জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

অনেকদিন ধরে চেষ্টা করেছি, পারি নি। অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি যদি একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট জোগাড় করা যায়, …না, কেউ কোন খবর দিতে পারে নি। বরং সবাই আমার কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। বলেছে, আমি নাকি বাড়াবাড়ি করছি। আমি বোঝাবার চেষ্টা করেছি যে, আমাদের পেশায় বাড়াবাড়ি বলে কিছু হয় না। আরে বাবা, আমি যদি কৃষ্ণ, ভূতের রাজা, বিদ্যাসাগর বা গব্বর সিং-এর সাক্ষাৎকার নিতে পারি তাহলে এটা পারবো না কেন ? কিন্তু কেউ আমার পাশে থাকে নি।

Banglalive

আমিও হাল ছাড়ার পাত্র নয়। ওনার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বিভিন্ন দিক দিয়ে চেষ্টা করে গেছি। হটাৎই আমার এক সাংবাদিক বন্ধুর কাছ থেকে সুদামার ফোন নং পেলাম। ও বললো সুদামা একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারে। ফোন করে সুদামাবাবুর সঙ্গে দেখা করলাম। সব শুনে উনি বললেন অসম্ভব, ওনার কথা রাধাদেবী শুনবেন না। একটা সামান্য বিষয় নিয়ে রাধাদেবী নাকি ওনার জীবন নষ্ট করে দিয়েছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী ঘটনা ? আমাকে বলা যায় ? উনি বললেন, ‘সে অনেকদিন আগের কথা। কৃষ্ণ তখন পৃথিবীর মানুষকে প্রেম শেখাচ্ছে। আমি  ওনার ছায়াসঙ্গী। রাধাদেবীর সঙ্গেও কৃষ্ণর সম্পর্কটাও বেশ সেটেলড। এই সময় কৃষ্ণ একদিন গোপিনী বিরজার সঙ্গে প্রেমালাপে ব্যস্ত। রাধাদেবী খবরটা পেয়ে একেবারে হাতেনাতে ধরবেন বলে ছুটতে ছুটতে আসছেন। আমার অপরাধ আমি ওনার আসার খবরটা কৃষ্ণকে আগেই জানিয়ে দিই। ব্যস, কৃষ্ণ পালিয়ে যায়। বিরজা অপমান, অভিমানে আত্মহত্যা করে। আর রাধা দেবী অভিশাপ দিয়ে আমাকে অসুর করে দেয়। বুঝুন, একজন প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে আমি আমার কাজটা সঠিকভাবে করার জন্য অপরাধী হলাম। আমিও ছাড়িনি বুঝলেন, অভিশাপ দিলাম যে, ওনাকে একশো বছর কৃষ্ণ-বিরহ সহ্য করতে হবে। করলেনও তাই, একশো বছর ধরে তিলে তিলে … কৃষ্ণবিরহ কি মারাত্মক জিনিষ সেটা যারা ফিল করেছে তারাই জানে’।

আমি ওনাকে অনেক করে অনুরোধ করাতে উনি একটু নরম হলেন। বললাম, এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলে মিডিয়াতে বিপ্লব হবে। কোথাও কোনদিন রাধাদেবীর নিজের বলা একটা লাইনও প্রকাশিত হয়নি। মানুষ তাঁর ভাবনা, মান, অভিমান, বিরহ, সব তাঁর মুখ থেকেই জানতে পারবে, আর এই বিপ্লবের কান্ডারী হবেন আপনি। এই দোলে পৃথিবীর মানুষের কাছে এটা একটা বড় পাওনা। রাধাদেবী ছাড়া দোল বা বসন্ত উৎসবের কোন মানে নেই। সুদামাবাবু, মানুষ আপনাকে মাথায় করে রাখবে।

আরও পড়ুন:  দয়া করে অটিস্টিক বাচ্চাকে ‘পাগল’ ভাববেন না

সুদামাবাবু রাধাদেবীকে ফোন করলেন। রাধাদেবী ফোনে ওনার সঙ্গে খুব ভালভাবেই কথা বললেন এবং আমাকেও সময় দিলেন, কিন্তু মুশকিল হলো জায়গা নিয়ে। উনি যমুনার তীরে সেই কুঞ্জবনেই কথা বলতে চাইছেন। আমি ওনাকে বুঝিয়ে বললাম, ম্যাডাম সেই কুঞ্জবন আর নেই, একটাও কদম গাছ নেই। চারদিকে বড় বড় কমপ্লেক্স, মল, টাওয়ার। আর যমুনার অবস্থাও খুব করুন, প্রায় একটা খাল হয়ে গেছে। উনি আমার কথা বুঝলেন এবং ওনার বাড়িতেই আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিলেন কিন্তু একটা শর্তে, চারটের বেশি প্রশ্ন করা যাবে না। আমি ওনার সব শর্ত মানার জন্য তৈরি ছিলাম।  

সেই বৈপ্লবিক সাক্ষাৎকার একটুও এডিট না করে পুরোটাই প্রকাশিত হলো। পৃথিবীর মানুষকে বসন্ত উৎসবে এই অসাধারণ উপহারটি যিনি দিলেন তিনি কৃষ্ণের পি.এ সুদামাবাবু। তার জন্যই এই অসম্ভব সম্ভব হল। সাক্ষাৎকারটি পড়ে পাঠক তাকে একটু ধন্যবাদ জানাবেন প্লিজ। 

একটা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে, খোলা চুলে রাধাদেবী এসে বসলেন। সুন্দরী শব্দের প্রকৃত অর্থ চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করলাম। ওনার দিকে তাকিয়ে কথা হারিয়ে ফেলেছিলাম। উনিই বললেন…

রাধা – কী খাবেন ? চা, কফি না সরবত ?

জলদ – চা

রাধা – এই বিশাখা, এখানে দুকাপ চা দিতে বল… বলুন আপনি কী জানতে চান ?

জলদ – আসলে সামনেই আমাদের দোল উৎসব। এই উৎসব আপনাদের দুজনকে ছাড়া একেবারেই অচল। তাই এই উৎসবের…

রাধা – ভুল, ভুল একদম ভুল। এই দোল উৎসবের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ তৈরি করেন আপনারা মানে মানুষেরা।  ওর গায়ের রঙ কালো ছিল। যদিও সেটাই ওর সৌন্দর্য, আকর্ষণ। ও আমার গায়ের রঙও কালো করার জন্য আমার গায়ে রঙ ছুঁড়ে দিত। এটা ও লুকিয়ে লুকিয়ে করত । আমি খুব মুশকিলে পড়তাম জানেন। কী করব, ওভাবে বাড়ি যাব কী করে… খুব কান্না পেত, আবার ভালও লাগতো, মনে হত আরও রঙ দিক… যত খুশি দিক…

আরও পড়ুন:  আজকের গণতন্ত্র কি রাজতন্ত্রেরই পরিবর্তিত রূপ?

(বিশাখা চা নিয়ে আসে, ললিতার হাতে ট্রেতে মিষ্টি)

রাধা – ওদের দুজনকে তো নিশ্চয়ই চেনেন, ও বিশাখা, আর ও ললিতা। যাই হোক, যেটা বলছিলাম। মাত্র বারো বছর বয়সে ও আমাকে ছেড়ে, বৃন্দাবন ছেড়ে দেশ গড়ার কাজে চলে যায়, আর ফিরে আসেনি, তাহলে আমরা দোল খেললাম কখন ?

আসলে আমি ওর থেকে বয়সে অনেকটাই বড় হলেও ও আমাকে খুব পছন্দ করত, ভালবাসতো। আমিও তাই, ওকে একদিন না দেখে আমি থাকতে পারতাম না। আমার গায়ে রঙ দেওয়াটা শুধুমাত্রই ওর দুষ্টুমিই ছিল, কোন উৎসব অনুষ্ঠান ছিল না।

জলদ – তাহলে এই দোল উৎসবের শুরু কোথায় ?

রাধা – তখন পৃথিবীতে কেশি নামে এক ভয়ঙ্কর অসুর মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত করে দিয়েছিল। তার অত্যাচারে মানুষের সমাজ সংসার সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। ও কেশি’কে হত্যা করে মানব সভ্যতাকে বাঁচায়। বসন্ত পুর্ণিমার এই দিনে ওর হাতে কেশি মারা যায়। মানুষ আনন্দে আত্মহারা হয়ে অত্যাচারী কেশির রক্ত চারদিকে ছড়িয়ে আনন্দ করে। সেটাই প্রথম দোল উৎসব বা রঙ খেলার আদি ইতিহাস। আর হোলিকার বিষয়টা তো আপনারা সবাই জানেন। হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদকে মারার জন্য কত কান্ডই না করেছিল। শেষে নিজের বোন হোলিকার কোলে প্রহ্লাদকে দিয়ে আগুনে প্রবেশ করালো। হোলিকার আগুনে প্রবেশ করার ক্ষমতা থাকলেও সে জানতো না যে, অন্য কাউকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে সে নিজে মারা যাবে। ঘটনাটা তাই ঘটলো। হোলিকা পুড়ে মরলো আর প্রহ্লাদ বেঁচে গেল। এই হোলিকার মৃত্যুকে ঘিরেই হোলি উৎসবের সূচনা হয়। এসব কিছুই ওর কৃতিত্ব। ও ভক্তদের জন্য এমনই ব্যাকুল, এতটাই সিরিয়াস… শুধু আমার বেলা…

জলদ – আপনিও কি ওনার ভক্ত ছিলেন ?

রাধা – সে সময় সবাই ওর ভক্ত ছিল। ওর মতো ক্ষমতা, বুদ্ধি, বীর সে সময় আর কে ছিল বলুন ? তাছাড়া ওর কথা বলার স্টাইল বা মানুষকে বোঝানোর ক্ষমতা, ওর তীব্র আকর্ষণ, ও সবাইকে হিপনোটাইস করে দিতে পারতো। মানছি আমিও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু আপনি বলুন, ওর প্যারালাল কোন মানুষ পৃথিবীতে একজনও এসেছে ? আগামীতে আসবে বলে আপনার মনে হয় ?      

আরও পড়ুন:  বাংলা, বাড়ি যা..

জলদ – না, সত্যিই আজও উনি আনপ্যারালাল কিন্তু দোল উৎসব আপনাদের দুজনের উৎসব হলো কী করে সেটা তো বললেন না ?

রাধা – পরবর্তীকালে বৃন্দাবনের মানুষই আমাদের জড়িয়ে দোল উৎসবের সুচনা করে। তারা ছাড়াও দেশ বিদেশের মানুষ আমাদের সম্পর্কটা নিয়ে প্রথম থেকেই খুব ইন্টারেস্টেড। আজও মানুষ প্রেম বলতে আমাদের দুজনের প্রেমকেই বোঝেন। কিন্তু প্রেমের আসল অর্থ হল নিবেদন। এ নিবেদন হৃদয়ের, এ নিবেদন অন্তরের। এখানে সমাজ, সংসার, সম্পর্ক সবই অর্থহীন হয়ে যায়। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তাই বৈধ অবৈধের সামাজিক বেড়া পার করে মানুষও আমাদের প্রেমকে মর্যাদা দিয়েছে, সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছে। দোল বা বসন্ত উৎসব সেই প্রেমেরই প্রতীক, যেখানে ভালবাসার রঙ লেগে হৃদয় রঙিন হয়ে ওঠে। সব যন্ত্রনা দুঃখ ভুলে মানুষ মেতে ওঠে আনন্দে।

জলদ – আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। দোলের আগাম শুভেচ্ছা। এই উৎসবে পৃথিবীর মানুষকে  যদি কোন বার্তা দেন…

রাধা – সবাই দোল খেলুন, আনন্দ করুন। কিন্তু মনে রাখবেন,  শুধু শরীরে রঙ মাখলেই দোল খেলা হয় না, মনে রঙ মাখাই প্রকৃত দোল খেলা। সবাই ভাল থাকুন।

NO COMMENTS