(দিয়েছ শুধু অপমান‚ লাঞ্ছনা‚ শারীরিক নির্যাতন; তাই হে পুরুষ প্রয়োজন ফুরিয়েছে তোমার | পুরুষ-নিষিদ্ধ এই গ্রামে মেয়েরাই ক্ষমতার উৎস | জিনওয়ার – রূপকথার এক বাস্তব স্বপ্নভূমি…)

অহরহ গুলির শব্দে প্রাণ ওষ্ঠাগত। জন্ম থেকেই যুদ্ধ-বিদ্রোহ এবং গোলাগুলিকে সঙ্গী করে বড় হয়ে ওঠা, তারপর দিন কেটেছে অনিশ্চিত জীবনের স্রোতে। সেইসঙ্গে ছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নির্মম অত্যাচার। কিন্তু একদিন সমস্ত ধৈর্য্য ও সহ্যের বাঁধ ভাঙল। ঘুরে দাঁড়ালেন তাঁরা। হাতে তুলে নিলেন অস্ত্র। সমস্ত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শিকল ছিঁড়ে বেড়িয়ে এলেন নিজের পায়ে দাঁড়াবেন বলে। বিষয়টি গল্পের মতো মনে হলেও এই ঘটনা দিনের আলোর মতো সত্যি।

পৃথিবীতে এমন জায়গাও রয়েছে, যেখানে মেয়েরা এইভাবে ভাবতে পেরেছেন। খুব জানতে ইচ্ছে করছে তো কোথায়? সিরিয়া সংলগ্ন একটি ছোট্ট গ্রাম, নাম জিনওয়ার। এই গ্রামে কোনও পুরুষের প্রবেশাধিকার নেই। যাঁরা বসবাস করেন তাঁরা সকলেই মহিলা।পুরুষতন্ত্রের বাঁধন ছিঁড়ে একা থাকার সিদ্ধান্ত একেবারেই তাঁদের নিজস্ব। তাঁরা নিজেদের চেষ্টায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে পুরুষদের গ্রাম ছাড়া করেছেন। কিন্তু কেন এই পথে হাঁটলেন তাঁরা? পৃথিবীর প্রায় সব কোণেই নারীরা প্রতিনিয়ত শোষিত হয়েছেন পুরুষের হাতে। কিন্তু পুরুষ সমাজকে বাদ দিয়ে কেউই নিজেদের চলার পথ বেছে নেন নি। বরং শত কঠিন পরিস্থিতিতেও পুরুষের ছত্রছায়াতেই জীবন কাটিয়েছেন মহিলারা।

Banglalive-8

Banglalive-9

এর পিছনে রয়েছে এক মর্মান্তিক কাহিনি। জিনওয়ার গ্রামের মহিলাদের কেউ বা আইসিস জঙ্গিদের হাতে দীর্ঘদিন ধরে থেকেছেন যৌনদাসী হয়ে, কেউ আবার প্রতিনিয়ত পাশবিক অত্যাচার সহ্য করে কাটিয়েছেন দিন, কারও স্বামীকে হত্যা করেছে জঙ্গিরা, কারওর আবার স্বামী-সন্তান দু’জনকেই হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। কেউ বা দিনের পর দিন জঙ্গিদের দ্বারা ধর্ষিত হয়ে অকালেই সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েছেন। এক সময়ে এই গ্রামেই পুরোপুরি কোণঠাসা ছিল এই গ্রামের মেয়েরা। খুব ছোট বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় অনেকেরই পরিবার-পরিজন বলতে কিছুই ছিল না। দাসত্ব এবং নির্মম মৃত্যুপুরী থেকে বেরিয়ে আসাই তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল। তাই এই গ্রামের প্রত্যেক মহিলার কণ্ঠে উঠে এসেছে পুরুষের বিরুদ্ধে রাগ-ঘৃণা-অভিযোগের সুর। তাই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার আগে ঘুরে দাঁড়ান আর নিজেদের প্রচেষ্টাতেই যুদ্ধের বাতাবরণ থেকে নিজেদের গ্রামকে বাঁচিয়ে আনেন তাঁরা।

আরও পড়ুন:  আকাশকুসুম চাকরি ! কিছুই করতে হবে না‚ অথচ হাতে মোটা বেতনের নগদনারায়ণ

এখন তাঁরা নিজেদের ও সন্তানদের প্রতিপালনে যথেষ্ট পটু। নিজেরাই চাষাবাদ করেন, জমিতে সার দেন, ফসল ফলান এবং সেই ফসল বাজারে বিক্রি করে রোজগারও করছেন সম্পুর্ণ নিজেদের চেষ্টায়। সেই উপার্জনের টাকায় হাল ধরেছেন গোটা সংসারের। এছাড়াও গোটা গ্রামের সামাজিক অবস্থা এবং অর্থনীতিকে সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য নিজেরাই ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নিজেরাই পরিচালনার ভার কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছে এক অদ্ভূত সাম্প্রদায়িক মেলবন্ধন। একই রান্নাঘরে তৈরি করা খাবার সকলে ভাগ করে খান। সেইসঙ্গে শিশুদের জন্য বানিয়েছেন স্কুল,  লালন করেন পোষ্যদেরও।

শুধু তা-ই নয়। নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্বও তাঁরা নিজেরাই সামলাচ্ছেন। জিনওয়ার গ্রামে ঢোকার মুখে প্রকাণ্ড আকারের দরজা তৈরি করেছেন তাঁরা। সেইসঙ্গে গ্রামে ঢোকার মুখে ফটকের সামনে বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন বেশ কিছু মহিলা। সেই গেটের ওপারে প্রবেশ করতে পারেন না কোনও পুরুষ। নিজেদের ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার বজায় রাখতে কোনওরকম আপস করেন না। গেটে বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ওই গ্রামের এক মহিলার কথায়, তাঁদের জীবনে পুরুষের প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তাই আর ওই গ্রামে কোনও পুরুষকে আর ঢুকতে দিতে চান না তাঁরা। এতদিন তাঁরা অনেক অত্যাচার সহ্য করেছেন, মার খেয়েছেন, অনেক প্রাণও হারিয়েছেন, কিন্তু আর নয়, এখন তাঁদের মাথা উঁচু করে বাঁচার সময়।

জিনওয়ার পেরোলেই চোখে পড়বে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার সীমানা। আইসিস জঙ্গিদের কালো পতাকা আর প্রতিনিয়ত গ্রেনেডের বিস্ফোরক শব্দে কার্যত শ্মশানে পরিণত হয়েছে ছোট্ট এই দেশটি। জিনওয়ার গ্রামের বাসিন্দা ২৮ বছরের তরুণী জায়নাব গাভারির কথায় তাঁদের গ্রাম পুরোপুরিভাবেই নারী-অধ্যুষিত। এখানে বসবাসকারী মহিলারা জীবনের কুৎসিত দিকটি দেখে এসেছেন। কিন্তু, আজও তাঁরা চান নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে, নিজেদের জন্য কিছু করতে। নারীরা যেখানে শক্তির আধার, সেখানে তাঁরা মন থেকে কিছু চাইলে সেই লক্ষ্যে অবশ্যই পৌঁছোতে পারবেন বলেই মনে করেন তাঁরা। আর তাই গোটা বিশ্বের কাছে সাদরে সমাদৃত হয়েছে সিরিয়ার এই জিনওয়ার গ্রাম।

আরও পড়ুন:  বিশ্বের কিছু কুখ্যাত কারাগার যেখানে বেঁচে থাকাটাই নির্মম শাস্তি

NO COMMENTS