বিরাটকে ‘পায়ে ঠেলছেন’ অনুষ্কা! ‘সংস্কার বিরোধী’ নাকি ‘সভ্যতার অপমান’? কীভাবে দেখব?

খুব ছিমছাম একটি সুখী গৃহকোণ। সেখানে সুখের ওম গায়ে মেখে বাস করেন একজোড়া কপোতকপোতী। তাঁদের ঘরের বয়স কিন্তু বেশি নয় মাত্র একবছরএই একবছরের অভিজ্ঞতাই তাঁদের অনেক সমৃদ্ধ করেছে। আড্ডার ছলে সেই আলোচনাই তাঁরা করছিলেন একদিন। কপোতী কপোতকে দেখাচ্ছিলেন, তাঁর স্কুল লাইফে অভিনয়ের ফটো। তাই দেখে কপোতের মিষ্টি খুনসুটি। নিজের স্কুলের ড্রামা কমপিটিশনের ছবি দেখিয়ে পাল্টা জাহির, ‘আমিও কিন্তু অভিনয় পারি।’ কিছুটা বন্ধুত্ব, অনেকটা খুনসুটি আর ষোলোআনা ভালোবাসার আশ্লেষে জড়ানো এই দাম্পত্যের ছবি ইতিমধ্যেই ভাইরাল। একটি সংস্থার বিজ্ঞাপনের সৌজন্যে। সংস্থাটি বলতে চেয়েছে, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তাদের প্রডাক্ট এই জুটির মতোই অটুট। বিজ্ঞাপনের জনপ্রিয়তার আরও একটা কারণ এই দম্পতির অফস্ক্রিন রসায়ন। জুটির একজন যে বিরাট কোহলি। অন্যজন? অবভিয়াসলি ‘লেডি লাক’ অনুষ্কা শর্মা!

বিজ্ঞাপনটি কিন্তু জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চর্চিতওএবং একটু বিতর্কিত, নিন্দিতকারণ, একটি ছোট্ট দৃশ্য। যেখানে সোফায় বসা অনুষ্কা পা দিয়ে ঠেলে ডাকছেন বিরাটকে। আর বিরাট অলরেডি ‘দেহি পদপল্লব’ গোছের আকুতি নিয়ে যেন বউয়ের পায়ের গোড়ায় বসে (দর্শকের মত এমনটাই)! বিশ্লেষণাত্মক মন নিয়ে দেখতে বসলে প্রশ্ন জাগবেই, দাম্পত্যের এমন দুর্লভ মুহূর্ত সত্যিই কি খুবই দৃশ্যদূষণ ঘটিয়েছে? বিরাটকে অনুষ্কার ‘পায়ে ঠ্যালা’ কী প্রমাণ করতে চেয়েছে? বন্ধুত্ব থাকলে এই আচরণ চলতেই পারে? উদারমনস্কদের মতে, নারীপুরুষ নির্বিশেষে ‘হ্যাঁ’ রক্ষণশীলদের দাবি, ‘না’ কেন? দাম্পত্য সুখের হয় বন্ধুত্বের গুণে। সেখানে বউকে সোফাসেটে আরাম করে বসতে দিয়ে স্বামী মাটিতে বসতেই পারেন। তাই নিয়ে রক্ষণশীলদের কোনও সমস্যা নেই। তাঁদের যাবতীয় সমস্যা ওই ‘পায়ে ঠ্যালা’ দৃশ্য। এখানে আবার মুখ খুলেছেন উদারমনস্করা। তাঁদের কথায়, বিরাট যদি পা দিয়ে অনুষ্কাকে ঠেলতেন তাহলে তথাকথিত নারীবাদীরা রেরে করে উঠতেনবলতেন, ‘‘এমনিতেই নারীরা পুরুষের পায়ের তলায় পড়ে থেকেছে বরাবরএবার সেটা বিজ্ঞাপনেরও ‘পণ্য’ হচ্ছে! মুখে কথা বলুন বিরাট। কেন অনুষ্কাকে পায়ে ঠেলবেন? তারপরেও আবার মাঠে বড়াই করে বলেন, অনুষ্কা নাকি তাঁর ‘লেডি লাভ’ এবং ‘লাক’! আজ বিপরীত লিঙ্গ সেই কাজটা করায় সব খুশ হ্যায়?’’

এই প্রেক্ষিতে উদারমনস্কদের কটাক্ষ, পাও কি হাতের মতোই শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নয়? হাতের বদলে পা দিয়ে ডাকলে দোষের কী? আর বন্ধুত্বের খাতিরে এটুকু মেনে নেওয়া যেতেই পারে। একুশ শতকেও যদি নিখুঁত আচরণ নিয়ে এত বাড়াবাড়ি, কড়াকড়ি, তবে মুক্ত মন ডানা মেলবে কবে? উদারপন্থীদের এই যুক্তি অকাট্য। ভালোবাসার জন্য অবশ্যই দুনিয়া কুরবান। কিন্তু নারীপুরুষ ভেদাভেদ ভুলে যদি দেখা হয় ব্যাপারটা? তাহলে মানতেই হবে বিরাটকে অনুষ্কার পা দিয়ে ঠ্যালা কিংবা অনুষ্কার বিরাটকেব্যাপারটা চোখে বেঁধে বৈকি। এমন মন্তব্যের নেপথ্যের নিরপেক্ষ কারণগুলো এরকম

কারণ ১: সভ্যতা এগিয়েছে। আমরা চারপেয়ে থেকে দু’পেয়ে হয়েছি। হাত দুটো ব্যবহার করি লেখাপড়া সহ যাবতীয় কাজে, খেতে, কাউকে ডাকতে, আদর করতে, জড়িয়ে ধরতে এবং আঘাত করতে। পায়ের কাজ চলাফেরায় সাহায্য করা। একই সঙ্গে কাউকে হেয় করতে যতটা আঘাত এবং অপমান করা যায় পা দিয়ে, সেটাও করা হয়। এর মধ্যে লাথি মারা, ঠোক্কর মারা বা পা দিয়ে ঠেলে দেওয়াও আছে। প্রসঙ্গত, এখনও কোনও সহকর্মী তাঁর সিনিয়রের মনপসন্দ না হলে তিনি সেই বিরক্তি প্রকাশ করেন সহকর্মীকে অসাবধানতাবশত (পড়ুন ইচ্ছাকৃত) পা দিয়ে ঠোক্কর মেরে। একে কোনওভাবেই কি খুনসুটি বা ভালোবাসার প্রকাশ বলা যাবে?

কারণ ২: আমাদের শরীরের প্রত্যেক অঙ্গ নির্দিষ্ট কাজের জন্য নির্দিষ্ট। তাহলে তো আমরা হাত দিয়ে হাঁটতেই পারি? কিংবা পা দিয়ে খাওয়াদাওয়া! শুধুই অফিসিয়ালি নয়, বন্ধুদের মধ্যেও পাশ্চাত্যে তাহলে কেন করমর্দন করা হয়? পায়ে পা মেলানোর বদলে!

কারণ ৩: যেকোনও বিরক্তিকর জিনিস, সেটা বস্তু হোক বা প্রাণীতাকে সরাতে আমরা পায়ের সাহায্য নিই। যেমন, কুকুর, বেড়াল। দীর্ঘক্ষণ ধরে পায়ে পায়ে ফিরলে প্রথমে হুশহাশ করে তাড়ানোর চেষ্টা চলে। তারপরেই সজোরে লাথি। আবার চলার পথে পাথর বা ইঁটের টুকরো পড়লে পা দিয়েই ঠেলে সরাই আমরা। এছাড়া, সম্মানজনক কোনও জিনিস বা ব্যক্তির গায়ে পা ঠেকলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে তাকে প্রণাম করি। পা যদি হাতেরই সমান, তবে এই কাজ আমরা করি কেন?

খুঁজে দেখলে এমন আরও লাখো যুক্তি পক্ষেবিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায়। চাইলে, ‘পায়ে পা লাগিয়ে’ নারীবাদী ও নিপীড়িত পুরুষদের মধ্যে ‘উপভোগ্য খণ্ডযুদ্ধ’ও বাধিয়ে দেওয়া যেতেই পারে। বিশ্বাস করুন, তেমন কোনও ভাবনা থেকে এই লেখা নয়। আসলে আমাদের সংস্কার, আমাদের রীতি বলছে, পায়ে ঠ্যালা অসম্মান দেখানোরই নামান্তর। এই অসম্মান পুরুষ করলেও যা, নারী করলেও একই। যতই তা ভালোবাসার প্রকাশ হোক না কেন! বিরুষ্কা, আপনারাই তো বলেছিলেন, এমন কোনও বিজ্ঞাপনের ব্র্যান্ডিং করবেন না যা আমাদের সংস্কারকে আঘাত করে। সমাজকে ভুল বার্তা দেয়। পায়ে ঠেলে কাউকে ডাকা সত্যিই কি নারীপুরুষ নির্বিশেষে উদারমনস্কতার পরিচায়ক? যাকে মারাত্মক ভালোবাসব তাকে কি পায়ে ঠ্যালা যায়? পাঠক, আপনারা কী বলেন?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here