কিউপিড রইলেও নিজের স্থান হারালেন প্রেমের প্রতীক মদনদেব

649

মদনদেব না থাকলে কী করে কুরূপা থেকে সুরূপা হতেন রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা ? কিন্তু এই মদনদেব বা কামদেব হিন্দুশাস্ত্র বা হিন্দু দেবদেবীর মধ্যে সেভাবে উল্লেখিতই হন না | প্রায় নামমাত্র তাঁর উপস্থিতি | অথচ ঋকবেদে তাঁর উল্লেখ আছে | বিস্তারিত মহিমাও বর্ণিত হয়েছে সেখানে | কামনার দেবতা তিনি‚ তাই কামদেব | টিয়াপাখি তাঁর বাহন | আখের ধনুক এবং ফুলের বাণই তাঁর অস্ত্র | তির ধনুক ঘিরে গুঞ্জরিত হয় এক ঝাঁক মৌমাছি | মদনদেবের শরাঘাতে কামবিদ্ধ হতে বাধ্য দেবতারাও‚ মানুষ তো বটেই | 

বৈদিক বা ভারতীয় সভ্যতায় যেমন কামদেব‚ প্রাচীন গ্রীক সভ্যতায় তেমনই এরোস এবং রোমান সভ্যতায় কিউপিড | বলা হয়‚ মহাদেবের তপস্যায় বিঘ্ন ঘটিয়েছিলেন মদনদেব | ফলে তিনি দেবাদিদেবের রোষের শিকার হন | তাঁকে ভস্মে পরিণত করা হয় | এরপর হর পার্বতীর বিবাহ হলে আবার জীবন ফিরে পান মদনদেব | কিন্তু তিনি নিজের হারানো জায়গা পুনরুদ্ধার করতে পারেননি | ফিরে আসতে পারেননি প্রথম সারির শক্তিশালী দেবতাদের মধ্যে |

কিন্তু কেন এমন হল ? হতে পারে এর জন্য সক্রিয় দুটি কারণ | বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে মদনের কিছুটা রূপান্তর ঘটে | তিনি হয়ে যান ভগবান বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর পুত্র | এরপর বৈষ্ণব সাহিত্যের যুগে আরও কিছুটা পিছিয়ে পড়লেন তিনি |  ক্রমে মহাভারতের কূটনীতিক শ্রীকৃষ্ণ পাল্টে গিয়েছেন প্রেমিক অবতারে | তাই‚ প্রেমের প্রতিভূ হিসেবে তিনিই এগিয়ে এলেন‚ মদনদেবকে পিছনে ফেলে | রাধিকা ও গোপিনীদের নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ তখন আদর্শ প্রেমিক | মদনলীলাও হয়ে গেল শ্রীকৃষ্ণের রসমণ্ডিত রসলীলা বা রাসলীলা |

দৈনন্দিন জীবন থেকে কামদেবের মিলিয়ে যাওয়ার আরও একটি কারণ হতে পারে কাম-কে নিয়ে হিন্দু সমাজের দুই চরম অবস্থান | মানুষের জীবনের খুব স্বাভাবিক এই চাহিদার মেরুকরণ করা হয় | হয়‚ একে দার্শনিক রূপ দেওয়া হয় | কামনা-বাসনা-আকাঙ্খা সব মিলিমিশে একটা রূপ যা অত্যন্ত ইন্টেলেকচুয়াল‚ সাধরণ মানুষের বোধবুদ্ধির বাইরে | নয়তো‚ শরীরী কামনা‚ যা পাপ এবং বর্জনীয় | এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে মদনদেব হারিয়ে গেলেন | সমাজের সাধারণ মানুষ ভাবল এই দেবতার পুজো করে না করলেও ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না |

অথচ কয়েকশো বছর আগেও ছবিটা এরকম ছিল না | ঐতিহাসিক তথা দার্শনিক বি.জি গোখলে বর্ণনা করেছেন‚ কাম ছিল এমনই একটি উপায় যার মাধ্যমে মানুষ উপভোগ করত অনাবিল আনন্দ | তার উদযাপনেও কোনও ফাঁক থাকত না | সূক্ষ্ম বস্ত্র‚ অবশ্যই সুরভিত ও অলঙ্কৃত‚ মূল্যবান পাথর খোদিত গয়না‚ প্রসাধনী‚ চন্দন লেপন‚ ফুল‚ ফুলের মালা‚ সুগন্ধি দেওয়া পান‚ সুস্বাদু মশলাদার খাবার এবং অবশ্যই সুরা‚ কামকে আহ্বান করার জন্য থাকত সব উপকরণই | 

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাহাত্ম্য হারাল কাম | গুরুত্বপূর্ণ স্থান হারালেন কামদেব | দেবতা থেকে হয়ে গেলেন উপদেবতা বা Demi God | সাহিত্যে নামমাত্র উপস্থিতি থাকলেও তাঁর মন্দির খুঁজে পাওয়া দুষ্কর | এমনকী মন্দিরের গায়ে যে ভাস্কর্য আছে‚ সেখানেও তিনি প্রায় নেই | ওড়িশার ভুবনেশ্বর মন্দির বা ইলোরার কৈলাস মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে তাঁর মূর্তি আছে | তবে কামদেব ও তাঁর স্ত্রী রতির সবথেকে শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য আছে কাঠের উপর | যা সংরক্ষিত হায়দ্রাবাদের সালারজং মিউজিয়মে | 

মধুঋতু সমাগমে কিউপিড উজ্জ্বল সর্বত্র | কিন্তু আমাদের নিজস্ব প্রেমের দেবতাকে ভুলে গিয়েছি আমরাই |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.