মুখে যতই বলি, বয়স একটা সংখ্যা মাত্র, জীবন কিন্তু অন্য গল্প শোনায়| বয়স যত সামনের দিকে গড়ায় তত জমে থাকা নানা স্মৃতি মনকে ধূসর করে| সেই যন্ত্রণা চাপতে গিয়ে কেউ হারিয়ে ফেলেন সৌজন্যের মাত্রা বোধ| কেউ সরিয়ে নেন, গুটিয়ে নেন সবার থেকে| সব কিছু থেকে| জীবনের সায়াহ্নে পৌছে এই সমস্যা কি আপনারও? আপনার মতো আরও যাঁরা এই ধরনের সমস্যায় জেরবার, মন-বিশ্লেষক পারমিতা মিত্র ভৌমিক রয়েছেন তাঁদের পাশে—

Holi Hai

 

পারমিতা মিত্র ভৌমিক

ঘটনা ১ : শাহীন খান| বয়স ৫২| আজীবন গৃহবধূ| বাড়িতে স্বামী দুই দত্তক সন্তান আর এক বোন থাকেন| এমন ভরভরন্ত সংসার পেয়েও সন্তুষ্ট নন নিরক্ষর শাহীন| আমার কাছে এসে তাঁর স্বামীর একরাশ অভিযোগ, গত দু’বছর ধরে শাহীন সারাক্ষণ অকারণ উদ্বেগ, দুশ্চিন্তায় ভোগেন| খাওয়ার পর প্যালপিটিশন বাড়ে| হাতে-পায়ে জোর নেই| শরীর জুড়ে ক্লান্তি| ঘুম কমেছে| রাগ বেড়েছে| মাথাব্যথায় কষ্ট পান| নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নিয়েছেন| কারোর সঙ্গে কথা বলতে চান না| রাস্তার জল বা খাবার কিচ্ছু খান না তিনি| তাঁর ধারণায়, ওগুলো ভীষণ নোংরা! পায়ের তলা ভীষণ জ্বালা করে মাঝে মধ্যেই| আবার শীতও করে তাঁর| মনে যতই চাপা কষ্ট থাক, মন খুলে কান্নাটুকুও আসে না তাঁর| বদলে সারাক্ষণ সন্তানের ভবিষ্যত আর নিজের অসুস্থতার জন্য ‘দোয়া’ প্রার্থনা করেন| কী হয়েছে শাহীনের?

কী হয়েছে, কেন হয়েছে— কথা বলে বুঝতে পারলাম, শাহীনের দু’টি সমস্যা| এক, সে মানসিক অবসাদে ভুগছে| দুই, সে অবসেসিভ কমপালসিভ সমস্যায় আক্রান্ত| পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, শাহীনের জীবনে সমস্যা অনেক| তার সিংহভাগ সমাধান হয়নি আজও| সে গর্ভে সন্তান ধারণ করতে পারেনি| তার জন্য অনেক খারাপ কথা শুনতে হয়েছে| শ্বশুরবাড়ির সবাই খুব বিরক্ত তার ওপর| অনেক খারাপ কথা শুনতে হয়েছে| শুধু স্বামী পাশে থাকায় বাড়ির লোকের বিরুদ্ধে গিয়ে ছেলে-মেয়েকে দত্তক নিয়েছেন| এর জন্য শাহীন একঘরে হয়েছেন| তাঁকে আর তাঁর সন্তানদের বাড়ির কেউ পছন্দ করে না| এত যন্ত্রণা সামলাতে গিয়েই আজ তাঁর এই অবস্থা|

সমাধান— ওষুধের পাশাপাশি শাহীনের cognitive behavioural therapy হয়েছে| অবসাদের মাত্রা কমলে anxiety/stress management programme চলছে| একই সঙ্গে পরিবারের সবাইকেই কাউন্সেলিং করা হয়েছে| যাতে সবাই ওর সমস্যা বোঝে| শাহীন কিন্তু এখন অনেকটাই ভালো আছেন|

ঘটনা ২ : ৬২ বছরের সন্ধ্যা সিংঘনিয়ার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে গত ১ বছর ৩ মাস ধরে| ৫৪ বছর বয়সে বিধবা হওয়ার পর থেকে আপাদমস্তক গৃহবধূ সন্ধ্যা ভীষণ একা| শাহীনের মতই সারাক্ষণ অকারণ অস্থিরতা, অনিদ্রা, ক্লান্তি, দুশ্চিন্তায় ভোগেন| উপরি সমস্যা, একটুও বনিবনা নেই ছেলের বউয়ের সঙ্গে| বিয়ের পরে মেয়ে প্রবাসী| সন্ধ্যার অভিযোগ, বউমা চাকরি করেন| তাই ঘরের কাজের প্রতি একটুও মন নেই| এদিকে ছেলের অভিযোগ, সব ব্যাপারে মায়ের নাক গলানোয় তাদের দাম্পত্য জীবন নষ্ট হতে বসেছে| সন্ধ্যা কি সত্যিই সৌজন্য বোধ হারিয়েছেন?

কী হয়েছে, কেন হয়েছে— সন্ধ্যার আসল সমস্যা ছেলের প্রতি অধিকার বোধ থেকে| সেই জায়গা থেকে সে কিছুতেই বউমাকে মেনে নিতে পারছেন না| বউমার সঙ্গে জেনারেশন গ্যাপ আরও একটা ফ্যাক্টর| সব মিলিয়ে সন্ধ্যা তাঁর ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন|

সমাধান— সমস্ত কথা শোনার পর আমরা সন্ধ্যা এবং তাঁর ছেলে-বউমার সঙ্গে আলোচনায় বসি| ছেলেকে মায়ের সঙ্গে রোজ একান্তে কিছু সময় কাটানোর পরামর্শ দেওয়া হয়| পাশাপাশি দু’জনকেই বলা হয়, সারাক্ষণ বাড়িতে অশান্তি না করতে| এবার সন্ধ্যার পালা| একাকিত্ব কাটাতে তাঁকে লেডিস ক্লাব আর জিম জয়েন করতে বলি| কারণ, ক্লাবে অন্য মহিলাদের সঙ্গে সময় কাটালে মন ভালো থাকবে| শরীরচর্চা করলে এন্ডরফিন আর adrenaline ক্ষরণ সঠিক মাত্রায় হবে| ছেলে-বউমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে তিনি যাতে আর নাক না গলান সেটাও মেনে চলতে বলি তাঁকে| সঙ্গে ফোন আর whatsappএ কথা বলে থেরাপিস্ট রোজের সমস্যা সমাধান করেছেন| এখন মাসে মাত্র একবার আসতে হয় সন্ধ্যাকে| বউমার সঙ্গে তাঁর ব্যবহার অনেকটাই বদলেছে|

 

চলবে

পারমিতা মিত্র ভৌমিক – যোগাযোগ: ৯৮৩০০-২১৫৬৭

আরও পড়ুন:  প্রজাতন্ত্র, পাবলিক ও পরিণত জনমানস

NO COMMENTS