ছেলে রাহুলের ন’বছর বয়সে দেওয়া সুর বাবা শচীন দেব বর্মন ব্যবহার করেছিলেন ছবিতে

11000

এ ছেলে যে একেবার পঞ্চম স্বরে কাঁদে | কী করে এর নাম টুবলু হবে !

ছেলের ডাকনাম পাল্টে দিলেন শচীনকর্তা | দাদুর দেওয়া টুবলু নাম হয়ে গেল পঞ্চম | কিন্তু কে আর তখন ভেবেছিল ত্রিপুরার রাজবংশের এই উত্তরাধিকারের আজীবনের সঙ্গী হবে নিঃসঙ্গতার কান্না |

জীবনের শুরুটা অবশ্য ছিল রঙিন ডানায় ভর করে | জন্ম কলকাতায় | ১৯৩৯ সালের ২৭ জুন | শচীন দেব বর্মন ও মীরা দেব বর্মনের একমাত্র ছেলে |

কোন বয়স থেকে সুর দিচ্ছেন নিজেরও মনে ছিল না | মাত্র ন’বছর বয়সে একটা সুর দিয়েছিলেন | বালক পঞ্চমের দেওয়া সেই সুর ব্যবহার করেছিলেন শচীনকর্তা | ১৯৫৬ সালের ফান্টুস ছবিতে | সেই গান হল আয়ি মেরি টোপি পালট কে আ | তারপর গুরু দত্তের প্যায়সা ছবির সর জো তেরা‚ সেটাও কিন্তু পঞ্চমের সুর |

বাবার সহকারী হয়ে কাজ শিখেছেন‚ কাজ করেছেন দীর্ঘদিন | হারমোনিকা বাজাতেন অর্কেস্ট্রায় | অনেকেই বলেন‚ আরাধনা ছবির সুরকার বকলমে পঞ্চমই |

স্বাধীন সুরকার হিসেবে প্রথম কাজ মেহমুদের ছবি ছোটে নবাব-এ | মেহমুদ চেয়েছিলেন এস ডি-কেই | কিন্তু তাঁর সময় না থাকায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন | মেহমুদ নিজেই সুযোগ দিয়েছিলেন পঞ্চমকে | সেই বন্ধুত্ব অটুট ছিল |

পঞ্চম পরিচিত হলেন তারকা সুরকার রাহুলদেব বর্মন হয়ে‚ যখন মুক্তি পেল তিসরি মঞ্জিল | ১৯৬৬ সালে | এরপর একে একে কাটি পতঙ্গ‚ ইয়াদোঁ কে বরাত‚ গাইড‚ শোলে‚ কুদরত‚ পরিচয়‚ মেহবুবা‚ শান‚ সাগরপ্রায় দু দশক ধরে তিনি বলিউডের একচ্ছত্র সুরসম্রাট |

নোটেশনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও তখন রোম্যান্স | খ্যাতির মধ্যগগনে রাহুল তখন দার্জিলিঙে | তাঁকে দেখে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরলেন এক তরুণী ভক্ত | আর ডি বর্মনের সঙ্গে ডেট করবেন | বাজি জিতলেন সেই তরুণী‚ রীতা পটেল | শুধু ডেটিং-এই থেমে রইল না সম্পর্ক |

১৯৬৬ সালে বিয়ে করলেন রাহুল-রীতা | মাত্র ৫ বছর স্থায়ী হয়েছিল সেই দাম্পত্য | এরপর দীর্ঘ ৯ বছরের অপেক্ষা | ১৯৮০ সালে আশা ভোঁসলেকে বিয়ে করেন রাহুল দেব |

দুজনের পরিচয় দীর্ঘদিনের | গানের মধ্যে দিয়েই তৈরি হয়ে যায় পারস্পরিক নির্ভরশীলতা | দুজনেরই ভেঙে গেছে প্রথম বিয়ে | ১৯৬০ সালে আশা ভোঁসলে শেষ করে দিয়েছিলেন প্রথম দাম্পত্য | বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল প্রথম স্বামী গণপতরাও ভোঁসলের সঙ্গে | তার দীর্ঘ দু দশক পরে ফের ঘর বাঁধা এক সুরপাগলের সঙ্গে | আশা তখন দুই ছেলে‚ এক মেয়ের মা | আর . ডি-র থেকে বয়সে ছ বছরের বড় |

তাঁদের দুজনের মানসিকতা‚ পটভূমি সব ছিল দুই মেরুর | সুর দিয়ে মুছতে চেয়েছিলেন সেই ব্যবধান | সম্পূর্ণ সফল হয়তো হননি | কিন্তু দুজনে চেষ্টা করে গেছেন |

দুজনেই ছিলেন সু-রাঁধিয়ে | বাড়িতে প্রায়ই লেগে যেত কপট কলহ | কে ভাল রান্না করে‚ এই নিয়ে | সত্যি ঝগড়াও হতো | স্বামীর প্রতি অনুযোগ ছিল আশার | আর. ডি সব ভাল ভাল প্রেমের গান দিয়ে দেন দিদি লতাকে | আর ক্যাবারে‚ জ্যাজ প্রধান গান থাকে আশার জন্য | এই নিয়ে বাকবিতণ্ডাও কম হয়নি | পরবর্তীকালে আশা নিজেই জানিয়েছেন একাধিক সাক্ষাৎকারে |

উত্তরে নাকি রাহুলদেব বলতেন আশাকে‚ ওই গানগুলো একমাত্র আশাই পারবেন সঠিকভাবে গাইতে | নিজের কাছে‚ সবার কাছে এতটাই অকপট ছিলেন তিনি |

আর ছিলেন বৈষয়িক দিকে উদাসীন | জানতেন না কেমন দেখতে হয় হিরে | আর্থিক দিক দিয়েও পড়েছেন সঙ্কটে | আটের দশকের শেষে সংসার ও কেরিয়ার‚ দু দিক দিয়েই তিনি বিধ্বস্ত |

১৯৮৬ সালে সুর দিয়েছিলেন ‘ইজাজত’ ছবিতে | অসামান্য এবং অনবদ্য বললেও কম বলা হয় | কিন্তু তা থেকে যায় সমান্তরাল ছবি হয়েই | বাণিজ্যিক ছবিতে তখন রাহুল দেবের জাদুকে ধীরে ধীরে গ্রাস করেছে বাপ্পি লাহিড়ি নামে একটি নামের ছায়া | পরপর ছবি ফ্লপ করায় মুখ ফিরিয়ে নেন অতি ঘনিষ্ঠ প্রযোজক-পরিচালকও |

বিবাহবিচ্ছেদ না হলেও তখন কার্যত আলাদা থাকতেন রাহুল-আশা | যাঁর সুরে হিন্দি ছবিতে এসেছিল বৈপ্লবিক পরিবর্তন‚ এক বিন্দুতে এসে মিলেছিল প্রাচ্য-পাশ্চাত্য‚ সেই আর ডি বর্মন কিনা হয়ে গেলেন ব্রাত্য ! মানতে না পারায় ডুবে গিয়েছিলেন একাকীত্ব আর অবসাদের নিঃসঙ্গতায় |

পাশে পেয়েছিলেন গুটিকয়েক মুখকে | তাঁদের মধ্যে একজন বিধুবিনোদ চোপড়া | তাঁর ‘১৯৪২ : আ লভ স্টোরি’-তে পঞ্চম ফিরে এসেছিলেন ফিনিক্স পাখি হয়ে | যখন সবাই সেই উত্তরণ দেখল‚ তখন‚ পাখি নিজে অবশ্য খাঁচা ছেড়ে চলে গিয়েছে বহুদূরে | ছবির মুক্তি বা গানের জনপ্রিয়তা‚ দেখে যেতে পারেননি কোনওটাই | এই ছবির জন্য পেয়েছিলেন মরণোত্তর তথা তৃতীয় ফিল্মফেয়ার পুরস্কার | তার আগের দুটি এসেছিল ১৯৮৩ সালে‚ ‘সনম তেরি কসম’ এবং ১৯৮৪ সালে‚ ‘মাসুম’ ছবির সঙ্গীত পরিচালনার জন্য |

যাঁর হাত ধরে এক লাফে বহু আলোকবর্ষ এগিয়েছিল‚ সাবালক হয়েছিল হিন্দি ছবি সেই সুরকারের ঝুলিতে মাত্র তিনটি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড !নমিনেশন পেয়েছিলেন আরও চোদ্দবার ! সেইসঙ্গে একবার গায়ক হিসেবেও | শোলের সেই বিখ্যাত মেহবুবা মেহবুবা-র জন্য |

এত অবমাননা সহ্য করতে না পেরেই বোধহয় বড্ড তাড়াতাড়ি চলে গেলেন তিনি | ১৯৯৪-এর ৪ জানুয়ারি | মাত্র ৫৪ বছর বয়সে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.