পিতামহ ভীষ্মর জীবনে স্বেচ্ছামৃত্যু কি সত্যি আশীর্বাদ ছিল ? নাকি অভিশাপ ?

3196

জীবনে যা সর্বোচ্চ সত্য ও শাশ্বত‚ সেই মৃত্যু নিয়ে সবথেকে বেশি শঙ্কিত থাকে মানুষ | শঙ্কামোচনের উপায় স্বরূপ যদি স্বেচ্ছামৃত্যুর আশীর্বাদ থকে‚ এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বোধহয় আর কিছু হয় না | মহাকাব্যে যে এই আশীর্বাদ পেয়েছিলেন আজ তাঁকে নিয়েই কতিপয় কথা | কিন্তু সত্যি স্বেচ্ছামৃত্যু আশীর্বাদ ছিল ? নাকি পিতামহ ভীষ্মর কাছে তা ছিল প্রকৃতপক্ষে এক অভিশাপ ?

ভীষ্মর জন্মের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে এক অভিশাপের আখ্যান | ঋষি বশিষ্ঠের আশ্রমে গিয়েছিলেন সস্ত্রীক অষ্টবসু | সেখানে ঋষির বিখ্যাত গাভী কামধেনুর প্রতি লোভাতুর হয়ে পড়েন প্রভাস নামক বসুর স্ত্রী | বারবার স্বামীকে অনুরোধ করতে থাকেন‚ ওই গাভী তাঁর চাই | শেষে স্ত্রীর আব্দারে পদস্খলন স্বামীর | বাকি বসুদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে চুরি করলেন কামধেনু | কিন্তু বশিষ্ঠের নজর এড়ানো সহজ নয় | কুপিত ঋষি অভিশাপ দিলেন | অষ্টবসুকে মনুষ্য জন্ম নিতে হবে | বাকি সাত বসু এভাবে রক্ষা পেলেন যে তাঁরা জন্মাবেন কিন্তু দুঃখ কষ্ট কিছু ভোগ করবেন না | কিন্তু যেহেতু প্রভাস সরাসরি জড়িত কামধেনু হরণে‚ তাঁকে অভিশাপ বহন করতেই হবে |

মর্ত্যে রাজা শান্তনু বিবাহ করলেন গঙ্গাকে | তাঁদের সাত সন্তান হয়ে পরপর জন্ম নিলেন সাতজন বসু | কিন্তু নবজাতকদের গঙ্গায় ভাসিয়ে দিলেন স্বয়ং মা গঙ্গা | তিনি বিবাহপূর্বেই শর্ত দিয়েছিলেন এই আচরণ নিয়ে কোনও প্রশ্ন করতে পারবেন না স্বামী শান্তনু | এভাবে সাত বসু শাপমুক্ত হলেন | অষ্টম পুত্র হিসেবে জন্ম নিলেন প্রভাস | এ বার আর রাজা শান্তনু নিজেকে সংযত করতে পারলেন না | অনুসরণ করলেন মহিষী গঙ্গাকে | এই মর্মান্তিক কাজে বাধা দিলেন স্ত্রীকে | তিনি তো আর জানতেন না এভাবে অষ্টবসু শাপমুক্ত হচ্ছেন | 

বাধা পেয়ে প্রতিশ্রুতিমতো গঙ্গা বিসর্জন দিলেন না সদ্যোজাতকে | রাজা শান্তনুর পুত্রের নাম হল দেবব্রত |  উপযুক্ত রাজপুত্র হয়ে বড় হতে লাগলেন তিনি | অস্ত্র শস্ত্র বিদ্যায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষা লাভ করলেন তিনি | গুরু বৃহস্পতি তাঁকে শেখালেন রাজকর্তব্য বা দণ্ডনীতি | শুক্রাচার্য শিক্ষাদান করলেন রাজনীতি বিষয়ে | বশিষ্ঠের কাছে শিখলেন বেদাঙ্গ | সর্বোপরি‚ পরশুরামের কাছে পেলেন অস্ত্রশিক্ষা |

রাজা শান্তনুর পরে সিংহাসনে আসীন হবে যুবরাজ দেবব্রত‚ এ বিষয় নিশ্চিত ছিল হস্তিনাপুর | বাধ সাধলেন সত্যবতী বা মৎস্যগন্ধার ধীবর পিতা | ধীবররাজ বললেন‚ তিনি শান্তনুর সঙ্গে কন্যার বিবাহ দেবেন না | কারণ শান্তনুর সুযোগ্য পুত্র রয়েছে | তাঁর কন্যা সত্যবতীর পুত্ররা তো সিংহাসনের অধিকার পাবেন না | কারণ যুবরাজ দেবব্রত রাজা শান্তনুর জ্যেষ্ঠ সন্তান | 

দ্বিতীয় দার পরিগ্রহে পিতার যাতে সমস্যা না হয়‚ দেবব্রত কঠিন প্রতিজ্ঞা করলেন | তিনি কোনওদিন সিংহাসনের দাবিদার হবেন না | আজীবন ব্রহ্মচর্য পালন করে যাবেন | যাতে তাঁর উত্তরাধিকার এসেও ওই সিংহাসন দাবি না করতে পারে | নিজে রাজা না হলেও শেষ বিন্দু অবধি সেবা করবেন হস্তিনাপুর রাজ্য এব্ং তার রাজার | এবং তাঁর এই প্রতিজ্ঞার জন্য পিতা শান্তনুকে কোনওভাবেই যেন দোষারোপ না করা হয় | এই কঠোর প্রতিজ্ঞার জন্য তাঁর নাম হল ভীষ্ম | দেবভাষায় যার অর্থ যিনি কঠিন প্রতিজ্ঞা ধারণ করেন | পুরস্কার স্বরূপ পিতা শান্তনু তাঁকে বর দিলেন স্বেচ্ছামৃত্যুর | 

নিজের মৃত্যুফাঁদ নিজেই পাতলেন ভীষ্ম | সৎভ্রাতা বিচিত্রবীর্যের জন্য কাশীরাজের তিন কন্যা অম্বা‚ অম্বিকা‚ অম্বালিকাকে হরণ করলেন স্বয়ংবর সভা থেকে | বড় বোন অম্বা ছিলেন শল্যরাজের বাগদত্তা | ভীষ্মের পথে শল্যরাজ বাধা দিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন | দুজনের মধ্যে ভীষণ সমরে ভীষ্মের আঘাতে মারাত্মক আহত হলেন শল্যরাজ | পরাজিত হয়ে প্রত্যাবর্তন করলেন | হস্তিনাপুরে এসে অম্বা জানালেন তিনি শল্যরাজের প্রেয়সী তথা বাগদত্তা | 

এ কথা জেনে ভীষ্ম তাঁকে তৎক্ষণাৎ ফিরে যেতে বললেন | প্রত্যাবর্তন করলেন অম্বা | কিন্তু পরাজিত লজ্জিত শল্য তাঁকে আর গ্রহণ করলেন না | অপমানিত অম্বা ভীষ্মকে বললেন বিবাহ করতে | কিন্তু ভীষ্ম তো নিজের প্রতিজ্ঞা থেকে বিচ্যুত হবেন না | অম্বার অনুরোধে ভীষ্মর বিপক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন পরশুরাম | শিক্ষকের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করলেন ভীষ্ম | তবু সরলেন না নিজের দায়বদ্ধতা থেকে | তেইশ দিন ধরে চলেছিল দুই মহারথীর সমর | তা অমীমাংসিত থেকে যায় | সব বিফলে গেল দেখে অম্বা মহাদেবের তপস্যা করলেন | বর পেলেন‚ তিনি পরজন্মে ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হবেন |

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি পাণ্ডু বা ধৃতরাষ্ট্রর কোনও পুত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবেন না | তিনি জানতেন কৌরবরা অধর্মের পথের শরিক | কিন্তু তিনি তো প্রতিজ্ঞা করেছিলেন জীবনভর হস্তিনাপুরের সিংহাসনের সেবা করবেন | সেই বচন রক্ষায় ভীষ্ম কৌরব পক্ষেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হন | প্রতিদিন বিপক্ষের এক হাজার সেনা এবং এক হাজার রথ তিনি ধ্বংস করতেন | 

কিন্তু পাণ্ডব ভ্রাতাদের আঘাত করছেন না দেখে দুর্যোধন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন | শেষে বৃদ্ধ পিতামহ বলেন‚ হয় তিনি অর্জুনকে বধ করবেন | নয়তো শ্রীকৃষ্ণকে বাধ্য করবেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধকালে অস্ত্র ধারণ করতে | কারণ কৃষ্ণ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি যুদ্ধে কোনও অস্ত্র স্পর্শ করবেন না | সেইমতো যুদ্ধে অর্জুনকে তীব্র আক্রমণ করলেন ভীষ্ম | সব জানতেন জনার্দন কৃষ্ণ | তিনি একটি রথের চাকা নিয়ে বাধা দিলেন ভীষ্মকে | এতে সবদিক রক্ষ হল | অর্জুনবধে নিবৃত্ত হলেন ভীষ্ম | 

অপ্রতিরোধ্য পিতামহ ভীষ্মকে প্রতিহত করতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের দশম দিনে কৃষ্ণের পরামর্শে রথের অগ্রভাগে ধ্রুপদরাজের সন্তান শিখণ্ডীকে রাখলেন অর্জুন | এক অ-পুরুষকে দেখে অস্ত্র স্পর্শ করলেন না ভীষ্ম | কারণ শিখণ্ডী ছিলেন নপুংসক | নিরস্ত্র পিতামহকে পরপর শরাঘাতে বিদ্ধ করলেন অর্জুন | কিন্তু তাঁকে ভুলুণ্ঠিত হতে দিলেন না | শরশয্যায় থাকলেন পিতামহ | ওই অবস্থায় চাইলেন একটি উপাধান | কারণ তাঁর মাথা ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল | নানা জনে এসে রেশম ইত্যাদির নান উপাধান নিয়ে এল | কিন্তু পিতামহ জানতেন তিনি কী চাইছেন জানেন শুধু অর্জুন | তুণীর থেকে তিনটি বাণ নিয়ে পিতামহর মাথার নিচে শর উপাধান রচনা করলেন অর্জুন | তৃষ্ণা নিবারণে শরাঘাতে ভূমি থেকে জলধারা বের করে আনলেন | কথিত‚ স্বয়ং মা গঙ্গাই বর্ষিত হয়েছিলেন পুত্রের কণ্ঠে | 

শরশয্যায় ৫৮ রাত ছিলেন পিতামহ | ওই অবস্থাতেই সাক্ষী ছিলেন সমগ্র যুদ্ধের | তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে দেখেন কৌরব ও পাণ্ডব পক্ষকে | কুন্তীর সন্তানরা জীবিত ছিলেন | কিন্তু পাণ্ডব পক্ষ সামগ্রিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল | অপেক্ষাবসানে উত্তরায়ণের প্রথম দিনে‚ মাঘমাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে মৃত্যুবরণ করে স্বর্গারোহণ করেন ভীষ্ম | 

মহাকাব্যিক বিচার কী বলে ? অবিনশ্বর মরণের রাশ কি নিজের হস্তে থাকা ভাল ? পিতামহ ভীষ্মর জীবনে কি প্রকৃত আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল স্বেচ্ছামৃত্যু ? নাকি তাঁর ইহজীবন ছিল দায়বদ্ধতার প্রতি উৎসর্গীকৃত ?

Advertisements

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.