বিশেষ কিছু বাংলা ছবির রেকর্ড ভাঙতেই কি এসেছিল কমল হাসানের ‘বিশ্বরূপ ২’!

জানি এরকম একটা হেডলাইন পড়ে আপনার মনে হতে পারে যে কোথাকার কী বাংলা সিনেমা, তার আবার এমন কী রেকর্ড, যে সেটা ভাঙার জন্যে কমল হাসানের মতো মেগাস্টারের সিনেমা রিলিজ হবে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ব্যাপারটা শুনতে যতই অবিশ্বাস্য লাগুক না কেন, আমার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে ব্যাপারটা অনেকখানি এই রকমই দেখতে লাগছে যেন।

আলাদা করে বিশেষ কোন বাংলা ছবির নাম করতে চাই না আমি। কিন্তু দুয়েকজন মহামানব পরিচালকের কথা বাদ দিলে বাকি বেশির ভাগ বাংলা ছবিকেই একটা রেকর্ড করতে দেখি। সেটা হল, ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো-তেও সিনেমা হল প্রায় ফাঁকা রেখে দেওয়ার রেকর্ড।

এই তো হপ্তা দুয়েক আগের কথা হবে। নিউজ চ্যানেল, খবরের কাগজ, সোশ্যাল মিডিয়া, মেট্রো রেলের ইনকোডা টিভি – সব কিছুতে লাগাতার ঢাক পিটিয়ে কী একটা সিনেমা রিলিজ করল যেন। তারপর ওপেনিং শো শুরুর ঘণ্টাখানেক আগে বুকমাইশো চেক করতে গিয়ে আঁতকে উঠেছিলাম আমি। নন্দনের এ কী হাল দ্যাখাচ্ছে রে বাবা! খুব বেশি হলে পুরো হাউসে দশ-বারোজন লোক!

সেকেন্ড উইকে পৌঁছে সে ছবি কলকাতা থেকে ভ্যানিশ হয়ে গেল প্রায়!

নামী হাউসের নামী স্টারের তৈরি করা ছবি। সেই সিনেমাকেই কিনা পাবলিকেরা হাওয়ায় উড়িয়ে দিল?

মনে মনে যখন এটাকেই একটা রেকর্ড বলে ভাবছি, তখনও এটা টের পাই নি যে ঠিক পরের উইকে এই রেকর্ড এসে গুঁড়িয়ে দেবে কমল হাসানের ফিল্ম! আর শুধু তো কমল হাসান নয়, সে ছবির সঙ্গে আবার জড়িয়ে থাকবে রিলায়েন্স বা রোহিত শেঠি-র মতো বড় বড় সব নামও!

‘বিশ্বরূপ টু’ যে ১০ তারিখে রিলিজের পর মেরেকেটে পাঁচ দিন চলে চৌদ্দ তারিখেই শেষ!

কলকাতার যে মাল্টিপ্লেক্সে ছবিটা দেখতে ঢুকেছি, সেখানে অবস্থা দেখি ফাঁকা মাঠের মতো প্রায়। আমি ছাড়া পুরো অডিটোরিয়ামে আর একটা লোক নেই। একটা সময় ভয় করছিল এটা ভেবে যে, শো ক্যান্সেল করে টিকিটের টাকা ফেরত দিয়ে বাড়ি না পাঠিয়ে দ্যায়! তারপর দেখি শো শুরুর ঠিক আগে আগে আরও তিন-চারজন এলো।

মুশকিল আরও হয়েছে এটা যে, সিকুয়েল ছবির তুলনা যত টানতে যাচ্ছি, মনের মধ্যে উঠে আসছে তত ‘বাহুবলী – টু’র নাম। কী ক্রেজ ছিল সেটা দ্যাখার জন্য, বাপ রে বাপ রে বাপ! সকালবেলাতেও প্লেক্সে সে বার ঠাসাঠাসি করা ভিড়!

আর সেখানে ‘বিশ্বরূপ’ কি তাহলে একটা এত খারাপ ছবি? যে বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়বে এভাবে সেটা?

‘বিশ্বরূপ – পার্ট ওয়ান’ (২০১৩) তো এত টানটান ছিল যে, সিনেমার এন্ড ক্রেডিট চলার সময়েও চেয়ার ছেড়ে উঠতে পারি নি আমি। সেকেন্ড পার্টে এসে সেটা এত ঝুলে যেতে পারে? ‘বাহুবলী’র কথা না হয় ছেড়েই দিন, ‘রক্তচরিত্র’ (২০১০) বলুন বা ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’ (২০১২)– এরকম কেস তো আমি দেখি নি আগে কোথাও!

পুরো ছবিটা দ্যাখার পর বুঝতে পারলাম গোলমালটা কী! ফার্স্ট পার্টের পর সেকেন্ড পার্টে এসে গল্প থমকে গ্যাছে যে! বলার মতো নতুন করে আর ঘটছে না যে কিছু! যেটুকু ঘটছে, মনে হচ্ছে, দূর বাবা – এ তো আগেই দেখেছি, বলে! কমল হাসানের মতো একটা লোক যে জেনেবুঝে এই কাণ্ড করতে পারে, না দেখলে আমার সেটা বিশ্বাস হত না ভাই!

পার্ট ওয়ানের ওপেনিং সিন মনে আছে তো? একটা ঘরের মধ্যে রাশি রাশি পায়রার খোপ, আর স্ক্রিন জুড়ে অগুন্তি পায়রার ডানা ঝাপটানি শুধু। সঙ্গে একটা কালো চশমা পরা লোক। এছাড়া আর কিছু হচ্ছে না, কিন্তু শুধু ওইটুকুই যেন ম্যাজিকের মতো বানিয়ে দিচ্ছে পুরো ছবির মুড, টানটান হয়ে উঠতে হচ্ছে ঠিক এর পরে কী হবে বলে।

সেখান থেকে কাট টু যদি সোজা এই দ্বিতীয় পর্বে আসেন তো দেখতে পাবেন এখানেও শুরুর সিনে স্ক্রিনের এদিক থেকে ওদিক অবধি একটি পায়রা উড়ে যাওয়ার সিন। কিন্তু এটা যে সত্যি নয় মেকি, সেটা বোঝানোর জন্যে দেখতে পাবেন স্ক্রিনের এক কোণে ইয়া বড় করে লেখা রয়েছে CGI!

মানে গোড়াতেই আন্ডারলাইন করে বলে দেওয়া হচ্ছে, শটটা আসল নয়, ফেক। যত দিন যাচ্ছে স্ক্রিনে পশু-পাখি দ্যাখানোর হ্যাপা তত বাড়ছে, আর কোণে সাঁটা এই ডিসক্লেমারগুলো যে সিবিএফসি-র অর্ডার মতোই লিখতে হয়, সেটা আমার জানা। শুধু যেটুকু বুঝতে পারলাম না, সিনেমার ফার্স্ট পার্টে পায়রার অত ভাল শট থাকতে সেকেন্ড পার্টের জন্যে বেফালতু কেন গ্রাফিক্সে পায়রা বানিয়ে ওপেনিং শট বানাতে গেলেন কমল।

ফার্স্ট পার্ট থেকে শট ধার নিয়ে এখানে বসিয়ে দিলে ইমপ্যাক্ট তো অনেক বেটার হত?

আগের ছবিতে পায়রার সিনটা যেমন বেঁধে দিয়েছিল পুরো ছবিটার মুড – এ ছবিতেও সেটাই হল, CGI লেখা সিনটা এসে যেন গলা উঁচু করে জানিয়ে গেল, যা দেখবেন, সেই পুরো ছবিটাই ফেক!

আর শট ধার করার ব্যাপারটা নিয়ে বলি, এখানে না হলেও, ‘বিশ্বরূপ টু’ ছবির অন্য পোর্শনে বহু বহু শট ছবির ফার্স্ট পার্ট থেকে জাস্ট কপি পেস্ট করে তুলে এনেছেন কমল। আফগানিস্তানের জঙ্গী ঘাঁটির যে অংশটুকু এই ছবিতে রয়েছে, তার পঁচানব্বই ভাগ শট পার্ট ওয়ান থেকে রিপিট।

এভাবে বালতি বালতি শট রিপিট করার কারণটা কী জানেন? আগের ছবিতে দেখিয়ে দেওয়া ওই ঘটনাগুলো কমল আবার এখানে নতুন করে দ্যাখাতে বসেছেন যে! খুব মন দিয়ে যাঁরা ছবি দেখবেন, তাঁরা বুঝতে পারবেন যে, পার্ট ওয়ানে ওই সিকোয়েন্সগুলোর পুরোটা দ্যাখান হয় নি, একটু একটু অংশ বাদ রেখে যাওয়া ছিল। পার্ট টু-তে কমল সেই অংশগুলো দ্যাখাতে গিয়ে পুরো সিকোয়েন্সটাই নতুন করে দেখিয়ে দিচ্ছেন আবার।

কমল হাসানকে সিনেমার ভাষা শেখাতে যাব, আমার সে ধৃষ্টতা নেই। কিন্তু মামুলি এক ভিউয়ারের জায়গা থেকে বলতে পারি – গোলমালটা কোথায় হচ্ছে জানেন? ফার্স্ট পার্টে যে অংশগুলো না-বলা রয়ে গেছিল, সেগুলো এত ইম্পরট্যান্টও ছিল না যে সেটা জানার জন্যে পাবলিক বসে থাকবে টানা সাড়ে পাঁচ বছর ধরে! তার ফলে হাতে গোনা কিছু লোক ছাড়া বাকিদের তো মনে হবে, ধুস – এটা আগেই দেখেছি বলে।

ঈজাম আহমেদ কাশ্মীরি (অভিনয়ে কমল হাসান) যে আসলে ‘র’-এর কর্মী, আর ‘ওসামা’ নামে এক সন্ত্রাসবাদীর ডেরা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ছদ্ম-পরিচয়ে সে মিশে গেছিল জেহাদিদের সঙ্গে – সে সব পুরোটা তো ফার্স্ট পার্টেই দেখিয়েছিলেন আপনি। সেকেন্ড পার্টে ফের একবার গোটা কাহিনিকে ফ্ল্যাশ ব্যাকে টেনে নিয়ে গিয়ে দ্যাখান হচ্ছে কী ভাবে ঈজামের গদ্দারি প্রথম ধরা পড়ে যায় ওমর কুরেশি-র (রাহুল বোস) কাছে।

কিন্তু এই অংশগুলো ভিস্যুয়ালি নতুন করে তো আর কিছু অ্যাড করছে না এখানে। আফগানিস্তানের জঙ্গী ঘাঁটি সিনেমার ফার্স্ট পার্টেই যে লেভেলে এক্সপোজ করা আছে, তার থেকে চারটে শট এই ছবিতে এক্সট্রা দ্যাখালে এই এত দিন পরে সেটা আর কত ভাল লাগতে পারে, বলুন আমায় আপনি।

অন্ধকার রাতে আকাশে উড়তে থাকা মার্কিনী হেলিকপ্টারকে সংকেত দেওয়ার জন্যে দু’হাতে দুটো অগ্নিপিণ্ড নিয়ে এক বাড়ির ছাদ থেকে অন্য বাড়ির ছাদে লাফের যে সিনটা এই সেকেন্ড পার্টের সবচেয়ে বড় চমক হতে পারতো, খেয়াল করে দেখুন সেই সিনটা কমল জুড়ে দিয়েছিলেন ছবির ফার্স্ট পার্টের একেবারে শেষে ‘ছবির সেকেন্ড পার্টে কী আসতে চলেছে’ অংশে।

ফলে সিনেমায় ওই অংশটাও দেখছি যখন, ফিলিং হচ্ছে যে, যাহ, এটাও তো আগে দ্যাখা হয়ে গেছে বলে!

সিনেমায় ঈজাম ওরফে কমল হাসানের স্ত্রীর ভূমিকায় যাঁকে দ্যাখা যাবে, তিনি বয়সে আসলে ওঁর থেকে ২৩ বছর ছোট। সেটা নিয়ে আমার কোন অসুবিধে নেই, ভাই। ইন ফ্যাক্ট ঈজাম আর তাঁর বৌ নিরুপমার মধ্যে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটে গিয়ে ফাইনালি যে দেহ-মিলনটা ঘটেই গেল, ফার্স্ট পার্টের একদম শেষে গানের মধ্যে এক ঝলক সেটা দেখে মনে হয়েছিল সুন্দর এক কবিতা দেখছি যেন।

এবার সেকেন্ড পার্টে এসে সেই দেহ-মিলন কবে কোথায় ইউ কে-র কোন হোটেলে কী ভাবে হয়েছিল, সেই ডিটেল দেখতে গিয়ে মনে হবে না যে, আগের পর্বে এক ঝলক হঠাৎ দ্যাখার সেই মাধুর্যটা ঘেঁটে পুরো ‘ঘ’ হয়ে যাচ্ছে বলে!

সব থেকে চোখে লাগছিল যেটা, সেটা হল সিনেমা জুড়ে অদৃশ্য ফর্মুলার শাসন চলতে থাকা। কী রকম সেটা, ডিটেলে লিখছি, দাঁড়ান।

বহু বছর আগে আর্মি ক্যাম্পে ট্রেনিংয়ের সময় ঈজামের সঙ্গে প্রেমের একটা রিলেশন হয় অস্মিতা সুব্রমণিয়ামের (অভিনয়ে আন্দ্রিয়া জেরেমিয়া – বাস্তবে ইনি কমলের থেকে ৩১ বছর ছোট)। মাঝখানে বহু বছর যোগাযোগ ছিল না কোন, এই এত বছর পর এখন ২০১১ সালে আবার দেখা হল তার সঙ্গে। একপাশে অফিসিয়াল বৌ নিরুপমা আর অন্য পাশে ‘র’ সহকর্মিনী অস্মিতাকে নিয়ে শত্রু দমনের অভিযান ঈজামের চলছিল বেশ ভালোই। তার সঙ্গে এটাও ভাবতে খুব ইন্টারেস্টিং লাগছিল যে কী হবে একেবারে শেষে? দুজনেই কি রয়ে যাবে ঈজামের জীবনে? কেমন ইক্যুয়েশন হবে তাহলে সেটা?

আঁতকে উঠলাম এটা দেখে যে, এটা নিয়ে সাহসী কোন নিরীক্ষার ধারে-কাছেও পা রাখলেন না কমল! শুরুর ওই ফ্লাইটের সিনটা ধরুন আপনি। পাশে বৌ বসে রয়েছে, তবু অপার এক নির্ভরতায় ঈজামের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ছে বিশেষ বন্ধু অস্মিতা। খুব নিরীহ মাপের দৃশ্য হয়তো, তবু দেখতে গিয়ে কী গা শির-শির করে। বা যখন গাড়ির মধ্যে ভাবলেশহীন মুখে অস্মিতা সবার সামনে এটা বলে দ্যায় যে, ওকে ‘রেপ’ করার অপরাধেই আর্মি থেকে তাড়ানো হয় ঈজামকে, তখন মনে হতে থাকে সম্পর্কের মধ্যে লুকনো বোমাগুলো এই ফেটে গ্যাল বুঝি!

কী ইন্টারেস্টিং ভাবে টার্ন নিতে পারত এই সম্পর্কটা স্যর! তা নয়, আপনি কিনা দেখিয়ে দিলেন, ওমরের লোকজনের হাতে নারকীয় ভাবে অস্মিতার খুন! অস্মিতার গলা কাটা মুণ্ডুটা যখন পলিথিনে মুড়ে ঈজামের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হল, তখন ঈজাম ওটা দেখে ছটফট করবে কী, মনে মনে ছটফট করছি তো আসলে আমি। মনে হচ্ছে, যাই ক্ষমা চেয়ে আসি সেই অস্মিতার কাছে আর এটা বলে আসি যে হিরোর লাইফে বৌ ছাড়া আর অন্য কোন মেয়েকে হজম করতে যে এখনও তৈরি নয় মেনস্ট্রিমের ছবি।

ফার্স্ট পার্টে দেখতে পেয়েছিলেন নিউ ইয়র্ক শহরে সন্ত্রাসীদের হানা দেওয়ার প্ল্যান। সেকেন্ড পার্টে দেখতে পাবেন ইউ কে এবং লন্ডনে টেররিস্ট হানার ছক। কিন্তু গাড়ি উলটে পড়ার সিনগুলো দেখে অবাক হচ্ছিলাম খুব, কারণ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, পুরোটা জাস্ট গ্রাফিক্স দিয়ে করা। একদিকে যখন ‘মগধীরা’ (২০০৯) বা ‘বাহুবলী’র (২০১৫-২০১৭) মতো সিনেমাগুলো সাউথের সিনেমা নিয়ে বিশেষ একটা বেঞ্চমার্ক সেট করে দিল প্রায়, তখন কমল হাসানের মতো লোকের ছবিতে কাঁচা হাতের এরকম আনাড়ি কাজ দেখতে ভাল লাগে কিনা, আপনি বলুন ভাই!

লন্ডনের এই অংশটা নিয়ে আরও যেটা বলার সেটা হচ্ছে, রাজেশ মেহতা (অনন্ত মহাদেবন) নামে যে হাই-প্রোফাইল লোকটিকে দ্যাখান হল এখানে, তার ক্যারেক্টারের কোন মাথামুণ্ডু খুঁজে পেলাম না যে আমি। সে আসলে শয়তান ওমরের সঙ্গে ঠিক কী ভাবে লিংকড, তার কিছুই তো স্পষ্ট নয় ছবিতে। ঈজাম যখন তার স্বরূপ ধরে ফেলেছে, আর আমিও যখন ভাবতে শুরু করেছি যে এবার বোধহয় ফাঁস হবে সেই মিস্ট্রি, তৎক্ষণাৎ পিস্তল বের করে সুইসাইড করল রাজেশ! আমি তো হাঁ! স্টোরির মেজর একটা ট্র্যাক এই ভাবে কারণ-টারন না দেখিয়ে একটা সুইসাইড দিয়ে শেষ করে দেওয়া যায় নাকি?

বা ইন্টারভ্যালের পরের ওই সিনটা ভাবুন, যেখানে হোটেলে বহু দূরে বসা দুই অফিসারের (‘র’ অফিসার কর্নেল জগন্নাথ আর সঙ্গে ভারত সরকারের কেষ্ট-বিষ্টু কেউ) কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে ঈজামের স্ত্রী নিরুপমা। অত দূর থেকে দুজনের কথা এরকম ভাবে শুনতে পাওয়া যায় কখনও নাকি? ফাইনাল এডিট হওয়ার পর সিনটা দেখতে গিয়ে খটকা লাগে নি কোন?      

আসুন এবার সমুদ্রের নিচে, যেখানে বহু বছর আগে ডুবে থাকা জাহাজের মধ্যে রাখা বোমা নিস্ক্রিয় করার কাজ করছেন ঈজাম। বোমাটা ফাটলে পুরো লন্ডন শহর ধুলো হয়ে যেতে পারে নাকি। এখানে মুশকিল হচ্ছে যে, একদম এই হুমকিগুলো তো আমরা পাঁচ বছর আগের সেই পার্ট ওয়ানেও শুনেছিলাম। এখানে তাহলে নতুন কী পাচ্ছি বলুন?

আর সত্যি বলতে কী, বোম দিয়ে শহর উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, আর তারপর সেই বোম খুঁজে বের করে সেটাকে ডি-অ্যাক্টিভেট করার স্টোরি তো ছোট স্ক্রিনে ‘স্যাক্রেড গেমস’-এ এর মধ্যেই দেখে ফেলেছি যে দাদা! তারপর বড় পর্দায় বাঁধা গতের এই কারবার দেখে মনে হবে না যে এটা বোধহয় বহু যুগের বাসি হয়ে যাওয়া চিজ!

ছবিতে চমকে যাওয়ার মতো ভাল মোমেন্টস যে নেই, তা নয়। ফ্ল্যাশ ব্যাকের ওই সিনটা ভাবুন, যেখানে গুলি খেয়ে অচেতন ঈজামকে চিকিৎসার জন্যে নিয়ে আসা হয়েছে আর্মি ক্যাম্পে, আর শক দিয়ে ফেরানোর চেষ্টা করানো হচ্ছে ওঁর হার্ট বিট – আর সেখান থেকে কেটে এক ঝটকায় গল্প চলে আসছে ২০১১ সালের ব্রিটেনে যেখানে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টের পর ধাক্কা মেরে চেতনা ফেরানো হচ্ছে ঈজামের। দেখে মনে হয়, বাহ, এই না হলে এডিট!

পলকের মধ্যে চোখের ভিতর ছুরি গেঁথে দেওয়ার সিন, বা মারপিট করার সময় মট করে একটা মেয়ের হাত পুরো উলটো দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে সেটা ভেঙে দেওয়ার সিন – ছবির এখানে ওখানে খুচরো এরকম ঝটকা রয়েছে ঠিকই।

কিন্তু এরকম অল্প কিছু ভাল লাগার রেশ দিয়ে একটা গোটা ছবি আপনি টেনে রাখবেন কী করে, কমল?

আর এ ছবির সবচেয়ে বড় রহস্যের তো কোন সমাধান হল না এখানে, স্যর!  ছবির ফার্স্ট পার্টের শেষে সেকেন্ড পার্টের যে ঝলকটা দ্যাখান হয়েছিল, সেখান থেকে এটা একেবারে স্পষ্ট যে সেকেন্ড পার্টের বেশির ভাগ অংশের শুটিং সারা হয়ে গেছিল তখনই। আলাদা করে কমলের একটা ইন্টারভিউতেও একই কথা পড়লাম।

তারপরেও এই পার্ট টু রিলিজ করাতে পাক্কা সাড়ে পাঁচ বছর লেগে গেল কেন, দাদা? এই রহস্যের কোন উত্তর এই ছবিটায় নেই!

যত দিন যাচ্ছে পাবলিকের তো হ্যাবিট হয়ে যাচ্ছে, মজা-টজা সব ইনস্ট্যান্ট খেয়ে ফ্যালার। একটা-একটা এপিসোড নয়, এখন একসঙ্গে সব এপিসোড বিঞ্জ-ওয়াচের যুগ! সেখানে একটা স্টোরির পার্ট টু দ্যাখার জন্যে বছরের পর বছর ধরে ওয়েট করবে লোকে, কোন লজিকে এই ভাবনাটা এল?

‘হিন্দুস্থানী’ (১৯৯৬) দ্যাখার পর আমি আপনার ফ্যান হয়ে গেছিলাম, কমল। এরপর ‘হে রাম’ (২০০০), ‘অভয়’ (২০০১), ‘ভিরুমানডি’ (২০০৪), ‘দশাবতারম’ (২০০৮), ‘পাপনাশম’ (২০১৫) যেন ছিল আপনাকে আলাদা আলাদা ভাবে আবিষ্কারের মত। ‘এক দুজে কে লিয়ে’ (১৯৮১), ‘পুষ্পক বিমান’ (১৯৮৭) বা ‘নায়কন’-এর (১৯৮৭) মত ছবির কথা ছেড়েই দিলাম না হয়।

সেরকম এক ফ্যানের কাছে এতদিন ধরে ওয়েট করার পর জোড়াতালি দেওয়া ‘বিশ্বরূপ টু’ দেখতে বসাটা যে কী যন্ত্রণার, কী করে বোঝাই সেটা বলুন।

১০ আগস্ট রিলিজ করেছিল ছবিটা। কী করে মানব বলুন কমল যে, ১৫ আগস্ট কলকাতার কোন হল-এ আর আপনার ছবি নেই!  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here