কার্ল মার্ক্স কি ভারত ও ভারতীয়দের ঘৃণা করতেন?

karl marx about India

আমেরিকার এক প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি একবার এক আলোচনায় বলেছিলেন, বামপন্থী হলেন যারা মার্কস পড়েন, আর ডানপন্থী হলেন যারা মার্কস বোঝেন।তবে মার্কসবাদ যে আর্ন্তজাতিক ক্ষেত্রে এখনও বহু আলোচিত বিষয় সে ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।সারা বিশ্বে এই মতবাদ ও দর্শন নিয়ে আলোচনা হওয়ার পাশে বহুদেশ শুধুমাত্র মার্কসবাদ বা মার্কসীয় অর্থনীতি মেনে কিভাবে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সে ব্যাপারেও যথেষ্ট আলোচনা চারদিকে হচ্ছে।আবার অন্যদিকে চীন সহ বেশ কিছু দেশ প্রথাগত মার্কসীয় দর্শন বা অর্থনীতি ছেড়ে এক উদার, দক্ষিণ পন্থী ও বামপন্থী অর্থনীতির মাঝামাঝি এক অর্থনীতির পথ মানছে।স্বাধীনতার আগে থেকেই আমাদের দেশে অনেকেই এই বামপন্থা বা মার্কসীয় দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ছিলেন।এই দর্শন কতটা ভুল বা ঠিক অথবা ভারতীয় অর্থনীতি বা সমাজ নীতিতে কতটা উপযোগী সে ব্যাপারে আলোচনা না করে একটু দেখা যাক মার্ক্স নিজে ভারতবর্ষের সমাজ, দর্শন বা অর্থনীতি সম্পর্কে কতটা সচেতন ছিলেন, বা আমাদের দেশকে কতটা শ্রদ্ধা করতেন?

কেননা আমাদের দেশের অনেকেই এখন এই দেশের সম্পর্কে খারাপ কথা বলে, দেশকে টুকরো করবার কথা বলে।হিন্দু ধর্মের ভাবাবেগে ক্রমাগত বিভিন্ন ভাবে আঘাত করে নিজেকে সেক্যুলার পরিচয় দেবার চেষ্টা করে, কিন্তু অদ্ভুত ভাবে এই সবের সাথে একটা বামপন্থা মানসিকতা জড়িয়ে থাকে বা আছে।তাদের মুখে কথায় কথায় মার্কসের ধর্মকে আফিমের সাথে তুলনা করবার কথা এসে যায়।আমাদের দেশে কেউ ভুলেও হিন্দু ধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্মকে আঘাত করে না, এমনকি খুব পরিষ্কার ভাবে বলতে গেলে আমাদের এই বাংলাতেই বামপন্থী রাজনীতিতে অনেক অন্য ধর্মের মানুষ আছেন, তাঁরা তাদের মত রাজনীতি করবার পাশে ধর্মচর্চাও করে যান, কেউ কিছু বলে না, কিন্তু বেশ কয়েক বছর আগে এক মন্ত্রী একটি হিন্দু মন্দিরে গিয়ে পুজো করবার পরেই তার দল তাঁকে শো’কস করেছিল।অর্থাৎ মার্কসীয় দর্শনে হিন্দুধর্ম পালন একটি অপরাধ, না হলে সেই মন্ত্রীকে এইরকম সমস্যাতে পড়তে হত না।এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই চলে আসে, বামপন্থীদের এই রকম মানসিকতা এল কেন, তাহলে কি বামপন্থার মূলেই কি হিন্দু ধর্মকে ঘৃণা করবার বীজ লুকিয়ে আছে ?

মার্কস, ভারত বা ভারতীয়দের সম্পর্কে কতটুকু জানতেন বা বুঝতেন এই ব্যাপারে সন্দেহ আছে, যদিও ভারতীয় ও মার্কসীয় দর্শনের মধ্যে তত্ব ও তথ্যগত ভাবে অনেক পার্থক্য।যেমন মার্কসীয় দর্শন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের (dialectic materialism) ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সেখানে ভারতীয় দর্শন যুক্তি তর্কও আধ্যাত্মবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত যার সম্পর্কে মার্কসের নিজের ধারণা ছিল, ‘ঘরের একটি তাকের মধ্যেই সমস্ত জ্ঞান সীমাবদ্ধ।’ আসলে মার্কসের কাছে ভারত মানেই ছিল একটি গরিব দেশ যারা ধর্ম ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না, বন জঙ্গলের পুজো করে, পশুদের পুজো করে, যে কারণে হনুমানকে তিনি কনুমান বলে ব্যাঙ্গ পর্যন্ত করেছেন, কালি তাঁর কাছে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধ্বংসের প্রতীক, এমনকি ভারতীয়দের জন্ম মৃত্যুর ধারণাও তাঁর কাছে ভারতীয়দের ক্ষয়ে যাওয়া শক্তি ও আত্মমর্যাদার বহিঃপ্রকাশ।তাঁর নিজের ধারণা ছিল ইংরেজ তথা পশ্চিমের মানুষ এই মূর্খ ভারতীয়দের শিক্ষিত করেছে।ভাবতে অবাক লাগে মার্কস নিজে এশিয়াটিক, ওরিয়েন্টাল প্রভৃতি শব্দগুলো প্রিমিটিভ বা প্রাচীন মতবাদের ভারতীয়দের বোঝাতে ব্যবহার করেছিলেন।

ভারতবর্ষের লোকসংখ্যার লাভ ক্ষতি বোঝার মত বিন্দুমাত্র মানসিকতা তাঁর ছিল না, সেই সময়কার সামাজিক প্রেক্ষাপট, তৎকালীন অর্থনৈতিক অবক্ষয়কে খুব সচেতন ভাবে এড়িয়ে গেছেন।ভারতীয় ধর্মের দ্বৈতবাদ, ত্যাগের মানসিকতাকে চরম সমালোচনা করেছেন।যদিও ধর্ম সম্পর্কে মার্কসীয় ধারণার মধ্যে আমরা চরম বৈপরীত ও জটিলতা খুঁজে পাই।তিনি একদিকে ধর্মকে বলেছেন চেতনাহীনদের চেতনা( soul of soul less condition),ধর্মকে আফিমের সাথে তুলনা করে বলেছেন, ‘ধর্ম সব সময় শাসকের হাতে থাকা অন্যতম শাসন যন্ত্র, যা দিয়ে খুব সহজেই দরিদ্র শ্রমিক শ্রেণিকে পদানত করা যায়।’ খুব ভালো চিন্তা।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল তিনি এই চিন্তা ভাবনা নিয়ে শেষ পর্যন্ত থাকতে পারলেন না।তাই আরেক জায়গায় তিনি বলেন, ‘ধর্ম হল সম্মিলীত প্রতিবাদের আরেক নাম, পরাজিতদের একত্রীকরণের উপায়।’ তিনি ভারতবর্ষের সিপাহী বিদ্রোহকে সমর্থন জানিয়েও একে ধর্মীয় বিদ্রোহ ছাড়া অন্য কিছু মানতে রাজি হন নি, বিশ্বাস করতেন যুদ্ধের পরিণাম যাইহোক যুদ্ধে হার হবে ভারতীয়দের কারণ এই যুদ্ধ কায়েমী স্বার্থে হয়েছে এবং একটি ‘matter of hysteria’। অন্যদিকে ভারতীয় মুসলিমদের এই বিদ্রোহর প্রধান কারিগর হিসাবে দাবি করেন।

বিশ্বজুড়ে যে মার্কসীয় ধারণা শ্রমিক কৃষকদের একত্রীকরণের কাজ করে বলে মনে করা হয় সেই মার্কসের ভারতীয় শ্রমিক বা কৃষকদের নিয়ে খুব একটা ভালো ধারণা ছিল না,তাই তাঁর কাছে ভারতবর্ষ মানে ব্যক্তিগত মালিকাধীনে থাকা কিছু জমিতে গরিব চাষিদের ধর্ম নিয়ে আন্দোলনের দেশ। ভাবতে অবাক লাগে যে মার্কসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমিক, কৃষক শ্রেণি সেই মার্কস ভারতীয় শ্রমিকদের নিজেদের তৈরী পোশাক পরবার ব্যাপারে বলেছিলেন,‘ইংরেজদের তৈরী পোশাক পরলেই তাদের বেশি সুবিধা, দাম কম, তাঁতীদের হাতে পোশাক তৈরী সভ্যতাকে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটা উপায় মাত্র।’ তাঁর একদিকে যেমন ধারণা ছিল ভারতবর্ষে কোনদিন বড় কোন শিল্প হবার সম্ভাবনা নেই, অন্যদিকে ভেবেছিলেন ভারতবর্ষের ধনতন্ত্র বলে কিছু নেই, হবেও না।

যদিও ভারতবর্ষ সম্বন্ধে এরকম ধারণা থাকলেও সেই সময়ে ভারতে শাসন করতে আসা ইংরেজদের সম্পর্কে তাঁর কিন্তু এক অদ্ভুত মানসিকতা ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন ব্রিটিশরা ভারতের মত দেশে একটা বিরাট সামাজিক দায়িত্ব পালন করছে এমনকি সেই সময় বৃহত্তর ভারত জুড়ে তাঁতী, চাষি ও অন্যান্য অনেক কুটির শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়লেও তিনি ব্রিটিশ শাসন ও শাসকদেরই প্রশংসা করেন, এমনকি আগামীদিনে ভারতবর্ষ এই শাসক ইংরেজদের জন্যেই তার নিজস্ব অজ্ঞানতা শেষ করে পশ্চিম সভ্যতার সাথে মিশে যাবে সেই ব্যাপারেও খুব আশা বাদী ছিলেন তিনি।তবে তাঁর জীবনের শেষদিকে তাঁর ভাবনা একটু বদলে যায়, তিনি ভাবতে আরম্ভ করেন ভারত- বর্ষ ব্রিটিশদের কাছে একটি শোচনীয় পরাজয় যা পরবর্তী কালে অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সাথে সুসম্পর্ক নষ্ট করতে পারে।

অর্থাৎ অনেক ভারতীয়দের কাছে মার্কস যতই গুরুদেব হোন ব্যক্তি মার্কস কিন্তু ভারতবর্ষকে ঘৃণা করতেন, স্বভাবতই তাঁর দীক্ষায় দীক্ষিত ভারতীয়দের এই দেশকে তো ঘৃণা করতেই হবে, এদেশের হিন্দু দেব দেবী, হিন্দু ভাবাবেগকে আঘাত করবার মধ্যেই তাদের প্রমাণ করতে হবে আমরা ভারতীয় না, মার্কসীয় সরি মার্কসবাদী।

Avatar
জন্ম ১৯৮১| ইংরাজিতে এম এ| নেশা কবিতা ও ছোট গল্প লেখা |

3 COMMENTS

  1. পুরোটাই লেখকের ব্যাক্তিগত মতামত। লেখক একেবারেই ভাবলেননা যে who cares about his personal opinion. বাংলা লাইভ ছাড়া কোনও কাগজ এটা ছাপবে না। একবারের বেশী পড়লে বমি পরাব উপক্রম হয়।

  2. I must thank you for this article. I did some reading on this particular topic and cannot agree with you more on your findings. I hope you will work on similar topics in the future. The fake narratives that were force-fed to us must be challenged with facts. Good luck!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here