ইন্দিরার কঠোর সমালোচক ছিলেন তাঁর বিখ্যাত পিসি‚ প্রিয়দর্শিনী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই সম্পর্কে অবনতি পিসি-ভাইঝির

3833

তিনি বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত ।ভারতীয় রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য তথা অন্যতম রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিক, সম্পর্কে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বোন। ইন্দিরা গান্ধীর পিসি ও রাজীব গান্ধীর পিসি-ঠাকুরমা। 

বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত ১৮ আগস্ট, ১৯০০ সালে  উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন ।বাবা মতিলাল নেহেরু ছিলেন কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায়ভুক্ত এক ধনী ব্যারিস্টার। রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনিও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালীন দু’বার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হন । মা স্বরূপরাণী ছিলেন লাহোরে বিখ্যাত কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে । প্রসঙ্গত, স্বরূপরাণী ছিলেন মতিলাল নেহরুর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী । বিজয়লক্ষ্মী ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর চেয়ে বয়সে এগারো বছরের ছোট।

ছোট থেকেই তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন । শোনা যায় ধনী পরিবারের সন্তানরা বিলাসবহুল পরিবেশে বড় হলে খানিক দাম্ভিক হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে তা হয়নি। প্রখর বুদ্ধিমতী বিজয়লক্ষ্মী ছিলেন পরিশ্রমীও। পড়াশোনার প্রতি ছিল তাঁর প্রবল ঝোঁক। একুশ বছরের মধ্যেই তিনি উচ্চশিক্ষা শেষ করেন।

প্রত্যেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের মতো তাঁরও জীবন ঘিরে আছে বিতর্ক | প্রথম তারুণ্যে সুন্দরী বিজয়লক্ষ্মী প্রেমে পড়েছিলেন সৈয়দ হুসেনের | বিদেশে উচ্চশিক্ষিত এই সুপুরুষের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে যান মতিলাল-কন্যা | ঝকঝকে সৈয়দ ছিলেন নামী সাংবাদিক | মতিলালের বিশেষ স্নেহভাজন | কিন্তু এই সম্পর্ক ঘিরে দুই পরিবারেই ঝড় ওঠে | পালিয়েও শেষরক্ষা হয়নি বিজয়লক্ষ্মী-সৈয়দের | ফিরে আসতেই হয় চেনা মানুষের মাঝে | বিজয়লক্ষ্মীকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সবরমতী আশ্রমে | সৈয়দকে মহাত্মা গান্ধী দায়িত্ব দিয়েছিলেন খিলাফৎ আন্দোলনের | দুজনের পথ ঘুরে যায় দুদিকেই | নিন্দুকদের মুখ তো আর বন্ধ করা যায় না | তারা বলে‚ সৈয়দ ছিলেন সম্পর্কে বিজয়লক্ষ্মীর বৈমাত্রেয় ভাই | এবং বিজয়লক্ষ্মীর বড় মেয়ে চন্দ্রলেখার জন্মদাতা আসলে সৈয়দ হুসেনই | যাই হোক‚ কলঙ্কের জন্য তো আর চাঁদের আলো কমে না | নেহরু পরিবারের কন্যা বিজয়লক্ষ্মীরও কিছু এসে যায়নি |

১৯২১ সালে বিজয়লক্ষ্মীর সঙ্গে কাথিয়াওয়াড়ের সফল মরাঠি ব্যারিস্টার এবং সংস্কৃত ভাষাবিদ রঞ্জিত সীতারাম পণ্ডিতের বিবাহ হয় । রঞ্জিত সীতারাম পণ্ডিত কলহনের  ঐতিহাসিক মহাকাব্য রাজতরঙ্গিনী সংস্কৃত থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন । স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনিও একাধিকবার কারাবাসে যান । ১৯৪৪ সালে  লখনউ-এর জেলে কারারুদ্ধ অবস্থায় থাকাকালীন তিনি মারা যান। রাজনৈতিক পরিবেশে বড় হয়ে তিনি বরাবরই স্বাধীনতা সংগ্রামে পরোক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন। 

মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেন।
বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত ছিলেন প্রথম ভারতীয় মহিলা ক্যাবিনেট মন্ত্রী। ১৯৩৭ সালে তিনি যুক্তপ্রদেশের প্রাদেশিক আইনসভায় নির্বাচিত হন এবং স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসন ও জনস্বাস্থ্য মন্ত্রী হন। ১৯৪৬ সালে তিনি যুক্তপ্রদেশ থেকে ভারতের গণপরিষদে নির্বাচিত হন। 

১৯৪০ সালে গান্ধীর সঙ্গে সত্যাগ্রহ আন্দোলনে যুক্ত থাকার সময় প্রথমবার কারাবাসে যান ।পরবর্তী ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে ভারত ছাড়া আন্দোলন চলাকালীন তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য কারাবন্দি হন।
১৯৪৭সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে যান। ১৯৪৯-৫১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো, ১৯৫৫-৬১ সালে আয়ারল্যান্ডে (এই সময় তিনি যুক্তরাজ্যেও ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন) এবং ১৯৫৮-৬১ স্পেনে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। 

ভারতে তিনি ১৯৬২-৬৪ সাল পর্যন্ত মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল ছিলেন । এরপর তিনি ফুলপুর থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হন। ফুলপুর ছিল জওহরলাল নেহরুর লোকসভা কেন্দ্র । ১৯৬৪-৬৮  তিনি এই কেন্দ্রের সাংসদ ছিলেন। 

১৯৬৪ সালে জওহরলাল নেহরু প্রধানমন্ত্রী পদে থাকাকালীন মৃত্যু হওয়ায় দল থেকে তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য নির্বাচিত করা হয়। বিজয়লক্ষ্মী দেবীর ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তখন ওই পদের জন্য যোগ্য মনে করেননি। ইন্দিরা গান্ধীর কঠোর সমালোচকও ছিলেন তিনি । ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হলে ক্রমেই উভয়ের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে । একসময় বিজয়লক্ষ্মী সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। এরপর তিনি কার্যত লোকচক্ষুর অন্তরালে দেরাদুনে বসবাস শুরু করেন। ১৯৯০ সালে ১ ডিসেম্বর বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত প্রয়াত হন। 

তাঁর রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য দি ইভোলিউশন অফ ইন্ডিয়া ও দ্য স্কোপ অফ হ্যাপিনেস: আ পার্সোনাল মেময়ার।বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের তিন কন্যা ছিল, চন্দ্রলেখা মেহতা, নয়নতারা সেহগল ও রীতা ঢর । বিজয়লক্ষ্মীর কন্যা নয়নতারা সেহগল ছিলেন বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক। তিনি পরে দেরাদুনে তাঁর মায়ের বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন। তাঁর কন্যা গীতা সেহগল বর্তমানে একজন লেখিকা-সাংবাদিক-বিভিন্ন পুরস্কার-জয়ী তথ্যচিত্রের পরিচালক এবং মানবাধিকার কর্মী।ছোট মেয়ে রীতা ছিলেন রেডক্রস কর্মী |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.