মা ষষ্ঠীর সঙ্গে ঘটা করে জামাই-আদরের সম্পর্ক কী?

আজকাল সারা পৃথিবী জুড়েই এক একটা দিনকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করার জন্য নামকরণ করা হয় — আন্তর্জাতিক শ্রমদিবস, ভাষাদিবস, কৃষাণ দিবস, মাতৃত্ব দিবস, শিশু দিবস ইত্যাদি | পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমাজ বিজ্ঞানীরা বা রাজনৈতিক নেতৃবর্গ এতকাল পরে যেটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন তা আমাদের দেশের মুনি-ঋষিগণ বা সমাজের বিধানদাতারা ভেবেছেন অনেক আগেই | আর তারই ফলস্বরূপ রক্তের বন্ধন, আত্মীয়তার বন্ধন বা সামাজিক বন্ধনকে অটুট রাখতে বা কোনও কোনও ক্ষেত্রে আরও জোরালো করতে তাঁরা সমাজে চালু করেছেন ভ্রাতৃদ্বিতীয়া, রাখীবন্ধন ইত্যাদি | আর এতেই সম্ভবত সর্বশেষ সংযোজন জামাইষষ্ঠী |

জামাইকে কেন্দ্র করে ষষ্ঠী উৎসব পালন করা হয় প্রধানত পশ্চিমবঙ্গে | কন্যার বিবাহের মাধ্যমে একটি পরিবারের সঙ্গে আর একটি পরিবারের যে সম্পর্ক স্থাপন করা হয় সেই সম্পর্ককে সুদৃঢ় করাই এই জামাই ষষ্ঠীর উদ্দেশ্য | তাই এদিন মেয়ে-জামাইকে যেমন নেমন্তন্ন করা হয় তেমনি আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদেরও ডাকা হয় | সকলে অন্তরঙ্গভাবে মিলেমিশে মহা সমারোহে এই ধর্মীয় তথা সামাজিক উৎসব পালন করে |

আমাদের দেশে সেই অতি প্রাচীনকাল থেকেই বহুদেবত্ববাদের পূজারি হিন্দু মুনিঋষিগণ বিভিন্ন দেবদেবীর পাশাপাশি কিছু উপদেবতারও পুজো করতেন | ‘ষষ্ঠী’ বা ‘মা ষষ্ঠী’ সেইরকমই এক উপদেবতা | সম্ভবত শিশুমৃত্যু ও প্রসূতি মৃত্যুর হার অত্যধিক বেশি হওয়ায় শিশুর জন্ম ও স্বাস্থ্যরক্ষা এবং প্রসূতির জীবনরক্ষার ভার ন্যস্ত করা হয় এই মা ষষ্ঠীর কাছে | তাই সন্তানের মঙ্গল কামনায় মায়েরা ষষ্ঠীর পুজো করে থাকেন | এখন প্রশ্ন উঠতে পারে — মা ষষ্ঠীর সঙ্গে জামাই-এর সম্পর্ক কী ?

ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একসময় সংস্কার ছিল কন্যা যতদিন না পুত্রবতী হয় ততদিন কন্যার পিতা বা মাতা কন্যাগৃহে পদার্পণ করবেন না | এই ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিল — সন্তানধারণে সমস্যা বা সন্তান মৃত্যুর (শিশুমৃত্যু) ফলে কন্যার পিতামাতাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হত কন্যার বাড়ি যাওয়ার জন্য | সেক্ষেত্রে বিবাহিত কন্যার মুখদর্শন কীভাবে ঘটে? তাই সমাজের বিধানদাতা জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লা ষষ্ঠীকে বেছে নিলেন জামাই ষষ্ঠী হিসাবে | যেখানে মেয়ে জামাইকে নেমন্তন্ন করে সমাদর করা হবে ও কন্যার মুখ দর্শন করা যাবে আর সেইসঙ্গে মা ষষ্ঠীর পুজো করে তাঁকে খুশি করা যাতে কন্যা শীঘ্র পুত্রমুখ দর্শন করতে পারে | বর্তমানে অবশ্য এই সংস্কার পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছে — কন্যার পিতামাতা অথবা যে ব্যক্তি কন্যা সম্প্রদান করবেন তিনি এক বৎসর কন্যার বাড়ি যাবেন না বা গেলেও কন্যার বাড়ির অন্নগ্রহণ করবেন না | যদিও আধুনিক শহুরে জীবনে এই সংস্কার বিশেষ গুরুত্ব পায় না | সংস্কার যাই হোক না কেন, মেয়ে জামাইকে ডেকে এনে সমাদর করা ও সেইসঙ্গে কন্যা যাতে সন্তানবতী হয় সেই লক্ষ্যে ‘মা ষষ্ঠীকে’ জুড়ে দিয়ে উৎসবের নামকরণ হল জামাই ষষ্ঠী |

ষষ্ঠী-পালন সাধারণত করে থাকেন মেয়েরা | তাঁদের কাছে এর তাৎপর্য অন্যরকম | কথিত আছে — এক পরিবারে দুটি বউ ছিল | ছোট বউ ছিল খুব লোভী | বাড়ির মাছ বা অন্যান্য ভাল খাবার রান্না হলেই সে লুকিয়ে লুকিয়ে খেয়ে নিত আর শাশুড়ির কাছে অভিযোগ করত ‘সব কালো বেড়ালে খেয়ে নিয়েছে |’ বেড়াল মা ষষ্ঠীর বাহন | তাই বেড়াল, মা ষষ্ঠীর কাছে অভিযোগ জানাল | মা ষষ্ঠী রেগে গেলেন | ফলে ছোট বউ-এর একটি করে সন্তান হয় আর মা ষষ্ঠী তার প্রাণ হরণ করেন | এইভাবে ছোট বউয়ের সাত পুত্র ও এক কন্যাকে মা ষষ্ঠী ফিরিয়ে নেন | ফলে স্বামী, শাশুড়ি ও অন্যান্যরা মিলে তাকে ‘অলক্ষণা’ বলে গালিগালাজ করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় | অথচ বড় বউ পুত্রকন্যাদের নিয়ে সুখে ঘর করতে থাকে |

যাই হোক, ছোট বউ মনের দুঃখে বনে চলে যায় ও একাকী কাঁদতে থাকে | শেষে মা ষষ্ঠী বৃদ্ধার ছদ্মবেশে তার কাছে এসে কান্নার কারণ জানতে চান | সে তার দুঃখের কথা বলে | তখন মা ষষ্ঠী তার পূর্বের অন্যায় আচরণের কথা বললে সে মাফ চায় | ষষ্ঠী তাকে ক্ষমা করেন | এরপর বলেন — ভক্তিভরে ষষ্ঠীর পুজো করলে সাতপুত্র ও এক কন্যার জীবন ফিরে পাবে | তখন ছোট বউ সংসারে ফিরে এসে ঘটা করে মা ষষ্ঠীর পুজো করে ও ক্রমে ক্রমে তার পুত্র কন্যাদের ফিরে পায় | এর থেকে দিকে দিকে ষষ্ঠী পুজোর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে | এটাই জামাই ষষ্ঠী বা অরণ্যষষ্ঠী ব্রতকথার মূল গল্প |

এদিকে যে সময় জামাই ষষ্ঠী পালন করা হয় অর্থাৎ জৈষ্ঠ্য মাসে, প্রকৃতিতে আম-জাম-কাঁঠাল ইত্যাদি নানা ফলের সমারোহ | তাই খুব ঘটা করে এদিন শাশুড়িরা ষষ্ঠীর পূজা করেন | তারপর নেমন্তন্ন করে নিয়ে আসা জামাইকে আসনে বসিয়ে প্রথমে কপালে দইয়ের ফোঁটা দিয়ে আশীর্বাদ করেন ও দীর্ঘজীবন কামনায় মা ষষ্ঠীর স্মারক তেল-হলুদে চোবানো সুতো হাতের কবজিতে বেঁধে দেন | এরপর আশীর্বাদী বস্ত্রাদি জামাইয়ের হাতে তুলে দেন | আর সামনে বিবিধ মিষ্টান্নসহ নানা ফল খেতে দেন | অবশ্য জামাই বাবাজীও শ্বশুরবাড়ি ঢোকার সময় যেমন দই-মিষ্টি আনতে ভোলে না তেমনি আশীর্বাদের পর প্রণামী হিসেবে শাশুড়িকে বস্ত্রাদি দিয়ে থাকে | এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য — শুধুই জামাই নয়, মেয়েও কিন্তু বস্ত্রাদি উপহার হিসাবে পেয়ে থাকে |

সমারোহের ব্যাপার বোঝা যায় দুপুরের আহারে | তখন গরমভাতে ঘি থেকে শুরু করে শেষে পানমশলা | মাছ, বাঙালির প্রিয় এবং মাঙ্গলিক বলে — ইলিশমাছের পাতুরি, গলদা চিংড়ির মালাইকারি, দই-রুই, ভেটকি মাছের ফ্রাই ইত্যাদি মাছেরই অনেক রকম পদ এবং মাংস ( জামাই রাত্রে থাকলে সাধারণত রাত্রে হয় ), চাটনি, দই, মিষ্টি ইত্যাদি নানা ব্যঞ্জন ভাতের ( বাসমতী বা গোবিন্দভোগ চালের ) থালার চারপাশে সাজিয়ে দেওয়া হয় |

আগেকার দিনে শাশুড়িরা সাধারণত জামাইকে খেতে দিয়ে তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করতেন | এখন ইলেকট্রিক ফ্যান আর এসি-র দৌলতে তার আর প্রয়োজন হয় না | বছরের পর বছর এইভাবে চলতে থাকায় ভগ্নীপতিরা কখন যে শ্যালকদের কাছের মানুষ হয়ে ওঠে তা বোঝা যায় না | পরবর্তীকালে অনেক সময় দেখা গেছে এই ভগ্নীপতিরাই ছোট ছোট শ্যালকদের মনের অগোচরে অভিভাবকের স্থান দখল করেছেন | তবে দুঃখের বিষয় আজ আর সেদিন নেই | শ্বশুর-শাশুড়ি যতদিন আছেন বা সংসারে তাঁদের কর্তৃত্ব আছে ততদিনই জামাইদের আদর-আপ্যায়ন থাকে | পরবর্তী কালে সম্পত্তি আইনে, বাবার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির উপর ভাই এবং বিবাহিত বোন সমান অংশীদার হওয়ায় রক্তের সম্পর্কও ব্যবসায়িক সম্পর্কে পরিণত হচ্ছে | বেশিরভাগ সংসারেই ভগ্নীপতিকে সংসারের / পরিবারের একজন না ভেবে পর ভাবা হচ্ছে | এইভাবে সমাজে ভাইবোনের মধুর সম্পর্কও যেমন হারাচ্ছে, তেমনি হারাচ্ছে বাঙালির সংস্কৃতি |

(পুনর্মুদ্রিত)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

One Response

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Illustration by Suvamoy Mitra for Editorial বিয়েবাড়ির ভোজ পংক্তিভোজ সম্পাদকীয়

একা কুম্ভ রক্ষা করে…

আগের কালে বিয়েবাড়ির ভাঁড়ার ঘরের এক জন জবরদস্ত ম্যানেজার থাকতেন। সাধারণত, মেসোমশাই, বয়সে অনেক বড় জামাইবাবু, সেজ কাকু, পাড়াতুতো দাদা