহার-ব্যবহার পরিত্যাগ করিবেন‚ অতএব নারায়ণের বিবাহ নিবারণ করা আবশ্যক | এ-বিষয়ে আমার বক্তব্য এই যে‚ নারায়ণ স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া এই বিবাহ করিয়াছে; আমার ইচ্ছা বা অনুরোধে করে নাই | আমি বিধবাবিবাহের প্রবর্ত্তক | আমরা উদ্যোগ করিয়া অনেকের বিবাহ দিয়াছি | এমন স্থলে আমার পুত্র বিধবাবিবাহ না করিয়া কুমারীবিবাহ করিলে আমি লোকের নিকট মুখ দেখাইতে পারিতাম না |

            ভদ্রসমাজে নিতান্ত হেয় ও অশ্রদ্ধেয় হইতাম | নারায়ণ স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া এই বিবাহ করিয়া আমার মুখ উজ্জ্বল করিয়াছে এবং লোকের নিকট আমার পুত্র বলিয়া পরিচয় দিতে পারিবে‚ তাহার পথ করিয়াছে | বিধবাবিবাহ প্রবর্ত্তন আমার জীবনের সর্ব্বপ্রধান সৎকর্ম | এ জন্মে যে ইহা অপেক্ষা অধিকতর সৎকর্ম করিতে পারিব‚ তাহার সম্ভাবনা নাই | ‘

এরপর এই একই চিঠিতে শেষ এবং বৃহত্তর বোমাটি ওহাটালেন বিদ্যাসাগর —

           ‘ কুটুম্বমহাশয়েরা আহার-ব্যবহার পরিত্যাগ করিবেন‚ এই ভয়ে যদি আমি পুত্রকে তাহার অভিপ্রেত বিধবাবিবাহ হইতে বিরত করিতাম‚ তাহা হইল আমা অপেক্ষা নরাধম আর কেহ হইত না | আমি দেশাচারের নিতান্ত দাস নহি | নিজের বা সমাজের মঙ্গলের নিমিত্ত যাহা উচিত বা আবশ্যক বোধ হইবে‚ তাহা করিব | লোকের বা কুটুম্বের ভয়ে কদাচ সঙ্কুচিত হইব না | ‘

(সমাপ্ত)

( প্রথম পর্বের লিঙ্ক:  https://banglalive.com/blogs/as-ishwar-chandra-vidyasagar-introduced-the-practice-of-widow-remarriages-there-had-been-attempts-to-murder-him/)

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
তাঁর কর্মজীবন শুরু ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে স্কটিশ চার্চ কলেজে | তারপর তিনি আজকাল সংবাদপত্রে যুক্ত হন সহকারী সম্পাদক রূপে | সেখান থেকে সহকারী সম্পাদক রূপে আনন্দবাজার পত্রিকায় | বর্তমানে তিনি যুক্ত সংবাদ প্রতিদিন-এর সঙ্গে | তবে এখন তাঁর প্রধান পরিচয় সাহিত্যিক হিসেবে | তাঁর বেস্টসেলার বইগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রাণসখা বিবেকানন্দ ( দু খণ্ড)‚ কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট‚ রবি ও সে ‚ আমি রবি ঠাকুরের বউ‚ রবি ও রাণুর আদরের দাগ‚ নায়ক রবি ( ১ ম খণ্ড)‚ দ্বারকানাথ থেকে রবীন্দ্রনাথ; ঠাকুরবাড়ির গোপনকথা‚ প্লাতা নদীর ধারে; রবীন্দ্র-ওকাম্পোর প্রণয়কথা | সম্প্রতি ‘রাধা ও রবি’, ‘স্বামী’-সহ একাধিক সংগ্রহে সমাদৃত হয়েছে তাঁর ভাষ্যপাঠ |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here