মুখে যতই বলি, বয়স একটা সংখ্যা মাত্র, জীবন কিন্তু অন্য গল্প শোনায়| বয়স যত সামনের দিকে গড়ায় তত জমে থাকা নানা স্মৃতি মনকে ধূসর করে| সেই যন্ত্রণা চাপতে গিয়ে কেউ হারিয়ে ফেলেন সৌজন্যের মাত্রা বোধ| কেউ সরিয়ে নেন, গুটিয়ে নেন সবার থেকে| সব কিছু থেকে| জীবনের সায়াহ্নে পৌছে এই সমস্যা কি আপনারও? আপনার মতো আরও যাঁরা এই ধরনের সমস্যায় জেরবার, মন বিশ্লেষক দেবলীনা লাহিড়ি রয়েছেন তাঁদের পাশে—

Banglalive

ঘটনা ১: রজত চৌধুরি| বয়স ৬৪ বছর| নেভিতে চাকরি করতেন| কলকাতার বাসিন্দা| স্ত্রী আর দুই মেয়ে নিয়ে ছিমছাম সংসার| দুই মেয়েই কলেজে পড়ে| মাত্র ৪৭ বছর বয়সে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে নিয়েছেন| তারপর থেকে রজত ঘরে বসা| কোথাও কিচ্ছু কাজ করেন না| এবং সমস্যার শুরু সেখান থেকেই| স্ত্রী এবং দুই মেয়ের নানা অভিযোগ রজতকে নিয়ে|

কী করেছেন রজত? দীর্ঘদিন ধরে প্রচন্ড মদ্যপান করছেন| একটুতেই রেগে যান| আর রেগে গেলে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন| সারাক্ষণ অকারণ উদ্বেগে উদ্বিগ্ন| সঙ্গে অবসাদ| এদিকে স্ত্রী বা মেয়ে যদি কোনো কাজ করতে বলেন, তাতেও রাজি হন না রজত| কারণ, নিজেকে নিয়ে তাঁর প্রচন্ড ভয়| দীর্ঘদিন বাড়ি বসে আছেন| যদি নতুন কাজে গিয়ে না মানাতে পারেন! বা আদৌ কি তিনি আর কাজ করতে পারবেন?

এদিকে দীর্ঘদিন বাড়িতে বসে থেকে তাঁর শরীরও ভেঙ্গে পড়ছে| এসবের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে রজত তাঁর স্ত্রীর ওপর শারীরিক অত্যাচার করতেন| বিয়ের পর থেকেই রজতের হাতে অত্যাচারিত তাঁর স্ত্রী| ৪০ বছর বয়সে আসার পর থেকেই মদ্যপান শুরু করেছেন| মেয়েদের জন্মের পরে রেহাই দিতেন না তাদেরও| তাদের ওপর তিনি মানসিক নির্যাতন চালাতেন| এছাড়া, অল্প বয়সে এক্সট্রা ম্যারিটাল সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়েছিলেন একাধিকবার| তখনও তিনি অকারণ উদ্বেগ আর মানসিক অবসাদে ভুগতেন| কেন ছোট পরিবার হয়েও সুখী পরিবার হল না রজতের? রজতের আসল সমস্যা কী?

কী হয়েছে, কেন হয়েছে— দীর্ঘ সময় রজতের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, ওঁর একাধিক সমস্যা রয়েছে| প্রথমত, রজত স্নায়বিক সমস্যায় ভুগছেন| সেটা এই বয়সে অনেকেই ভোগেন| রজতের সাইকোলজিকাল টেস্ট এবং ইইজি-র রিপোর্ট ভালই| কিন্তু কেস হিস্ট্রি বলছে, রজত Bipolar Affective Disorder-এ ভুগছেন| তার থেকেই তিনি মদ্যপায়ী| সবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছেন এই কারণেই|

সমাধান— রজতকে সুস্থ করতে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি cognitive behavioural therapy শুরু করা হল| এই থেরাপিতে রজতের অবসাদ যখন কিছুটা কমলো তখন তাঁর পরিবারের সবাইকে নিয়ে psycho-education শুরু করলাম| ওদের শেখালাম, রজতের মানসিক সমস্যা বেশি হলে কী করে সবাই তাঁকে সামলাবেন| তাঁকে বোঝাবেন| রজত সাহায্য চাইলে তাঁরা কী করে সাহায্য করবেন| কী দেখে বুঝবেন, রজত অবসাদে ভুগছেন| কী করে রজত রাগ সামলাবেন, সেটাও তাঁকে শেখানো হলো| প্লাস বাড়ির লোককে বোঝানো হল, কীভাবে তাঁরা মনের ভাব প্রকাশ করবেন রজতের সামনে|

এভাবে টানা ৪ মাস ট্রিটমেন্ট-এর পর রজত যখন অনেকটাই সুস্থ, আচমকা একদিন তিনি চিকিত্সা বন্ধ করে দিলেন| তার ফল দাঁড়াল আরও ভয়ঙ্কর| মানসিক এবং শারীরিক দিক থেকে রজত এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে তাঁকে মানসিক হাসপাতালে রেখে চিকিত্সা করাতে হয়েছিল| টানা ৭ দিন হসপিটালে থাকার পর রজত বাড়িতে ফেরেন| ভগবানের অসীম কৃপা যে বড় ধরনের ক্ষতি কিছু হয়নি তাঁর|

এখন রজত ৬ মাসে একবার আসেন মানসিক চিকিতসার জন্য| ৩ মাসে একবার আসেন শারীরিক চিকিত্সা করাতে| রজত কিন্তু এখন অনেকটাই ভালো আছেন|   

যোগাযোগ: ৯৮৩০৫-৪৫৯৩৬      

আরও পড়ুন:  গরমে কীভাবে হিট স্ট্রোকের হাত থেকে বাঁচবেন? জেনে নিন

NO COMMENTS