প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না? জেনে নিন কী কারণে হয় এমন…

482

আচমকা হাঁচলে বা কাশলে বা খুব জোড়ে হাসলে শৌচালয়ে পৌঁছানোর আগেই প্রসাব হয়ে যায় ? চাইলেও চেপে রাখতে পারেন না? জেনে রাখুন এটি কিন্তু ঠিক কোনও অসুখ নয়, প্রাথমিকভাবে মুত্রথলি বা মুত্রনালীর সংক্রমণের ফলে এই সমস্যা হয়ে থাকে। এই সমস্যা কমবেশি পুরুষ-নারী উভয়েরই হয় – বিশেষ করে বৃদ্ধবয়সে এই সমস্যায় অনেকেই ভোগেন। বয়সকালে এই সমস্যা পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের বেশি হয়। যদিও স্বাস্থ্যের দিক থেকে এটি গুরুতর সমস্যা নয়, কিন্তু এইধরণের সমস্যা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলে।

মূত্রথলি থেকে মূত্র বেরোনোর সময়ে মূত্রনালীর চারিদিক পেশী দিয়ে ঘেরা থাকে। পুরুষদের ক্ষেত্রে মূত্রনালী প্রস্টেটের মধ্যে দিয়ে যায়। মূত্রস্থলী যখন প্রস্রাবে পূর্ণ হয়ে যায়, যতক্ষণ পর্যন্ত না স্নায়ু মারফত সংকেত আসে, ততক্ষণ ঘিরে থাকা পেশী শক্ত হয়ে মূত্রনালীর পথ চেপে বন্ধ করে রাখে, ফলে মূত্রস্থলী প্রস্রাব-পূর্ণ হলেও সেটি বাইরে বেরিয়ে আসে না। প্রস্রাব হওয়ার সময়ে মূত্রথলি স্নায়ুর সংকেতে সংকুচিত হতে সুরু করে এবং মূত্রনালীকে ঘিরে থাকা পেশী শিথিল হয় এবং মূত্র বেরিয়ে আসে।

প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণের অসুবিধা তখনই হয়, যখন সংকুচিত হওয়া উচিত তখন না হয়ে অত্যাধিক প্রস্রাবে পরিপূর্ণ হয়ে যায়, যার প্রবল চাপে অনিচ্ছাসত্বেও মূত্র বেরিয়ে আসে। এছাড়া মূত্রনালীকে ঘিরে থাকা পেশী ঠিকমতো তার কাজ না করলেও এই সমস্যা হতে পারে। অনেক সময়ে এই নিয়ন্ত্রণের সমস্যা হঠাৎ করে অল্প দিনের জন্য দেখা দেয়, আবার নিজে থেকেই তা ঠিক হয়ে যায়। এগুলি বিভিন্ন অসুখের জন্য হতে পারে এবং সেই অসুখের চিকিৎসা করলে তা ঠিকও হয়ে যেতে পারে। অন্য সমস্যা হল ক্রনিক সমস্যা – যেটি দীর্ঘস্থায়ী।

কেন হয় এই ধরণের সমস্যা?

# ডায়বেটিস হলে রক্তে শর্করার মাত্রা অনেকখানি বৃদ্ধি পায়। টাইপ ১ এবং টাইপ ২ ডায়বেটিস-এর কারণে কিডনি ফিল্টার করতে পারে না। ফলে বার বার প্রস্রাবের একটা প্রবণতা থেকে যায়। টাইপ ১ ডায়বেটিসের থেকে টাইপ ২ ডায়বেটিস একেবারে আলাদা। ডায়বেটিস ইনসিপিডাস হলে ভাসোপ্রেসিন হরমোন বেশি মাত্রায় বেরোতে থাকে। ফলে রক্তে অতিরিক্ত পরিমাণে জল মিশে যায়। যার জন্য শরীর থেকে অনেক জল বেরিয়ে যায় মূত্রের মাধ্যমে। এর পাশাপাশি ক্লান্ত হয়ে যাওয়া বমি বমি ভাব এই ধরণের সমস্যা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ।

# কিডনি, লিভার বা উচ্চরক্তচাপ-এর সমস্যা থাকলেে চিকিৎসকেরা ডিউরেটিক্স জাতীয় ওষুধ দিয়ে থাকেন। এর ফলে প্রস্রাবের সঙ্গে অতিরিক্ত সোডিয়াম বেরিয়ে যেতে পারে। শরীরে সোডিয়াম ও পটাসিয়ামের মাত্রা সঠিক না থাকলে তা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। ফলে অতিরিক্ত প্রস্রাব হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এই ধরণের সমস্যা হলে অবিলম্বে চিকিৎসককে জানিয়ে ওষুধের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া উচিৎ।

# মানসিক চাপ বা স্ট্রেস-জনিত কারণে অনেক সময় এই সমস্যা দেখা দেয়। এটা সাধারণত ঘটে যখন কোনো কারণে মূত্রথলিতে চাপ পড়ে – যেমন, কাশলে, হাঁচলে, জোরে হাসলে বা ওজন তুললে। পুরুষদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ে প্রস্টেট গ্রন্থির সার্জারির পর এটা দেখা দেয়। কোনো কারণে এই সার্জারির সময়ে স্নায়ু বা মূত্রনালীর চারপাশের পেশী আঘাত পেলে তা অকেজো হয়ে পড়তে পারে বা তার শক্তি কমে যেতে পারে। তখন মূত্রথলির উপর চাপ পরলে প্রস্রাব আটকে রাখা যায় না।

# অতিরিক্ত মদ্যপান করলে বা একাধিক বার কফি খেলে কিডনিতে চাপ পড়ে। ফলে কিডনি প্রয়োজনের থেকে অতিরিক্ত জল ফিল্টার করে। সেখান থেকে জটিল সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

# নারীদের ক্ষেত্রে সন্তানের জন্ম দেওয়ার সময়ে, বা অত্যাধিক ওজন বৃদ্ধি হলে কিংবা অন্য কোনো কারণে পেটের নিচের পেশীগুলি শিথিল হয়ে পড়লে সেটি মূত্রথলিকে ঠিকমত ধরে রাখতে পারে না, ফলে অতিরিক্ত প্রস্রাব হওয়ার প্রবণতা থেকেই যায়।

# অনেক সময়ে এত প্রস্রাবের বেগ আসে যে, শৌচালয়ে পৌঁছনো পর্যন্ত তা চেপে রাখা যায় না। এই অবস্থাকে অনেক সময়ে অতি-ক্রিয়াশীল মূত্রথলি (overactive bladder) বলা হয়। এই সমস্যার সঠিক কারণ কী তা অনেক সময়েই ধরতে পারা যায় না। তবে এর মূলে মূত্রনালীর কোনো সংক্রমণ, মূত্রস্থলীর ক্যানসার, প্রস্টেটের সমস্যা, পার্কিন্সন্স, স্ট্রোক ইত্যাদি জড়িত থাকতে পারে।

# অনেক সময়ে প্রস্রাবের পরেও মূত্রথলি সম্পূর্ণ খালি হয় না। একটু একটু করে সেটা বেরোতে থাকে। মূত্রস্থলীর পেশীগুলি দুর্বল হয়ে পড়লে বা অন্যকোনো বাধার জন্য যেমন- মূত্রনালী কোনো কারণে ক্ষুদ্র হয়ে গেলে কিংবা পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে গেলে সেটা ঘটতে পারে। মূত্রনালীকে যে পেশীগুলি চেপে বন্ধ করে রাখে সেগুলি দুর্বল হয়ে গেলে সব সময়েই একটু একটু প্রস্রাব বের হতে থাকে।

এর চিকিৎসা কি ?

প্রথমে সমস্যার গোড়ায় পৌছোতে হবে যে, কেন এই সমস্যা হচ্ছে। তারজন্য মূত্র পরীক্ষা, পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রস্টেট গ্ল্যান্ড পরীক্ষা ও অন্যান্য আরও কিছু পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র ওষুধ, ব্যায়াম, কিংবা অপারেশন করেই এই সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.