প্রেম নিয়ে বিক্রমাদিত্যের এক নিষ্ঠুর প্রশ্ন

যে বছর ভারত স্বাধীন হলো, তার ঠিক ছয় বছর পরের বাংলা | সেই ১৯৫৩ সালে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক কতটা শোচনীয়, কিম্বা বাংলার মাটি-গাছপালা-আকাশ-বাতাসে তখন ঠিক কতটা মিশেছে দাঙ্গা-হত্যা-ধর্ষণের উল্লাস, সেই প্রসঙ্গকে দূরে সরিয়ে রেখে আসুন আমরা পৌঁছে যাই ছায়া সুনুবিড় শান্তির নীড় মানিকপুর গ্রামে | সেখানে এক জমিদারের (বরুণ চন্দ) মেয়ে পাখি (সোনাক্ষী সিনহা) ঠিক যেন রূপকথার পরীর মতো ঘুরে বেড়ায় রাজপুরীর মহলে-মহলে (পড়ুন জমিদারের হাভেলিতে) আর ড্রাইভারের সঙ্গে মিষ্টি খুনসুটি করতে করতে একে-ওকে-তাকে ধাক্কা মেরে মোটরগাড়ি চালাতে শেখে গ্রামের পথে | এই করতে করতেই একদিন তার গাড়ি এক অচেনা বাইক-আরোহী আগন্তুককে প্রায় ধাক্কা মারতে মারতে সামলে নিলো, কিন্তু ততক্ষণে দুর্ঘটনা যা ঘটার ঘটে গেলো, উল্টে গেল সেই অচেনা মানুষের বাইক | মিষ্টি মুখে মিষ্টি হেসে আর তার সঙ্গে মেয়েলি ন্যাকামি (বা সরলতা) মিশিয়ে পাখি সেযাত্রা রক্ষা পেয়ে গেলো বটে, তবে যেটা ও বুঝতে পারলো না, সেটা হলো, এই ছোট্ট দুর্ঘটনা থেকেই ওর জীবনের একের পর এক দুর্ঘটনার শুরু |

অল্প পরেই জানা গেলো বাইক-আরোহী সেই অচেনা মানুষটি যাচ্ছিলেন পাখিদের জমিদার-মহলেই | তিনি এসেছেন ইন্ডিয়ান আর্কিওলজি বিভাগ থেকে | গ্রামের যে পুরনো কৃষ্ণমন্দির আছে, তার চারপাশে খনন করে এক পুরনো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করাই তাঁর লক্ষ্য | সেই যুবক বরুণ (পরে জানা যাবে তাঁর আসল নাম আত্মানন্দ ত্রিপাঠী, এই ভূমিকায় অভিনয় করছেন রণবীর সিং) একদম সিনেমার নিয়ম মেনে ক্রমে ক্রমে জড়িয়ে পড়তে থাকে পাখির জীবনে | পাখির জীবন সম্পৃক্ত হবার এই মুহূর্তগুলোয় পাখি জানতে পারে যে যতই বরুণ ক্যানভাস নিয়ে ঘুরুক না কেন, আসলে সে একটুও আঁকতে পারে না | এমনকি গাছের একটা পাতা অব্দি আঁকার সামর্থ্য নেই তার | আর বরুণ জানতে পারে, পাখি যত মোহময়ী আর আকর্ষনীয়ই হোক না কেন (পশ্চিমি জিরো ফিগার নয়, সরস দেশি গার্লের ডাঁসালো যৌবন), একটু এধার থেকে ওধার হলেই পাখির শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়, আর তখন তাকে সঙ্গে সঙ্গে ইনজেকশন দিয়ে বাঁচাতে হয় | এরপর দুজনের এই সম্পর্কে এসে যেন জমতে থাকে এই পৃথিবীর সবটুকু মায়া, সবটুকু আদর | সারা পৃথিবীকে ভুলে ওরা দুজন দুজনকে নিয়ে ঘর বাঁধবে বলে ঠিক করে | ঠিক সেইসময় নিয়তিঠাকুর মুচকি হাসেন |

কীভাবে মুচকি হাসেন তিনি? এটা তো কোনো থ্রিলার গল্প নয়, তাই এর পরের মোচড়টা বরং বলেই দিই | যেদিন পাখি সলজ্জা নয়নে বরুণের বাহুডোরে বাঁধা পড়ার জন্য পুরো তৈরি, যেদিন সে তার সখীদের হাতে সকাল থেকে একটু একটু করে সেজে উঠেছে প্রাকবিবাহ-আশীর্বাদের জন্যে, ঠিক সেদিন সে আর তার গোটা পরিবার জানতে পারলো এই বরুণ ছেলেটি আসলে একজন ঠগ, প্রতারক | এককথায় যাকে বলা যায়, ‘লুটেরা’ | অদৌ সে কোনো আর্কিওলজি বিভাগে চাকরি করে না, পাখির বাবাকে সম্পূর্ণ ঠকিয়ে নিঃস্ব করে জমিদারবাড়ির সব সম্পদ আর গ্রামের মূল্যবান দেবমূর্তিটি চুরির উদ্দেশ্যেই সঙ্গী-সাথী নিয়ে তার এই গ্রামে আগমন | এতদিন ধরে তারা মাটি খুঁড়েছে হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার খোঁজে নয়, মাটির তলা দিয়ে পালানোর মতো সুড়ঙ্গ তৈরির জন্যে | এইভাবে গোপন গর্ত খুঁড়ে শুধু সম্পদকেই তো লুঠ করে না বরুণ, লুঠ করে পাখির জীবনের সবটুকু আশা ভরসা, ভালবাসা আর মানুষের ওপর বিশ্বাসটুকুও | আর সেইজন্যেই তো এই ছবির নামটাও রাখা হয় বরুণের নামেই, ‘লুটেরা’ |

এখানে অবশ্য ছবির শেষ নয়, ইন্টারভ্যাল | বিরতির পরে আমরা দেখি গল্প বাংলা থেকে সরে গিয়ে পৌঁছে গেছে ডালহৌসি শহরে | সাল ১৯৫৪ | জীবনের সেই চূড়ান্ত বিশ্বাসভঙ্গ পাখিকে মানসিকভাবে শেষ তো করে দিয়েইছে, তবে সবচেয়ে বড় অঘাত হেনেছে তার বাবার ওপরে | এতবড় প্রতারণার পরে আর বেশিদিন নিজের ধ্বস্ত জীবনকে টেনে নিয়ে যেতে পারেননি সেই জমিদারমশাই | নিজের দুয়েকজন সহচরীকে নিয়ে তাই এখন ডালহৌসির পৈতৃক-আলয়ে একাকিনী অ-সুখী জীবন-যাপন করে পাখি | কথা বলতে গেলেই এখন তার কাশি উঠে আসে, আর আমরা দেখি সেই কাশির সঙ্গে উঠে আসছে কালচে লাল রক্ত | সে জানে, তার ফুসফুসে বাসা বেঁধেছে রাজরোগ যক্ষ্মা, আর মনে মনে এটাও বিশ্বাস করে জানলার অদূরে তুষারপাতে সাদা হয়ে যাওয়া গাছটার শেষ পাতাটাও যেদিন খসে পড়বে, ঠিক সেইদিন হারিয়ে যাবে তার জীবনের শেষ প্রাণ-কণাটুকুও | স্থানীয় থানার বড়বাবু এরমধ্যেই পাখির সাহায্য প্রার্থণা করতে থাকেন, সেই দাগী প্রতারক ‘লুটেরা’ বরুণকে ধরার জন্যে | কারণ আর পাঁচজনের মতো তিনিও তো জানেন, সেই প্রতারককে সবচেয়ে ভালো চেনে পাখিই, তার হাতেই যে লুঠ হয়েছিলো তার অনাঘ্রাতা মেয়েবেলার ভালবাসাটুকু | ঠিক এইসময়েই আরেকবার মুচকি হাসেন নিয়তি ঠাকুর | আরেক লুঠতরাজের পরিকল্পনায় ডালহৌসিতে এসে পৌঁছয় সেই বরুণ, আর তার আশ্রয় জোটে কিনা সেই পাখির বাড়িরই গেস্ট হাউসে | এরপর এক চূড়ান্ত মুহূর্তে যখন দুজনে দুজনের মুখোমুখি হয়, তখন কি দুজনেরই হৃদস্পন্দন থেমে যায় কয়েকপলের জন্যে?

বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানে ( জন্ম : ১৯৭৬) তাঁর প্রথম ছবি ‘উড়ান’ (২০১০) দিয়েই চমকে দিয়েছিলেন সকলকে | পরের ছবি লুটেরাতে পৌঁছে তাঁর সিনেমার ভাষা আরো পরিণত, আরো ইঙ্গিতপূর্ণ | ও হেনরির ছোটগল্প ‘দ্য লাস্ট লিফ’ থেকে শুধু কনসেপ্টটুকু ধার করে বাকি গল্পটা নিজে লিখেছেন বিক্রমাদিত্য | ও হেনরির গল্পে শুধু অ-সুখী মেয়েটির দিনযাপন আছে, কিন্তু আসল ‘লুটেরা’ বরুণের চরিত্রটাই নেই | এই ছবিতে সেই চরিত্রটা যেন নিজের হৃদয় দিয়ে গড়েছেন বিক্রমাদিত্য | কী বলছেন? ‘লুটেরা’ মানে তো দুষ্টু লোক, তার চরিত্র আঁকতে আবার হৃদয় লাগে নাকি? লাগে কিনা, বুঝতে গেলে আপনাকে যে এই ছবি দেখতে হবে ভাই | দেখলে বুঝবেন হৃদয় দিয়ে গড়া এই চরিত্রকে অনুভব করতে গেলেও আবার ওই হৃদয়টাই লাগবে |

বিগত কয়েকবছর ধরে বাংলা ছবিতে প্যাঁচ-মারা সংলাপের কেরামতি ক্রমবর্ধমান | সেইসব বাঙালি সংলাপ-লিখিয়ে পরিচালক-প্রতিভাদের কাছে বিক্রমাদিত্যের এই প্রায়-বাংলা ছবি (ছবির অর্ধেক শুট বাংলায়, ছবির অর্ধেক গল্প বাংলার, কয়েকটি মুখ্য চরিত্রে আছেন বাঙালিরা) এক সুস্পষ্ট থাপ্পড়ের মতো | তার কারণ গোটা ছবিটায় সংলাপ বলতে গেলে তো হাতে গোনা | উচ্চারিত শব্দ নয়, বিক্রমাদিত্য আসল খেলাটা খেলেছেন ছবির নিজস্ব ভাষা নিয়ে, আর গল্প বোনার জন্যে জাল বিছিয়েছেন ক্যামেরা-এডিট-মিউজিকের | ছবি দেখতে গিয়ে একটা সময় আপনি টের পাবেন যে নীরবতার যে ভাষা, মুহূর্তের যে ভাষা, তাকে এইভাবেই সাপটে ধরতে হয়, দিস্তে দিস্তে সংলাপ লিখে তাকে ধরবে এমন বাপের ব্যাটা পরিচালক এখনো জন্মায় নি |

কবিতার মতো সহমর্মী এই ছবির শেষটা খুব নিষ্ঠুর আর রক্তাক্ত | তবু, সেই কর্কশ সত্যিটাকেও জাদু-বাস্তবীয় ভালবাসা দিয়ে মুড়ে দিয়েছেন পরিচালক | আর তারপর নীরবে খুব নিষ্ঠুর একটা প্রশ্ন করেছেন যেন আমাদের সব্বাইকেই |

জানতে চেয়েছেন, এরকম একটা ‘লুটেরা’ বরুণ যেভাবে তার প্রেয়সী পাখিকে ভালবেসে নিজের শরীরের পুলিশি বুলেটের ক্ষতকে অগ্রাহ্য করে ঘোর তুষারপাতের মধ্যে প্রেমিকার প্রাণ-বাঁচানোর জন্যে এক প্রায়-অসম্ভব আয়োজনে মেতে ওঠে (তার এই চেষ্টা হলো: কিছুতেই যেন জানলার অদূরের সেই গাছ থেকে না পড়ে যায় গাছের শেষ পাতাটা – তাহলেই তো পাখি পৌঁছে যাবে মৃত্যুর দোরগোড়ায়), ঠিক সেরকমটা চ্যালেঞ্জ আমরা কি কেউ আদৌ নিতে পারবো আমাদের প্রিয়জনের জন্যে? আমরা মানে আমরা সভ্যজনেরা, যাদের শরীরে সেরকম বুলেটের কাঁচা রক্তাক্ত ক্ষত নেই, যারা ‘লুটেরা’ নই, যারা সমাজে বেশ মান্যি-গন্যি ভদ্র ও সুবিধেজনক অবস্থানে কালাতিপাত করছি, সেই তারা |

প্রেম নিয়ে পরিচালক বিক্রমাদিত্যের এই নিষ্ঠুর প্রশ্নটার সৎ উত্তর দেবার ক্ষমতা আমার অন্তত নেই | আপনার আছে তো?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here